শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

English

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর চিন্তাধারায় মুস্তাক্বেরীন ও মুস্তায্‘আফীন

পোস্ট হয়েছে: জুন ১৫, ২০২১ 

news-image

-নূর হোসেন মজিদী  : “ মুস্তাকবেরীন্‌” (مستکبرين) ও “মুস্তায্‘আফীন্” (مستضعفين) কোরআন মজীদে ব্যবহৃত পরিভাষাসমূহের অন্যতম। এ দু’টি পরিভাষা যথাক্রমে کبر (বড়ত্ব, অহঙ্কার) ও ضعف (দুর্বলতা) ক্রিয়ামূল (মাছদার) থেকে নিষ্পন্ন। مستکبرين ও مستضعفين ছাড়াও উভয় ক্রিয়ামূল থেকে নিষ্পন্ন আরো বিভিন্ন শব্দরূপ ও ক্রিয়ারূপ কোরআন মজীদের অনেকগুলো আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআন মজীদের শুরুর দিকেই ইবলীস্ কর্তৃক হযরত আদমকে (‘আ.) সিজ্দাহ্ না করার কারণ সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে :

أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
‘সে অস্বীকার করল ও অহঙ্কার প্রদর্শন করল; বস্তুত সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ (সূরা আল্-বাক্বারাহ্ : ৩৪)

এখানে যে اسْتَكْبَرَ ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়েছে যার ক্রিয়ামূল (মাছদার) হচ্ছে استکبار (ইস্তিকবাার – যা کبر থেকে নিষ্পন্ন) এবং এর কর্তাবাচক বিশেষ্য (ইসমে ফাা‘এল্) مستکبر (বহুবচনে مستکبرون ও مستکبرين) – যার ব্যবহারিক তাৎপর্য ‘দাম্ভিক’ ও ‘বলদর্পী’ (অমার্জিত ভাষায় বললে ‘মাস্তান্’)।
আর ضعف ক্রিয়ামূল থেকে নিষ্পন্ন استضعاف-এর কর্মবাচক বিশেষ্য (ইসমে মাফ্‘ঊল্) مستضعف মানে ‘দুর্বলকৃত/ যাকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে’ (বহুবচনে مستضعفون ও مستضعفين)। যেমন, এরশাদ হয়েছে :

وَمَا لَكُمْ لا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ
‘তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা যুদ্ধ করছ না আল্লাহর রাস্তায় এবং মুস্তায্‘আফীনের জন্য ….?’ (সূরা আন্-নিসাা’ : ৭৫)

কোরআন মজীদে “ মুস্তাকবেরীন্‌” ও “মুস্তায্‘আফীন্” পরিভাষা এবং অভিন্ন মূল থেকে নিষ্পন্ন বিভিন্ন ক্রিয়াপদ ও বিশেষ্য অনেকগুলো আয়াতে ব্যবহৃত হলেও এ বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) যেভাবে দৃষ্টি দিয়েছেন তাঁর পূর্বে অন্য কোনো ইসলামি মনীষী সে ধরনের দৃষ্টি দিয়েছেন বলে জানা যায় না। বস্তুত ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের আগে-পরে সব সময়ই ইমামের বাণী ও ভাষণে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে এবং “ মুস্তাকবেরীন্‌” ও “মুস্তায্‘আফীন্” কা’রা, তাদের ভূমিকা কী, এ দু’টি শ্রেণির উদ্ভবের পিছনে নিহিত কারণ ও এ থেকে মানব প্রজাতির মুক্তির পন্থা কী সে সম্পর্কে তিনি বিশ্লেষণাত্মক মতামত ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা একটি গ্রন্থ রচনার দাবি রাখে; এখানে আমরা অত্যন্ত সংক্ষেপে এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করব।

