বৃহস্পতিবার, ১৪ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সাদী ও হাফিজের হৃদয়ের ধ্বনিই আমরা নজরুলের কবিতায় পাই: ড. কাহদুয়ী

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ 

news-image

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকাস্থ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘নজরুল ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’ ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে ইরানের কবি শেখ সাদী ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও সাহিত্যকর্মের ওপর এক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। নজরুল ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লেখক গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সংস্কৃতিসেবী জাহিদুর রহমানের উপস্থাপনায় উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কাজেম কাহদুয়ী একথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর ও নজরুল-গবেষক ড. কাজেম কাহদুয়ী, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ মাহদী হোসেইনী ফায়েক, প্রবীণ সাংবাদিক ও বিশিষ্ট কবি জনাব এরশাদ মজুমদার, নজরুল-গবেষক ও নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক কবি আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং লালকুঠি দরবার শরীফের পীর জনাব আহসানুল হাদী। আলোচনায় অংশ নেন নয়া সৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ড. মুহাম্মদ একরামুল ইসলাম, কবি ও আবৃত্তিকার আহমদ বাসীর, কবি শাহ সিদ্দিক, জনাব মাহবুব মুকুল প্রমুখ। শেখ সাদীকে নিবেদিত কবিতা পাঠ করেন কবি আমিন আল আসাদ ও কবি রহমান মাজিদ।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কাজেম কাহদুয়ী বলেন, ফেরদৌসী, রুমী, সাদী, হাফিজ ইরানের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ কবি। ইরানের এই চার কবি বাংলাদেশের জনগণের কাছেও প্রিয় ও পরিচিত। বিশেষ করে শেখ সাদী ও রুমী মিশে আছেন বাংলাদেশের ধর্মীয় আবহের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালনে এসেছি। আজ থেকে ২৫ বছর আগে যখন প্রথমবার বাংলাদেশে আসি তখন ঈদের নামাজ পড়তে গিয়ে দেখলাম ইমাম সাহেব মুনাজাতে দরূদ, দোয়ার সাথে শেখ সাদী (র)-এর বিখ্যাত চার লাইন নাত পাঠ করছেন- ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি/ কাশাফাত দুজা বি জামালিহি/ হাসুনাত জামিও খিসালিহি/ সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি’- এটা শুনে আমার খুব প্রশান্তি অনুভব হয়েছে। শেখ সাদী (র) মানবাত্মাকে আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন করার ও রাসূলপ্রেমের পরম প্রশান্তির পথে ধাবিত হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা প্রবেশ করেছে মানব হৃদয়ের গভীরে। সাদি ও হাফিজ-এর হৃদয়ের ধ্বনিই আমরা বাংলাদেশের নজরুলের কবিতায় পাই। হাফিজের ‘দিওয়ান’ নজরুল অনুবাদ করেছেন। নজরুল হাফিজ-প্রেমিক ছিলেন বলেই তিনি তাঁর ছেলের নাম রেখেছিলেন বুলবুল। এই বুলবুল যখন জন্মগ্রহণ করে তখন নজরুল ‘দিওয়ানে হাফিজ’ অনুবাদের কাজও শুরু করেন একই দিনে। সবচেয়ে বেদনা ও মর্মপীড়ার বিষয় এটা যে, যেদিন এই ‘দিওয়ান’ অনুবাদ শেষ হলো সেই দিন নজরুলের পুত্রসন্তান বুলবুলও অসুস্থতায় ইন্তেকাল করলো।

নজরুল ‘ধুমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। নজরুল প্রচুর ফারসি শব্দ তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন। তখনকার অনেক কবি-লেখক-সমালোচক নজরুলের এই সব ফারসি শব্দ বাংলায় ব্যবহারের সমালোচনা করেন, বিশেষ করে নজরুল ফারসি ‘খুন’ শব্দটি প্রয়োগ করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপত্তি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফারসি আমার প্রাণের শব্দ, সেগুলো আমার কবিতায় আমি অবশ্যই ব্যবহার করব। সর্বোপরি শেখ সাদী ছিলেন একজন মানবতাবাদী কবি। 

নজরুল-গবেষক শেকড়সন্ধানী কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, শেখ সাদীর জ্ঞানের গভীরতা পাশ্চাত্য পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী পিথাগোরাস এবং টেনিশন থেকেও অনেক ঊর্ধ্বে। শেখ সাদী মানবতাকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছেন আধ্যাত্মিক চেতনা দিয়ে। হাফিজ ও শেখ সাদীর মধ্যে পার্থক্য হলো হাফিজ মানবাত্মার রোদনকে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন পরমলোকে। আর সাদী পরমলোক থেকে আলো এনে মানব জীবনকে সার্থক করতে চেয়েছেন। শেখ সাদী (র) মহানবী (সা.)-এর হাদীসের সেই পরম বাণী ‘সকল বিশ্বাসী মানবম-লী এক দেহের মতো, এর যে কোন অংশে আঘাত লাগলে সমস্ত দেহে এর বেদনা অনুভূত হয়’ অনুযায়ী যে কবিতার লাইন রচনা করেন তা জাতিসংঘের সদর দরজায় লিপিবদ্ধ আছে। শেখ সাদী সহ ইরানি কবিদের রচনার পরিচয় পেতে মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর ‘পারস্য প্রতিভা’ ও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনের ‘ইরানের কবি’ পড়তে হবে। শেখ সাদীর কবিতা বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। শেখ সাদী যেদিন এই ধরাধামে জন্মগ্রহণ করেন সেই দিন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন বিখ্যাত অলি আবদুল কাদের জিলানী (র)। এ যেন এক সূর্যের অস্ত গিয়ে একই ভাবাদর্শের আরেক সূর্যের উদয়। শেখ সাদী (র) অত্যাচারের প্রতিবাদে অনেক কবিতা লিখেছেন। তিনি জালিম শাসকদের সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি জালিম শাসকদের অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেছিলেন। যখন ডাকাত হালাকু-মঙ্গোলরা বাগদাদ নগরী দখল করে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল। তিনি এই হত্যাকা- দেখে প্রচ-ভাবে বেদনাহত হন এবং বাগদাদ ছেড়ে মক্কায় চলে আসেন।
শেখ সাদী অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। ইবনে বতুতার পর শেখ সাদীর মতো ভ্রমণ আর কেউ করেন নি।
কবি আবদুল হাই শিকদার হাফিজ ও শেষ সাদীর ওপর ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালে ইরান সফরের স্মৃতি উল্লেখ করে প্রসঙ্গিকভাবে বলেন, ইরান একটি সুন্দর দেশ ও ইরানি জাতি একটি সংস্কৃতিবান ও সুশীল জাতি। ইরানের সাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও শাণিত। ইরানের সাহিত্যের মতো ইরানি জাতির সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনাও শাণিত। এ জাতি ঐক্যবদ্ধ জাতি। ইরান অস্তিত্বহীন হলে মুসলমানদের আর কিছুই থাকবে না। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের সাহিত্যেও আমরা পাই ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা। আমরা ইরানি জাতিকে সমর্থন করি। ইরানের সা¤্রজ্যবাদবিরোধী চেতনাকে সালাম জানাই। আমরাও ইহুদি যায়নবাদের প্রতি ধিক্কার জানাই।


প্রবীণ সাংবাদিক এরশাদ মজুমদার বলেন, সাদীর সাহিত্য আমাদেরকে খাঁটি মানুষ ও মুসলমান হতে বলে সেই সাথে মানবতাবাদী মানুষ হতে বলে। কথা প্রসঙ্গে তিনি ধর্মদ্রোহিতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি ও চিন্তার সীমাবদ্ধতা উভয়ের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একদল লোক না বুঝেই যেমন ধর্মের বিরোধিতা করে আবার একদল চিন্তাবিদ না বুঝেই ইকবাল, নজরুল, ইবনে সীনা, ওমর খৈয়ামকে কাফের বলেছিল। রোকেয়াকে ফাসেক বলেছিল। ইসলামের বড় বড় সাধককে তাঁদের কথার মর্মার্থ না বুঝতে পেরে তাদের প্রতি মারমুখী হয়েছিল। যেমন মনসুর হাল্লাজের কথা ধরা যায়।
শেখ সাদী যেমন ছিলেন কবি তেমন ছিলেন ওলি। শেখ সাদীর তাসাউফযুক্ত সাহিত্য মানুষকে আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন করতে চায় ও ইনসানে কামেল হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু আজকে মানুষের কথা ও কাজের কোন মিল নেই। সৃষ্টির সেরা মানুষ আজ তাদের স্বভাব-চরিত্রে পশুত্বকে হার মানিয়েছে। মানুষের ভেতর ঢুকে পড়েছে মুনাফেকী ও স্ববিরোধিতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অনুষ্ঠানের বক্তাদের বক্তব্যকে বাংলা থেকে ফারসি ভাষায় এবং ইরানি বক্তাদের ফারসি বক্তব্যকে বাংলায় ভাষান্তর করেন। এছাড়া তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, কবিদের কবিতায় অফুরন্ত এক জীবনী শক্তি লুক্কায়িত থাকে যা যুগ যুগ ধরে আলো বর্ষণ করে। সেই আলোকে গ্রহণ করে মানব সমাজকে পশু সমাজের থেকে পৃথক করা হয়। শেখ সাদীর কবিতা মরিচাযুক্ত ধরা আত্মাকে মরিচামুক্ত করতে সহায়তা করে।
নয়া সৈনিক পত্রিকার সম্পাদক একরামুল ইসলাম বলেন, ধর্মের প্রকৃত রূপ কখনো উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদকে সমর্থন করে না। শেখ সাদী তাঁর রচনায় ধর্মের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছেন। ইসলামের জিহাদ আর উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদ এক জিনিস নয়। ধর্মের নামে জঙ্গীবাদ, বোমা মেরে অতর্কিতে মানুষ মারা ইহুদি-যায়নবাদীদের ফিলিস্তিনি হত্যা, বর্মী নাসাকা বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা হত্যা একই অপরাধ। ইসলামের বিজয় হচ্ছে নৈতিক বিজয়। সেটা শেখ সাদীর মতো আল্লাহর খাঁটি বান্দা ও রাসূলপ্রেমিকদের দ্বারাই হয়েছে।
আবৃত্তি শিল্পী আহমদ বাসির বলেন, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে ইরানের। আর পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানই সারা বিশ্বে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসার ঘটাতে সর্বদা তৎপর। ইরান ইসলামি বিপ্লব করেছে। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের চেতনা মিলে মিশে যে আত্মবিশ্বাস ইরানি জাতির মধ্যে তৈরি হয়েছে সেই আত্মবিশ্বাসই তাদের সকল প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে বিজয়ী করেছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সব সময়ই ইরান সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের সাথে শেখ সাদীর বড় মিল উভয়ই রাসূল (সা.)-এর শানে নাত লিখেছেন। শেখ সাদী ও রুমির কবিতার ভেতর যে অফুরন্ত শক্তি রয়েছে সেটা আত্মোন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে।
কবি শাহ সিদ্দিক বলেন, শেখ সাদী ও নজরুল উভয়েই মানবতার জয়গান গেয়েছেন। নজরুল মানুষকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর মানুষ কবিতায় মানবের জয়গান গেয়েছেন। বিদ্রোহী কবিতায় কবি বলেছেন, মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ ভুলোক দূলোক গোলাক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া উঠিয়াছি চির বিস্ময়…’ এই কবিতায় তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মেরাজের ঘটনার কথাই বলেছেন। রাসূল (সা.)-এর মেরাজে গমন মানে মানবতার প্রতিনিধির মেরাজে গমন। এতো মানবতারই সম্মান। তিনি একই কবিতায় বলেছেন, ‘আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি’- এ লাইনে তিনি নমরুদের অগ্নিকু- থেকে মুসলমান জাতির পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর পূর্ণাঙ্গ ফিরে আসার চিত্র এঁকেছেন। নমরুদের আগুনের স্থলে ফুল হয়ে গেল। আর পুষ্পের সাথে ইবরাহীম (আ.)-ও পুষ্পের মতো হাসি হেসেছেন। সেটাই তিনি বুঝিয়েছেন। এখানেও তিনি মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন।
জনাব মাহবুব মুকুল তাঁর আলোচনায় বলেন, শেখ সাদীকে যতটা জানার দরকার ছিল আমাদের দেশে তা মোটেই চর্চা হয় নি। আমরা শুধু সাধারণভাবে শেখ সাদীর পোশাকের গল্পটি ছাড়া আর কিছুই তাঁর সম্পর্কে জানি না। আর তাঁর সেই বিখ্যাত নাত ‘বলাগাল উলা বি…’। কিন্তু ‘গুলিস্তা’, ‘বোস্তা’ ছাড়াও তাঁর অপরাপর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আমাদের জানা প্রয়োজন। প্রয়োজন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেমিনার বা আলোচনা সভা। 

◊ আমিন আল আসাদ