সোমবার, ১৮ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)- অতুলনীয় যুবক

পোস্ট হয়েছে: মে ১০, ২০১৭ 

news-image

হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আত্মত্যাগী সাহাবী। শুরু থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি মহানবী (সা.)-এর পাশে ছিলেন এবং ইসলামের প্রতি ধারাবাহিক মূল্যবান সেবা প্রদান করেছেন। যেহেতু তিনি প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে ও যুদ্ধ-বিগ্রহে অতি প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেন সেহেতু মহানবী (সা.) তাঁকে খুব বেশি ভালোবাসতেন।

আলী (আ.) ছিলেন হযরত আবু তালিবের সন্তান। আবু তালিব ছিলেন আরবের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গোত্র কুরাইশের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। হযরত আলীর মা ছিলেন একজন মহীয়সী ও সম্মানিতা নারী যাঁর নাম ছিল ফাতেমা। তিনি ছিলেন আসাদ ইবনে মানাফের কন্যা। তিনিও কুরাইশ বংশের নারী ছিলেন। একারণেই হযরত আলীকে প্রথম শিশু হিসেবে ধরা হয় যিনি কুরাইশ পিতা ও কুরাইশ মাতার মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেন।১

হযরত আলী (আ.) অলৌকিকভাবে পবিত্র কাবাঘরে জন্মগ্রহণ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে আল্লাহর ঘর কাবায় জন্মগ্রহণ করার সম্মান হযরত আলী ছাড়া আর কারো হয় নি। জন্মগ্রহণের পর তিনি তিন দিন কাবাঘরে ছিলেন। তিন দিন পর সেই পবিত্র স্থান থেকে তিনি মায়ের কোলে বের হন। এই ঘটনার ব্যাপারে ইতিহাসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে।২

যখন ইসলাম ধর্ম ভীষণ চাপের মধ্যে ছিল এবং কাফের-মুশরিকরা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সেই সময় হযরত আলী (আ.)-এর পিতা হযরত আবু তালিব আল্লাহর নবী (সা.)-কে সমর্থন করেন ও তাঁর সুরক্ষা দেন। তিনি নবুওয়াতের মিশনের ১০ম বর্ষে ইন্তেকাল করেন। সেই বছরেই কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিতা স্ত্রী হযরত খাদিজাও ইন্তেকাল করেন। এজন্য মহানবী (সা.) সেই বছরের নামকরণ করেন ‘আমুল হুয্ন’ (শোকের বছর)। মহানবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-কে খুব অল্প বয়সেই নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর বাড়িতেই বড় হয়ে ওঠেন। মহানবী (সা.)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশনায় তিনি বয়োপ্রাপ্ত এবং উন্নত হন।৩

যখন ওহীর ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) মক্কার নগরীর হেরা গুহায় আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাছে অবতীর্ণ হন এবং এই মহান ব্যক্তিও তাঁর নবুওয়াতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশপ্রাপ্ত হন তখন আলী (আ.)-এর বয়স ছিল দশ বছর। এই ঘটনা শোনার পর হযরত আলীই ছিলেন সেই আহ্বানে সাড়াদানকারী এবং ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম পুরুষ।৪

মহানবী (সা.) নবুওয়াতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ পাওয়ার পর তিন বছর পর্যন্ত তাঁর কর্মকা- প্রকাশ্যভাবে শুরু করেন নি। নবুওয়াত ঘোষণার তৃতীয় বর্ষে তিনি প্রকাশ্যে জনসমক্ষে ইসলামের আহ্বান জানানোর জন্য মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশপ্রাপ্ত হন। প্রথম যেসকল লোককে মহানবী (সা.) আল্লাহর ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানান তারা হলো তাঁরই নিকটাত্মীয়। তিনি তাদের জন্য ভোজের ব্যবস্থা করেন। ভূরিভোজনের সময় তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন : ‘হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! আল্লাহ আমাকে সমগ্র মানবের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য, বিশেষ করে আপনাদের- আমার বংশধরদের জন্য মনোনীত করেছেন। তিনি আমাকে সর্বপ্রথমে আমার পরিবারকে সতর্ক করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমার আত্মীয়-স্বজনকে বলতে বলেছেন যেন তারা আল্লাহর অবাধ্য না হয়।’
সেই ভোজসভায় মহানবী (সা.) এই কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন। কিন্তু আলী ছাড়া আর কেউ তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয় নি। আলী (আ.) সেই সময় তের বছর বয়সের একজন কিশোর ছিলেন মাত্র। মহানবী (সা.) বলেন : ‘হে আলী! তুমি আমার ভাই ও উত্তরসূরি। তুমি আমার উত্তরাধিকারী ও উযির।’৫

আলী (আ.) তাঁর মূল্যবান জীবনকালে মহান আল্লাহর ধর্মের প্রসারে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ইতিহাসে আলী (আ.)-এর প্রচুর সংখ্যক মূল্যবান সেবার কথা উল্লিখিত হয়েছে। আমরা এখানে সেগুলোর মধ্য হতে অল্প কয়েকটি এখানে উল্লেখ করব :

১. মহানবী (সা.)-এর বিছানায় শুয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেয়া : নবুওয়াতের চতুর্দশ বর্ষে কুরাইশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় ও এ ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবককে নির্বাচন করে এবং রাতের বেলা আক্রমণ করে মহানবী (সা.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। মহানবী (সা.) যিনি তাদের শয়তানি অভিপ্রায় সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন তিনি আলী (আ.)-কে তাঁর বিছানায় ঘুমানোর জন্য বলেন যাতে মহানবী (সা.)-এর পক্ষে শত্রুদের অবগতি ছাড়াই শহর থেকে বের হয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। মহানবী (সা.)-এর বিছানায় শোয়ার আহ্বানে সাড়া দেয়ার সময় হযরত আলী (আ.)-এর বয়স ছিল ২৩ বছর। আল্লাহর নবী (সা.) গোপনে শহর ত্যাগ করেন এবং মক্কার নিকটবর্তী সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। রাতের শেষ ভাগে চল্লিশজন সশস্ত্র ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর গৃহে আক্রমণ চালায়, কিন্তু মহানবী (সা.)-এর বিছানায় হযরত আলীর মুখোমুখি হয়ে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়।৬

বদরের যুদ্ধ
বদর যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় দ্বিতীয় হিজরিতে মক্কা ও মদীনার মাঝে বদর নামক একটি কূপের জায়গায়। কাফেরদের সৈন্যসংখ্যা ছিল নয়শ’ পঞ্চাশেরও অধিক আর তার ছিল যথেষ্ট অস্ত্রসজ্জিত, যেখানে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গী-সাথির সংখ্যা তিনশ’ তের জনের বেশি ছিল না। কাফেরদের তিনজন প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী যোদ্ধা উতবা, তার ভাই শাইবা ও তার ছেলে ওয়ালিদ যথাক্রমে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব, হযরত হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব ও হযরত উবায়দা ইবনে হারিস কর্তৃক নিহত হয়। যখন এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় তখন হযরত আলীর বয়স ছিল পঁচিশ বছর।৭