সংক্ষেপে বলতে গেলে হযরত ইমামের দৃষ্টিতে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বিশেষে মুস্তাক্বেরীন্ হচ্ছে তারা যারা অন্যায়ভাবে ও জবরদস্তি করে সাধারণ জনগণের ওপর নিজেদের শাসন, নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য চাপিয়ে দেয় এবং তাদেরকে শোষণ করে, প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে ও সমস্ত রকমের সুযোগ-সুবিধা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করে, অন্যদিকে মুস্তায্‘আফীন্ হচ্ছে শোষিত-বঞ্চিত ও আধিপত্য কবলিত জনগণ- ক্ষেত্রবিশেষে যারা জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম উপায়-উপকরণ থেকেও বঞ্চিত।

হযরত ইমামের (র.) দৃষ্টিতে মুস্তাকবের  হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভুলে যাওয়া ও তার পরিবর্তে শয়তানের ও নাফ্সের পূজারী হওয়া। এ কারণেই তারা অন্যদের বিরুদ্ধে অন্যায়-অপরাধ ও যুলুম-শোষণের আশ্রয় নেয় এবং সমাজে বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এ কারণেই – আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে জবাবদিহিতার কথা ভুলে যাবার কারণেই – তারা অহঙ্কার ও দাম্ভিকতার আশ্রয় নেয়। তারা তাদের সৃষ্ট যুলুমমূলক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে, বিশেষত তাদেরকে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও শ্রেণিতে বিভক্ত করে, স্বীয় পদতলে দাবিয়ে রেখে মুস্তায্‘আফীনে পরিণত করেছে। অবশ্য স্বয়ং মুস্তাকবেরীন্‌-এর মধ্যে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণি রয়েছে, কিন্তু তাদের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যুলুম-শোষণ। অন্যদিকে মুস্তায্‘আফীন্ শ্রেণির লোকেরা সাধারণত সৎ ও খোদাভীরু। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের সকলের অবস্থা এক রকম নয়, তবে সকলের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তাদের সকলেই কম-বেশি মযলূম, শোষিত ও বঞ্চিত।
হযরত ইমামের মতে, যদিও কোরআন মজীদের উল্লেখ অনুযায়ী মানব প্রজাতির ইতিহাসে সব সময়ই মুস্তাকবেরীন্‌  ও মুস্তায্‘আফীনের অস্তিত্ব ছিল তবে মুসলিম অধ্যুষিত দেশসমূহে উপনিবেশবাদীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর এতদবিষয়ক মতামতে বিশেষভাবে ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানি সমাজের অবস্থাকে বিশ্লেষণ করেন – যা থেকে বিশ্বের সকল দেশের অবস্থা সম্পর্কেই কম-বেশি ধারণা মেলে। তিনি সম্পদ ও ক্ষমতাকে মুস্তাক্বেরীনের ব্যবহৃত দু’টি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেন; একদিকে সম্পদ ক্ষমতায় উপনীত হওয়ার তথা ক্ষমতা ক্রয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে ক্ষমতা সম্পদ হস্তগতকরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে সম্পদ ও ক্ষমতা একটি শ্রেণির কুক্ষিগত হয়ে যায়, অন্যদিকে ব্যাপক জনগণ শুধু ক্ষমতাহীন ও দরিদ্রই নয়, বরং সরকারি ব্যয়ে শিক্ষা লাভ ও সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়; কেবল ব্যতিক্রম হিসেবে অসাধারণ প্রতিভার কারণে বা ঘটনাক্রমে সাধারণ মানুষের মধ্যকার কিছু লোক নিজেদেরকে উপরে তুলতে সক্ষম হয়।
ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পূর্বে সুযোগ-সুবিধার বিচারে ইরানি জনগণ সাধারণভাবে মোটামুটি তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল : (১) শাহের পারিষদবর্গ ও তাঁবেদার গোষ্ঠী, পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ, বিদেশী (প্রধানত আমেরিকান) পুঁজি বিনিয়োগকারিগণ ও দেশী পুঁজিপতিগণ, (২) সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ছোটখাট ভূমি-মালিক ও পেশাজীবীসহ মধ্যবিত্ত শ্রেণি, (৩) কৃষিশ্রমিক, কারখানা-শ্রমিক, ক্ষুদ্র চাষী, বস্তিবাসী ও ঝুপড়িবাসীসহ সুবিধাবঞ্চিত ব্যাপক সাধারণ জনগণ।
হযরত ইমাম (র.) এর আলোকে সেই যুগে মুসলিম জাহানের অবস্থা সম্পর্কে বলেন : ‘উপনিবেশবাদীরা জনগণের ওপর চেপে বসা তাদের রাজনৈতিক এজেন্টদের মাধ্যমে যুলুমমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে এবং এর ফলে জনগণ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে : যালেম ও ময্লূম। একদিকে শত শত মিলিয়ন মুসলমান ক্ষুধা ও বঞ্চনা কবলিত, অন্যদিকে ধনী ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী স্বল্পসংখ্যক লোক ভোগ-বিলাসিতা, অপচয় ও পাপাচারে নিমজ্জিত। ময্লূম বঞ্চিতরা সব সময়ই এই মুষ্টিমেয় সংখ্যকের আধিপত্য থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করছে, কিন্তু যুলুমমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুক্তির পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।’
শাহের তথাকথিত সংস্কার পরিকল্পনার সমালোচনায় হযরত ইমাম (র.) বলেন : ‘শাহ্ …. দেশের শিল্পায়নের বাহানায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহে দেশী-বিদেশী পুঁজিবিনিয়োগকারীদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছে, …. আর এখন দেখতে পাচ্ছি, সরকারের তাঁবেদার ইরানের সেই বড় বড় ভূমি-মালিকরা বিরাট বিরাট কারখানার মালিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।’ তিনি আরো বলেন : ‘আমেরিকান পুঁজিপতিরা ইরানকে শোষণের উপযোগী সর্বোত্তম জায়গা হিসেবে গণ্য করে এবং বিভিন্নভাবে ইরানে তাদের পুঁজি ঢেলে দিয়েছে।’ হযরত ইমাম (র.) সেই সাথে এদের সহযোগী জমিদার, ভূমিদস্যু, সরকারের তাঁবেদার, মাস্তান ও যারা বসে বসে অন্যদের শ্রমের ফল ভোগ করে তাদের কথাও উল্লেখ করেন।

ইমাম খোমেইনী তাঁর অন্তিম বাণীতে সারা দুনিয়ার মুস্তাকবেরীন্‌  ও মুস্তায্‘আফীনের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন : ‘অন্তত বিগত একশ বছরে – যখন পর্যায়ক্রমে সকল মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে ও অন্যান্য ছোট দেশে বিশ্বভুক বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রবেশ ঘটে – আমরা ও আপনারা প্রত্যক্ষ করেছি বা সঠিক ইতিহাস আমাদেরকে জানিয়েছে যে, এসব দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কোনো সরকারই স্বীয় জাতির মুক্তি, স্বাধীনতা ও কল্যাণের চিন্তা করে নি ও করছে না; বরং তাদের প্রায় সকলেই স্বীয় জনগণের ওপর যুলুম ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে এবং তারা যা কিছুই করেছে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে এবং ধনিক ও বালাখানাবাসীদের জন্য করেছে; ঝুপড়িবাসী ও বস্তিবাসীরা জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য সমস্ত উপকরণ থেকে, এমনকি পানি, রুটি ও কোনোমতে বেঁচে থাকার উপযোগী পুষ্টি থেকেও বঞ্চিত থেকে যায়, আর এই হতভাগাদেরকে ধনিক ও বিলাসী শ্রেণির স্বার্থে কাজে খাটানো হয়।’

