রবিবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সাংস্কৃতিক বিনিময় বনাম সাংস্কৃতিক আধিপত্য

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৩০, ২০১৪ 

সংস্কৃতি হলো একটি গতিশীল বিষয়। মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসই সংস্কৃতির এই চিরন্তন পরিবর্তনশীল বা গতিশীলতার অনড় সাক্ষী। সংস্কৃতির এই আবহমান পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণেই একটি সংস্কৃতির মৃত্যু এবং আর একটি সংস্কৃতির জন্ম হয়। তবে সবসময় যে এই পরিবর্তনগুলো একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেবে, এমন কথা নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয়ও না। ইসলামী সংস্কৃতিও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলাম তার চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে এরূপ অনেক জোয়ার-ভাটা প্রত্যক্ষ করেছে। তবে একথাও সত্য যে, নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতার পরও ইসলামী সংস্কৃতি তার স্বকীয়তায় বিদ্যমান থেকে নিজস্ব গতিতে এগিয়েও চলছে।

বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীতে বর্তমান সংস্কৃতি ও সভ্যতাগুলোও কম-বেশি এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এগুলো বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়েই বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এগুলোর মধ্যে যেগুলো এসব ধকল বা প্রতিকূলতা সামলিয়ে উঠতে পারেনি, সেগুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে।

যে তিক্ত বিষয়টি বর্তমান বিশ্বের সবাইকে কম-বেশি ভাবিয়ে তুলেছে তা হলো ‘পশ্চিমা মার্কিন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’, বিশেষ করে ‘মার্কিন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদের মাধ্যমেই পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ গড়ে উঠেছে। তারা তাদের চাপিয়ে দেওয়া অপসংস্কৃতির ফাঁদে ফেলে অন্যান্য জাতির বিশ্বাস ও মূল্যবোধে ধস নামানোর হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এক্ষেত্রে তারা তাদের প্রচারণামূলক কাজে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোকে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করছে।

পশ্চিমাদের এরূপ আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক নীতির কারণেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ব্যবধান ও দ্বন্দ্ব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত না থেকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। কেননা, বিশ্বের মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে অন্যান্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই এবং অন্যান্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করাই তার মূল উদ্দেশ্য। সে জন্য অন্যান্য সংস্কৃতির সাথে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিনিময় দ্বি-পাক্ষিক না বলে বরং এক তরফা বলা চলে। পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতার সমৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতি ও প্রাচ্যের সংস্কৃতির বিনিময়ের বেলায় এই দর্শন অকার্যকর; বরং সেখানে বিনিময়টা হয় একপেশে বিনিময় নীতির ভিত্তিতে।

ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, পৃথিবীর অন্যান্য সংস্কৃতি থেকে একটি বিশেষ সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতা তাকে লাঞ্ছনা ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এটাকে আমরা মূল থেকে বিচ্ছিন্ন একটি গাছের সাথে গণ্য করতে পারি।

কাজেই কোন সংস্কৃতি যদি তার স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকতে চায় এবং যথাযথ মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা পেতে চায়, তাহলে তাকে যথাযথ অর্থে ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ দর্শনে বিশ্বাসী হতে হবে এবং কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ হতে হবে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এবং সৌহার্দমূলক পরিবেশে। অন্যথায় এই ‘সাংস্কৃতিক সম্পর্ক’ উন্নয়নের বিষয়টি কেবল একটি ‘স্বগতোক্তি’র মতোই হয়ে থাকবে। বাস্তবতায় এর কোন প্রতিফলন থাকবে না। উপরন্তু তা কিছু বাড়তি সমস্যার সৃষ্টি করবে যা জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক সত্তার জন্য বয়ে আনবে ভীতিকর দুর্দশা।

বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো যদি ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ কিংবা ‘যোগাযোগ বিপ্লব’ প্রভৃতি স্লোগানের আলোকে সবকিছু চিন্তা-ভাবনা করে, তবে এটা দিবালোকের মতো সত্য যে, তারা বলতে চায়, ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ প্রতিষ্ঠিত আছে এবং তা এই বৃহৎ শক্তিগুলো বনাম অন্যান্য দেশের মধ্যে। কিন্তু ইতিমধ্যে বাস্তবে আমরা যা দেখতে পেয়েছি তা হলো এই তথাকথিত বিনিময়ের নামে এই ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ একপেশে এবং এক তরফা বিনিময়ে পরিণত হয়েছে। এই বিনিময় ব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ঐসব তথাকথিত বৃহৎ শক্তির কাছ থেকে সংবাদ, তথ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রভৃতি গ্রহণ করবে, কিন্তু তারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করবে না। কাজেই এই একতরফা ‘সংস্কৃতি-বিনিময়কে’ আমরা আর যা কিছু বলতে পারি অন্তত একে ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ বলতে পারি না।

এই প্রেক্ষিতে ঐসব তথাকথিত বৃহৎ শক্তির সর্তক হওয়া উচিত। কেননা, তারা যদি মনে করে যে, তারা তাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা দিয়ে বিশ্বের সব মানুষের চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করে তাদের স্বমতে নিয়ে আসতে পারবে, তবে তা হবে একটি বিরাট ভুল চিন্তা। কেননা, অতীতেও অনেক স্বৈরাচারী শক্তি এরূপ চিন্তা করেছিল এবং তা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সব ধরনের পন্থাও অবলম্বন করেছিল; কিন্তু তাদের সব চিন্তা-চেতনা ও প্রয়াস ভেস্তে গিয়েছিল। কোন সংস্কৃতিই তার স্বকীয়তা পুরোপুরি হারায় না এবং কালের ¯্রােতে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ফিরে আসে। এই একই কারণে এই নব্য শক্তিরাও তাদের অপসংস্কৃতি দ্বারা অন্যান্য বিশুদ্ধ সংস্কৃতির মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হবে না।

এসব তথাকথিত শক্তিকে সর্তক করা এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং এই প্রেক্ষিতে মুসলমানদের করণীয় কী তাই স্মরণ করিয়ে দেওয়াই আমাদের এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। মুসলমানদের উচিত ইসলামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে অনুধাবন করে তা বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করা। কেননা, পবিত্র কুরআনের মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতিকে সাগরের ঢেউয়ের চূড়ায় যে ফেনা থাকে তার সাথে তুলনা করা যায় যা ঢেউ সরে গেলে সাগরের বুকে বিলীন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে ইসলাম ও ইসলামী সংস্কৃতিকে একটি প্রশান্ত সাগরের স্থির পানির সাথে তুলনা করা যায় যা অনন্ত ও স্থায়ী।