মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৭ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সম্পাদকীয়

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ১৯, ২০১৬ 

নওরোয- মানবমন ও প্রকৃতির জাগরণের উৎসব

ইরানী বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন পয়লা র্ফার্ভাদীন (খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ২১শে মার্চ)-যা একই সাথে প্রকৃতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারকারী বসন্তের প্রথম দিন-ঐতিহ্যিকভাবে নওরোয নামে পরিচিতি। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ইরানী জনগণ ও মধ্য এশীয়ার দেশসমূহ সহ আরো কতক দেশের জনগণ অত্যন্ত ধুমধামের সাথে এদিনে উৎসব পালন করে আসছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী প্রাগৈতিহাসিক কালে এ দিনে জনগণের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন পারস্যে (বর্তমানে যা ইরান) একজন স্বৈারাচারী যালেম বাদশাহকে উৎখাত করে সুবিচারের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং এ উপলক্ষেই নওরোয উৎসব প্রবর্তিত হয়।
নওরোযের উৎসব ইরানী জনগণের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সাসানী রাজবংশের শাসনামলে (২৬২ থেকে ৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) নওরোয উৎসব প্রচলিত ছিল বলে বহু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাখ্তে জামশীদে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, হাখামানেশীদের পূর্ববর্তী মদ্ রাজবংশের শাসনামলে নওরোযের উৎসব পালিত হতো। হাজার হাজার বছর আগেই এ উৎসব ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে এবং ইরান ছাড়াও তুরস্কে, ইরাকে, আযারবাইজানে, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে ও ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে এ উৎসব পালন করা হচ্ছে।
প্রাচীন ইরানের র্ফাস এলাকায় যরথুস্ত্রীরা নববর্ষের সূচনায় বিভিন্ন প্রতীকী বস্তু দ্বারা সাতটি ট্রে পূর্ণ করে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গ করত। এই সাতটি ট্রে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সুদপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য এবং ক্ষমা ও অমরত্বের প্রতীক। ইরানে ইসলামের বিস্তার লাভের পরে ইরানের মুসলমানদের মধ্যেও সংশোধিত রূপে এ উৎসব অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তীকালে ইরানী বর্ষপঞ্জির পূর্ববর্তী বর্ষগণনাকে সংশোধন করে এটিকে হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জিতে পরিণত করা হয়। এছাড়া অনেক মুসলিম কবিই নওরোয ও প্রাকৃতির নব জীবন লাভ নিয়ে কবিতা লিখেছেন।
ইরানী জনগণ নওরোযের সূচনায় কুরআন তেলাওয়াত করে ও বর্ষবরণের বিশেষ দো‘আ পাঠ সহ দু’হাত তুলে মহান আল্লাহ্র কাছে নিজেদের, জাতির ও মুসলিম উম্মাহ্র জন্য একটি সুন্দর এবং সুস্থতা ও সমৃদ্ধিপূর্ণ নতুন বছর কামনা করে। এভাবে নওরোয উৎসব ইরানী সমাজের জন্য নৈতিক ও সামগ্রিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
শুভ বাংলা নববর্ষ
পয়লা বৈশাখ (মোতাবেক ১৪ই এপ্রিল) বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনÑ বাংলা নববর্ষ। বাংলা বর্ষপঞ্জি ইরানী বর্ষপঞ্জির ন্যায় একটি হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জি।
বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলা ভূখ-ে পূর্বে প্রচলিত চান্দ্র হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী খাজনা আদায়ের সমস্যা এড়ানোর উদ্দেশ্যে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে হিজরি সৌর বর্ষ হিসেবে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহ্ উল্লাহ সিরাজী চান্দ্র মাসনির্ভর হিজরি বর্ষপঞ্জি এবং সৌর বর্ষপঞ্জির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ১১ই মার্চ ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে একটি নতুন সৌর বর্ষপঞ্জি প্রস্তাব করলে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনক্ষমতায় আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরে এ নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করা হয়।
ফসল তোলা সমাপ্ত হওয়ার পর পরই নতুন বছরের শুরু হিসেবে এক সময় বাংলা সনকে ফসলী সনও বলা হতো। খাজনা আদায় ছাড়াও এ সময় ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে বকেয়া পাওনা আদায় করতো এবং উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছর শুরু করতো। এভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন- বাংলা নববর্ষ একটি উৎসবের দিনে পরিণত হয় এবং সেই শুরু থেকেই এ দিনটি উৎসব হিসেবে পালন করা হয়ে আসছে। বিশেষ করে জীর্ণ আর পুরনোকে বিদায় দিয়ে সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরপুর আগামীর প্রত্যাশা সহ নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয় বিধায় পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশী সহ বাংলাভাষী সকল জনগণের কাছে ভিন্ন একটি তাৎপর্য বহন করে।
ইরানী বর্ষপঞ্জির নওরোয ও বাংলা বর্ষপঞ্জির নববর্ষ উপলক্ষে আমরা নিউজলেটারের পাঠক-পাঠিকাগণ সহ সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
এছাড়া ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমরা বাংলাদেশের গণমানুষের কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
তেমনি বারোই র্ফাভারদীন্ মোতাবেক পয়লা এপ্রিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আমরা নিউজলেটারের পাঠক-পাঠিকাগণ, বাংলাদেশের জনগণ ও ইরানী জনগণকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।