বৃহস্পতিবার, ২১শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সম্পাদকীয়

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৫, ২০১৬ 

হজ : মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যের প্রতীক
হজ ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের অন্যতম। কা‘বা গৃহে পৌঁছার মতো সামর্থ্যরে অধিকারী প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ করা ফরয।
কা‘বা গৃহ হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদতের উদ্দেশ্যে হযরত আদম (আ.) কর্তৃক নির্মিত সর্বপ্রথম গৃহÑ যা কালের প্রবাহে বিধ্বস্ত হয়ে যাবার পর হযরত ইবরাহীম (আ.) পুনঃনির্মাণ করেন। এ গৃহের তাওয়াফ, হযরত হাজেরা (আ.)-এর স্মৃতি পুনরুজ্জীবনে ছ¡াফা’ ও র্মাওয়া পাহাড়ের মাঝে সা‘ঈকরণ, হযরত আদম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ‘আরাফায় সমাবেশ, হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মিনায় শয়তানের প্রতীকের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ ও কোরবানিসহ হজের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতাই দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্র খলীফা হিসেবে বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণের আগমন ও দায়িত্ব পালনের কথা গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে একজন হজযাত্রী নিজেকে তাঁর প্রভু আল্লাহ্ তা‘আলার ঘনিষ্ঠতম নৈকট্যে অনুভব করেন। এ হচ্ছে ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় বাস্তব চর্চা।
তবে হজ কেবল ইবাদত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। হজের সমাবেশে বর্ণ-গোত্র-ভাষা নির্বিশেষে সারা দুনিয়ার মুসলমানরা একত্রিত হন, পরস্পরের সাথে পরিচিত হন, দ্বীনী ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদিতে পরস্পর মতবিনিময় করেন এবং মুসলমানদের প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর সমস্যাবলিসহ গোটা উম্মাহ্র অভিন্ন সমস্যাবলির সমাধান উদ্ভাবনের লক্ষ্যে পরস্পর পরামর্শ ও মতবিনিময় করেন। এভাবে হজের সমাবেশ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির চেতনা দৃঢ়তর করে এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রায়তনে হলেও এ সমাবেশ প্রতিনিধিত্বমূলকভাবে মুসলিম উম্মাহ্র বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে।
এ বছরের হজের সময় দু’টি দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তা হচ্ছে, মসজিদুল হারামে ক্রেন বিধ্বস্ত হয়ে ও মিনায় ভীড়ে পদদলিত হয়ে বহু সংখ্যক হাজীর মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ। আমরা এ ঘটনায় নিহত হাজীদের পরিবারবর্গ ও আহতদের প্রতি এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য যে, উক্ত দুর্ঘটনার কারণে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যেই হজের সময়কার নিরাপত্তা প্রশ্নে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেকের মনেই ভবিষ্যতে হজে গমন সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। তাই অনেকে যেমন প্রস্তাব করেছেন, হজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র প্রতিনিধিত্বশীল ওলামায়ে কেরাম, ইসলামী চিন্তাবিদ ও নগর বিশেষজ্ঞগণের সমন্বয়ে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করে তার ওপর হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মনে হয়।
শোকাবহ আশুরা
দশই মুহররম আশুরাÑ সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা ও বেহেশতে যুবকদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী। ৬১ হিজরির এ দিনে কারবালায় তিনি তাঁর স্বজন ও সহচরগণসহ ইয়াযীদী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।
কারবালার ঘটনার প্রেক্ষাপট প্রতিটি মুসলমানেরই জানা। হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাতের ঘটনার পরে হযরত ইমাম হাসান (আ.) মুসলিম উম্মাহ্কে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সম্ভাব্য রোমান হামলা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে আমীরে মু‘আবিয়ার সাথে কয়েকটি শর্তে একটি সন্ধি করেন। আমীরে মু‘আবিয়া হযরত ইমাম হাসান (আ.)-এর সাথে কৃত সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে মৃত্যুকালে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হাতে খেলাফতের দায়িত্ব হস্তান্তরের পরিবর্তে স্বীয় চরিত্রহীন পাপাচারী পুত্র ইয়াযীদকে খেলাফতে অধিষ্ঠিত করে গেলে ইয়াযীদ ইমামের কাছ থেকে শক্তিপ্রয়োগে বাই‘আত আদায়ের জন্য মদীনার উমাইয়াহ্ প্রশাসককে নির্দেশ দেয়। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ন্যায় ব্যক্তি ইয়াযীদের আনুগত্য করলে যে কারো জন্য তা ইসলামী মূল্যবোধ বিসর্জনের সপক্ষে দলিল হিসেবে গণ্য হতো। এ কারণে তিনি ইয়াযীদের অনুকূলে বাই‘আত্ করা থেকে বিরত থাকেন এবং রক্তপাত এড়াবার লক্ষ্যে মদীনা ত্যাগ করে মক্কায় চলে যান। সেখানে তিনি লোকদের মধ্যে মুসলমানদের হুকুমাতের ক্রমাবনতি ও উম্মাহ্্র সামাজিক ও নৈতিক অবস্থার ভয়াবহ স্খলন সম্বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু ইয়াযীদ সেখানে তাঁকে হজের ভীড়ে হত্যার জন্য গুপ্তঘাতক পাঠালে ইমাম পবিত্র স্থানে রক্তপাত এড়াবার লক্ষ্যে মক্কা ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং কুফার জনগণের দাও‘আতে সাড়া দিয়ে সেখানে পৌঁছার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে কারবালায় উপনীত হন। সেখানে ইয়াযীদী বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কিন্তু ইয়াযীদী বাহিনী তাঁর ওপরে ইয়াযীদের অনুকূলে বাই‘আত্ করার জন্য চাপ দেয় এবং তিনি তা না করায় এক অসম যুদ্ধে তাঁকে স্বজন ও সহচরসহ হত্যা করে।
দুর্ভাগ্যজনক যে, কারবালার ঘটনা সম্পর্কে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা মতৈক্যের বরখেলাফে ইদানিং কিছুসংখ্যক লোক ইয়াযীদকে নির্দোষ প্রমাণের ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বলছে, ইয়াযীদের অনুমতি ছাড়াই কারবালার ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। আমরা এ ব্যাপারে তাদের বিবেকের কাছে একটাই প্রশ্ন করব : যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে যারা এ জন্য দায়ী ইয়াযীদ কি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিল?