সোমবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ২৯শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শেখ সাদী ও ‘বুস্তান’

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ২৫, ২০১৯ 

শাহনাজ আরফিন –

বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ফারসি ভাষার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশে ফারসি ভাষার প্রচলন ছিল। ফারসি ভাষার বিশিষ্ট কবি শেখ সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, মাওলানা রুমী ও ফেরদৌসির নাম জানে না এমন লোক আমাদের সমাজে খুব কমই আছে।
ইরানের কবি শেখ সাদীর অনেক কবিতা এখনও আমাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং মিলাদ মহফিলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
বালাগাল উলা বি কামালেহি
কাশাফাদ্দুজা বি জামালেহি
হাসুনাত জামিউ খেসালেহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলেহি।
অর্থ : ‘সমাসীন তিনি সুউচ্চ শিখরে, নিজ মহিমায়
তিমির-তমসা কাটিল তার রূপের প্রভায়
সুন্দর আর সুন্দর তাঁর স্বভাব, চরিত্র তামাম
জানাও তাঁর ও তাঁর বংশের ’পরে দরূদ সালাম।’
মহান কবি শেখ সাদী নবীজীর শানে লেখা তাঁর এ আরবি কবিতায় যে আবেগময়ী ও প্রাঞ্জল ভাষায় রাসূলে খোদার (সা.) ওপর দরূদ ও সালাম পৌঁছে দিয়েছেন তা সত্যিই নজিরবিহীন। এছাড়া পরোপকার এবং দুস্থ মানবতার কল্যাণে তিনি নিজে যেমন ব্রতী ছিলেন তেমনি অন্যকে প্রেরণা যুগিয়েছেন এইভাবে-
‘তরীকত বেজুয খেদমাতে খাল্ক নিস্ত
বে তাসবীহ ও সাজ্জাদে ও দাল্ক নিস্ত।’
তাঁর এ বাণী মুসলিম জাহানে অমর হয়ে আছে।
ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র এই মহান কবির জীবণ ও কর্ম কেবল ফারসি ভাষাভাষী মানুষের জন্যেই নয়, বরং বিশ্বের যে কোন ভাষার সাহিত্যানুরাগীর কাছেই মূল্যবান দিক-নির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
শেখ সাদীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো ‘গুলিস্তান’, ‘বুস্তান’, ‘কারিমা’, ‘সাহাবিয়া’, ‘কাসায়েদে ফারসি ও আরবি’, ‘গাযালিয়াত’, ‘কুল্লিয়াত’ ইত্যাদি। এসব কাব্যগ্র›েহর মধ্যে ‘গুলিস্তান’ ও ‘বুস্তান’ আজও ভারত উপমহাদেশের বহু মাদ্রাসায় পাঠ্য বই হিসেবে পড়ানো হয়।
সাদীর ‘গুলিস্তান’ বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সেরা স¤পদ হিসাবে স্বীকৃত। এটি পৃথিবীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তবে ‘বুস্তান’ গ্রন্থটিও সমমর্যাদার দাবিদার। এই দুটি কালজয়ী গ্রন্থ সেকালে সমগ্র এশিয়ায় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।এ দুটি গ্রন্থের অনেক পঙ্ক্তি আজ ফারসি সাহিত্যে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
‘গুলিস্তান’ হচ্ছে উপদেশমূলক গদ্যের ফাঁকে ফাঁকে কাব্যে রচিত একটি গ্রন্থ। আর ‘বুস্তান’ পুরোটাই কাব্য। ‘গুলিস্তান’ মানে ফুলের বাগান আর ‘বুস্তান’ মানে বাগান বা সুবাসিত স্থান। ‘গুলিস্তান’ গ্রন্থে শেখ সাদী যেসব কাহিনী দিয়ে মানবমনের চিরন্তন বাগানে ফুল ফুটিয়েছেন তা অনেকটা দৃশ্যমান। কিন্তু ‘বুস্তান’-এর ফুলগুলো দৃশ্যমান নয়, কাছে গেলে অর্থাৎ নিয়মিত চর্চা করলে এর ভেতরের সুবাস মন-প্রাণকে বিমোহিত করে।
ইরানের সাহিত্য জগতে ‘শাহনামা’র রচয়িতা কবি ফেরদৌসির পরই রয়েছে শেখ সাদীর অবস্থান। শেখ সাদীর পুরো নাম হচ্ছে, আবু মোহাম্মাদ মুশরেফ উদ্দীন সাদী। তাঁর জন্ম ঠিক কবে হয়েছিল তা সঠিকভাবে কারো জানা নেই। তবে নিজ কাব্যগ্রন্থ ‘গুলিস্তান’-এ তিনি তাঁর জন্ম তারিখ প্রায় ৬০৬ হিজরি বা খ্রিস্টীয় ১২০৯ সাল বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি শিরাজ নগরীর এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর ভাষায়, আমি এমন এক পরিবারে জন্ম নিয়েছি ও বড় হয়ে উঠেছি যার প্রত্যেকেই ছিলেন উঁচু স্তরের আলেম।
জন্মস্থান শিরাজে ধর্মীয় ও সাহিত্যের প্রাথমিক ধাপগুলো অতিক্রম করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি বাগদাদে যান। শেখ সাদীকে নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন অনেকের মতে, তাঁর এ বাগদাদ সফরই পরবর্তীকালে আরও অনেক দীর্ঘকালীন সফরের পটভূমি রচনা করেছিল।
তিনি বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। কেবল বাগদাদে পড়ালেখা করেই তিনি থেমে যান নি , পরবর্তীতে তিনি বিশ্বের আরও বহু দেশ ভ্রমন করেন এবং সেখানকার বিজ্ঞ ও প-িত ব্যক্তিদের সাহচর্যে মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করেন।
তিনি বেশ কিছুকাল হিকমাত ও দর্শনশাস্ত্রের বিজ্ঞ মনীষীদের সান্নিধ্যে কাটান। তাঁদের মধ্যে শেখ শাহাবউদ্দীন সোহরাওয়ার্দির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শেখ সাদী তাঁর জীবনের একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন বিশ্বের নানা দেশ ঘুরে। এসব ভ্রমণ থেকে তিনি বহু মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ সাদীর এসব ভ্রমণকে তাঁর জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যা আহরণের অক্লান্ত প্রয়াসের অংশ ধরা যায়। তিনি বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসায় পড়ালেখার পর বিশ্ব ভ্রমণে বের হন। তিনি হেজাজ, লেবানন, সিরিয়া ও রোমসহ বিশ্বের আরো বহু স্থান ঘুরে দেখেন। সাদীর ভাষায় :
در اقصی عالم گیتی بگشم سی
بر بردم ایام با هر کسی
تمتع ز هر گوشه اس یانتم
زهر جرمنی خوشه ای یافتم
অর্থাৎ আমি বিশ্বের বহু দেশ ঘুরে দিখেছি এবং বহু জনের সাথে দিবস যাপন করেছি। প্রত্যেক প্রান্তেই কোন না কোন শিক্ষা লাভ করেছি এবং প্রতিটি শস্যস্তূপ থেকেই শস্যদানা সঞ্চয় করেছি।
এখানে সাদী বুঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে অনেক মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করেছেন এবং এভাবে নিজের জ্ঞান ভা-ার সমৃদ্ধ করেছেন।
শেখ সাদী দীর্ঘ সময় ভ্রমণে কাটাবার পর ৬৫৫ হিজরি বা ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন এবং জীবনের বাকি অংশ শিরাজেই অতিবাহিত করেন। এসময় তিনি কাসিদা, গজল, বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা ও জনগণকে সদুপদেশ দেয়ার কাজে নিজেকে নিয়েজিত করেন। শেখ সাদী ৬৯১ হিজরি পর্যন্ত শিরাজ নগরীর অদূরে একটি নির্জন স্থানে আধ্যাত্মিক চর্চা ও মহান আল্লাহর ইবাদতে সময় কাটান। এসময় তিনি তাঁর মূল্যবান কাব্যগ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ ও ‘বুস্তান’ রচনা করেন।
তিনি ফারসি ও আরবি ভাষায় কবিতা ও গজল রচনার পাশাপাশি নানা দেশ ভ্রমণ থেকে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, যে সব ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন সে সবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ৬৫৫ হিজরিতে ‘বুস্তান’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। কথিত আছে, তিনি বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশ ভ্রমণকালে ‘বুস্তান’ রচনায় হাত দেন এবং নিজ দেশে ফিরে এসে বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের সামনে এই মূল্যবান রচনা উপস্থাপন করেন। ‘বুস্তান’কে নৈতিক জ্ঞান ও শিক্ষার আধার বলে মনে করা হয়। অবশ্য শেখ সাদী একে ‘সাদী নামা’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
‘বুস্তান’-এর শুরুতেই রয়েছে মহান স্রষ্টার বন্দনা। অত্যন্ত সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় কবি লিখেছেন :
‘কারীমা বে বাখশায়ে বার হা’লে মা’
কে হাস্তাম আসীরে কামান্দে হাওয়া
না দরাম গাইর আজ থো ফরিয়াদ রাছ
তু-য়ী আসীয়ারা খাতা বাখ্শ ও বাস্
নেগাহদার ম রা যে রাহে খাতা’।’
অর্থ : ‘হে দয়াল প্রভু, আমার প্রতি করুণা কর।
আমি কমিনার শিবিরে বন্দি।
তুমি ছাড়া আর কেউ নাই যার কাছে অমার ফরিয়াদ পৌঁছবে।
তুমিই পাপীদের একমাত্র রক্ষাকারী। তুমি পাপ পথ থেকে আমাকে রক্ষা কর।’
সাদীর ‘বুস্তান’ গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের ওপর দশটি পর্ব রয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার, এহসান বা পরোপকার, ইশ্ক বা ভালোবাসা , বিনয়, সন্তুষ্টি আত্মতৃপ্তি, শিক্ষাদান ও প্রতিপালন এবং তওবা উল্লেখযোগ্য বিষয়।
‘বুস্তান’-এর জগৎ শেখ সাদীর আপন চিন্তা ও চেতনা থেকে উৎসারিত। এ বইয়ে তিনি একজন মানুষের কী গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত চমৎকার ভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
সাদী মুলত তার এই বইয়ে নিজের কল্পিত স্বর্গরাজ্যের চিত্র নিপুন শিল্পির তুলির আচড়ে চিত্রিত করেছেন।
বর্তমান পৃথিবী পাপ-পঙ্কিলতা, অন্যায়,অসত্য, আর কলুষতায় পরিপূর্ণ। অথচ ‘বুস্তান’-এ চিত্রিত পৃথিবী সত্য, সুন্দর, পবিত্র ও মার্জিত। সেখানে অন্যায় অবিচার, মানবতা ও মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনার কোন স্থান নেই।
‘বুস্তান’-এ চিত্রিত সুন্দর ও পবিত্র পৃথিবীই সাদীর একান্ত কাম্য ও প্রত্যাশিত। সাদী তাঁর এ স্বপ্নের জগৎ চিত্রায়নে নিজ অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞ ও প-িত ব্যক্তিদের জীবনী ও তাঁদের রেখে যাওয়া শিক্ষাকে ব্যবহার করেছেন। তিনি একজন প্রকৃত মানুষ বা মানুষের মর্যাদা তুলে ধরতে গিয়ে এসব সূত্র ব্যবহার করেছেন। এক চমৎকার বর্ণনায় তিনি দেখিয়েছেন,একজন মানবদরদী ও সাহসী যুবক নিজে হতদরিদ্র ও নিঃস্ব হওয়া সত্ত্বেও একজন অসহায় ও ঋণভারে জর্জরিত ব্যক্তিকে পাওনাদারের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেবার জন্য কীভাবে নিজে জামিন হয়ে তাকে পালাবার রাস্তা দেখিয়ে দেয় এবং বছরের
পর বছর ধরে তার জায়গায় বন্দিত্বের জীবন বেছে নেয়।
অন্য এক বর্ণনায় তিনি দেখিয়েছেন, এক ব্যক্তি তার পড়শীর বাড়িতে চুরি করতে আসা এক অসহায় চোরকে কিভাবে নির্দিষ্ট বাসায় চুরি করতে বাধা দিয়ে স¤পূর্ণ অপরিচিত লোকের বেশে নিজ বাড়িতে নিয়ে যায় এবং নিজের বিছানাপত্রসহ সব মালামাল তার হাতে তুলে দেয় যাতে সে খালি হাতে বাড়ি না ফিরে।
সাদীর ‘বুস্তান’-এ মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, এমনকি জগতের প্রতিটি বস্তুকে বাকশক্তিস¤পন্ন দেখানো হয়েছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি বস্তুই যেন একে অপরের সহমর্মী ও বাকসঙ্গী। তাদের প্রত্যেকের মধ্যে যেন রয়েছে আত্মিক ও সুদৃঢ় বন্ধন।
সাদীর মতে, এ বিশ্বজগতে একমাত্র মানুষই সম্মান, মর্যাদা, দয়া ও ভালোবাসা পাওয়া যোগ্য নয়, বরং প্রতিটি জীবেরই তা প্রাপ্য।
‘বুস্তান’-এর দশটি পর্বে শেখ সাদী যে পৃথিবী চিত্রিত করেছেন তাতে রয়েছে মহান স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা এবং সত্য ও সুন্দরের জয়গান, যা বিদগ্ধ পাঠক মাত্রকেই সুন্দর ও পবিত্র এক পৃথিবী বিনির্মাণে উদ্বুদ্ধ করবে।