রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর বহুমুখী ব্যক্তিত্বের ওপর এক নযর

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ২৫, ২০১৯ 

নূর হোসেন মজিদী
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) মানব জাতির ইতিহাসে অন্যতম বিরল ব্যক্তিত্ব; তাঁর পূর্ণ পরিচয়ের ব্যাপ্তি ও গভীরতা মহাসাগরতুল্য। তাঁর জীবন ও আচরণের অনেক দিকের মধ্য থেকে এখানে আমরা মাত্র কয়েকটি দিক অতি সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
যুগসচেতন মুজতাহিদ : হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ছিলেন চিন্তা, কথা ও আমল-আচরণে ভারসাম্যের (عدالة) অধিকারী একজন যুগসচেতন দূরদর্শী মুজতাহিদ তথা একজন প্রকৃত দ্বীনী আলেম- কোরআন মজীদে যে ধরনের ব্যক্তিদের সম্পর্কে يَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ (সূরা আত্-তাওবাহ্ : ১২২) ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ওয়ারেছে আম্বিয়া।
তিনি ছিলেন যুগজিজ্ঞাসার জবাব দানে সক্ষম গতিশীল ইজতিহাদের পথিকৃৎ এবং এ ক্ষেত্রে তিনি কতগুলো মৌলিক বিষয়ে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন; এগুলোর মধ্যে মুজতাহিদের শাসন (বেলায়াতে ফকীহ্) তত্ত্ব প্রদান ও এর ‘আক্বায়েদী ভিত্তি নির্ধারণ এবং ‘নামের অভিন্নতা সত্ত্বেও বিষয়বস্তুর প্রকৃতিতে পরিবর্তনের ফলে হুকূমে পরিবর্তন’ মূলনীতি ও প্রাথমিক বিধান (হুক্মে আইয়ালীয়াহ্) কার্যকরকরণের শর্তাবলির অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় স্তরের বিধান (হুক্মে ছানাভীয়াহ্) কার্যকরকরণ মূলনীতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। [এ সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা স্বতন্ত্র পরিসরের দাবিদার।] এছাড়া তিনি কোরআন মজীদের আলোকে সৃষ্টির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আল্লাহ্ তা‘আলার একক ইচ্ছা, আল্লাহ্র ইচ্ছার ভিত্তিতে বান্দার ইচ্ছা ও বান্দাহ্র স্বাধীন ইচ্ছা-র যে সমন্বয় তুলে ধরেন (ত্বালাব্ ও ইরাদাহ্ গ্রন্থে) তা মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যকার হাজার বছরেরও বেশিকালের অদৃষ্টবাদ বনাম কর্মবাদ বিতর্কের অবসানের পথনির্দেশক হয়েছে।
তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ ও সার্বিক মুজতাহিদ (ফাক্বীহে জামে‘); তিনি দ্বীনী ‘ইল্মের সকল দিকের ওপরই সমান দক্ষতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর র্দাস্সমূহ কেবল ফিকাহ্, উছূলে ফিকাহ্ ইত্যাদি দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্রসমূহে বহুলপ্রচলিত বিষয়সমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং পাশ্চাত্য দর্শন, ইসলামি দর্শন, আধ্যাত্মিকতা (‘র্ইফান/মা‘রেফাত), তাফসীর ইত্যাদি অনেক বিষয়েই তিনি র্দাস্ দিতেন। বিভ্রান্ত চিন্তাধারার অধিকারীদের সৃষ্ট বিভ্রান্তি ও সংশয়সমূহের জবাব দানেও তিনি ছিলেন উপযুক্ত ব্যক্তি।
আজীবন দ্বীনী শিক্ষক : তিনি ছিলেন আজীবন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দ্বীনী শিক্ষক- যাঁর কাছে দ্বীনী শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেক সুযোগ্য মুজতাহিদ গড়ে ওঠেন। তিনি কোমের দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষাদানরত অবস্থায়ই (১৯৬১) বিশ^ব্যাপী শিয়া ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে বরিত হন। তাঁকে দেশ থেকে নির্বাসিত করে তুরস্কে পাঠানোর (১৯৬৪) এক বছর পর ইরাকের নাজাফে স্থানান্তরিত করা হলে তিনি সেখানকার দ্বীনী জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে পাঠদান করতে শুরু করেন ও দীর্ঘ ১৪ বছর সেখানে দ্বীনী জ্ঞানের আলো বিতরণ করেন। দেশে ফিরে (১৯৭৯) জাতীয় নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হবার পরেও ইন্তেকালের (১৯৮৯) পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সব সময়ই তিনি ‘ইল্মী বিষয়াদিতে শিক্ষক ও গবেষকসুলভ দিকনির্দেশ প্রদান অব্যাহত রাখেন।
মনীষী গ্রন্থকার : হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর প্রণীত গ্রন্থাবলি, বিশেষ করে ফিক্বাহ্ শাস্ত্রীয় গ্রন্থাবলি দ্বীনী ‘ইলমের জগতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী হয়ে আছে। তিনি তাঁর ক্লাসসমূহে যে বক্তব্য রাখতেন তাঁর ছাত্রগণ তা লিখে রাখতেন এবং পরে মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করতেন।
পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে দ্বীনের উপস্থাপন : তিনি ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন : ‘ইসলামে সকল কিছুই শামিল রয়েছে- এ দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে ইসলাম সকল সমস্যার সামাধান প্রদান করেছে।’
সসম্মান সমালোচনা : তিনি যখন তাঁর র্দাসে মনীষীদের মতামতের সমালোচনা করতেন তখন তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে করতেন। এছাড়া তিনি ‘ইল্মী আলোচনায় কখনোই কারো অন্ধ অনুসরণ ও বা অন্ধ বিরোধিতা করতেন না, বরং গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করতেন।
সুন্নাতী ধারার দ্বীনী নেতৃত্ব : বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশে^ ইসলামি রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে ধারণা গড়ে ওঠে ও বহুলপ্রচলিত হয়ে পড়ে হযরত ইমাম সে ধরনের কোনো ইসলামি রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না এবং তিনি কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেন নি। তিনি কেবল নবী-রাসূলগণের (আ.) ও মা‘ছ¡ূম্ ইমামগণের (আ.) তাত্ত্বিক প্রতিনিধি বা উত্তরাধিকারী হিসেবে দ্বীনের শিক্ষা প্রদান এবং জনগণকে দেশের ও বিশে^র প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করার নৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। আর ইরানি জনগণ গণবিরোধী ও ধর্মদ্রোহী পাহলাভী শাহীতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং তাদের সহযোগী বিশ্বগ্রাসী আমেরিকা ও ফিলিস্তিনগ্রাসী যায়নবাদী ইসরাঈলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে নেতৃত্বে বরণ করে নেয়।
দায়িত্ব পালনের অনুভূতি : হযরত ইমাম কোনোরূপ ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি বা সাফল্য-ব্যর্থতার প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে একজন ওয়ারেছে আম্বিয়া’ হিসেবে সব সময়ই কেবল দায়িত্ব পালনের অনুভূতি সহকারে সত্য প্রকাশ ও জনগণকে দিকনির্দেশ প্রদান করতেন। ১৯৬৪ সালের ২৬শে অক্টোবর ক্যাপিচুলেশন আইন সম্পর্কে ভাষণ দেয়ার পর তিনি বলেন : ‘আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি; এবার স্বস্তি পেলাম।’ এর পর পরই তাঁকে তুরস্কে নির্বাসিত করা হয়।
উঁচু স্তরের রাষ্ট্রনায়ক : হযরত ইমাম ছিলেন একজন উঁচু স্তরের রাষ্ট্রনায়ক। তিনি রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে সুপরিচালনা, সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শৃঙ্খলা, আইন, জনগণ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের প্রতি ছিলেন আন্তরিক ও নিজেকে তাঁদের সহযোগী মনে করতেন; বিনা কারণে দায়িত্বশীলদের পরিবর্তন করাকে সমর্থন করতেন না।
নিয়োগ, বরখাস্ত, স্থগিতকরণ, সমালোচনা ও প্রতিবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় তিনি দেখতেন কর্তব্য ও করণীয় কী এবং তদনুযায়ী কাজ হয়েছে কিনা। এ সব ক্ষেত্রে কারো প্রতি ব্যক্তিগত স্নেহ ও বিরাগকে তিনি মোটেই স্থান দিতেন না। তিনি সংবিধান ও আইনের সীমারেখা এবং জনগণের রায় মেনে চলতেন, নিজস্ব মত আন্তরিকতার সাথে পেশ করতেন এবং তিনি দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে উপদেশের ভঙ্গিতে কথা বলতেন।
পরিপূর্ণ ভারসাম্যের অধিকারী : চিন্তা, কথা ও আচরণে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ ভারসাম্যের অধিকারী। নিজের ওপর তাঁর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি কারো প্রতিই এমন নিঃশর্ত ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের মনোভাব পোষণ করতেন না যে, ভালো-মন্দ সর্বাবস্থায় ও অন্ধভাবে তাকে সমর্থন করবেন, অন্যদিকে কাউকে বৈধ সাহায্য-সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে মোটেই দ্বিধা করতেন না।