ইমামের দৃষ্টিতে শক্তিশালী সরকারগুলো তাদের তাঁবেদার স্বল্পসংখ্যক লোক ব্যতীত সকল জাতির সমস্ত জনগণকে মুস্তায্‘আফে পরিণত করেছে। তিনি বিশেষভাবে ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানের অবস্থা সম্পর্কে এক কথায় বলেন যে, শাহী সরকার ওলামা, গ্রামবাসী ও অন্যান্য শ্রেণির লোক নির্বিশেষে সর্ব স্তরের জনগণকে তার হুকুমবরদার হিসেবে গণ্য করত। তিনি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরকে মুস্তায্‘আফ্ হিসেবে গণ্য করেন।

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর বিভিন্ন বাণী ও ভাষণে মুস্তাকবেরীনের  যেসব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন তা হচ্ছে : তারা আধিপত্যবাদী, সীমালঙ্ঘনকারী, আক্রমণকারী, নিপীড়ক, আরাম-আয়েশপ্রিয়, ভোগবাদী, লোভী, মুফ্ত্খোর, পাপাচারী, সমাজে বিভেদ-অনৈক্য সৃষ্টিকারী, জনগণকে নিষ্পেষণকারী, নিষ্ঠুর, প্রতারক, চক্রান্তকারী, বর্ণবৈষম্যবাদী, সত্য ও বাস্তবতাকে অস্বীকারকারী, কাপুরুষ ইত্যাদি। এছাড়া তারা তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে চেষ্টা করে যাতে মুস্তায্‘আফ্ জনগণ স্বনির্ভরতা ও আত্মবিশ্বাসের অধিকারী হতে না পারে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অগ্রসর হতে না পারে।

অন্যদিকে হযরত ইমামের দৃষ্টিতে যারা প্রকৃত মুস্তায্‘আফীন্ তারা বিপ্লবী, সংগ্রামী সাহসী, নিষ্ঠাবান মুসলমান, ইখলাছের অধিকারী, নৈতিক শক্তির অধিকারী, আত্মবিশ্বাসী, আশাবাদী, আত্মরক্ষাকারী, বাস্তবদর্শী ও পদ-পদবির লোভ থেকে মুক্ত। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবে মুস্তায্‘আফ্ জনগণের অংশগ্রহণের কথার উল্লেখ করে বলেন, এই বঞ্চিত জনগণ, গ্রামবাসী ও শহরের অনুন্নত এলাকার জনগণের সাহসী অংশগ্রহণ ব্যতীত শাহী সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হতো না।

কিন্তু তিনি মুস্তায্‘আফীনের দুর্বলতাকেও অস্বীকার করেন নি। তিনি বলেন যে, মুস্তাকবেরদের শাসনব্যবস্থায় মুস্তায্‘আফীনের মধ্যকার কয়েক ধরনের লোক থাকে যারা সংগ্রামের ময়দানে নামে না অথবা উদাসীনতা, মুস্তাকবেরীনের  দ্বারা প্রতারিত হওয়া, ঈমান না থাকা বা ভয়ের কারণে মুস্তাকবেরীনের  যুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেমন : সাধারণ সরকারি কর্মচারী, সৈনিক এবং বিশ্বের সকল দেশেরই বিরাটসংখ্যক বেখবর জনগণ।

হযরত ইমাম (র.) যে কোনো সমাজের ওলামা, লেখক, বক্তা ও বুদ্ধিজীবীদেরকে সমাজের দায়িত্বশীল অংশ বলে গণ্য করেন এবং বলেন যে, তাঁদের অবশ্যই মুস্তায্‘আফীনের পাশে থাকা উচিত।

ইমাম স্মরণ করিয়ে দেন যে, এ ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে লোকদেরকে গোমরাহী থেকে রক্ষা করা। এ লক্ষ্যে তিনি ‘রাজা-বাদশাহ্দের ইসলাম, পুঁজিপতিদের ইসলাম, হক্ব-বাত্বিলের সংমিশ্রিত ইসলাম ও আমেরিকান ইসলাম’-এর বিপরীতে খাঁটি মুহাম্মাদী (সা.) ইসলামকে তুলে ধরার জন্য বার বার তাকীদ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে গুনাহ্-খাতা ও দোষ-ত্রুটি থাকতেই পারে, কিন্তু কতক আলেম নামধারী লোক মুস্তাকবেরীন্‌  সহযোগী হয়ে দ্বীনকে বিকৃত করছে; প্রবৃত্তির দাস এই সব আলেমের সহযোগিতায় মুস্তাকবেরীন্‌  গোষ্ঠী জনগণের মধ্যে দ্বীনী চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে। তাই যে আধিপত্যবাদীরা প্রকাশ্যে ইসলামের বিরোধিতা করছে তাদের তুলনায় ইসলামের জন্য এ ধরনের আলেমদের সৃষ্ট ক্ষতি অনেক বেশি গুরুতর। ফলত এ ধরনের আলেমরা কার্যত মুস্তাকবেরীনের  প্রশাসনের মধ্যেই শামিল। হযরত ইমাম (র.) বলেন, যেসব আলেম মুস্তাকবেরীনের  খেদমতে আত্মনিয়োজিত তাদের পক্ষে যুলুম, শির্‌ক ও কুফরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্ভব নয়।

ইমাম খোমেইনী (র.) বার বার স্মরণ করিয়ে দেন যে, নিষ্ঠাবান ওলামায়ে কেরাম, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক, গ্রামবাসী, ঝুপড়িবাসী, ছাত্র ও সমাজের অন্যান্য অবহেলিত গোষ্ঠীর লোকেরা – এক কথায়, মুস্তায্‘আফীন্ ইসলামি বিপ্লবকে বিজয়ী করে। তাই তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনসহ ইসলামি হুকূমাতের সর্ব স্তরে মুস্তায্‘আফীনের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইসলামি হুকূমাতের অন্যতম গুরুদায়িত্ব হচ্ছে বঞ্চিত জনগণের বঞ্চনা দূর করা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে জনগণের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য চেষ্টা করা এবং পরাশক্তিবর্গকে ভয় না করে বিশ্বের মুস্তায্‘আফীনের, বিশেষত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো – যাতে তারা বৈশ্বিক ইসলামি হুকূমাত প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হতে পারে।

একই সাথে তিনি মুস্তায্‘আফীনের ঐক্যের এবং ‘ইল্ম্ ও তাক্বওয়ার অস্ত্রে তাদের সজ্জিত হওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি সতর্ক করে দেন যে, মুস্তায্‘আফ্ লোকেরা যেন পদ-পদবির অধিকারী হলে ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদের কথা ভুলে না যায় এবং নিজেরা মুস্তাকবেরের  ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়। তিনি ইসলামি সরকারকে সতর্ক করে দেন যে, মজুদদার, জোঁকের স্বভাববিশিষ্ট পুঁজিপতি ও অন্যান্য লোক যেন অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে বা স্বীয় অবস্থানের অপব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হতে না পারে। তিনি বলেন, ইসলামের অন্যতম অবদান হচ্ছে বঞ্চিতদের বঞ্চনার অবসান ঘটানো ও সকল ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সুতরাং মুসলমানদের মধ্য থেকে যারাই শাসনক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা যেন ভুলে না যায় যে, দেশের স্বাধীনতার সংরক্ষণ, আধিপত্যের ও শোষকদের শোষণের অবসান ঘটানো, সরকারি কর্মচারী, শ্রমিক, কৃষক ও সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য পবিত্র ও সুস্থ জীবন যাপন নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সাধন ইসলামি হুকূমাতের মূলনীতিসমূহের অন্যতম।
এখানে যে কারো মনে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, তা হচ্ছে, একটি সমাজে বিপ্লবের মাধ্যমে মুস্তায্‘আফীন্ শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তারা যে, ঐ সব মূলনীতির অনুসরণ অব্যাহত রাখবেই তার কী নিশ্চয়তা আছে? এ সম্পর্কে ইমাম খোমেইনীর অভিমত এই যে, মুস্তাকবেরীনের, ধর্মসম্পর্কহীনদের ও বিকৃত ধর্মানুসারীদের শাসনকাঠামোই এমন যে, তাতে যে কেউই অংশগ্রহণ করুক তার পক্ষে অনুরূপ স্বভাব পরিগ্রহণ ব্যতীত গত্যন্তর থাকে না। তাই মুস্তায্‘আফীনের শাসনকাঠামো অবশ্যই এমন হতে হবে যাতে এতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য মুস্তার্ক্বে স্বভাব পরিগ্রহণের আশঙ্কা না থাকে। এ কারণে সুযোগ-সুবিধা বণ্টন, দায়িত্ব অর্পণ ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনী মানদ- অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে মূল্যবোধকে তথা তাক্বওয়া ও আল্লাহর পথে চেষ্টাসাধনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং প্রয়োজনে গতানুগতিকভাবে চলে আসা নিয়ম-কানুন ও রীতিনীতিকে বদলে ফেলতে হবে।

