সোমবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৮ ইং, ১লা শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

সংকটে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ২, ২০১৮ 

news-image

এম জাভেদ জারিফ: পরম করুণাময় দয়ালু প্রভুর নামে শুরু করছি। ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিটিপি) ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর তৃতীয় কোনো বহুপাক্ষিক চুক্তি হিসেবে ইরানের পরমাণু সমঝোতা তথা জেসিপিওএ থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেয় বর্তমান মার্কিন প্রশাসন। এছাড়া উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (নাফটা) মতো বৈশি^ক বাণিজ্য ব্যবস্থা ও জাতিসংঘের কিছু অঙ্গ সংস্থাকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আমেরিকার এমন আচরণ জোটবদ্ধতা ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসার সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বিপর্যস্ত করছে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ছয় জাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সই হওয়া পরমাণু সমঝোতার শর্তগুলো পুরোপুরিভাবে মেনে চলছে বলে যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন দিয়েছে এ বিষয়ে একমাত্র উপযুক্ত আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থা। তা সত্ত্বেও জেসিপিওএ এর শর্তগুলো একের পর এক লঙ্ঘন করতে করতে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৮ মে এ চুক্তি থেকে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি ইরানের ওপর একতরফা ও বেআইনিভাবে পুনরায় পরমাণু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তিনি। আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম্প প্রশাসন।

চলতি বছরের ২১ মে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পোম্পেও এক ভিত্তিহীন ও অপমানজনক বিবৃতি দেন এবং এই বিবৃতিতে তিনি ইরানের কাছে কিছু সংখ্যক দাবি তোলেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। যা আন্তর্জাতিক আইন, সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিয়ম ও সভ্য আচরণের নির্লজ্জ লঙ্ঘন। ইরানের পরমাণু সমঝোতা তথা জেসিপিওএ বানচাল করতে হোয়াইট হাউজ ক্রমাগত যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে অভূতপূর্বভাবে তার বিরোধিতা করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এমন অভূতপূর্ব বিরোধিতার ফলে মাইক পোম্পেও’র ওই বিবৃতিতে আমেরিকার হতাশাজনক প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের বিচ্ছিন্নতা অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে।

মি. পোম্পেও তার বিবৃতিতে জেসিপিওএ থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে যুক্তিসঙ্গত বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এই বিবৃতির মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বেআইনি আচরণ ও দেশটি কর্তৃক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা ২২৩১ এর স্পষ্টত লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে আন্তর্জাতিক জনমতকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। ২২৩১ জাতিসংঘের এমন একটি রেজ্যুলেশন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যার খসড়া প্রণয়ন ও প্রস্তাবনা এনেছিল এবং সেটি নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল। কূটনীতি ও জোটবদ্ধ ব্যবস্থাকে বানচালের প্রচেষ্টা চালানোর কারণে মার্কিন প্রশাসন ক্রমবর্ধমান হারে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তাই ইরানকে মেনে চলার জন্য  মি. পোম্পেও’র দেওয়া ১২টি পূর্বশর্ত বিশেষভাবে অযৌক্তিক। ইরান সম্পর্কে পোম্পেও ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিবৃতি কোনো চমক নিয়ে আসতে পারে নি। তাদের এই বিবৃতি মার্কিন বন্ধু ও মিত্ররাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে হয় উপেক্ষিত হয়েছে অথবা তা নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের অত্র অঞ্চলে আমেরিকার কেবল একটি ক্রেতা রাষ্ট্র (সৌদি আরব) এটিকে স্বাগত জানিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইরানের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান। এমনকি স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য ইরানি জনগণ যে সংগ্রাম করেছে সে সম্পর্কেও তার জ্ঞান অতি নগণ্য। তিনি কি জানেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর বিপরীতে একটি জনপ্রিয় বিপ্লব ও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত? তিনি যদি সত্যিই জেনে থাকেন- তাহলে কি এমন উদ্ভট বিবৃতি দিতে পারতেন? তার জানা উচিত, ইরানে ১৯৫৩ সালে মার্কিন চক্রান্তে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পরবর্তী ২৫ বছর দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘটনা চরম রূপ ধারণ করেছিল। তাই ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানি জনগণের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এই বিদেশি হস্তক্ষেপের অবসান ঘটানো। তার আরও অবগত হওয়া উচিত, ইরানি জনগণ বিগত ৪০ বছরে অভ্যুত্থান চেষ্টা, সামরিক হস্তক্ষেপ, ৮ বছরের (ইরাক-ইরান) যুদ্ধে আগ্রাসী দেশকে সমর্থনের ঘটনা, একতরফা, বহির্দেশীয় এমনকি বহুপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ মার্কিন আগ্রাসন ও চাপ বীরত্বপূর্ণভাবে প্রতিহত করেছে ও তা নস্যাৎ করে দিয়েছে। মার্কিন আগ্রাসনের অংশ হিসেবে পারস্য উপসাগরে ১৯৮৭ সালে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা হয়। তবে আমাদের মন্ত্রই হলো ‘কখনও ভুলে যেও না’।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সাহস দিয়ে শক্তি ও স্থিতাবস্থা ধরে রেখেছে। শান্তিপ্রিয় ইরানি জনগণ এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বিশে^র সঙ্গে গঠনমূলক মিথস্ক্রিয়া গড়ে তুলতে চাই। এবং তারা ঐক্যবদ্ধভাবে তর্জনগর্জন ও জুলুমবাজি প্রতিহত এবং নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, সাদ্দাম হোসেন ও তার শাসন ব্যবস্থার সমর্থকদের মতো যারা এই সুপ্রাচীন ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়েছে তারা সকলেই কলঙ্কজনক ভাগ্য বরণ করেছে। অন্যদিকে, ইরান অব্যাহতভাবে গর্ব ও প্রাণবন্তভাবে উত্তম ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হচ্ছে।

