শনিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সৃষ্টিশীল কবি নজরুল

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৭, ২০১৮ 

আফতাব চৌধুরী

কবি নজরুল তাঁর সতেজ কণ্ঠস্বর ও রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে সংগীতের জগতে প্রবেশ করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রচিত হতে থাকে তাঁর নিজস্ব সংগীত জগৎ। মূলত গানের মাধ্যমে তাঁর কলকাতা জীবনের শুভারম্ভ হয়েছিল। সেই গানের ক্ষেত্রেই কবি নজরুল বিপুল প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তিনি মর্মস্পর্শী আবেগে স্বরচিত কবিতা পাঠ করতেন যা সহজেই মানুষকে মাতিয়ে তুলত। কবি নজরুলের সৃষ্ট বিভিন্ন আঙ্গিকের গান মানুষের মাঝে বিশেষ প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যা কারও অজানা নয়।
এ প্রসঙ্গে কবি নজরুলের সংগীতের বিশাল ভাণ্ডার থেকে স্বল্প পরিসরে তাঁর কিছু জনপ্রিয় গানের নমুনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
দেশাত্মবোধক গান
তথ্য সংগ্রহে যতটুকু জানা যায়, উদ্দীপনায়ময় দেশাত্মবোধক গান দিয়ে কবি নজরুলের সংগীত যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর শুরুতেই এই গান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কবি নজরুল জনতার কাছ থেকে যে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন ও প্রশংসা লাভ করেছিলেন সংগীতের ইতিহাসে তা এক বিরল ঘটনা। তাঁর এই ধরনের জনপ্রিয় গানে গর্জে উঠেছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের দুর্বার উৎসাহ। কবির দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ ইত্যাদি।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু নজরুলের এই উদ্দীপনামূলক গান সম্পর্কে লিখেছেন- ‘তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারণ। তাঁর গান পড়ে আমার মতো বেরসিক লোকের জেলে বসে গান গাইবার ইচ্ছে হতো। নজরুলকে যে বিদ্রোহী কবি বলা হয় এটা সত্য কথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে, আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনও তাঁর গান গাইবো।’
আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়াই, বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় জাতীয় সংগীত শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’-র মতো প্রাণমাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না।
গজল
দেশাত্মবোধক গান রচনার পাশাপাশি সময়েই নজরুল সবাইকে চমকে দেন গজল গান রচনা করে। তাঁর জনপ্রিয় গজল গানের মধ্যে আমরা দেখতে পাই- ‘কে বিদেশী মন উদাসী’, ‘মুসাফির মোছরে আখি জল’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ ইত্যাদি। গজল মূলত পারস্যের গান। কবি তাঁর গজল রচনার ক্ষেত্রে ভাষার প্রয়োগ, সুর সংযোগের সৌন্দর্য, গায়ন শৈলী বিশ্লেষণ করে শায়েরির ব্যবহারের জন্য প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। ‘কে বিদেশী মন উদাসী’ গজল গানটি শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত জনসাধারণের মুখে মুখে জনপ্রিয় হয়েছিল। নজরুল প্রচুর জনপ্রিয় গজল গান রচনা করে গেছেন। নজরুলের গজল গানের জনপ্রিয়তা কোন সময়ই হ্রাস পাবে বলে মনে হয় না।
ইসলামি গান
বাংলায় ইসলামি গান রচনার ক্ষেত্রেও কবি প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। কবি নজরুল হাম্দ ও নাত শ্রেণির গান ছাড়াও ঈদ, মুহররম, আজান, নামাজ প্রভৃতি সম্পর্কে অনেক গান রচনা করেছেন। বর্তমানেও এ ধরনের গানের জনপ্রিয়তা কমে নি। এই ধরনের গানের রচনার মতো সুরের বৈচিত্র্য যথেষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর গানে। কবি নজরুলের জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’, ‘এ কোন মধুর সারাব দিলে’ প্রভৃতির মতো অনেক জনপ্রিয় গান।
কাব্যগীতি
জনপ্রিয়তার দিক থেকে গজলের পরই আসে নজরুলের কাব্যগীতি। এর মধ্যে আছে আধুনিক ও প্রেম সম্পর্কিত গান। তাঁর রচিত এই ধরনের প্রচুর গান বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে আছে- ‘মোর প্রিয়া হবে এস রাণী’, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’, ‘আমায় নহে গো ভালবাস’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়’- এই ধরনের অসংখ্য জনপ্রিয় গান। কাজী নজরুল ইসলাম এই ধরনের গান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয় গড়ে তুলেছিলেন যা আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। সংগীতশাস্ত্রের বিভিন্ন রাগের স্পর্শে এই ধরনের গান জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
শ্যামা সংগীত
নজরুলের শ্যামা সংগীত তাঁর রচনা ও সুর সংযোজনার মাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। জানা যায়, আধুনিক কালের বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ রচয়িতাদের কেউই এই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ধারার গান রচনায় এগিয়ে আসছিলেন না। কিন্তু কবি নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর রচিত শ্যামাসংগীতগুলো বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। যেমন- ‘বলরে জবা বল’, ‘আমরা কালো মেয়ের পায়ের তলায়’, ‘আর লুকাবি কোথা মা কালী’ ইত্যাদি।
রাগ প্রধান
কবি নজরুলের বহু রাগপ্রধান গান আজও জনপ্রিয়। রাগ সংগীতের মূলস্রোতের সঙ্গে মিশিয়ে কবি নজরুল অনেক জনপ্রিয় রাগপ্রধান গান রচনা করেন গেছেন। যার মধ্যে ছিল দক্ষিণ ভারতীয় রাগের ওপরও অনেক জনপ্রিয় গান। কবি নজরুলকে তাঁর জীবনে জমিরুদ্দিন খাঁ সাহেবের মতো অনেক ওস্তাদের কাছে তালিম নিতে হয়েছিল যা তাঁর রাগপ্রধান গান সৃষ্টি ও জনপ্রিয় করে তুলতে সাহায্য করেছিল। তাঁর সৃষ্ট রাগপ্রধান গানগুলোর মধ্যে আছে- ‘কাবেরি নদী জলে কে গো বালিকা’, ‘স্নিগ্ধ শ্যামবেণীবর্ণা এস মালবিকা’, ‘তরুণ কান্তি কে গো যোগী ভিখারী’, ‘কুহু কুহু কুহু কোয়েলিয়া কুহরিল’ ইত্যাদি। ‘কুহু কুহু কুহু কোয়েলিয়া কুহরিল’ গানটি খাম্বাজ রাগে ‘ন মানুঙ্গী ন মানুঙ্গী ন মানুঙ্গী’ নামক হিন্দি খেয়ালের অনুসরণে রচিত। আজ পর্যন্ত এমনি অনেক গান জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যা কবির সৃষ্টির জীবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।