সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শেষ হলো ‘এশিয়ান থিয়েটার সামিট ২০১৭’

পোস্ট হয়েছে: মে ৭, ২০১৭ 

news-image

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ৫ মে থেকে শুরু হওয়া দুদিনব্যাপী ‘এশিয়ান থিয়েটার সামিট ২০১৭’ শনিবার শেষ হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন—আইয়াটার এশিয়ান রিজিওনাল সেন্টারের উদ্যোগে এবং পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনের এই অনুষ্ঠানে সেমিনারের পাশাপাশি একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার ৩ নম্বর মহড়াকক্ষ, সেমিনার রুম, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হল এবং স্টুডিও থিয়েটার হলে দুই দিনব্যাপী পরিবেশনায় ছিল দেশের বাউল সংগীত, চর্যানৃত্য, গৌড়ীয় নৃত্য, শিশুনৃত্য ও নাটক; বিদেশি নাটক, ঐতিহ্যবাহী নাট্যের বিভিন্ন পরিবেশনা ও যাত্রাপালা। অনুষ্ঠানে একই সাথে লাওস, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আগত অতিথিরা তাদের পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।তিনি বলেন, “সময়ের প্রেক্ষাপটে এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর থিয়েটারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সেভাবে স্থাপিত হয়নি। আমাদের এ ক্ষেত্রটিতে আরও বেশি আলোচনা করার আছে।”

বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের বিপরীতে থিয়েটারকে একটি ‘শক্তিশালী অস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী।তিনি বলেন, “অবিবেচকদের অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে থিয়েটারকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে হবে আমাদের।”

ইন্টারন্যাশনাল অ্যামেচার থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (আইটিআই) এশিয়ান রিজিওনাল সেন্টারের উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষকতা করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

অনুষ্ঠানে আইটিআইয়ের অনারারি প্রেসিডেন্ট রামেন্দু মজুমদার বলেন, “থিয়েটার সংলাপনির্ভর। এই সংলাপের মাধ্যমেই আমরা অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারি।”

সিঙ্গাপুরের চায়নিজ অপেরা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চুয়া সু পং বলেন, এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে। যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সেই কঠিন চ্যালেঞ্জ জয় করা যায়।

 

অনুষ্ঠানে  অধ্যাপক আবদুস সেলিম ‘এশিয়ান থিয়েটার: ট্র্যাডিশন অ্যান্ড ট্রেন্ড’,  সিঙ্গাপুরের চুয়া সু পং ‘সাউথইস্ট এশিয়া অ্যান্ড ইস্ট এশিয়ান ট্র্যাডিশনাল থিয়েটার: ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। এর মুক্ত আলোচনা পর্বে ইরানের ‘চলচ্চিত্র ও থিয়েটার’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন ঢাকাস্থ ইরানের   সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সায়্যেদ মূসা হুসাইনি। তিনি বলেন,  ইরানের ইসলামী বিপ্লব ছিল একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লবের শুরুতেই দেশটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানাসমস্যা এমনকি যুদ্ধের মতো ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হলেও সবচেয়ে কঠিনতম মুহুর্তেও ইরান  শিল্প ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে মনোযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সামান্যতম অবহেলা করেনি। আর এ কারণেই শিল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ অর্থাৎ চলচ্চিত্র ও থিয়েটার দুটি ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরিণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানের অগ্রগতি আজ সবার চোখে পড়ার মতো।

ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান বলেন, চলচ্চিত্রের  ভাষাকে বলা হয় সপ্তম শিল্প যা মানুষের বিনোদন জগতের অন্যতমআকর্ষণীয় দিক এবং সাংস্কৃতিকজগতে এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবফেলতে সক্ষম। দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে পেশাদারিত্বের সাথে যদি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়, তাহলে অবশ্যই এরমাধ্যমে দর্শকদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরি ও সুষ্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব। যেমনটি একজন কবির ছোট্ট একটি কবিতায় মানব চরিত্রের মূল্যবাণ বাণি আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।

সায়্যেদ মূসা হুসাইনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকে বিগত বছরগুলোতে ইরানের চলচ্চিত্র শিল্প চলচ্চিত্র জগতের দর্শকদের কাছে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বের অধিকাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতারা যখন যৌনতাকে তাদের বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সস্তা বিনোদনের অংশ হিসেবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে তখন ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের পেশাগত দক্ষতা ও নান্দনিক শিল্পকর্মকে কাজে লাগিয়ে এবং সামাজিক, চারিত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধগুলোকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্র জগতে দর্শকের কাছে একটা ভিন্ন মাত্রা যোগকরেছে।

তিনি বলেন, ইরান প্রতিবছর প্রায় ১০০ টি পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত গত ৩৮ বছরে দেশটিতে অভ্যন্তরিণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে ৩৫ টি চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরিণ চলচ্চিত্রের মানউন্নয়ন ও এর পরিচিতি এবং বিশ্বের অত্যাধুনিক চলচ্চিত্র নির্মান কৌশল এবং নতুন নতুন চলচ্চিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াই এই চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ইরানের চলচ্চিত্র আজ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়ার পাশাপাশি অস্কার ও কান চলচ্চিত্র পুরস্কারের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে।যা ইরানের চলচ্চিত্র  শিল্পের সফলতার একটা অন্যতম উদাহরণ।