এটা অনুতাপের বিষয় যে, গত দেড় বছরে ইরান সম্পর্কে মার্কিন নীতিসহ আমেরিকার পুরো পররাষ্ট্রনীতি ত্রুটিপূর্ণ অনুমান  ও ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হলেও এটা ভ্রান্ত্র প্রত্যক্ষণের ওপর ভিত্তি গেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের বিরুদ্ধে অনবরত ভিত্তিহীন ও উত্তেজক অভিযোগ করে যাচ্ছেন, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভয়ানক হস্তক্ষেপ ও জাতিসংঘের একটি সদস্য দেশের বিরুদ্ধে বেআইনি হুমকি। এটা জাতিসংঘ সনদের ১৯৫৫ ট্রিটি ও ১৯৮১ আলজিয়ার্স অ্যাকর্ডের (ডিক্লারেশন) অধীন যুক্তরাষ্ট্রের যেসব আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে তার লঙ্ঘন। আমি এসব কল্পিত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের কাছে তাদের বর্তমান রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির কিছু দিকের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করতে চাই, যেসব নীতি পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যই ক্ষতিকারক।

১. বিগত ১৭ মাস যাবত মার্কিন প্রেসিডেন্টের আবেগপ্রবণ ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত এবং আচরণ ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ার মূল চিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের এই প্রক্রিয়া মূলত অসুস্থ ভাবনা ও ত্বরিত ব্যাখ্যা মিশ্রিত। ফলে তা স্বাভাবিকভাবেই তাদের পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেওয়া ও সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত করছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সিআইএ পরিচালক হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে একবার মাইক পোম্পেও জোরালোভাবেই বলেছিলেন, ‘‘ইরান তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নি।’’ এরই মধ্যে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পরবর্তীকালে ২১ মে এবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পোম্পেও তার বিবৃতিতে জোর দিয়েই বললেন, ‘ইরান তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।’’

২. এটা বললে অতিরঞ্জিত হবে না যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কিছু দিক নিলামের জন্য রাখা হয়েছে, যা মূলত রুটিনমাফিক তদবির চর্চা থেকে অনেক দূরে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, এটা নজিরবিহীন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় যে দেশটিকে ধর্মান্ধ ও সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলেছিলেন, সেই দেশটিকেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য বেছে নেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় সাপেক্ষে সেই ক্রেতা দেশের পক্ষে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান হয়ে থাকে, প্রকাশ্যে এমনটাই তুলে ধরলেন ট্রাম্প। এছাড়া আরও জানা গেছে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসুস্থতায় পরিপূর্ণ মার্কিন নীতির অবস্থান গঠনের জন্য মূল ভিত্তি হলো অবৈধ আর্থিক স্বার্থ।

৩. আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা এবং বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে আইনের শাসনকে খাটো করার চেষ্টা করা বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিস্তারিত বলতে গেলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের কথা বলা যায়। এই সম্মেলনে অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল- ‘নিয়ম-নীতিভিত্তিক বিশ^শৃঙ্খলা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা’। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, গেল জি-৭ সম্মেলনে যেসব মার্কিন আলোচক যোগ দিয়েছিলেন, তারা সেই অঙ্গীকারকে বাতিল করার ওপর অত্যন্ত জোর দিয়েছিলেন। মূলত ‘প্যাক্টা সান্ট সারভানদা’র মৌলিক নীতিমালার প্রতি অবমাননা প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধ্বংসাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি শুরু হয়েছে। ‘প্যাক্টা সান্ট সারভানদা’ হলো ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি যা পালন করা আবশ্যিক এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের অতি পুরনো একটি নীতি। কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং অন্য চুক্তিগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা- এ দুটিই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা। আর এ দুটি বিষয়কেই মার্কিন সরকারের এ পর্যন্ত নেওয়া ধ্বংসাত্মক উদ্যোগের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। যা দুর্ভাগ্যক্রমে বিশ^শৃঙ্খলাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছে। আমেরিকার এই ধরনের নীতির ধারাবাহিকতা আবশ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতাকে বিপজ্জনক করতে পারে, দেশটিকে পরিণত করতে পারে একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রে। আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে দেশটি।

৪. ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বর্তমান প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি দিক। পশ্চিম এশিয়ার দিকে তাকালে যার বিশেষ প্রমাণ পাওয়া যায়। জেরুসালেমের পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে অবৈধ ও উত্তেজক সিদ্ধান্ত, গাজাবাসীদের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরাইলের চালানো নিষ্ঠুর নৃশংসতা এবং সিরিয়ায় আকাশপথে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতি অন্ধ সমর্থন- এই ধরনের একটি নীতিহীন পররাষ্ট্রনীতির আরও কিছু নির্লজ্জ দিক।

২১ মে মি. পোম্পেও’র দেওয়া বিবৃতি ছিল আমাদের অঞ্চলের প্রতি মার্কিন ভ্রান্ত নীতির চূড়ান্ত রূপ। হাস্যকরভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন এক সময় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা ও চুক্তির জন্য কিছু পূর্বশর্ত বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে কোনো ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বা চুক্তির সম্ভাব্যতা অথবা কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। শত শত ঘণ্টার দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনার ফলশ্রুতিতে যে চুক্তি (জেসিপিওএ) সম্পাদিত হয়েছিল, তা থেকে একতরফা ও অন্যায্য ভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পরও মার্কিন সরকার কিভাবে আরেক ধাপ সিরিজ আলোচনার একটি নির্ভরযোগ্য পক্ষ হওয়ার প্রত্যাশা করে? অথচ ওই আলোচনায় আমেরিকার উচ্চপদস্থ পররাষ্ট্র বিষয়ক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং যা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দাখিল করা হয়। জাতিসংঘ সনদের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সমঝোতাটি একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার হিসেবে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে যৌথ বিবৃতিতে অনুমোদন দেওয়ার পরও পরবর্তীকালে তা থেকে নাটকীয়ভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি সম্মেলনের আংশিক ত্যাগ করার ইঙ্গিত দেন ও বাণিজ্যিক এ জোটটির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। জি-৭ সম্মেলনে বিশৃঙ্খলা তৈরি সহ সম্প্রতি ট্রাম্পের দেওয়া বিবৃতি ও কর্মকা- তার খেয়ালী আচরণের আরেকটি দৃষ্টান্ত। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেন যে, ছয় মাসের মধ্যে তার মানসিকতা পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিশ্ব কী ধরনের একটি অমূলদ ও বিপজ্জনক মার্কিন প্রশাসনের সম্মুখীন তার এই মন্তব্য সেই ইঙ্গিত বহন করে। কেননা, তার মানসিকতা ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায় যার স্বীকৃতি তিনি নিজেই দিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি প্রত্যাশা করেন, ইরান এমন এক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করুক যার প্রেসিডেন্ট বলেন,  ‘ছয় মাসের মধ্যে আমি তোমার সামনে দাঁড়াতে পারি এবং বলছি হেই, আমি ভুল ছিলাম। আমি জানি না যে আমি কখনও এটা স্বীকার করব কি না। তবে আমি কিছু ধরনের অজুহাত খুঁজে নেব।’  আসলে এমন ধরনের একটি সরকার কি পারে ইরানের জন্য পূর্বশর্ত নির্ধারণ করতে? মি পোম্পেও ভুলে গেছেন যে, মার্কিন সরকারের প্রয়োজন তাদের দেওয়া কথার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং তাদের স্বাক্ষরের বৈধতা প্রমাণ করা। তার মনে করা উচিত- আমেরিকা এমন একটি পক্ষ যে তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলে না এবং নিজেদের দেওয়া কথার ওপর অনড় থাকে না। বাস্তবিক পক্ষে সত্য বিষয় হলো- মার্কিন প্রশাসন বিগত ৭০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দ্বিমত পোষণ ও ইরানের সঙ্গে দেশটির স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বহু চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এর জন্য তাদের জবাবদিহিতা গ্রহণ করা উচিত। মার্কিন সরকারের কাছ ইরানি জনগণ যেসব যুক্তিসঙ্গত দাবি জানায় তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো-