সাহসী ও বিনয়ী ব্যক্তিত্ব : হযরত ইমাম ছিলেন একই সাথে সাহসী ও বিনয়ী। সাহসিকতা, স্পষ্টবাদিতা, দৃঢ় প্রতিরোধ ও স্থৈর্য সহ একজন প্রকৃত বীর পুরুষের সবগুলো বৈশিষ্ট্যই তাঁর মাঝে ছিল এবং তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ, বিবৃতি ও লেখায় তা ফুটে উঠত। অন্যদিকে তাঁর কথা, মৃদু হাসি, স্নেহশীলতার হস্ত উত্তোলন ইত্যাদিতে স্নেহাস্পদদের ও জনগণের প্রতি বিনয় ফুটে উঠত।
১৯৬৩ সালে কোমের মাদ্রাসায়ে ফায়যিয়ায় শাহের ভাড়াটে এজেন্টদের হামলা কালে, ১৯৬৪-র ২৬শে অক্টোবর তাঁকে গ্রেফতারের সময় এবং দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্বাসনশেষে ১৯৭৯-র পয়লা ফেব্রুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তেহরানের বেহেশ্তে যাহ্রায় প্রদত্ত ভাষণে তাঁর মধ্যে সমভাবেই বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে।
তিনি শাহের ও শাহানশাহী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, আমেরিকা ও ইসরাঈলের বিরুদ্ধে, সাদ্দামের বিরুদ্ধে ও ইতিহাসের রাজা-বাদশাহ্দের সম্পর্কে আগুনঝরা শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহার করতেন, এরপর তিনি স্নেহ-মমতামাখা শব্দাবলি ও হিতোপদেশের ভঙ্গিতে উপদেশ দিতেন। এমনকি তিনি বানী ছাদ্রকে বরখাস্তের সময় তার ভুলের কথা একই সাথে অত্যন্ত বিনয় ও দৃঢ়তা সহকারে উল্লেখ করেন।
সিদ্ধহস্ত লেখক ও সুবক্তা : হযরত ইমাম ছিলেন একই সাথে একজন অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত লেখক ও সুবক্তা। কেবল দ্বীনী জ্ঞানগর্ভ বিষয়াদিতে লেখার ক্ষেত্রেই নয়, বরং তাঁর নিজের দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি দাফতরিক কাজকর্মের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লেখাগুলোতেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন; এ সব লেখার ক্ষেত্রেও তিনি কারো মুসাবিদার ওপর নির্ভর করতেন না। তিনি কাউকে কোনো দায়িত্ব প্রদান করলে তার হুকুমনামা ও প্রেসিডেন্টের নিয়োগপত্র নিজের হাতেই লিখতেন। তিনি ইন্তেকালের আগে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে, বিশেষ করে বিশ্বের মুসলিম ও মুস্তায্‘আফ্ জনগণের উদ্দেশে এবং আরো বিশেষভাবে ইরানি জাতির উদ্দেশে স্বহস্তে দ্বীনী ও রাজনৈতিক পথনির্দেশমূলক ওয়াছ¡ীয়াতনামা (অন্তিম বাণী) লিখে রেখে যান।
তিনি যখনই যা কিছু লিখতেন কদাচিৎ তাতে কাটাকাটি থাকতো। তিনি সংস্কৃতি, দর্শন, চিন্তামূলক ও রাজনৈতিক নির্বিশেষে বিভিন্ন বিষয়ে যা কিছু লিখেছেন তাতেই সহজ-সরল, গতিশীল, সুখপাঠ্য, পরিপূর্ণ অর্থজ্ঞাপক, সুস্পষ্ট, ওজস্বী, আবেগময় ও জ্ঞানপূর্ণ শব্দাবলি ও বাক্যাবলি ব্যবহার করেছেন। এর ফলে তা পাঠকদের মধ্যে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করে এবং লোকদের অন্তঃকরণে প্রবেশ করে তাদের জান-প্রাণের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে যায়।
তিনি যে বিষয়ে লিখতেন এবং যখন কোনো লিখিত বক্তব্য বা বাণী প্রদান করতেন তখন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ছোটখাট ও সূক্ষ্ম দিকসমূহের প্রতিও দৃষ্টি রাখতেন। তিনি তাঁর লেখায় প্রকৃত ও নিগূঢ় সত্যসমূহ তুলে ধরতেন।
পেশাদার ওয়াযেয, খতীব বা বাক্যবাগীশদের বরখেলাফে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, কিন্তু তিনি যখন চরিত্রনীতি থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য দর্শন, ইসলামি দর্শন, ফিকাহ্ বা উছূলে ফিকাহ্র যে কোনো বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন, বা কোরআন মজীদের তাফসীর করতেন, অথবা সাধারণ মানুষ বা সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতেন সর্বাবস্থায়ই এমনভাবে কথা বলতেন যাতে তা সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষে বুঝতে পারা সম্ভব হয়।
