রবিবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সন্ত্রাসবাদ কবলিত মুসলিম বিশ্ব শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অতিথিদের উদ্দেশে

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১০, ২০১৬ 

রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী
রাহবার আয়াতুল্লাহ আল-উযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী গতকাল ২৫ নভেম্বর ২০০৪ তারিখে সন্ত্রাসবাদ কবলিত মুসলিম বিশ্ব শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলেম ও চিন্তাবিদদের উদ্দেশে বলেন : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকফিরি ধারাগুলোর পুনর্জীবিত হওয়া মুসলিম বিশ্বের ওপর সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃক গড়ে তোলা ও চাপিয়ে দেওয়া একটি সমস্যা। রাহবার বিগত দিনগুলোতে তাকফিরি গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কীভাবে জঘন্য নৃশংসতা ও বর্বরতা চালিয়েছে সে দিকে ইঙ্গিত করেন। ফিলিস্তিন ও মসজিদুল আকসার প্রসঙ্গকে বিস্মৃতির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার জন্য কতই না চেষ্টা করা হয়েছে! রাহবার তাগিদ দিয়ে বলেন : বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইসলামী জাহানের আলেমবৃন্দের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তাকফিরি ধারাগুলোর মূলোৎপাটন ও এ ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাম্রাজ্যবাদী নীতিকৌশলের ভূমিকা সম্পর্কে সবাইকে স্পষ্ট করে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি জ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক এবং সর্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে আয়াতুল্লাহ আল উযমা মাকারিম শিরাজী, আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানি সহ কোম নগরীর শীর্ষ আলেমবৃন্দকে এরূপ একটি সম্মেলন আয়োজন এবং তাকফিরি গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলার লক্ষ্যে ইসলামী জাহানের প-িতবর্গ ও চিন্তাবিদদের মাঝে একটি ব্যাপক ইলমি ধারার রূপরেখা তৈরিতে আন্তরিক প্রয়াস চালানোর জন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন : এ বিপজ্জনক গোষ্ঠী সম্পর্কে বিশ্লেষণের সময় এ দিকটির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে যে, মূল বিষয় হল নতুন করে জেগে ওঠা তাকফিরি গোষ্ঠীকে সর্বাত্মক মোকাবিলা করা। এ ধারাটি আইএসআইএল নামে খ্যাত গোষ্ঠীটির চেয়েও বড় ও ব্যাপক। প্রকৃতপক্ষে আইএসআইএল হচ্ছে এ বিষবৃক্ষের একটি শাখা মাত্র।
রাহবার অতঃপর একটি অনস্বীকার্য বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন : তাকফিরি গ্রুপগুলো এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দানকারী রাষ্ট্রসমূহ সম্পূর্ণরূপে সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের লক্ষ্যপথেই হাঁটছে। তারা বাইরে ইসলামের বেশ ধারণ করে কার্যত তাদেরই সেবাদাসে নিয়োজিত। এ মর্মে তিনি তাদের কিছু কার্যকলাপের নমুনাও উল্লেখ করেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী জাগরণের জোয়ারকে বিপথে পরিচালিত করা তাদের এরূপ কার্যকলাপের প্রথম নমুনা বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন : ইসলামী জাগরণ ছিল মার্কিনবিরোধী, স্বৈরাচারবিরোধী ও আমেরিকার পুতুল সরকারগুলোর বিরোধী একটি গণজাগরণ। কিন্তু তাকফিরি গ্রুপগুলো এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মহান উত্থানকে একটি গৃহযুদ্ধ ও মুসলমানদের ভাই ভাই হত্যাযজ্ঞে পরিণত করেছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন : এতদঞ্চলে মুসলমানদের সংগ্রামের ফ্রন্ট লাইন ছিল অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড। কিন্তু তাকফিরি গ্রুপগুলো এ ফ্রন্ট লাইনকে পাল্টে দিয়ে ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান ও লিবিয়ার সড়ক ও জনপদগুলোর মধ্যে টেনে এনেছে। এটা হল তাকফিরি গ্রুপগুলোর এমন এক জঘন্য অপরাধ যা ভোলা যায় না।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ইসলামী জাগরণকে বিপথে পরিচালিত করাকে আমেরিকা, ইসলাইল, ইংল্যান্ড ও যায়নবাদী সরকারের এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতি খেদমত বলে অভিহিত করে বলেন : তাকফিরি গ্রুপগুলো যে সাম্রাজ্যবাদীদের লক্ষ্যের পথেই হাঁটছে তার আরেকটি নমুনা হল যারা এদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে তারা যায়নবাদী জান্তার বিরুদ্ধে ‘টু’ শব্দটিও করে না। এমনকি মুসলমানদের মোকাবিলা করার জন্য এই জান্তার সাথে তারা সহযোগিতা করে। অথচ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য তারা আদাজল খেয়ে লেগে আছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তাকফিরি সন্ত্রাসীদের হাতে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর মূল্যবান ভৌতিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে মুসলমানদের শত্রুদের স্বার্থে আরেকটি বড় খেদমতের নমুনা হিসাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন : তাকফিরি গ্রুপগুলোর আরেকটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক কাজ হচ্ছে ইসলামের দয়াশীল, বুদ্ধিগ্রাহ্য ও যৌক্তিক চেহারাকে খর্ব করা। তারা তাদের পৈশাচিক কার্যকলাপ, যেমন নিরপরাধ মানুষদের ওপর তলোয়ার চালানো, কিংবা একজন মুসলমানের হৃৎপি- বের করে এনে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা ইত্যাদি কাজগুলো তারা ইসলামের নামেই ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শন করেছে।
হযরত আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তাকফিরিদের কর্তৃক সা¤্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে সেবাদাসের আরেকটি নমুনা হিসাবে ৫০ দিনব্যাপী গাযা যুদ্ধে প্রতিরোধ ফ্রন্টকে নিঃসঙ্গ ফেলে রাখা বলে মনে করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, এরূপ আরেকটি নমুনা হল ইসলামী জাগরণের জোয়ারে মুসলিম যুবশ্রেণির মধ্যে যে উচ্ছ্বাস ও বীরত্ববোধ জন্ম নিয়েছিল সেটাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। পরিতাপের কথা হল ঐ উচ্ছ্বাসকে অপর নিরপরাধ মুসলমানদের হত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
ইসলামী বিপ্লবের নেতা এরূপ আরেকটি নমুনা হিসাবে ইরাকে সাম্প্রতিক মার্কিন ত্রাণবাহী বিমান থেকে আইএসআইএল নামের সন্ত্রাসীদের জন্য পুনঃপুন অস্ত্র ফেলার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন : মার্কিনীরা এসব কর্মকা- সত্ত্বেও বাহ্যত আইএসআইএল বিরোধী জোট গঠনের দাবি করে আসছে। যা একটি নির্জলা মিথ্যা বৈ কী। কারণ, এ জোটের মূল উদ্দেশ্য হল যুদ্ধের ফিতনা ও মুসলমানদের মাঝে সংঘাতকে জিইয়ে রাখা। অবশ্য তারা তাদের সে উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না।
ওয়ালীয়ে আমরে মুসলিমীন হযরত আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী অতঃপর বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী জাহানের আলেমবৃন্দের মহান কর্তব্য সম্পর্কে বলেন : বর্তমান সময়ে ইসলামী মাযহাবসমূহের আলেমবৃন্দের অন্যতম কর্তব্য হল তাকফিরি ধারার মূলোৎপাটন করার নিমিত্তে একটি জ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক ও সর্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা। তিনি বলেন : তাকফিরিরা সালাফে সালেহগণের নামে মিথ্যা স্লোগান তুলে এ অপকর্মে নেমেছে। তাই তাদেরকে দ্বীন, ইল্ম ও মানতিকের (যুক্তির) ভাষায় জবাব দিতে হবে এবং তাদের এহেন গর্হিত কার্যকলাপের প্রতি সালাফে সালেহীনদের অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরতে হবে। তিনি আরও বলেন : এ জ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে যেসব নিরপরাধ যুবক তাদের জঘন্য ফাঁদে আটকা পড়েছে তাদেরকে মুক্ত করতে হবে। এ দায়িত্ব আলেমবৃন্দের ওপর ন্যস্ত।
হযরত আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তাকফিরি ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও যায়নবাদী জান্তার ভূমিকাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরা মুসলিম দেশগুলোর আলেমবৃন্দের আরেকটি গুরুদায়িত্ব হিসাবে উল্লেখ করেন। রাহবার বলেন : আলেমবৃন্দের ওপর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি হচ্ছে ফিলিস্তিন ও মসজিদুল আকসা ইস্যুর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা। যেন ইসলামী জাহানের এ আসল বিষয়টি অবহেলা ও বিস্মৃতির কবলে না পড়ে। তিনি অতিসম্প্রতি যায়নবাদী সরকারের মন্ত্রীসভায় অধিকৃত ফিলিস্তিনকে ইয়াহুদিকরণের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে তার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন : যায়নবাদী জান্তা বায়তুল মুকাদ্দাস ও মসজিদুল আকসাকে দখল করার এবং ফিলিস্তিনীদের যতটা দুর্বল করতে পারা যায় সেই পাঁয়তারা করছে। তাই প্রত্যেকটি মুসলিম জাতি এবং আলেমবৃন্দকে স্ব স্ব সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে যেন ফিলিস্তিনের ব্যাপারে সোচ্চার থাকে।
ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ‘ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ও যায়নবাদী জান্তার বিরুদ্ধে শত্রুতা’র নীতি ঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত করে জোর দিয়ে বলেন : আমরা আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে সরকার ও জনগণ ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন আর যায়নবাদী জান্তার বিরুদ্ধে শত্রুতার প্রশ্নে এক কণ্ঠ ও এক তান রয়েছে। ইমাম খোমেইনী (রহ.) যে পথ এঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন, বিগত ৩৫ বছরে তারা সে পথ থেকে বিচ্যুত হয়নি।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী জোর দিয়ে বলেন যে, ইরানের জাতি ও যুবসমাজ পূর্ণ আগ্রহ সহকারে ফিলিস্তিনের জনগণের পক্ষে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং যায়নবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তারা মনেপ্রাণে আসক্তি পোষণ করে। তিনি আরও বলেন : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান খোদায়ী অনুগ্রহ ও কৃপা গুণে মাযহাবী সংকীর্ণতা ও ভেদাভেদের মধ্যে বন্দি হয়নি। তারা লেবাননের শিয়া হিজবুল্লাহদেরকে যেমন সাহায্য করে থাকে, ফিলিস্তিনে হামাস ও ইসলামী জিহাদসহ অন্যান্য আহলে সুন্নাত গ্রুপগুলোকেও তদ্রুপ সাহায্য ও সহযোগিতা করে থাকে। ভবিষ্যতেও এরূপ সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তিনি গাযায় ফিলিস্তিনী ভাইদের শক্তিশালী করাকে ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাহায্যের একটি নমুনা হিসাবে গণ্য করেন এবং বলেন : আগেও যেমনটা বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরকেও সশস্ত্র হতে হবে এবং প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আর এ কাজ নির্ঘাত সম্পন্ন করা হবে।
ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইসলামী জাহানের শত্রুদের শক্তি ও অবস্থা অতীতের চাইতে কয়েক গুণে দুর্বলতর বলে মূল্যায়ন করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সমস্যাবলির প্রতি ইঙ্গিত করেন। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরো করুণতর নৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলি, বিশেষ করে তাদের মুদ্রা ও আর্থিক সমস্যা এবং পরাশক্তি হিসাবে ভাবমূর্তি দুর্বল হওয়ার কথাও ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন : যায়নবাদী ইসরাইলও অতীতের তুলনায় প্রচ-ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ হল সেই জান্তা যারা কিছুকাল আগে ‘নীল হতে ফোরাত পর্যন্ত’ বলে স্লোগান দিয়ে বেড়াত। কিন্তু আজ ৫০ দিনের যুদ্ধে সর্ব শক্তি ক্ষয় করেও হামাস ও ইসলামী জিহাদের আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলগুলোকে ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী এতদঞ্চলে বিশেষ করে ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসলামের শত্রুদের সমস্যাবলি ও ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন : দুশমনের দুর্বলতার আরেকটি নমুনা হচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো একত্রে জড়ো হয়েছে পরমাণু ইস্যুতে ইরানকে নতজানু করতে। কিন্তু তারা সক্ষম হয়নি। ভবিষ্যতেও সক্ষম হবে না।

সূত্র : ইসলামিক স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি (ইস্না)