১. মার্কিন সরকারকে অবশ্যই ইরানের স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং ইরানকে নিশ্চিত করতে হবে  যে, আন্তর্জাতিক সাধারণ আইন ও বিশেষত ১৯৮১ আলজিয়ার্স অ্যাকর্ড অনুযায়ী দেশটি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপের অবসান ঘটাবে।

২. যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ‘হুমকি ছুড়ে দেওয়া’ বা ‘শক্তির ব্যবহার’ নীতি ত্যাগ করতে হবে, যে নীতি আন্তর্জাতিক আইনের অবশ্য পালনীয় নিয়মসমূহ ও জাতিসংঘ সনদের মূলনীতির লঙ্ঘন দিয়ে গঠিত। অর্থাৎ আমেরিকা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘হুমকি ছুড়ে দেওয়া’ বা ‘শক্তির ব্যবহার’ নীতিকে যে একটি পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে দেশটিকে তা ত্যাগ করতে হবে।

৩. মার্কিন সরকারের উচিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সরকারের রাষ্ট্রীয় অনাক্রমণ্যতা তথা বিদেশি আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার  যে অধিকার রয়েছে তার প্রতি সম্মান দেখানো, যা আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। অন্যদিকে, স্বেচ্ছাচারপ্রসূত ও বেআইনি ভাবে চাপিয়ে দেওয়া আগেকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞাগুলোও তুলে নিতে হবে।

৪. আমেরিকা বিগত দশকগুলোতে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায্য ও বেআইনি যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে মার্কিন সরকারকে প্রকাশ্যে তা স্বীকার করে নিতে হবে। পাশাপাশি দেশটিকে যাচাইযোগ্য আশ্বাস দিতে হবে যে, তারা পুনরায় ওইসব অবৈধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। মার্কিন সরকারকে যেসব বিষয় স্বীকার করে নেওয়া উচিত তা নিচে তুলে ধরা হলো-

ক. ইরানে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে আমেরিকার ভূমিকাকে স্বীকার করে নিতে হবে। যে অভ্যুত্থানের ফলে ইরানের বৈধ ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং পরবর্তী ২৫ বছর স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

খ. আমেরিকা ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানি জনগণের শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পত্তি বেআইনিভাবে আটক করে, জব্দ করে ও বাজেয়াপ্ত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বিভিন্ন ভিত্তিহীন অজুহাতে ইরানি জনগণের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনকে যা স্বীকার করে নিতে হবে।

গ. ১৯৮০ সালের এপ্রিলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন পরিচালনা করা হয়। যা ছিল ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড গত অখ-তার একটি ভয়ানক লঙ্ঘন।