উহুদের যুদ্ধ
বদরের যুদ্ধের এক বছর পর মক্কার কাফেররা পুনরায় তাদের শক্তি সঞ্চয় করে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্য বিপুল পরিমাণ রসদপত্র নিয়ে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হয়- যার দৈর্ঘ্য ছিল ছয় কিলোমিটার। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাত শ’ সৈন্য নিয়ে তাদের মোকাবিলা করেন। প্রথমে তিনি পঞ্চাশজন সুদক্ষ তীরন্দাজকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের অধীনে সরু গিরিপথ পাহারা দেয়ার জন্য নিযুক্ত করেন। এই পথটি মুসলমান সৈন্যদের পেছন দিকে ছিল। মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিলেন যেন তাঁরা কোন অবস্থাতেই সেই স্থান ত্যাগ না করেন।
কাফিরদের বীর যোদ্ধারা- তালহা ইবনে আবি তালহা, আবু সাইদ ইবনে তালহা, হারেস ইবনে আবি তালহা, আবু আজিজ ইবনে তালহা, আবদুল্লাহ ইবনে আবি জামিলা, আরতাত ইবনে শারাহবিল একের পর এক হযরত আলীর হাতে নিহত হয়।
সেই সময় আলী ছিলেন ২৬ বছরের যুবক। মুসলিম বাহিনী প্রাথমিকভাবে বিজয়ী অবস্থায় ছিল। কিন্তু মুসলিম তীরন্দাজরা তাঁদের নেতার আদেশ লঙ্ঘন করে উহুদের সরু গিরিপথ ত্যাগ করলেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ কয়েকজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণ করে। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার ফলে মুসলমানরা এই যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং তাঁদের সত্তর জন শাহাদাত বরণ করেন। যাঁরা এই যুদ্ধে শহীদ হন তাঁদের অন্যতম ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা হযরত হামযা (রা.)। আলী (আ.) সহ কয়েকজন সাহাবী বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সাথে মহানবীকে রক্ষা করেন। হযরত আলী ইবনে আবি তালিব এই যুদ্ধে নব্বইটি আঘাত পেয়েছিলেন। এই যুদ্ধের সময় আসমান থেকে একটি ধ্বনি শোনা যায়- ‘কোন আদর্শ বিজয় নেই আলী ছাড়া, কোন মূল্যবান তলোয়ার নেই যুলফিকার ছাড়া।’৮

খন্দকের যুদ্ধ (আহযাবের যুদ্ধ)
পঞ্চম হিজরির যিলকদ মাসে মক্কার মুশরিকরা মদীনায় ইসলামের নিরাপত্তাধীনে অবস্থানকারী ইহুদিদের সাথে যৌথভাবে আক্রমণ চালিয়ে ইসলাম ধর্মকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করল। তারা মদীনায় বসবাসকারী অন্যান্য গোত্রের কাছ থেকে সাহায্য ও সহযোগিতার বিষয়ে নিশ্চিত হলো। ষড়যন্ত্রকারীরা সম্মিলিতভাবে চার হাজার যোদ্ধাকে যুদ্ধের জন্য সংগ্রহ করল। মক্কার প্রসিদ্ধ বীর যোদ্ধা আমর ইবনে আবদে উদও এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আমর ইবনে আবদে উদ বদরের যুদ্ধে আহত হয়েছিল। সেজন্য সে তার অন্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচ- বিদ্বেষ পোষণ করত। সে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, যতদিন না সে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবী মুসলমানদের ওপর প্রতিশোধ না নিতে পারবে ততদিন পর্যন্ত গায়ে তেল মাখবে না। উল্লেখ্য, আরবের একটি সাধারণ প্রথা ছিল যে, যখনই কোন দল পরাজিত হতো অথবা অন্য কারো দ্বারা দুর্ভাগ্যকবলিত হতো তখন তারা নিজেদের সাথে একটি প্রতিজ্ঞা করত যে, যতক্ষণ না তারা তাদের শত্রুদের ওপর প্রতিশোধ নিতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত গায়ে তেল মাখবে না। তারা এমনটি করত এ কারণে যে, ওই সময়ে আরবের প্রথা অনুসারে শরীরে তেল দেয়া হতো তখন যখন তাদের কোন প্রকার দুঃখ থাকত না এবং তারা সুখের শীর্ষে অবস্থান করত।
যখন মক্কার কাফির-মুশরিকরা মদীনায় পৌঁছল তখন বনু কুরায়যার বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা, যারা মহানবী (সা.)-এর সাথে শান্তি ও সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করেছিল তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মক্কার কাফিরদের সাথে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত হয়। মুসলমানরা হযরত সালমান ফারসির পরামর্শ মোতাবেক মুশরিকদের মদীনায় প্রবেশে বাধা দেয়ার জন্য মদীনা নগরীর চারদিকে একটি খন্দক বা পরিখা খনন করে। মূর্তিপূজারীদের এই অবরোধ সাতাশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অবশেষে কাফিরদের প্রসিদ্ধ বীর যোদ্ধা আম্র ইবনে আবদে উদ খন্দক অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এবং মদীনায় প্রবেশ করে। সে চাইল যে, মুসলমানদের মধ্য থেকে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তার সাথে লড়াই করুক। হযরত আলী (আ.) ছাড়া আর কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পেল না। হযরত আলী সেই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পদার্পণ করলেন। মহানবী (সা.) বললেন : ‘সমগ্র ঈমান সমগ্র কুফ্রের মোকাবিলায় অবতীর্ণ হয়েছে।’
আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) কাফিরদের বীর যোদ্ধাকে হত্যা করলেন এবং তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। মহানবী (সা.) বললেন : ‘নিশ্চয়ই খন্দকের যুদ্ধে আলীর আঘাত সকল জীন ও মানুষের সত্তর বছরের ইবাদত অপেক্ষা মূল্যবান।’
আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এসব মূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দেন মাত্র ২৭ বছর বয়সে। এই যুদ্ধের পর মহানবী (সা.) আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর নেতৃত্বে ইহুদি গোত্র বনু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা ও অবাধ্যতার জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। ইহুদিদের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি হুয়াই ইবনে আখতাব যুদ্ধে নিহত হয় এবং ইহুদিদের দ্বারা পরবর্তী কোন ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে মূলোৎপাটিত হয়। ইহুদিদের সহায়-সম্পত্তি মুসলিমদের হাতে আসে এবং মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা এরপর থেকে সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে থাকেন।
হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর সাহস ও বীরত্বের কারণে এই বিরাট বিজয় অর্জিত হয়।৯

খায়বার বিজয়
৭ম হিজরিতে খায়বারের ইহুদিরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। তারা মদীনার দুশ’ মাইল উত্তরে খায়বারের সাতটি দুর্গকে নানা ধরনের অস্ত্রের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। চার হাজার ইহুদি এসব দুর্গে বসবাস করত এবং তারা মুসলমানদের জন্য একটি বড় বিপদ হিসেবে পরিগণিত হতো।
এই বিপদের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) এক হাজার পাঁচশ’ পদাতিক সৈন্য ও দুই হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে খায়বার অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর পতাকা হযরত আলীর হাতে অর্পণ করেন যখন তাঁর বয়স ছিল ত্রিশ বছর।
এই যুদ্ধে পর্যায়ক্রমে হযরত আবু বকর ও হযরত উমরকে আক্রমণের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, কিন্তু তাঁরা কেউই সফল হন নি। মহানবী (সা.)-এর নিকট হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না।
হযরত আলী ইহুদিদের বীর যোদ্ধা মারহাবকে হত্যা করেন। যখন মুসলমান সৈন্যরা দেখলেন যে, শত্রুদলের বীর যোদ্ধা নিহত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে তখন তারা ইহুদিদের ওপর প্রচ- আক্রমণ চালায়। আলী (আ.) খায়বারের লোহার ভারী দরজা উপড়ে ফেলেন এবং এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। এই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের তিন বীর যোদ্ধা মারহাব, হারিস ও ইয়াসির হযরত আলীর হাতে নিহত হয়। খায়বারের সাতটি দুর্গই বিজিত হয়। যুদ্ধশেষে চল্লিশ জন লোক একত্রে দুর্গের সেই দরজা স্বস্থানে পুনরায় সংযুক্ত করার বহন করে নিয়ে আসেন যেটি যুদ্ধের সময় হযরত আলী এক হাতে বহন করেছিলেন।১০