ওলামা ও সরকারি দায়িত্বশীলগণ যাতে পথচ্যুত না হন সে লক্ষ্যে হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁদের সম্পর্কে কতগুলো সাধারণ দিকনির্দেশনা প্রদান করতেও ভুলে যান নি। তিনি বলেন, সবকিছুর আগে আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি যথাযথ ঈমানই এ ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। তিনি আরো বলেন : ওলামা ও সরকারি দায়িত্বশীলগণের পক্ষে কেবল তখনই বঞ্চিত জনগণের পৃষ্ঠপোষক হওয়া সম্ভব যখন তাঁরা সাদাসিধা জীবন যাপন করবেন, জাঁকজমক পরিহার করবেন, আরাম-আয়েম ও ভোগ-বিলাসের পিছনে ছুটবেন না, জনগণের খেদমত করবেন, সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন, ঝুপড়িবাসী ও বস্তিবাসীদের সাথে ওঠা-বসা করবেন, প্রাসাদবাসীদের থেকে দূরে থাকবেন, মুস্তায্‘আফীনের পৃষ্ঠপোষকতা করবেন, বায়তুল মাল্ ও স্বীয় পদ-ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না, ইসলামের অপব্যবহার করবেন না, কারণ, ইসলাম পকেট ভর্তি করার দ্বীন নয়, ঘন ঘন জনগণকে (টেলিভিশনের মাধ্যমে) চেহারা দেখাবেন না, সাদাসিধা উপায়-উপকরণ (যেমন : কম দামী গাড়ি) ব্যবহার করবেন। তিনি বলেন, কিন্তু এগুলো সম্ভব নয় যদি না ব্যক্তি নিজেকে নাফ্সের প্রতি ভালোবাসা ও দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা থেকে মুক্ত করে, যদি না পদ-ক্ষমতাকে অস্থায়ী ও গুরুত্বহীন গণ্য করে এবং মনে রাখে যে, একদিন আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট পদ-ক্ষমতার হিসাব দিতে হবে, ফলত প্রয়োজন হলে খুব সহজেই তা ছেড়ে দিতে পারে।

মুস্তাকবেরীন্‌ ও মুস্তায্‘আফীন্ সম্পর্কে ইমাম খোমেইনী (র.)-এর সমস্ত কথার নির্যাস হচ্ছে এই যে, প্রবৃত্তিপূজা ও দুনিয়া-প্রীতিই সমস্ত গোমরাহী ও পাপাচারের মূল এবং এটাই মানুষকে মুস্তাকবের  হওয়ার দিকে এগিয়ে দেয়। তাই সর্বাবস্থায় প্রবৃত্তিপূজা ও দুনিয়া-প্রীতি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা তথা নাফ্সের বিরুদ্ধে জিহাদই ইস্তিকবার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।

* * *
কৃতজ্ঞতা : হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর উদ্ধৃতিগুলো ড. আলী আছগার মুক্বাদ্দাস্-এর مستکبرین و مستضعفین از دیدگاه امام خمینی শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে গৃহীত।
* * *