ঘ. আমেরিকা ৮ বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি স্বৈরাচারকে ব্যাপক সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা সরবরাহ করে। ইরানি জনগণের ওপর ইরাকি স্বৈরাচারের চাপিয়ে দেওয়া ওই যুদ্ধের ফলে ইরান ও ইরানি জনগণের শত শত বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঙ. সাদ্দামের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে বিগত তিন দশক ধরে ইরানিরা যে অসংখ্য ভোগান্তির শিকার হয়েছে তার প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে। কেননা, সাদ্দামের রাসায়নিক অস্ত্রের উপাদান সরবরাহ করেছিল আমেরিকা ও অন্যান্য কিছু পশ্চিমা দেশ।

চ. ১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে ইউএসএস ভিনসেন্স দিয়ে ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা হয়। আমেরিকার এই গুরুতর অপরাধের শিকার হয়ে প্রাণ হারায় ২৯০ জন নিরাপরাধ যাত্রী ও ক্রু। পরবর্তীকালে মার্কিন যে জাহাজের ক্যাপ্টেন বিমানটি ভূপাতিত করেছে তাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে শাস্তি না দিয়ে উলটো মেডেল দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

ছ. ১৯৮৮ সালে বসন্তকালে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের তেল প্লাটফর্মগুলোর ওপর একাধিকবার হামলা চালানো হয়।

জ. ইরানের পুরো জাতিকে ‘একটি বিচ্ছিন্ন’ ও  ‘দুর্বৃত্ত জাতি’ বা ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করে ইরানি জনগণকে বারবার অন্যায্যভাবে অপমান করা হয়েছে।

ঝ. ইরানসহ কিছু মুসলিম দেশের নাগরিকদের একটি গোড়ামিপূর্ণ তালিকা করে তাদের বিরদ্ধে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অযৌক্তিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। অথচ আমেরিকায় সর্বাপেক্ষা সফল, শিক্ষিত ও আইন মেনে চলা অভিবাসীদের মধ্যে ইরানিরাও রয়েছে এবং মার্কিন সমাজের প্রতি রয়েছে তাদের মহৎ সেবা। বর্তমানে তাদের ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে দেখা করা নিষিদ্ধ। এমনকি বৃদ্ধ দাদা-দাদিদের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না এসব অভিবাসী।

ঞ. যুক্তরাষ্ট্রে ইরানবিরোধী সেসব নাশকতাকারীকে লালন-পালন করা হচ্ছে এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল দেওয়া হয়েছে যারা প্রকাশ্যে ইরানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অন্ধ সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে এবং অপরাধী চক্র, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে। এসব নাশকতাকারীর কেউ কেউ বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে লবিস্টদের অর্থের বিনিময়ে করা ব্যাপক তদবিরের প্রেক্ষিতে তালিকা থেকে ওইসব নাশকতাকারীর নাম সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানে এই লবিস্টদের কেউ কেউ ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ পদে আসীন রয়েছেন।

ট. ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের একাধিকবার গুপ্তহত্যার জন্য ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ঠ. সাইবার হামলার মাধ্যমে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।

ড. ইরানে শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধোঁকায় ফেলতে এবং একটি অপ্রয়োজনীয় সঙ্কট তৈরি করতে জাল-জালিয়াতি করে ভুয়া নথিপত্র বানানো হয়েছে।

৫. আমেরিকা বিগত চার দশক ধরে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে যে অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালিয়ে আসছে তা থেকে মার্কিন সরকারকে অবশ্যই ক্ষান্ত হতে হবে। সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে, ইরানের স্বাভাবিক উন্নয়ন ব্যাহত করার লক্ষ্যে জারি করা শত শত বিধি ও নির্বাহী আদেশ তুলে নিতে হবে। আমেরিকার এসব নিবার্হী আদেশ আন্তর্জাতিক আইনের লজ্জাজনক লঙ্ঘন এবং দেশটির এই ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছে। এতে ইরানের অর্থনীতি ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি সাধনের জন্য দেশটির জনগণকে বিশ্ব সম্প্রদায় ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।

৬. মার্কিন সরকারের তাৎক্ষণিকভাবে উচিত জেসিপিওএ লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা। দেশটির পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘনের কারণে ইরানে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ইরানের প্রত্যক্ষভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। আমেরিকাকে ইরানি জনগণের এই ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং সমঝোতার অধীন নিজেদের অবশ্য পালনীয় সকল বাধ্যবাধকতাগুলো নিঃশর্ত ও যাচাইযোগ্য ভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। জেসিপিওএ অনুযায়ী, ইরানের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের স্বাভাবিকতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এমন যে কোনো নীতি বা কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে।

৭. নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের মনগড়া অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে নিষ্ঠুর অবস্থায় আটক থাকা সকল ইরানি ও অ-ইরানি বা প্রত্যার্পণের জন্য মার্কিন সরকারের বেআইনি চাপের ফলে অন্যান্য দেশে আটক থাকা ব্যক্তিদের মার্কিন সরকারকে ছেড়ে দিতে হবে এবং তাদের ক্ষতিসাধনের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যাদের মধ্যে গর্ভবতী নারী, বয়োবৃদ্ধ ও গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা লোকজনও রয়েছে। এমনকি এদের মধ্যে অনেকে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন।

৮. ইরাক, আফগানিস্তান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলসহ অত্র অঞ্চলে আমেরিকার আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপের ফলে যে পরিণতি হয়েছে মার্কিন সরকারকে তা স্বীকার করে নিতে হবে। পাশাপাশি এসব দেশ থেকে নিজেদের সৈন্য প্রত্যাহার এবং অত্র অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করা বন্ধ করতে হবে।

৯. ভয়ানক দায়েশ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও অন্যান্য উগ্রপন্থী সংগঠনের জন্ম দেয়া- মার্কিন সরকারকে এমন নীতি ও আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে । পশ্চিম এশিয়া ও গোটা বিশ্বে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ও তাদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করা বন্ধ করতে আমেরিকাকে তার মিত্রদের বাধ্য করতে হবে।

১০. যেসব আগ্রাসী ইয়েমেনে নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করছে এবং দেশটিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে মার্কিন সরকারকে তাদের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা বন্ধ করতে হবে এবং সেখানে পরিচালিত হামলাতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। দেশটির উচিত ইয়েমেনের বিরুদ্ধে তার মিত্রদের আগ্রাসন বন্ধে তাদের বাধ্য করা এবং দেশটির বিপুল পরিমাণ ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।

১১. আন্তর্জাতিক আইনে নিজেদের বাধ্যবাধকতা মোতাবেক মার্কিন সরকারকে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে সীমাহীন ও নিঃশর্ত সমর্থন করা বন্ধ করতে হবে। দেশটির জাতিবিদ্বেষ ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের নীতির প্রতি নিন্দা জানাতে হবে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও জেরুসালেমকে রাজধানী হিসেবে রেখে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের সকল অধিকারের প্রতি সমর্থন দিতে হবে।

১২. আমেরিকা প্রতি বছর সঙ্কটে থাকা অঞ্চলগুলো শত শত বিলিয়ন ডলারের যেসব প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করছে, মার্কিন সরকারকে তা বিক্রি বন্ধ করতে হবে। বিশেষত, পশ্চিম এশিয়ায় এসব অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে হবে। এসব অঞ্চল খুব সহজেই অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রূপ নেয়- এমন কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে মার্কিন সরকারের উচিত অস্ত্রের পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ উন্নয়ন ও দারিদ্র মোকাবেলায় ব্যবহার করার সুযোগ করে দেওয়া। আমেরিকার অস্ত্র ক্রেতারা অস্ত্র কেনার জন্য যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে কেবল তার সামান্য অংশ বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও চরম দারিদ্র দূর করতে পারে। এসব অর্থ দিয়ে সুপেয় স্বচ্ছ পানি সরবরাহ ও দুর্যোগ মোকাবেলা করা যতে পারে।

১৩. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থেকে মুক্ত একটি জোন প্রতিষ্ঠা করতে বিগত ৫ দশক ধরে যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, মার্কিন সরকারের উচিত এই প্রচেষ্টায় তাদের বিরোধিতা বন্ধ করা। আমেরিকার উচিত ইহুদিবাদী ইসরাইলকে পরমাণু অস্ত্র  নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করা- যে রাষ্ট্রটির ইতিহাসই হলো আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের। একইভাবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার যে ভয়ানক হুমকি রয়েছে তা নিষ্ক্রিয় করতে হবে- যে হুমকি উদ্ভূত হয়েছে আমাদের সময়কার সবচেয়ে বিপজ্জনক শাসকগোষ্ঠীর হাতে সর্বাপেক্ষা বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার কারণে।

১৪. মার্কিন সরকারের উচিত ক্রমবর্ধমান হারে পরমাণু অস্ত্র ও চিরাচরিত হুমকি মোকাবেলায় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ডকট্রিনের (মতবাদ) ওপর নির্ভর করা বন্ধ করা। কেননা, এটা এমন একটি নীতি যা দেশটির দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির (এনপিটি) ৬ অনুচ্ছেদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের উপদেশমূলক মতামত, ১৯৯৫ এনপিটি রিভিউ কনফারেন্স ডিক্লারেশন ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা ৯৮৪ এর লঙ্ঘন। পরমাণু অস্ত্র মুক্তকরণের ক্ষেত্রে আমেরিকার যে নৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তা বাধ্যবাধকতা রয়েছে দেশটির উচিত তা মেনে চলা- যে বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ও বিশ্বের সকল মানুষ প্রায় সর্বসম্মতভাবে দাবি তুলেছে। এমনকি আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও একই দাবি তুলেছেন।

১৫. মার্কিন সরকারকে নিজের দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি পূরণ করে ‘প্যাক্টা সান্ট সারভানদার’ (অবশ্য পালনীয় চুক্তি) মূলনীতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।  ‘প্যাক্টা সান্ট সারভানদা’ আন্তর্জাতিক আইনের সর্বাপেক্ষা মৌলিক নীতিমালা ও জনগণের মাঝে সভ্য সম্পর্কের ভিত্তি। পাশাপাশি এমন বিপজ্জনক ডকট্রিন অনুশীলন করা পরিত্যাগ করতে হবে- যে ডকট্রিনে আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিছক আমেরিকার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়।

এখানে এমন সব মার্কিন নীতির দৃষ্টান্ত টানা হলো যার ফলে আমেরিকার সরকারের প্রতি ইরানিদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এছাড়া তারা পশ্চিম এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি অবিচার, সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধ ও অনিরাপত্তার শিকার। মার্কিন এসব নীতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবজীবন ও বস্তুগত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিশ^জনমত থেকে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন করা ছাড়া কিছুই বয়ে আনতে পারে নি। এর একমাত্র ফায়দা হচ্ছে- এর মাধ্যমে তারা হবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের উৎপাদক। মার্কিন সরকার যদি কথা ও কাজে এসব নীতিকে পরিত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারে তাহলে দেশটির বৈশি^ক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটবে, ইরানসহ গোটা বিশ্বে ফুটে উঠবে আমেরিকার নতুন চিত্র। প্রশস্ত করবে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমন্বিত টেকসই উন্নয়নের জন্য যৌথ প্রচেষ্টার পথ।

আমি আফসোসের সঙ্গে স্বীকার করি, মার্কিন আচরণে এমন ধরনের পরিবর্তনের আশা পোষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বছরের পর বছর অন্তর্ভুক্তিকরণ, জোটবদ্ধতা ও সংলাপকে উৎসাহ দিয়ে আসছে। সম্মান জানাচ্ছে আইনের শাসন এবং ‘ডায়লগ অ্যামাং সিভিলাইজেশন’ ও ডাব্লিউএভিএ (ওয়ার্ল্ড এগেইন্স্ট ভায়োলেন্স অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম) এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্র মুক্তকরণের পদক্ষেপের প্রতি। ইরান পরমাণু অস্ত্র মুক্তকরণের টার্গেট অর্জন ও নিয়ম-নীতিভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে আসছে। এছাড়াও আমরা বিভিন্ন সময় বাস্তবিক প্রস্তাব পেশ করেছি এবং সিরিয়া ও ইয়েমেনে আঞ্চলিক সংঘাতের অবসানে গুরুতর কূটনীতিক প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত হয়েছি। আমরা দুর্ভাগ্যজনক এসব সংঘাত শুরুর একেবারে প্রথম থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে তার অবসানে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছি। দুঃখজনক বিষয় হলো- আমেরিকা সবসময় বধির থেকে আমাদের অঞ্চলের প্রত্যেকটি সংঘাতে আগ্রাসী ও সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। জেসিপিওএ থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান সমঝোতায় থাকা বাকি দেশগুলোর সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক কূটনীতির মাধ্যমে অর্জিত এই অদ্বিতীয় চুক্তি রক্ষায় সর্বোত্তম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরান বিগত চার দশকে সহজাত অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও ইরানের মহান জনগণের ওপর নির্ভর করে নিজস্ব নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে, কোনো বিদেশি শক্তির উদারতা বা পৃষ্ঠপোষকতায় নয়। বিদেশি চাপ ও এই অঞ্চলের মধ্যে কম সংখ্যাক যুদ্ধোপকরণ থাকা সত্ত্বেও ইরান আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, স্থিতিশীল হয়েছে এবং দিন দিন আরও সামনে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের যুদ্ধোপকরণও তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমেরিকা ও তার বিদেশনীতির বিপরীতে আঞ্চলিকভাবে ইরান কখনই আধিপত্য বিস্তার করতে চায় না এবং ভবিষ্যতেও প্রভাব বিস্তারে নিজেকে নিয়োজিত করবে না।  ইরান বিশ্বাস করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কর্তৃত্বের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে এবং যে কোনো শক্তি এই কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা চালালে তা ব্যর্থ হবে। বিদেশি আধিপত্য  মেনে নেওয়া বা অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার পরিবর্তে আমাদের অঞ্চলের দেশগুলোর উচিত একটি শক্তিশালী, অধিক সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল অঞ্চল তৈরি করা। আমরা ইরানিরা আমাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখি। আমাদের রয়েছে একটি অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতি। সেই সাথে রয়েছে অবিভাজ্য সুযোগ সুবিধা। সঙ্গে রয়েছে অভিন্ন চ্যালেঞ্জও। আমরা কেবল তখনই নিজ ভূখণ্ডে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা উপভোগ করতে পারব যখন আমাদের প্রতিবেশীরা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা উপভোগ করবে। আমরা আশা করি, অন্যান্য আঞ্চলিক দেশ একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রয় বা বিদেশিদের দেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যর্থ পরীক্ষা চালানোর পরিবর্তে সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া, আস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতি মনোনিবেশ করবে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান মনে করে আঞ্চলিক সংকট সমাধান ও একটি শক্তিশালী অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সর্বোত্তম উপায় হতে পারে পারস্য উপসাগরে একটি ‘আঞ্চলিক ডায়লগ ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করা। আমরা রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্বের সমতা, হুমকি ছুড়ে দেওয়া বা শক্তির ব্যবহার না করা, বিবদমান বিষয়ের শান্তিপূর্ণ সমাধান, অন্য দেশের ভূখণ্ডগত অবিভক্ততার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক সীমানার অলঙ্ঘনীয়তা, অন্যদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি মূলনীতির ভিত্তিতে আঞ্চলিক দেশগুলোকে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে আস্থা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে থাকা হুমকি ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অভিন্ন বোঝাপড়া প্রতিপালনের মাধ্যমে আমরা একটি অনাগ্রাসী চুক্তি অর্জনের দিকে ধাবিত হতে পারি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জন্য তৈরি করতে পারি অভিন্ন কর্মকৌশল। আমরা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি, আমরা আঞ্চলিকভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব এবং বাইরের হস্তক্ষেপ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই আমরা আমাদের নিজেদের মধ্যকার সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারব। আমাদের সব শিশুর জন্য নিশ্চিত করতে পারব একটি সর্বোত্তম ভবিষ্যৎ। আর আমরা এসব পারব এজন্য যে, এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী সভ্যতার উত্তরাধিকারী আমরা।