মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সম্পাদকীয়

পোস্ট হয়েছে: জুন ৮, ২০১৬ 

৬ জাতি ও ইরানের সমঝোতা : একটি ঐতিহাসিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান
বিশ্বের ছয়টি শক্তিধর দেশ ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে জেনেভায় স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক বৈশ্বিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। যদিও এ সমঝোতা চুক্তি ইরানের মজলিসে শূরায়ে ইসলামী (পার্লামেন্ট) ও অপর পক্ষের দেশসমূহের পার্লামেন্ট কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পরেই কার্যকর হবে, তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইতিমধ্যেই এটি অনুমোদন করেছে এবং আশা করা যাচ্ছে যে, উভয় পক্ষের পার্লামেন্টসমূহ কর্তৃকও যথারীতি অনুমোদিত হবে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিধায় এ সমঝোতা গোটা বিশ্বের উৎসুক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং সকল মহল এ সমঝোতার সকল দিক নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও পর্যালোচনা করছে। সকলেই জানতে ও বুঝতে চান যে, এ সমঝোতার মাধ্যমে উভয় পক্ষের কে কী কী অর্জন করলো এবং কী কী হারালো।
জেনেভা সমঝোতার প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তু বিবেচনা করলে যে কারো কাছে সুস্পষ্ট হতে বাধ্য যে, এ সমঝোতায় উভয় পক্ষের জন্যই অনেকগুলো অর্জন রয়েছে এবং কোনো পক্ষকেই কিছু হারাতে হয় নি। তাই এ সমঝোতা সম্পর্কে নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, এতে উভয় পক্ষেরই জয় হয়েছে এবং কোনো পক্ষেরই পরাজয় ঘটে নি। তবে ইরানের অর্জনের পাল্লা অধিকতর ভারী।
এ সমঝোতার ফলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর আরোপিত নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা ইতিমধ্যেই তুলে নেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ছয় জাতির আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট পার্লামেন্টসমূহ কর্তৃক চুক্তিটি অনুমোদিত হওয়ার সাথে সাথেই উঠে যাবে। বিনিময়ে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচির ওপরে আট বছরের জন্য কিছুটা সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হবে। তবে এ সময়েও ইরান ছয় হাজারেরও বেশি সেন্ট্রিফিউয্ ব্যবহার করতে পারবেÑ যা তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির গতিধারা অব্যাহত রাখার জন্য যথেষ্ট। শুধু তা-ই নয়, সমঝোতা অনুযায়ী বাইরের দেশসমূহ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সব রকমের সহায়তা করতে পারবে। এছাড়া বিদেশে ইরানের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটক রয়েছে তা ছেড়ে দেয়া হবে এবং ইরানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাঙ্কিং তৎপরতা ও পুঁজি বিনিয়োগসহ সকল রকম অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর ইতিপূর্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাসমূহ উঠে যাবে।
যাঁরা মনে করেন যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান স্বীয় পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সঠিক কাজ করে নি বা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করা উচিত ছিল, তাঁদেরকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ইরানের সর্বপ্রধান করণীয় হচ্ছে যে কোনো পরিস্থিতিতে ও যে কোনো মূল্যে ইসলামী মূল্যবোধের অনুসরণ অব্যাহত রাখা। আর এটা সর্বজনজ্ঞাত যে, পারমাণবিক অস্ত্র হচ্ছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র যার ব্যবহার পুরোপুরি মানবতাবিরোধী। এ কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ ‘উয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী অনেক আগেই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারকে হারাম বলে ফত্ওয়া দিয়েছেন। তাই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের বিষয়টি কখনোই অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অন্যদিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান স্বীয় প্রতিরক্ষা স্ট্র্যাটেজিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছে এবং অ-পারমাণবিক অস্ত্রসহ স্বীয় সামরিক প্রস্তুতিকে এতোখানি উন্নত করেছে যে, তার প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোনোই কারণ নেই। এছাড়া জেনেভা সমঝোতায় ইরানের অ-পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর কোনো ধরনের বিধিবিষেধ তো আরোপিত হয়ই নি, অধিকন্তু ইরানের ওপর আরোপিত অস্ত্রনিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে যার ফলে ইরানের পক্ষে বিশ্বের যে কোনো দেশের সাথে অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়সহ যে কোনো ধরনের পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা সম্ভব হবে।
জেনেভা সমঝোতার ফলে আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যজগতের একটি বড় অর্জন হচ্ছে এই যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যে, পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা করছে না এ ব্যাপারে তারা মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিশ্চিন্ততা অর্জন করতে পেরেছে। যদিও এ ক্ষেত্রে ইরান কিছুই হারায় নি, কারণ, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় নি, কিন্তু তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না; জেনেভা সমঝোতার মধ্য দিয়ে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, ইরান তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই স্বীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির গতিধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়, কিন্তু পাশ্চাত্যজগৎ ইরানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইরানে পুঁজি বিনিয়োগ করতে না পারায় তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। জেনেভা সমঝোতার ফলে তাদের আর এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে না।
সর্বোপরি, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের একটি বড় শক্তি হিসেবে ইরানের সাথে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সমস্ত সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে- যা এর আগে আর কখনোই হয় নি। তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, ইরান ও ছয় জাতির মধ্যকার জেনেভা সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে তা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।