বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সম্পূর্ণ কাঠের তৈরী মমিন মসজিদ

পোস্ট হয়েছে: মে ২৮, ২০১৮ 

news-image

পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানী সাফা ইউনিয়নের উদয়তারা বুড়ির চর গ্রামের মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নিজ গ্রামে শুধু কাঠ দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তার নিজস্ব শিল্প ভাবনা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্মিত মসজিদটি শিল্পকর্মের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে আজো সবার নজর কাড়ে। তার নামানুসারে মসজিদটি মমিন মসজিদ ও সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি হিসেবে কাঠের মসজিদ নামেও পরিচিত।

মমিন উদ্দিন আকনের নাতি আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মদ শহিদুল্লহ তার ‘মমিন মসজিদ স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা’ বইয়ে লিখেছেন, ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়ার ছেলে পীর বাদশা মিয়ার অনুসারী ছিলেন তার দাদা মরহুম মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন। অনেক দিন ধরে নিজ বাড়িতে পাকা কাঠ দিয়ে মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে কাঠের বিভিন্ন নকশা দেখে নিজেই সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা করেন।

পরে ১৯১৩ সালে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কাঠশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলা থেকে তিনি হর কুমার নাথকে মাসিক ৪০ টাকা বেতনে মসজিদ তৈরির প্রধান মিস্ত্রি নিয়োগ করেন। হর কুমার নাথ ২১ জন সহযোগী মিস্ত্রি নিয়ে দীর্ঘ সাত বছর নিরলস কাজ করে ১৯২০ সালে নির্মাণকাজ শেষ করেন। মমিন উদ্দিন আকন সব সময় মিস্ত্রিদের কাছে থেকে তাদের কাজে নির্দেশনা দিতেন এবং কারুকাজগুলো সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করে দেখতেন।

মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলেন, শত বছর আগে মমিন মসজিদ তৈরিতে মমিন উদ্দিন আকন যে শিল্প রুচির পরিচয় দিয়েছেন, তা একটি বিরল দৃষ্টান্ত। মমিন মসজিদ সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি একমাত্র নিদর্শন। নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছে শাল, সেগুন ও লোহাকাঠ। কাঠগুলো বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার), ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। নির্মাণে কাঠ আটকাতে কোনো লোহা বা পেরেক ব্যবহার করা হয়নি। পেরেকের পরিবর্তে কাঠ দিয়ে খিল তৈরি করে তা দিয়ে এক কাঠের সাথে আরেক কাঠ আটকানো হয়েছে।

৩০ হাত দৈর্ঘ্য, ১৬ হাত প্রস্থ ও ২৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মসজিদটিতে আটচালা টিন দিয়ে ছাউনি দেয়া হয়েছে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দু’টি করে এবং পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি করে জানালা। পূর্ব দিকে একটিমাত্র প্রবেশদ্বারে অপূর্ব কারুকার্যখচিত দু’টি খাম্বাবিশিষ্ট দরজা রয়েছে, যাতে মসজিদ নির্মাণের সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম ফুটে উঠেছে। প্রবেশদ্বারের ওপরের বাঁ দিকে আরবি হরফে ইসলামের চার খলিফার নাম ও মাঝখানে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর পবিত্র নাম অঙ্কন করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারের মাঝখানের অংশে লেখা আছে কালেমা তাইয়েবা। কাঠশিল্পে জ্যামিতির ব্যবহার এবং কাঠের ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে মমিন মসজিদের নির্মাণশৈলী সবাইকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে।

একটি প্রবেশদ্বারসংবলিত এ মসজিদের বেড়ায় আয়তক্ষেত্র চতুর্ভুজ ও হীরক আকৃতির অলঙ্করণের পাশাপাশি জালি নকশা, রশির প্যাঁচ গাঁথুনি নকশা, সারিবদ্ধ বৃত্ত বা গোলাকার নকশা ও ডিম্বাকৃতির নকশা রয়েছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে পাতা, ফুল, লতা, ফল, ডালপালা ও গাছ। মমিন মসজিদের নকশায় উদ্ভিদ অলঙ্করণের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি এবং দারুণ আকর্ষণীয়। আনারস, নয়নতারা গাছসহ বিভিন্ন গাছ দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে। কুমড়াপাতা, আঙুরলতা ও কলমিলতা ছাড়াও কদম, সূর্যমুখী দিয়ে সাজানো হয়েছে মসজিদের অবয়ব। প্রায় শত বছরের কাঠের তৈরি মসজিদটি আজো অতুলনীয়।

প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর পুরাকীর্তি আইনানুযায়ী মমিন মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। ২০০৮ সালে খুলনা জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে মমিন মসজিদ প্রথমবারের মতো সংস্কার করা হয়। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ৩০টি শিল্পসম্পৃক্ত মসজিদের তালিকায় রয়েছে পিরোজপুরের মমিন মসজিদ।

মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের অভিযোগ, ২০০৮ সালে সংস্কারের সময় লোহা ব্যবহারসহ নকশার কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে মসজিদটি তার নিজস্ব রূপ হারিয়েছে। এ মসজিদ একবার দেখলে যে কেউ আবার তা দেখতে আসেন। আগত মুসলিম পর্যটকেরা মসজিদে নামাজ পড়েন। – নয়াদিগন্ত।