সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং, ৬ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) : ঐক্য, শান্তি ও সংহতির প্রতীক

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৩, ২০১৭ 

news-image

ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানঅধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীতে এমন কিছুসংখ্যক ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে যাঁরা তাঁদের মেধা, মনন এবং কঠোর সাধনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অসামান্য কীর্তি ও কর্মের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় নিজের অমর স্থান নিশ্চিত করে গেছেন। বিশ্বব্যাপী ইমাম খোমেইনী (রহ.) নামে সুপরিচিত হযরত আয়াতুল্লাহ্ আল্-উয্মা রুহুল্লাহ্ আল্-মুসাভী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ইরানে সফল ইসলামি বিপ্লবের মহান নায়ক ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও মারজায়ে তাকলিদ (ধর্মীয় নির্দেশনার বিষয়াদির জন্য যাঁর অনুসরণ করা হয়।)। একজন প্রাজ্ঞ দার্শনিক, রাষ্ট্রচিন্তক ও রাজনীতিজ্ঞ, আপোসহীন বিপ্লবী, একজন উঁচুমানের শিক্ষক, হৃদয়স্পর্শী বক্তা এবং সর্বোপরি একজন অনন্যসাধারণ আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তিনি বিশ্বময় স্বীকৃত। নব্য রাজনৈতিক চিন্তাধারার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে পৃথিবীর সকল বঞ্চিত ও শোষিত মানুষ, বিশেষ করে বঞ্চিত মুসলিম জনতার হতাশার দিগন্তে মূর্ত আশার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। জগদ্বিখ্যাত দ্যা টাইমস ম্যাগাজিন ১৯৭৯ সালে তাঁকে ‘Man of the year’ নির্বাচন করে। প্রকৃত অর্থেই হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর পূর্ণ পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি অতলান্ত মহাসাগরের ন্যায় ব্যাপ্তিময়। স্বল্প পরিসরে এর লেখচিত্র অংকন দুরূহ এবং বলতে গেলে অসম্ভব। আলোচ্য নিবন্ধটি তাঁর মহিমান্বিত কর্মময় জীবনের দু’টি উল্লেখযোগ্য দিক সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করার বিনীত প্রয়াস। আর এ দু’টি দিক হলো মুসলিম বিশ্বে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহান ইমামের কর্মপ্রয়াস।

এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, একতাই বল। আমরা দেখি যে, বালিকণা একত্রিত হয়ে একটি বিশাল মরুভূমি এবং সমুদ্রের জলরাশি একত্রিত হয়ে একটি সীমাহীন মহাসাগর হয়ে যায়। ইসলাম মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলাম মানবজীবনে ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। কেননা, মানুষের মধ্যকার ঐক্য তাদেরকে একটি অদম্য জাতিতে পরিণত করতে পারে। ইসলাম ধর্মের মৌলিক আহ্বান ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’- এ তাওহিদী বাণীর মধ্যেই মানবজাতির ঐক্যের বীজ নিহিত রয়েছে। পবিত্র কোরআনুল কারিম এবং আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, মহান আল্লাহপাক স্বয়ং ঐক্যের কথা বলেছেন। উল্লেখ্য যে, পবিত্র কোরআনে তিন পর্যায়ের ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, মানবজাতির ঐক্য। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে ভাগ করেছি, যেন তোমরা পরিচয় পাও।’ দ্বিতীয়, আহলে কিতাব বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহের অনুসারীদের মধ্যকার ঐক্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, হে কিতাবের অনুসারীরা! আমাদের এবং তোমাদের মাঝে যে বিষয়টি একই তার দিকে আস, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব করব না; আর তাঁর সাথে কারো শরীক করব না, আমরা কেউ আর কাউকে রব বানাব না। যদি তারা না মানে তাহলে বলে দাও যে, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম।’ (সূরা আলে ইমরান : ৬৪)। তৃতীয়ত, মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্য। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের  সূরা আলে ইমরানে বলা হয়েছে- ‘ওয়াতাসিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়াও ওয়া লা তার্ফারাক্কু’ অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিছিন্ন হয়ো না। (আয়াত ১০৩)। সূরা আম্বিয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন : ‘ইন্না হাযিহি উম্মাতুকুম উম্মাতান ওয়াহিদাতান ওয়া আনা রাব্বুকুম ফা’বুদূনি’ অর্থাৎ তোমাদের এই যে উম্মত, এতো একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব; অতএব, আমারই ইবাদত কর। (আয়াত ৯২) অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘ইন্নামাল মু’মিনুনা ইখওয়াতুন ফাছলিহু বায়না আখওয়ায়াকুম। ওয়াত্তাকুল্লাহ লাআল্লাকুম তুরহামুন।’ অর্থাৎ মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা ভ্রাতৃগণের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। (সূরা আল হুজুরাত : ১০)। শুধু পবিত্র কোরআন মাজিদ নয়, মহানবী (সা.)-এর অনেক হাদিসেও মানবজাতির, বিশেষ করে মুসলমান সমাজের ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন,  আল্লাহ এক এবং তিনি ঐক্য বা একতা পছন্দ করেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘উম্মাহ এক গোষ্ঠী: এটি কোনও ব্যাপার না যে, তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে অথবা তারা বিভিন্ন মাযহাব বা ফিকহের অন্তর্গত, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষ মুসলিম হয়, ততক্ষণ তারা তোমার শরীরের একটি অংশ।’ এরূপ আরো অনেক হাদিস রয়েছে যেখানে মানবজাতি তথা মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্যের কথা বলা হয়েছে এবং জাতিগত বৈষম্য কঠোরভাবে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম ¯পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আরবরা অনারবের ওপর শ্রেষ্ঠ নয়, অনরাবরা আরবদের ওপর অধিক মর্যাদাবান নয়। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, অনুরূপভাবে শ্বেতাঙ্গদের ওপর কৃষ্ণাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। অনৈক্যের ক্ষতি এবং ঐক্যের গুরুত্ব ও কল্যাণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অনৈক্য থেকে দূরে থাকবে। একাকী থাকা অবস্থায় ভেড়া যেভাবে বাঘের শিকার হয়, তেমনি একাকী অবস্থানরত ব্যক্তিকে শয়তান ঘেরাও করে ফেলে।’ ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, ইসলামে মুসলিম জাতির ঐক্যের বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।  তবে প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিশ্ব অনৈক্য ও বিভেদের বেড়াজালে আবদ্ধ। মুসলমানদের অসচেতনতা ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের মধ্যে মাযহাবি বিতর্কের মাধ্যমে অনৈক্য সৃষ্টি করে মুসলমানদের দুর্বল ও নতজানু শক্তিতে পরিণত করার অপপ্রয়াস চালায়। তারা পরোক্ষভাবে মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ, প্যান তুরানিজ্ম, প্যান ইরানিজ্ম এবং আরব জাতীয়তাবাদের ধারণা ঢুকিয়ে দিয়ে মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করতে সক্ষম হয়। বিশ্বের মুসলিম জাতিসমূহ বিশালায়তন ও উর্বর ভূমির অধিকারী। তথাপি তাদের মধ্যকার বিরাজমান বিরোধ ও অনৈক্যের কারণে তারা দুর্বল এবং আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে শক্তিহীন জাতিতে পরিণত হয়েছে। ইরানি জাতির পিতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইসলামের একজন একনিষ্ঠ সেবক এবং আল্লাহর রাসূলের একজন সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বিশ্ব মানবতা তথা মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় আজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক ও আদর্শ। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি চেতনা সংরক্ষণ ও জোরদার এবং অনৈক্যের বীজ বপনকারী যাবতীয় তৎপরতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছিল ইমাম খোমেইনী (রহ.) জীবনের অন্যতম ব্রত। মহান ইমাম অনৈক্যকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম মৌলিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি মনে করতেন, মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ ও অনৈক্য সৃষ্টিতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সুগভীর চক্রান্ত রয়েছে। বস্তুত সাম্রাজ্যবাদী ও আগ্রাসী শক্তিসমূহ নানাবিধ কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদের দেয়াল সৃষ্টিতে কেবল সাম্রাজ্যবাদীরাই যে দায়ী তা নয়। ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর মতে, এর পেছনে রাজতন্ত্রের মদদপুষ্ট ধর্মীয় নেতাদেরও দায় রয়েছে। প্রতিদিনই তারা কোনো না কোনোভাবে মুসলমানদের মধ্যকার বিরোধ ও অনৈক্যকে চাঙ্গা করে যাচ্ছেন। ইমাম খোমেইনী (রহ.) স্বীয় অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানের সাহায্যে ইসলামি ঐক্যের গুরুত্ব এবং মুসলমানদের মধ্যকার বিরোধ ও অনৈক্য যে মুসলমানদের সার্বিক উন্নয়নের পথে বিরাট অন্তরায় তা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি মুসলমানদের মধ্যকার বিরোধ ও অনৈক্যের প্রাচীর ভেঙে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। তাঁর ভাষায়Ñ ‘আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করে ইসলামি জাতির সকল স্তরের মাঝে একতা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছি ও করে যাচ্ছি এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছে এ অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ব্যাপারে সাহায্য চাচ্ছি। কেননা, এর ওপরই নির্ভর করছে এ জাতির অস্তিত্ব।’ মুসলিম সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশলও গ্রহণ করেছিলেন। অজ্ঞতা ও নানা চক্রান্তের শিকার পরস্পর বিচ্ছিন্ন মুসলিম জাতিকে অভিন্ন ছত্রছায়ায় ঐক্যবদ্ধ করে একটি বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর একান্ত ও সর্বাত্মক কর্ম প্রয়াসকে তাঁর জীবনের অন্যতম কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।    ১২ রবিউল আউয়াল তারিখটি মুসলিম সমাজের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এ দিন বিশ্বব্যাপী মুসলিম জাতি ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ পালন করেন। মহান ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ায় বিপ্লবের প্রাণপুরুষ মহান ইমামের নির্দেশে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে ১২-১৭ রবিউল আউয়ালকে মুসলমানদের জন্য ‘ঐক্য সপ্তাহ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঐক্য সপ্তাহে মহান ইমাম বিশ্বের সকল মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। আগেই বলা হয়েছে যে, মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার বিভেদ সৃষ্টিতে ইসলামের শত্রুরা অব্যাহতভাবে কুপরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। এসব কুপরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য বজায় রাখার জন্য ইমাম তাঁর অসিয়তনামায় বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও প্রিয় সাহসী যুবকদের প্রতি আমার আহ্বান, তারা যেন ওলামা ও ধর্মীয় ছাত্রদের সাথে তাদের একতা ও ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করে। বিপজ্জনক শত্রুদের কুপরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রসমূহ থেকে যেন অনবহিত না থাকে। কথা ও কাজের মাধ্যমে যে কেউ তাদের মাঝে বিভেদের বীজ বপন করতে চায়, তাকে যেন সৎপথে আনার চেষ্টা করা হয়। নিজেদের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে বাইরের দেশগুলোর ওপর প্রযুক্তিগত নির্ভরতার অবসান ঘটাবার লক্ষ্যে দৃঢ়চিত্ত হবে, বিদেশি প্রভুত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার লক্ষ্যে এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারী হবার মানসে সব ধরনের কঠোরতার বোঝা সহ্য করার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকবে।’ মহান ইমাম তাঁর অসিয়ত নামায় আরো বলেন, ‘হে বিশ্বের নির্যাতিত জনতা! হে মুসলিম দেশসমূহ! হে মুসলমানগণ! উঠে দাঁড়ান, সত্যকে আঁকড়ে ধরুন এবং পরাশক্তিবর্গ এবং তাদের পদলেহী দালালদের প্রচারণামূলক হৈচৈ-এ ভীত-সন্ত্রস্ত হবেন না।’  মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের পক্ষে একটি বড় অন্তরায় হলো ভৌগোলিক, জাতীয়তা ও ভাষাগত ভিন্নতা। এসব ভিন্নতার কারণে মুসলমানদের মধ্যকার অনৈক্যের অশুভ প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক ইমাম খোমেইনী (রহ.) বলেন, ‘ইসলাম আসার উদ্দেশ্য হলো জাতিসমূহ, তা আরব হোক, তুর্ক, ইরানি বা যা-ই হোক না কেন, সবাইকে নিয়ে বিশ্বের এক মহান সম্প্রদায় গড়ে তোলা- যার নাম ‘মুসলিম উম্মাহ।’  (নিউজলেটার, জানু-ফেব্রু. ২০১৪)  বিশ্বে প্রায় শত কোটি মুসলমানের বাস। সংখ্যা-শক্তির কারণে তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ তৈরি করে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এ প্রসঙ্গে ইমাম খোমেইনী (রহ.) বলেন, ‘পরাশক্তিসমূহ ও মুসলিম দেশসমূহে তাদের সেবাদাসরা মুসলমানদের বিভক্ত করার ও তাদের প্রতি মহান আল্লাহর নির্দেশিত ভ্রাতৃত্বকে বিনষ্ট করার পরিকল্পনা করে আসছে। এ সমস্ত পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে তুর্কি জাতি, কুর্দি জাতি, আরব জাতি, ইরানি জাতি প্রতিষ্ঠার ছদ্মাবরণে মুসলিম জাতিকে বিভক্ত করা। তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের বিরোধ সৃষ্টি চেষ্টা করছে- যা মূলত ইসলাম ও মহান কোরআন নির্দেশিত পথের সম্পূর্ণ বিপরীত।’ মহান ইমামের মতে, ইসলামে বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও অঞ্চলের প্রাধান্য নেই। ইসলামে কুর্দি, ফারসির প্রশ্ন নেই। ইসলাম দুনিয়ার সকল জাতি অর্থাৎ আরব, আজম, তুর্ক, ফার্স- সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং ইসলামি উম্মাহ নামে একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে। ইমামের ভাষ্য মতে, ‘ঐক্যবদ্ধ হওয়া সকল মুসলমানের জন্য ফরজ।’ ইমাম খোমেইনী (রহ.) বিশ্বের আলেমসমাজকে তাঁদের নিজ নিজ দেশে জনগণকে ঐক্যের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আহ্বান জানান। তিনি অনুরোধ জানান, তাঁরা যেন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বর্ণবাদী মানসিকতা এড়িয়ে চলেন এবং স্বীয় দ্বীনি ভাইদের প্রতি বর্ণ, গোত্র ও দেশীয় ভেদাভেদ ত্যাগ করে ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দেন। কারণ, ইসলাম তাদের সকলকে পরস্পর ভাই ভাই বলে উল্লেখ করেছে। তিনি বলেন, আমরা ‘ভাই ভাই হব। কেননা, শত্রুতা জাহান্নামবাসীদের ব্যাপার।’ ইমাম খোমেইনী (রহ.) বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইমামের মতে, ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিভিন্ন স্বাধীন প্রজাতন্ত্র থাকতে পারে। তবে এ প্রজাতন্ত্রগুলো ও সকল মুসলমান একটি অখ- মুসলিম উম্মাহ হিসেবে পরিগণিত হবে। মাযহাবি বিতর্ক তথা শিয়া-সুন্নি বিরোধ মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও প্রগতির পথে একটি শক্ত প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে। এ বিরোধকে জিইয়ে রেখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা নানাভাবে তাদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টারত। মুসলিম উম্মাহর জন্য এ ক্ষতিকর দিক উপলব্ধি করে ইমাম খোমেইনী (রহ.) শিয়া-সুন্নি ও অন্যান্য মাযহাবগত ফেরকা বা বিভেদের ঊর্ধ্বে গোটা মুসলিম জনসমাজকে ঐক্যবদ্ধকরণে আত্মনিয়োগ করেন। মাযহাবি মতপার্থক্য সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ যেন ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য পরস্পরকে সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা করে এবং পারস্পরিক মতপার্থক্যকে এতদূর নিয়ে না যায়- যা থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুরা লাভবান হবে- সে লক্ষ্যে মহান ইমাম সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুসলমানদের জাগ্রত হওয়া উচিত, মুসলমানদের সতর্ক হওয়া উচিত। যদি সুন্নি ও শিয়া ভাইদের মধ্যে বিতর্ক ও বিভেদ হয়, তবে এটি আমাদের সকলের জন্য ক্ষতিকর; এটি সব মুসলমানের জন্য ক্ষতিকর। যারা আমাদের মধ্যে বিতর্ক ও বিভেদের বীজ বপন করতে চায়, তারা না সুন্নি না শিয়া; তারা পরাশক্তির এজেন্ট এবং তাদের জন্য কাজ করে।’ যারা সুন্নি ও শিয়া ভাইদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে তারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের শত্রুদের পক্ষেই কাজ করে এবং তারা মুসলমানদের ওপর ইসলামের শত্রুদের বিজয় কামনা করে। ইমাম এ ধরনের লোকদের আমেরিকা ও সোভিয়েত চক্রের দালাল বলে আখ্যায়িত করেন। ইমাম খোমেইনী (রহ.) মনে করতেন, মুসলমানদের ঐ খোদায়ী নির্দেশ মনে রাখতে হবে; যেখানে বলা হয়েছে, মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। এ ঈমানী ভ্রাতৃত্বের নির্দেশ এসেছে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তা ইরানি বা অন্য কোনো দেশের মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট নয়; বরং এ নির্দেশ বিশ্বের সকল মুসলমানের ওপর প্রযোজ্য। তাই ইমাম বলেন, ‘শিয়া ও সুন্নি ভাইদের সকল ধরনের বিরোধ ও বিবাদ এড়িয়ে চলা উচিত। আজকে আমাদের মধ্যকার বিরোধের ফলে তারাই লাভবান হবে যারা শিয়া বা হানাফিদের অনুসারী নয়। শিয়া বা সুন্নিরা এ পৃথিবীতে টিকে থাকুক তা তারা চায় না। তারা চায় আমাদের মাঝে বিরোধ লেগে থাকুক। এ অবস্থায় আমাদের সকলকে এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আমরা সকলেই মুসলিম; আমরা সবাই কোরআনে বিশ্বাস করি; আমরা তাওহিদে বিশ্বাস করি এবং আমাদের কোরআন ও তাওহিদের সংরক্ষণ ও বিস্তারে একত্রে কাজ করতে হবে।’  তাঁর মতে, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে চিন্তা ও মাযহাবগত পার্থক্য সত্ত্বেও তাদের সকলকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র পতাকা তলে ভাই ভাই হিসেবে থাকতে হবে এবং ইসলাম ও উম্মতে ইসলামির শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ইমাম খোমেইনী (রহ.) হাজীদের উদ্দেশে প্রদত্ত এক বাণীতে বিশ্বের আলেমসমাজকে তাদের নিজ নিজ দেশে জনগণকে ঐক্যের ব্যাপারে দাওয়াত দিতে অনুরোধ জানান। মহাগ্রন্থ আল কোরআন মোতাবেক তাঁরা যেন মাযহাবি ও আঞ্চলিক ভেদাভেদ ভুলে যান ইমাম সে ব্যাপারে তাঁদের অনুরোধ করেন। মুসলিম বিশ্বের আন্তরিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘ বিশ বছর ধরে আমার কথাবার্তায় ও ভাষণে মুসলিম বিশ্বের সরকারগুলোকে বলে এসেছি যে, স্থানীয় ছোটখাট মতভেদ ত্যাগ করুন এবং ইসলাম ও ইসলামের মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তাবয়নের জন্য সম্মিলিত চিন্তা-ভাবনা করুন এবং পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হোন।’ তিনি মুসলিম দেশগুলোকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক হয়ে কাজ করার এবং তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা না দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘হে মুসলিম উম্মাহ! আসুন, আমাদেরকে দ্বীনি ভাই হিসেবে গ্রহণ করুন যাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মোকাবিলা করতে পারি এবং নিজ নিজ দেশের হেফাজত করতে পারি। আপনারা কি মনে করেন জার্মানি, ব্রিটেন এবং তাদের চেয়ে বড় আমেরিকা ও রাশিয়া আপনাদের স্বার্থ চিন্তা করে? কখনই নয়। তারা আপনাদের শোষণ করার জন্য দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছে এবং আমাদের দেশগুলোকে তাদের কলোনী বানিয়েছে। তাদের কাছে আপনাদের প্রয়োজন যখন শেষ হয়ে যাবে তখন তারা আপনাদের ধ্বংস করে ছাড়বে। তাই আসুন তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।’ ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর প্রদত্ত এক হজের বাণীতে বলেন, ‘হে বিশ্বের সম্মানিত হাজিগণ ও ওলামায়ে কেরাম! পাচ্য ও পাশ্চাত্যের যুলুমবাজদের প্রতাখ্যান করুন।… রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ইসলামের দুশমনদের বিতাড়িত করুন। হে শক্তিশালী মুসলিম জাতি! আপনারা জাগ্রত হোন, নিজেদের শক্তি সম্পর্কে জানুন। বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করুন।’   ইসলাম মানবতার ধর্ম। ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বলপূর্বক অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মান্তকরণে বিশ্বাস করে না। তবে ইসলামের অনুসারী হয়ে কেউ ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করবে, ইসলামকে অবমাননা করবে- এর অবকাশ ইসলামে নেই। ইসলাম কোনো মুসলমান কর্তৃক ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাও বরদাশত করে না। অন্য কথায় ইসলামের দৃষ্টিতে মুরতাদ হওয়া মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধ। নবিপ্রেমিক ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইসলামের এ বিধানকে জারি করেছিলেন সালমান রুশদীর ঘটনায়। ১৯৮৯ সালমান রুশদী কর্তৃক দ্যা স্যাটানিক ভার্সেস’ নামক গ্রন্থে মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করা হলে ইমাম তাকে মুরতাদ ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া দেন। ইমামের এ ঐতিহাসিক ফতোয়া তাৎক্ষণিকভাবে মুসলিম বিশ্বে সাদরে গৃহীত হয়। এমনকি বাংলাদেশের আলেমসমাজ ও ধর্মবেত্তাগণ এ ফতোয়ার সমর্থনে বিবৃতি দেন। বস্তুত সালমান রুশদীর বিষয়ে ইমাম খোমেইনী (রহ.) একটি মাত্র ফতোয়া হাজার বছর পর মুসলিম উম্মাকে এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এ ফতোয়াকে কেন্দ্র করে দেশ, বর্ণ ভাষা ও মাযহাবগত মতপার্থক্যের দেয়াল ভেঙে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল তা ছিল অকল্পনীয় ও নজিরবিহীন।  মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধকরণে মহান ইমামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ‘আল কুদ্স’ দিবস পালনের ঘোষণা। মাযহাবি ও গোত্রীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মুসলিম বিশ্ব প্রতি বছর পবিত্র রমযান মাসের শেষ শুক্রবার ‘আল কুদ্স’ দিবস পালন করে থাকেন। ১৯৭৯ সালে যায়নবাদী ইসরাঈলের হাতে নির্যাতনের শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি এবং পবিত্র আল আকসার পবিত্রতা রক্ষা ও এর মুক্তির লক্ষ্যে ইমাম খোমেইনী (রহ.) আল কুদ্স দিবস পালনের ঘোষণা দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘The Quds Day is the day of Islam. The Quds Day is the day on which Islam must be revived and it shall be revived; and the canons of Islam must be implemented in the Muslim countries. The Quds Day is a day on which all the superpowers must be warned that Islam shall not come under their subjugation through their evil lackeys.’ বর্তমানে এ দিবসটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বস্তুত ইমাম খোমেইনী (রহ.) ‘আল কুদ্স দিবস’ ঘোষণা করে সম্মিলিতভাবে তা পালনের আহ্বান জানিয়ে বিশ্বমুসলিমের মনে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী চেতনা জাগিয়ে দিয়েছেন। ইমাম খোমেইনী (রহ.) কেবল মুসলিমদের ঐক্যের কথাই বলেন নি, আহলে কিতাবের অনুসারী অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সাথেও ঐকের কথা বলেছেন। তিনি ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে তাদের ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি মুসলমানদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে আহলে কিতাবের অনুসারীদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তিনটি ঐশী ধর্মের অনুসারীরা ঐক্যবদ্ধ হলে এটি কেবল অধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করা সহজতর হবে। ইরানি বিপ্লবের প্রাক্কালে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের উদ্দেশে ইমাম খোমেইনী বলেছিলেন, ‘হে চার্চের ফাদার ও খ্রিস্টান ধর্মগুরুগণ! জাগ্রত হোন এবং যালেমদের কবল থেকে নির্যাতিত অবহেলিত লোকদের রক্ষা করুন। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাদের চার্চের ঘণ্টাধ্বনি আরেকবার বেজে উঠুক ইরানের নির্যাতিত মানুষের অনুকূলে এবং নির্যাতনকারীদের নিন্দায়।’

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) কেবল মুসলিম বিশ্বের ঐক্য সাধনেই অবদান রাখেন নি, বিশ্ব তথা মুসলিম সমাজে শান্তি ও সংহতি বিধানেও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং মুসলিম মানে হলো শান্তিপ্রিয়। ইসলামে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার কোনো স্থান নেই। বরং ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, শান্তি ও পরমত সহিষ্ণুতা ইত্যাদি ইসলামের মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনুল কারিমে বিশ্বে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও অরাজকতা এড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও তা বজায় রাখার জন্য মুসলমানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহপাক অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলাকে (ফিতনা) হত্যার চেয়েও জঘন্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। (সূরা আল বাকারা : ১৯১) অন্যত্র মহান আল্লাহ পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা আল আরাফ : ৫৬) শান্তিভঙ্গকারী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আল্লাহ যে পছন্দ করেন না সে কথাও তিনি কোরআনুল কারিমে বলে দিয়েছেন। (সূরা আল-কাসাস : ৭৭) হাদিস শরিফে আছে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে বা কষ্ট না পায়।’ অথবা ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জবান দ্বারা অন্য মুসলমান শান্তি পায়।’ (বুখারি শরিফ, খ- ১, ইমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ৪, হাদিস ৯, পৃষ্ঠা ১৭)। কোরআন ও হাদিসের এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, ইসলাম শান্তি, ন্যায় বিচার ও মানবতার জন্য কল্যাণের ধর্ম। তাই কোনো মুসলমানের সঙ্গে অন্য কোনো মুসলমানের দেখা-সাক্ষাৎ হলে ইসলামি সম্ভাষণরীতি হলো সালাম বা শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা। আরবিতে এই অভিবাদন বাক্যটি হলো : ‘আসসালামু আলাইকুম’ অর্থাৎ আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক বা আপনি নিরাপদে থাকুন। যিনি শান্তির পথের পথিক, যিনি অন্যের নিরাপত্তা বিধানে সর্বদা সচেষ্ট, যিনি পরের মঙ্গল কামনা ও হিত সাধনায় সদা ব্রতী; সর্বোপরি যিনি সৃষ্টিকুলের শান্তি রক্ষার জন্য মহান স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ করেছেন, তিনিই প্রকৃত ও যথার্থ মুসলিম। একজন সত্যিকারের দ্বীনদার ও যথার্থ মুসলমান হিসেবে যালেমদের হাত থেকে মযলুমদের সুরক্ষা এবং মুসলিম বিশ্বে শান্তি ও সহনশীলতার বাতাবরণ সৃষ্টিতে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে শান্তি ও সুবিচারকামী একটি নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা তাঁর এক বিরাট সাফল্য। ইরানি বিপ্লব আফ্রিকা মহাদেশকে উপনিবেশবাদের যুপকাষ্ঠ থেকে মুক্ত করা এবং সেই সাথে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের ক্ষেত্রে বিরাট ও শক্তিশালী অবদান রেখেছে। ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠ। তিনি ইসলামের ন্যায় ইনসাফ কায়েমকে মুসলিম জাতির সৌভাগ্যের একমাত্র পথ বলে মনে করতেন। এ কারণেই সম্ভবত তিনি মুসলিম সমাজে পারস্পরিক কলহ ও বিরোধের বিরোধী ছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মুসলমান ভাইয়ের রক্ত দ্বারা স্বীয় হাতকে রঞ্জিত করা অমার্জনীয় অপরাধ। কেউ ইসলামকে মেনে চলার নামে কিংবা ইসলামের প্রতি পাবন্দ থাকার নামে তার মুসলমান ভাইয়ের রক্ত দ্বারা নিজের হাতকে রঞ্জিত করতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত ও অন্য নানাবিধ কারণে ইরাক ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ আট বছর ধরে (১৯৮০-৮৮) চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের জন্য জাতিসংঘে গৃহীত ৫৯৮ নং প্রস্তাবটি ইমাম খোমেইনী (রহ.) মেনে নিয়েছিলেন। বাহ্যত এ প্রস্তাবটি ইরানের জন্য অবমাননাকর হলেও তিনি এটি মেনে নিয়েছিলেন। ইমামের নিজের ভাষায় এ যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবটি মেনে নেয়া ছিল তাঁর জন্য ‘বিষ পান’। তারপরেও এ প্রস্তাবটি মেনে নেয়ার পেছনে ইমামের যে সকল সুবিবেচনা কাজ করেছিল তার মধ্যে সম্ভবত ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশের সাথে শান্তি রক্ষার আকাক্সক্ষাও ছিল। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারার প্রতি সহনশীলতার পরিচয় প্রদান দ্বীনি শাসন ব্যবস্থার জন্য কেবল যথাযথ নয়; বরং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমাম মনে করতেন, ইসলাম হলো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ একক শক্তি। (Islam is the greatest unifying force in the world.) এটি জাতি, বর্ণ এবং ভাষা নির্বিশেষে সকল মানবতার ধর্ম। তবে এটি এমন এক ধর্ম যা অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল এবং এটি তার অনুসারীদের সকল মানবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের সুরক্ষা প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়। এজন্য আমরা লক্ষ্য করি যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) কেবল নিপীড়িত মুসলমানদের পক্ষে কথা বলেন নি, বরং বিশ্বের সকল মযলুম জনতার পক্ষে কথা বলেছেন এবং শোষক ও নিপীড়কদের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, ‘পৃথিবীর যেখানেই যালিমের বিরুদ্ধে মযলুমের সংগ্রাম সেখানেই আমরা আছি।’ইমাম খোমেইনী (রহ.) আহলে কিতাবের অনুসারী এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের সাথে শান্তিপূর্ণসহ অবস্থানের নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৭৮ সালে একটি ডাচ সংবাদপত্রে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে ইমাম বলেছিলেন, প্রত্যেক ইরানি তাদের ন্যায্য নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং এক্ষত্রে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর অনুসারীদের সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং তাদের শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপনের অধিকার হরণ না করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ সহজাতভাবে সত্য ও ন্যায়ের অন্বেষণ করে। তাঁর মতে, যদি মানুষের মাঝে সাধারণ সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, আত্মঅহংকার, উগ্রতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা হ্রাস পায়; মানুষ যদি স্রষ্টার অন্বেষণে থাকে, তবে তারা প্রশান্তি অর্জনে সক্ষম হবে। শান্তি ও সহনশীলতার দূত ইমাম খোমেইনী (রহ.) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণার পক্ষে তাঁর সমর্থন দান করেছিলেন। সহিফায়ে নূর (খ- ২, পৃ. ২৪২) এ তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণা অনুসরণে কাজ করতে আগ্রহী। আমরা মুক্ত থাকতে চাই। আমরা স্বাধীনতা ভালোবাসি।’মুসলিম জাতি তথা বিশ্বপরিসরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর মহান কর্ম প্রচেষ্টা প-িতদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ প্রসঙ্গে Dr. Kahumbi Maina এর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘Imam Khomeini (R.A) left a rich legacy as a defender and advocate of justcie and peaceful coexistance. He will be remeberd as a model par excellence for tolarance, spirituality and moral valus for generations to come. His works and initiatives remain equally popular among muslims, Chritians and followers of other faiths.’

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ঐক্য, শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের বিভিন্ন মাযহাব ও সম্প্রদায় এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে সংলাপে বিশ্বাসী ছিলেন। ইমাম মুসলমান সম্প্রদায়কে নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ও সমস্যাদি নিরসনে সংলাপের আহ্বান জানান। উদাহরণস্বরূপ ১৯৭১ সালে হাজীদের উদ্দেশে প্রেরিত তাঁর বাণীর কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে তিনি মুসলমানদের পারস্পরিক সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের প্রাক্কালে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে ইমাম খোমেইনী (রহ.) মুহাম্মদ রেযা শাহ পাহলভীর প্রধানমন্ত্রী শাহপুর বখতিয়ারের সাথেও সংলাপ চালিয়েছিলেন। ইমাম তাঁর জীবদ্দশায় অনেক ফতোয়া প্রদান করেছেন যার মধ্যে মুসলমানদের মধ্যে আন্তঃসম্প্রদায় এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের কথা বলা হয়েছে। শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সংলাপ ও সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। একে অস্বীকার করা হবে চরম মূর্খতা। ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে সংলাপের ব্যবহার করেছেন এবং মুসলমানদেরকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন শতাব্দীর মহানায়ক। তিনি কেবল ইরানিদের মহান নেতা নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত সিপাহসালার, মহান নেতা। ইমাম খোমেইনী আধুনিক মুসলিম বিশ্বে ত্যাগী ও বিপ্লবী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের হীন চক্রান্ত ভেদ করে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ইরানি জাতিকে কেবল উদ্ধার করেন নি, তিনি বিশ্ব মুসলিম সমাজকে সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্তির জন্য তাদের ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আস্থা ও নেতৃত্ব অর্জন করেন। বস্তুত তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, শান্তি ও সংহতির আদর্শ প্রতীক। তিনি শিয়া-সুন্নির পার্থক্য নিরসন করে মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের  লক্ষে কাজ করেন।  ‘এক আল্লাহ, এক কুরআন ও এক নবির মতাদর্শে বিশ্বাসী সকলেই এক’- এই দর্শনের ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের জন্য তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, তা সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয়। প্রাচ্য পাশ্চাত্যমুখিতা ত্যাগ করে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিত একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে- এটাই ছিল হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। অদূর ভবিষ্যতে কোনো এক সময় এটা ঘটবে বলেও তিনি আস্থাশীল ছিলেন।উপনিবেশবাদের কবল থেকে মুসলিম মিল্লাতের মুক্তি ও তাদের ওপর থেকে সকল প্রকার বিদেশি আধিপত্যবাদের অবসান ইমাম খোমেইনী (রহ.) জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, জনসমর্থন এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর অসীম রহমতে পাহাড়সম এ কঠিন কাজেও সফলকাম হন। আমরা বর্তমানে এক অস্থির পৃথিবীতে বাস করছি। বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মুসলিম বিশ্ব আজ অনৈক্যের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নব্য সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ে আফ্রিকার তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া এবং এশিয়ার সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও আফগানিস্তান আজ গৃহযুদ্ধের আগুনে দগ্ধিভূত হচ্ছে। সা¤্রাজ্যবাদীদের মদদপুষ্ট হয়ে একদল বিভ্রান্ত লোক ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে মুসলমানদের জঙ্গি হিসেবে পরিচিত করানোর অপচেষ্টা করছে। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ আজ বিশ্ব শান্তির জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও আজ আর মুক্ত নেই। আমরা এ অবস্থার পরিবর্তন চাই। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) নির্দেশিত ঐক্য, শান্তি ও সংহতির পথ আমাদেরকে বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে। বিশ্ব মুসলিমের মুক্তি ও নির্যাতিত মানবতার কল্যাণার্থে তাঁর পথনির্দেশনা অনুসরণ সময়ের দাবি। আসুন, আমরা সবাই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, বিশ্বশান্তি ও সংহতির লক্ষ্যে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর আদর্শের অনুসরণ করি। পরিশেষে প্রার্থনা, হে দয়াময় আল্লাহ! আপনি ইসলামি উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও প্রগতির জন্য খোমেইনী (রহ.)-এর সকল খেদমতকে কবুল করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁকে সুমহান মর্যাদা দান করুন। আমীন।

তথ্যসূত্র

  1. Hamid Algar (Trans.), Islam and revolution, Writings and declarations of Imam Khomeini.
  2. Ervand Abrahamian,
  3. Aqiqi Bakhshayeshi, Ten Decades of Ulema’s Struggle.
  4. Kahumbi Maina, ‘Intolarance as an emerging threat to global peace and security: lessons from some gleanings of Imam Khomeini (RA)’
  5. http://www.imam-khomeini.com/