হযরত ইমামের কথা শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে যেত এবং গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করত- লোকদের অন্তঃকরণে বিপ্লব সৃষ্টি করত। ইমামের ইন্তেকালের এত বছর পরেও এখনো তাঁর কথার প্রভাব মোটেই হ্রাস পায় নি। এখনো তাঁর বক্তৃতা ও ভাষণ রেডিও-টেলিভিশন থেকে প্রচার করা হলে অথবা রেকর্ড বা সিডি থেকে শোনা হলে মনে হয় যেন তিনি এখন কথা বলছেন এবং তা শ্রোতাকে আনন্দিত করে ও তার ওপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে।
ইমাম অত্যন্ত সংক্ষেপে অথচ জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রাখতেন। অনেক সময় তিনি একই বক্তৃতায় কয়েকটি মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ও একই সাথে চারিত্রিক নীতিমালা সম্পর্কে কথা বলতেন এবং লোকদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশ দিতেন।
সাক্ষাৎকারীদের প্রতি আন্তরিকতা : রাষ্ট্রীয় বা জ্ঞানমূলক বিষয়ে আলোচনা বা বন্ধুসুলভ দেখাসাক্ষাতের জন্য, এমনকি চিকিৎসা বিষয়ক আলোচনার জন্য হলেও, তাঁর সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতে আসা ও উপস্থিত ব্যক্তিদের সাথে তাঁর আচরণ ও কথাবার্তা হতো খুবই অন্তরিকতাপূর্ণ।
বন্ধুদের সাথে আজীবন সুসম্পর্ক : সহপাঠী ও জ্ঞানমূলক আলোচনার বন্ধুগণ সহ হযরত ইমাম তাঁর ছাত্রজীবনের ও যৌবন কালের বন্ধুদের সাথে পরবর্তী জীবনেও সম্পর্ক রক্ষা করেছেন এবং সব সময়ই তাঁদের খোঁজখবর নিতেন। যুগজিজ্ঞাসার জবাব নিয়ে আলোচনাকারিগণের ও ধর্মীয় স্থানসমূহ যিয়ারতের সময় একত্রে সফরকারীদের সাথেও তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। অনেকের সাথে তাঁর পারিবারিকভাবে ওঠাবসা ছিল। দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্ব পালন ব্যপদেশে অনেক প্রতিষ্ঠিত মনীষীর সাথেও তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ইমাম সব সময়ই বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক রাখতেন। হাজারো কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি তাঁদের খোঁজখবর নিতেন।
আধ্যাত্মিকতার পথের পথিক : হযরত ইমাম ছিলেন আধ্যাত্মিকতার পথপরিক্রমারত পথিক। তিনি কোরআন মজীদ ও আহলে বাইতের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রাখতেন এবং সম্ভব হলেই ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ নিয়মিত যিয়ারত করতেন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালন সহ হাজারো ব্যস্ততা সত্ত্বেও দো‘আ-দরূদ ছিল তাঁর নিয়মিত করণীয়। জীবনের শেষ দিকে তিনি তেলাওয়াত ও দো‘আ-দরূদে অনেক বেশি সময় দেন।
দীর্ঘ চৌদ্দ বছর নাজাফে নির্বাসিত জীবনে তিনি প্রতিদিনই হযরত ইমাম আলী (আ.)-এর মাযার যিয়ারত করতেন এবং প্রতিদিনই এক পারা বা তার বেশি পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন, এমনকি ইন্তেকালের অব্যবহিত পূর্বে যে রাতে তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয় সে রাতেও তিনি তাহাজ্জুদ নামায আদায় করেন।
তিনি ফ্রান্স থেকে ইরানে ফিরে আসার পথে বিমানে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য যে ভালোবাসার অশ্রুপাত করেন তা ছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
জাতীয় ও বিশ^পরিস্থিতির দূরদর্শী পর্যবেক্ষক : তিনি ছিলেন জাতীয় ও বিশ^পরিস্থিতির দূরদর্শী পর্যবেক্ষক; বিভিন্ন ঘটনায় এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্ক্সবাদের আশু ধসে পড়ার বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভকে লেখা তাঁর ঐতিহাসিক পত্রে তা উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া তিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয় ও সাদ্দামের চপেটাঘাত খাওয়ার (অভাবিতভাবে আঘাতের সম্মুখীন হওয়ার) ব্যাপারেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, সাদ্দামের বন্ধুরা ও প্রভুরা তার প্রতি বিমুখ হয়ে যাবে।
তিনি ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের অনেক আগেই বলেছিলেন যে, ইরানে অদূর ভবিষ্যতে পাহ্লাভী রাজবংশের পতন ঘটবে। এর ভিত্তিতে তিনি নাজাফে থাকাকালেই ইসলামি রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করেন এবং স্বীয় শিষ্য ও অনুসারীদের ইসলামি রাষ্ট্রের পরিচালনার ব্যাপারে শিক্ষা প্রদান করেন।
এছাড়া হযরত ইমাম ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, তাঁর অবর্তমানেও ইসলামি বিপ্লব ও ইরানের ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকবে- যার যথার্থতা সকলেই দেখতে পাচ্ছে।
জনমনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণে দক্ষতা : তিনি ইরানি জনগণ সম্পর্কে পুরোপুরি ও যথাযথ ধারণা রাখতেন এবং তাদের ওপর আস্থা পোষণ করতেন। ইরানি জনগণও তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আস্থা পোষণ করত এবং তিনি সে সম্বন্ধে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। এ কারণেই তিনি বিশ্বগ্রাসী আমেরিকার পক্ষপুটাশ্রিত শাহের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছিলেন এবং জনগণের সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্কের কারণে ইসলামি বিপ্লবের বিজয় সম্ভব হয়েছিল।
দুশমনদেরকে চেনা : হযরত ইমাম ইসলামের দুশমনদেরকে সঠিকভাবে চিনতেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্বন্ধেও যথাযথ ধারণা রাখতেন। এ কারণেই অনকূল ও প্রতিকূল অবস্থা নির্বিশেষে তিনি দুশমনদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে, বিশ্বের বলদর্পী শক্তিবর্গ ও তাদের তাঁবেদারদের সাথে আপোসহীন থাকতে এবং বিশ্বের জনমনে বিরাজমান বলদর্পী শক্তিগুলোর দেবমূর্তিতুল্য অপরাজেয়তার ধারণাকে চূর্ণ করতে সক্ষম হন।
ইসলামি উম্মাহ্র ঐক্য : তিনি দেশ-জাতি, বংশ-গোত্র, দল-মত ও মাযহাব-ফির্কাহ্ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল মুসলমানের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানান। এ লক্ষ্যে তিনি ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ্ উদযাপনের প্রচলন করেন।
আত্মবিশ্বাসী : হযরত ইমাম আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহের ওপর আস্থার ছায়াতলে দারুণ আত্মবিশ্বাসের অধিকারী ছিলেন। ইরানি জনগণ যাতে বিজাতীয় শক্তির ও বিশ্ববলদর্পীদের ভয়ে ভীত না হয় এবং তাদের কাছে পরাভূত না হয় সে লক্ষ্যে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। তাঁর ভূমিকা গোটা সংগ্রামী অধ্যায়ে ইরানি জনগণের মধ্যে আস্থা, দৃঢ়তা, আশা ও সাহস সৃষ্টি করে। এ কারণেই তাদের পক্ষে খালি হাতে ষড়যন্ত্র ও ফিতনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ইরানের ওপর সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে বীরত্বব্যঞ্জকভাবে আপোসহীন প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভবপর হয়েছিল।
অনন্য জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব : হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন থেকে যেদিন (পয়লা ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯) ইরানে ফিরে আসেন এবং যেদিন তিনি এ ধরাধাম থেকে চির বিদায় গ্রহণ করলে তাঁর নামাযে জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠিত হয় (৪ঠা জুন ১৯৮৯)- এ দু’টি দিন মানব জাতির ইতিহাসের দু’টি অতুলনীয় অবিস্মরণীয় দিন। এ উভয় দিনে ইমামের প্রেমে উদ্বেলিত জনগণ যেভাবে আক্ষরিক অর্থেই জনসমুদ্রের সৃষ্টি করেছিল মানব জাতির ইতিহাসে বিরল। অনন্য উচ্চতায় তাঁর এই জনপ্রিয়তার কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তখন উচ্চকিত হয়েছিল। এমনকি তাঁর ইন্তেকালের পর তিন দশক অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনো তাঁর জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বীনী গুরুত্ব কেবল যে টিকে আছে তা নয়, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

* * *