মক্কা বিজয়
ইসলামি বর্ষপঞ্জির (হিজরি) অষ্টম বর্ষে কোন ধরনের রক্তপাত বা যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় হয়। মহানবী (সা.) বারো হাজার সাহাবীসহ পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেন। মহানবী (সা.) নিজেই আল্লাহর ঘর কাবায় স্থাপিত সব মূর্তি ভেঙে ফেলেন। এরপর তিনি আলী (আ.)-কে তাঁর কাঁধে উঠে সেসব মূর্তি ধ্বংস করার আদেশ দেন যেগুলো কাবাঘরের ওপরের অংশে স্থাপন করা হয়েছিল। আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে তাঁর কাঁধে চড়ে কাবাঘরের ওপরে ওঠেন এবং সেসব মূর্তি ভেঙে ফেলেন। নেমে আসার সময় আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর কাঁধে পা দিয়ে নেমে আসার পরিবর্তে কাবাঘরের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে নামেন। মহানবী (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন : ‘নিচে নামার সময় কেন তুমি আমার কাঁধে পা রাখলে না?’ আলী (আ.) জবাব দিলেন : ‘আপনি ওপরে ওঠার সময় আমাকে আপনার কাঁধে ওঠার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু যখন আমি নিচে নামার সময় আপনি কিছু বলেন নি। সুতরাং আমি লাফ দিয়ে নিচে নেমেছি। আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই যে, আমি তাঁর নবীর সাথে ধৃষ্টতামূলক আচরণ করি নি।’১১

এখানে যা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো অতুলনীয় যুবক হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) ইসলামের প্রতি যেসব মূল্যবান সেবা দিয়েছেন তার কয়েকটি মাত্র। তিনি প্রতিটি ঘটনায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পর হযরত আলী (আ.) তাঁর পুরো অস্তিত্ব দিয়ে মুসলমানদের কল্যাণে সংগ্রাম করে গেছেন। হযরত আলী (আ.)-এর প্রশংসায় মহানবী (সা.)-এর বিপুল সংখ্যক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র
১. বিহারুল আনওয়ার, ৩৫তম খ-, পৃ. ৬৮
২. আল মুসতাদরাকুস সাহীহাইন, হাকিম, ৩য় খ-, পৃ. ৪৮৩; আল গাদীর, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ২২
৩. উসুলে কাফী, ২য় খ-, পৃ. ৩২৪; আল গাদীর, ৭ম খ-, পৃ. ৩৩০
৪. তারিখে তাবারী, ২য় খ-, পৃ. ২১২; ইহকাকুল হাক, ৭ম খ-, পৃ. ৪৯৭
৫. ইহকাকুল হাক, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ৪৬১; কানজুল উম্মাল, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ৩৯৭
৬. ইহকাকুল হক, ৮ম খ-, পৃ. ৩৩৪; সীরাতে হালাবীয়্যাহ, ২য় খ-, পৃ. ২৬
৭. ইহকাকুল হাক, ৮ম খ-, পৃ. ৩৪৮; বিহারুল আনওয়ার, ৪১তম খ-, পৃ. ৭৯; মুফিদ, আল ইরশাদ, ১ম খ-, পৃ. ৬২
৮. ইহকাকুল হাক, ৮ম খ-, পৃ. ৩৬৬; তাযকিরাতুল খাওয়াস, পৃ. ২১; তারিখে তাবারী, ৩য় খ-, পৃ. ৩৭
৯. হাকিম, মুসতাদরাকুস সাহীহাইন, ৩য় খ-, পৃ. ৩২, তারিখে বাগদাদ, ১৩তম খ-, পৃ. ১৯
১০. কানজুল উম্মাল, ৫ম খ-, পৃ. ১১৪; আল মুস্তাদরাকুস সাহীহাইন, ৩য় খ-, পৃ. ৩৭
১১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খ-, পৃ. ৪২৯; ইবনে সাদ, তাবাকাত, ২য় খ-, পৃ. ১০২

সংকলন : মিকদাদ আহমেদ