বৃহস্পতিবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সম্পাদকীয়

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৩০, ২০১৮ 

হজ্ব : মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্য-সংহতি ও শক্তির প্রতীক
ইসলামি উম্মাহ্র সর্বসম্মত মত অনুযায়ী হজ্ব ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের অন্যতম। কোরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে, কা‘বা গৃহে পৌঁছার মতো সামর্থ্যরে অধিকারী প্রতিটি মুসলমান যেন জীবনে অন্তত একবার হজ্বে গমন করে।
কা‘বা গৃহ হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদতের উদ্দেশ্যে প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) কর্তৃক নির্মিত সর্বপ্রথম গৃহÑ যা কালের প্রবাহে বিধ্বস্ত হয়ে যাবার পর আল্লাহ্ তা‘আলার আদেশে হযরত ইবরাহীম (আ.) তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সহায়তায় পুনঃনির্মাণ করেন এবং আল্লাহ্ তা‘আলার আদেশে হজ্বের প্রচলন করেন। তখন থেকেই এ পবিত্র গৃহকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর হজ্ব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
কা‘বা গৃহের তাওয়াফ, হজরত হাজেরা (আ)-এর স্মৃতি পুনরুজ্জীবনে ছ্বাফা’ ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সা‘ঈ করা, হযরত আদম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ‘আরাফায় সমাবেশ, হযরত ইসমা‘ঈলের স্মৃতিবিজড়িত মিনায় শয়তানের প্রতীকের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ ও কোরবানিসহ হজ্বের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতাই দুনিয়ার বুকে আল্লাহর খলীফা হিসেবে বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণের (আ.) আগমন ও দায়িত্ব পালনের কথা গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে একজন হজ্বযাত্রী নিজেকে তাঁর প্রভু আল্লাহ্ তা‘আলার ঘনিষ্ঠতম নৈকট্যে অনুভব করেন। এ হচ্ছে ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় বাস্তব চর্চা।
তবে হজ্ব কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর রাজনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। বস্তত হজ্ব হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পিত বান্দাদের- হযরত ইবরাহীম (আ.) যাদের নামকরণ করেছিলেন ‘মুসলিম’ (আত্মসমর্পিত)- ঐক্য-সংহতি ও শক্তির প্রতীক। জাহেলিয়াতের যুগে হজ্বের এ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি হারিয়ে যাবার পর আল্লাহ্ তা‘আলার নির্দেশে রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হজ্বকে এ মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন; নবম হিজরির হজ্বের অব্যবহিত পূর্বে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ (বারাআত্)-এর আয়াত নাযিল হলে তিনি হযরত আলী (আ.)-কে স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে এ আয়াত সহ মক্কায় পাঠিয়ে দেন এবং আলী (আ.) তা হজ্বের সমাবেশে পাঠ করে শোনান। বারাআাতের এ ঘোষণা ছিল হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলির অন্যতম এবং হজ্বের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশক।
পরবর্তীকালে ইসলামি উম্মাহ্র ওপর জাহেলী রাজতান্ত্রিক শাসন চেপে বসলে হজ্বের এ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য পুনরায় হারিয়ে যায় এবং হজ¦ কেবল আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের প্রায় চৌদ্দশ’ বছর পরে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের বিজয় ও ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হলে এ বিপ্লবের নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) হজ্বের এ বিরাট রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার এবং পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বারাআাতের প্রয়োগের উদ্যোগ নেন। তিনি হাজ্বীদের প্রতি ইসলামি উম্মাহ্র সবচেয়ে বড় দুশমন যায়নবাদী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাঈলের বিরুদ্ধে ও ফিলিস্তিনি জনগণের হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের সপক্ষে সোচ্চার হতে আহ্বান জানান। ইসলামি উম্মাহ্ তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দেয় এবং তখন থেকে প্রতি বছর হজ্বের সময় বিশ্বের  সর্বত্র থেকে আগত সচেতন হাজ্বিগণ বারাআতের সমাবেশে অংশগ্রহণ করছেন।
হজ্বের সমাবেশে বর্ণ-গোত্র-ভাষা-ভূখণ্ড দেশ নির্বিশেষে সারা দুনিয়ার মুসলমানরা একত্রিত হন, পরস্পর পরিচিত হন, দ্বীনী ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদিতে মতবিনিময় করেন এবং তাদের প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর সমস্যাবলি সহ গোটা উম্মাহ্র অভিন্ন সমস্যাবলির সমাধান উদ্ভাবনে পরামর্শ ও মতবিনিময় করেন। এভাবে হজ্বের সমাবেশ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির চেতনা দৃঢ়তর করছে এবং প্রতিনিধিত্বমূলকভাবে মুসলিম উম্মাহ্র বিশ্ব সম্মেলনের রূপ পরিগ্রহ করছে। আশা করা যায় যে, এতদসহ বারাআতের কর্মসূচি থেকে হাজ্বিগণ যে প্রেরণা ও বাণী নিয়ে স্বদেশে ফিরে যাচ্ছেন তার ধারাবাহিকতায় এক সময় সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সুদৃঢ় ঐক্য-সংহতি ও শক্তির অধিকারী হবে এবং এর ফলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও যায়নবাদীদের কবল থেকে ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার সহ উম্মাহ্র সকল গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে যথাযথ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। তাই হজে¦র এ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যটি পুরোপুরিভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মায্হাব্ ও র্ফিক্বাহ্ নির্বিশেষে ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি চিন্তাবিদগণের জন্য এগিয়ে আসা অপরিহার্য।
হজে¦র গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল কোরবানি ও পবিত্র ঈদুল আয্হা উপলক্ষে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি, বিশেষ করে নিউজলেটারের পাঠক-পাঠিকাগণ সহ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ও বাংলাদেশের মুসলিম জনগণের প্রতি মোবারকবাদ। ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক ইসলামি উম্মাহ্র প্রতিটি পরিবারের গৃহ।