অপরদিকে, থিয়েটারকে শিল্প বিশ্লেষকরা চলচ্চিত্রের জনক হিসেবে অভিহিত করে থাকেন এবং চলচ্চিত্রকে থিয়েটারের সন্তান মনে করেন। যদিও অনেকে আধুনিক থিয়েটারকে ইউরোপীয়দের অবদান বলে অভিহিত করেন তবে এটা না বললেই নয় যে, ইরানের নাটক ও থিয়েটারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ইরানের প্রথম দিকের নাটক বা থিয়েটার যা কিনা কারবালায় ইমাম হোসেনের শাহাদতের ঘটনা ও নবীদের জীবনির মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঞ্চস্থ হতো এমন নাটক বা থিয়েটার এখনো দেশটিতে প্রদর্শিত হয়ে আসছে। এছাড়া এ বিষয়টিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ইরানের মহাকবি ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামা ও এর বিরত্বগাথা বিভিন্ন গল্প ইরানের ঐতিহ্যবাহি থিয়েটার শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মহাকবি ফেরদৌসির শাহনামার গল্প ব্যবহার করে বিভিন্ন নাটক উপস্থাপন বিশেষকরে সোহরাব-রোস্তমের মতো ঐতিহ্যবাহি নাটক ইরানী শিল্পের ইতিহাসকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু উনিশ শতকের পর থেকে ইরানের প্রচলিত থিয়েটারের ধরন ও বিষয়স্তু অনেকটা আধুনিক ইউরোপীয় থিয়েটারের সাথে মিশে গেছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের গত ৩৮ বছরে চলচ্চিত্রের পর শিল্পের যে দিকটাতে ইরানের ব্যাপক সাফল্য এসেছে তার মধ্যে থিয়েটার অন্যতম। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর এ পর্যন্ত দেশটিতে ৩৫ টি আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসবেরও আয়োজন করা হয়েছে। এসব উৎসবে ছোটদের নাটক, পথ নাটক এবং প্রচলিত ও অঞ্চলিক নাটকসহ প্রায় সবধরনের নাটক মঞ্চস্থ হয়ে থাকে। থিয়েটারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কারণেই দেশটিতে প্রায় প্রতিবছরই নতুন নতুন থিয়েটার হল তৈরি হচ্ছে।

আইটিআইয়ের এশিয়া অঞ্চলের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কেন্দ্রের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, ইন্দোনেশিয়ার নাট্যকর্মী আলিকা চন্দ্র, ভারতের ডোংরে ইয়োৎসোনা সুহাস, নেপালের প্রেম পাওদেল, লাওসের পাংনা ফ্রানখোনে উপস্থিত ছিলেন।

মুক্ত আলোচনা পর্বে সভাপতিত্ব করেন রামেন্দু মজুমদার। পরে জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় লোকনাট্যদলের ‘রথযাত্রা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন লিয়াকত আলী লাকী।

প্রথম দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে নাট্যশালার ৩ নম্বর মহড়া কক্ষে ‘অবহেলায় মৃত্যু আর নয়’ শীর্ষক পরিবেশনায় অংশ নেয় পিএলটির শিল্পীরা।

এরপর স্টুডিও থিয়েটার হলে ঢাকা সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গীতানুষ্ঠান, কুঁড়িগ্রামের কুশান যাত্রা, কিশোরগঞ্জের রং জারি এবং নড়াইলের অস্টক যাত্রা পরিবেশিত হয়।  এর সঙ্গে লাওয়ের পাংনা ফ্রানখোনের পরিচালনায় ক্ল্যাসিক্যাল নৃত্য পরিবেশন করে লাও রামায়ানা দি ভিয়েনতিয়েন। এছাড়া থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার শিল্পীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনায় অংশ নেন।

সবশেষে জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার হলে লোকনাট্যদলের ‘সোনাই মাধব’ এর শততম মঞ্চায়ন হয়। এ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন লিয়াকত আলী লাকী।

আয়োজনের দ্বিতীয় দিন শনিবার বিদেশ থেকে আসা অতিথিরা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি অংশ নেন সংস্কৃতি বিষয়ক তুলনামূলক আলোচনায়।

শনিবার দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির পর মফিদুল হক ‘থিয়েটার অব দ্য মিডল ইস্ট: অ্যান ওভারভিউ’ এবং থাইল্যান্ডের স্টিফেন হাওয়ার্ড টমাস ‘এশিয়ান পাপেট থিয়েটার’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। এ পর্বটির সভাপতিত্ব করেন লিয়াকত আলী লাকী।

পরে ড. আফসার আহমেদ ‘ফর্ম অ্যান্ড কনটেন্ট ইন ট্র্যাডিশনাল বাংলা থিয়েটার’ এবং সাংবাদিক এরশাদ কমল ‘এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্র্যাডিশনাল আর্ট ফরমস ইন কনটেম্পরারি আরবান থিয়েটার: পোটেনশিয়ালস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান।