সোমবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ২৯শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শেষ হল বাঙালির প্রাণের মেলা, ৬৫ কোটি টাকার বই বিক্রির রেকর্ড

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২, ২০১৭ 

news-image

শেষ হল অমর একুশে গ্রন্থমেলার মাসব্যাপী আয়োজন। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার মেলায় সব স্টল মিলিয়ে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে; যা ২০১৬ সালের চেয়ে ২৩ কোটি টাকা বেশি।   সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদেএসব তথ্য জানান।

মেলায় ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্টল মালিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং মঙ্গলবারের সম্ভাব্য বিক্রি যুক্ত করে বাংলা একাডেমি এই অঙ্ক জানিয়েছে।

জালাল আহমেদ বলেন, “এবারের মেলায় প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে ৮৫৮টি বই মানসম্পন্ন। এটি নিঃসন্দেহে আশার কথা। এক বছরের গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে ৮৫৮টি মানসম্পন্ন বইয়ের প্রকাশ সহজ কথা নয়।”

বইয়ের উচ্চ মূল্য নিয়ে পাঠকদের অভিযোগের বিষয়ে জালাল আহমেদ বলেন, “যেসব বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয় বলে দাবি করা হয় কিংবা গ্রন্থমেলায় বিভিন্ন সংস্করণ প্রকাশিত হয়, সেসব বইয়ের দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে না। বইয়ের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগামী বছর আমরা আরও বেশি সুচিন্তিত মানদণ্ড প্রয়োগ করব।”

তরুণ লেখকদের উপযুক্ত সম্মানী বা রয়্যালিটি না পাওয়ার অভিযোগটিও বাংলা একাডেমি খতিয়ে দেখবে বলে জানান তিনি।

এবার মেলায় নতুন বই এসেছে ৩ হাজার ৬৪৬টি। গত বছরের চেয়ে ২০২টি বই বেশি প্রকাশিত হয়েছে।আত্মজৈবনিক গ্রন্থ নিয়ে আলোচনায় ছিলেন কবরী আত্মজৈবনিক গ্রন্থ নিয়ে আলোচনায় ছিলেন কবরী

প্রতিবছর কবিতার বই বেশি প্রকাশিত হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে ১ হাজার ১২২টি।

এছাড়া উপন্যাস ৫৭৬টি, গল্পগ্রন্থ ৫২০টি, প্রবন্ধ ১৬৮টি, শিশুতোষ গ্রন্থ ১১৮টি, ছড়াগ্রন্থ ১১৭টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ৯৭টি, গবেষণা গ্রন্থ ৮৭টি, জীবনী গ্রন্থ ৭১টি, ভ্রমণ বিষয়ক গ্রন্থ ৬৯টি, ইতিহাস গ্রন্থ ৪১টি, বিজ্ঞান বিষয়ক ৩৮টি, সায়েন্স ফিকশন ও গোয়েন্দা গ্রন্থ ৩৪টি, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক গ্রন্থ ২৮টি, অনুবাদ গ্রন্থ ১৮টি, নাটক ১৭টি, রাজনীতি বিষয়ক ১৭টি, রম্য/ধাঁধাঁ ১৭টি, ধর্মীয় গ্রন্থ ১০টি, রচনাবলি এসেছে ৭টি, কম্পিউটার বিষয়ক ৬টি, অভিধান ২টি। বিবিধ বই রয়েছে ৪৬৬টি।

মেলার শেষ দিনে ১৮০টি নতুন বই আসে। এর মধ্যে গল্প ৪২টি, উপন্যাস ৩০টি, প্রবন্ধ ১০টি, কবিতা ৬৪টি, গবেষণা ১০টি, ছড়া ৬টি, শিশুসাহিত্য ২টি, জীবনী ২টি, মুক্তিযুদ্ধ ১টি, বিজ্ঞান ২টি, ভ্রমণ ৩টি, ইতিহাস ২টি, রম্য/ধাঁধা ২টি, ধর্মীয় ১টি এবং অন্যান্য বিষয়ক ৩টি। এছাড়া ৩৪টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, “বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা এখন আর বই ক্রয়-বিক্রয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই ; এটি পরিণত হয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক জাগরণের উৎসমুখে।”

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, “এবারের গ্রন্থমেলা সার্বিক দিক দিয়ে সফল ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। লেখক-পাঠক-প্রকাশক সকলের সম্মিলিত ভাবনা ও প্রচেষ্টায় আগামীতে মেলায় আরও নতুনত্ব ও ইতিবাচকতা সংযোজিত হবে বলে আমরা আশা করি।”

ফাগুনের প্রথম দিনে বইমেলা ছিল জমজমাট ফাগুনের প্রথম দিনে বইমেলা ছিল জমজমাট অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন,  “গ্রন্থপ্রেমী মানুষের এই মিলনমেলা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে আমরা আশাবাদী।”

এবারের গ্রন্থমেলার নান্দনিকতা নিয়ে নানা সমালোচনার মুখে পড়ে বাংলা একাডেমি।

জালাল আহমেদ বলেন, “এই মেলার বিভিন্ন দিক নিয়ে মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের নির্দেশে আমরা যে মূল্যায়ন-সভা করব তাতে এসব দিক নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হবে।

“এসব আলোচনা থেকে পরামর্শ ও নির্দেশনা নিয়ে আগামী বইমেলা আরও সুন্দর, আরও উন্নত করার পরিকল্পনা ও কার্যক্রম আমরা শুরু করব।”

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার প্রদান

সমাপনী অনুষ্ঠানে কবি শামীম আজাদ ও লেখক অনুবাদক নাজমুন নেসা পিয়ারিকে বাংলা একাডেমির ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার ২০১৬’ দেওয়া হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫০ হাজার টাকার চেক, সনদ ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।

‘গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান

সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার’ তুলে দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য জার্নিম্যান বুককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭’, ২০১৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য রফিকুন নবীর ‘দেশসেরা জগৎসেরা শিল্পীকথা’ গ্রন্থের জন্য প্রথমা প্রকাশন, পাভেল রহমানের ‘সাংবাদিকতা আমার ক্যামেরায়’ গ্রন্থের জন্য মাওলা ব্রাদার্স, রনজিত কুমার মণ্ডলের ‘আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়’ গ্রন্থের জন্য পুঁথিনিলয়কে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৭’ দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চন্দ্রাবতী একাডেমিকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭’ এবং ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিঘর, সংবেদ ও পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৭’ দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালা ভঙ্গের জন্য ১৯টি স্টল চিহ্নিত

অমর একুশে গ্রন্থমেলার নীতিমালা ও নিয়মাবলি লঙ্ঘন করায়, টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে, ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে ১০টির বিরুদ্ধে নীতিমালার ৬.১ ধারায় বিদেশি বই বিক্রির এবং ৯টির বিরুদ্ধে নীতিমালার ১৩.১৩ ও ১৩.১৪ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে করা হয়।

উৎসর্গকরণ

বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশকে ১২টি চত্বরে বিভক্ত করা হয়। ১২ জন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও লেখকের নামে উৎসর্গ করা হয়। যাদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১২টি চত্বর উৎসর্গ করা হয় সৈয়দ শামসুল হক, শওকত ওসমান, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, আব্দুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দীন, সরদার জয়েনউদদীন, নূরজাহান বেগম, আহসান হাবীব, আব্দুল গফুর হালী, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, আমীর হোসেন চৌধুরী ও দীনেশচন্দ্র সেনের নামে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ উৎসর্গ করা হয় শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামে।