রবিবার, ২১শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৬ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সম্পাদকীয়

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২৫, ২০১৬ 

ইসলামী বিপ্লবের অব্যাহত বিজয়ধারা
ইরানী বর্ষপঞ্জির ২২শে বাহ্মান ১৩৯৪ (মোতাবেক ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬) ইরানের মহান ইসলামী বিপ্লবের ৩৭তম বিজয় বার্ষিকী। এদিন থেকে ৩৭ বছর আগে মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনীর (রহ্.) নেতৃত্বে ইরানের সংগ্রামী জনগণ আড়াই হাজার বছরের স্বৈরাচারী তাগূতী রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও বিজাতীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার শাহ্ ও তার সরকারকে উৎখাত করে ইসলামী শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় ইরানকে একটি ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন।
বিশ্বের তাবত পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা- যা কেবল একটি সরকারের পরিবর্তন ঘটায় নি; বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও নৈতিকসহ ইরানী জনগণের জীবনে আমূল পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। শুধু তা-ই নয়, এ বিপ্লব সমগ্র বিশ্বের জনগণকে সকল দিক দিয়ে প্রভাবিত করেছে এবং শত্রু-মিত্র সকলের ওপর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্বপরিস্থিতির ভারসাম্যে এক আমূল পরিবর্তন সংঘটিত করেছে।
‘স্বাধীনতা, মুক্তি ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র’- এ সেøাগানের মাধ্যমে ইরানের শান্তিপ্রিয় দ্বীনদার নিরস্ত্র জনগণ সুযোগ্য নেতার অধীনে তাদের ঈমানী শক্তির বদৌলতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তির অধিকারী শাহী সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। এ বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসমূহ এ সেøাগানের মধ্যেই নিহিত ছিল এবং বিপ্লবের বিজয়ের পর বিগত ৩৭ বছরে এ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসমূহ উল্লেøখযোগ্য পরিমাণে অর্জিত হয়েছে। এ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসমূহ ছিল : বহিঃশক্তির তাঁবেদারী থেকে স্বাধীনতা, অভ্যন্তরীণ স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি, নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণকে নিজেদের হাতে গ্রহণ করা, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, স্বকীয় সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের পথ উন্মুক্তকরণ এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন। ইরানের জনগণ ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের বদৌলতে বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান ও নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে গ্রহণের লক্ষ্য পরিপূর্ণভাবে অর্জনসহ অন্যান্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর মুহূর্ত থেকেই বিপ্লবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দুশমনরা এ বিপ্লবকে নস্যাৎ ও পথচ্যুত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে তারা বিপ্লবের বিজয়ের পর পরই সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে এ বিপ্লবের অগ্রসেনানী অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা, ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম ও বিপ্লবী কর্মীকে হত্যা করেছে, ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে- যা সর্বশক্তি নিয়োগ করে আট বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখে এবং এ দেশকে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়। সর্বোপরি তারা বিশ্বের জনগণকে সকল ক্ষেত্রে এ বিপ্লবের ইতিবাচক প্রভাব থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়াবার উদ্দেশ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ পরিকল্পিত প্রচারযুদ্ধ চালিয়েছে- যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলার অশেষ রহমতে তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছে এবং ইসলামী বিপ্লবের সেই ছোট্ট চারাগাছটি দিনের পর দিন যথাযথ বিকাশ ও বৃদ্ধির অধিকারী হয়ে আজ বিরাট ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিগত ৩৭ বছরে বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে বিরাট ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ও অগ্রগতির অধিকারী হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বঞ্চিত জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন, সাধারণ জনসেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সকল ধরনের জ্ঞানগবেষণা, বিশেষ করে পারমাণবিক বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও ন্যানোটেকনোলজি, সুস্থ সংস্কৃতি ও শিল্পকলা, রুচিশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ ও অন্যান্য ক্ষেত্র।
এ বিপ্লবের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হচ্ছে সাধারণভাবে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে এবং বিশেষভাবে তরুণ ও যুব প্রজন্মের ও সরকারি দায়িত্বশীলদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি। উদাহরণস্বরূপ, তাঁদের মধ্যে যে সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে তার বদৌলতে দেশের পরিচালকগণ সাফল্যের সাথে দেশের ও জনগণের বৈধ স্বার্থের প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সম্বন্ধে বিশ্বের ছয়টি শক্তিধর দেশের সাথে দীর্ঘ ১৮ মাস ব্যাপী আলোচনায় ইরানী কর্মকর্তাগণ যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন ও দেশের জন্য বিরাট সাফল্য নিয়ে এসেছেন তা-ই এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
সবচেয়ে বড় কথা, ইরানের ইসলামী বিপ্লব রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিক থেকে বিশ্ববাসীর সামনে একটি নতুন দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এ যুগেও ইসলামী নীতি-আদর্শ ও বিধি-বিধানের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনী ও পার্থিব উভয় দিক থেকে সাফল্যের সাথে পরিচালনা করা সম্ভবপর।
ইসলামী বিপ্লবের ৩৭তম বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা এ বিপ্লবের মহান রূপকার হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) এবং বিপ্লবের বিজয় ও প্রতিরক্ষার জন্য যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং বিপ্লবের বর্তমান রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ ‘উয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ ও পরিচালকবৃন্দ, বিদেশে অবস্থানরত ইরানী নাগরিকগণ, বিশ্বের তাবত মুসলিম ও মুস্তায্‘আফ্ জনগণ এবং বিশেষভাবে নিউজলেটারের পাঠক-পাঠিকাগণ সহ বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং সকলের জন্য সুস্থতা ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।