রবিবার, ২৩শে জুন, ২০১৮ ইং, ১০ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

শুভ নওরোয ও নতুন ইরানি বছর

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১৫, ২০১৮ 

news-image

ফিরুযে র্মিরাযাভী: ইরানের প্রাচীন ইতিহাসে নওরোয উৎসবের সূচনা ঘটে। আর বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষ প্রতি বছর ২১শে মার্চ-যখন সূর্য বিষুব রেখা অতিক্রম করে উত্তর গোলার্ধে প্রবেশ করে এবং এ গোলার্ধে বসন্ত ঋতুর সূচনা ঘটেÑনওরোয উৎসব পালন করে থাকে।

বর্তমানে বিশ্বে চলে আসা প্রাচীন উৎসবগুলোর মধ্যে নওরোয হচ্ছে প্রাচীনতম এবং সর্বাধিক আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ- জ্ঞাত ইতিহাস অনুযায়ী যা কমপক্ষে বিগত তিন হাজার বছরেরও বেশিকাল যাবত পালিত হয়ে আসছে।

নওরোয হচ্ছে মানবজাতির জন্য শান্তি, বন্ধুত্ব ও মহানুভবতার এবং প্রকৃতিকে ভালোবাসার দূত। আর এটা কেবল ইরানিদের জন্যই নয়, বরং ইরানিরা ছাড়াও আরো কয়েকটি জাতি ও গোষ্ঠী এ সুপ্রাচীন উৎসবটিকে ভালোবাসে এবং বর্ণাঢ্যতার সাথে উদ্যাপন করে থাকে।

বস্তুত নওরোয হচ্ছে নতুন করে চিন্তা করা, নতুন করে সূচনা করা ও নতুন করে গড়ে তোলার একটি সুযোগ।

নওরোয হচ্ছে মানব প্রজাতির আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার এবং বিশ্বের জাতিসমূহ যদি এ উত্তরাধিকারকে গ্রহণ করে নেয় এবং এ সুযোগটিকে কাজে লাগায় তাহলে ইরানিরা সর্বাধিক আনন্দিত হবে। কারণ, নওরোয হচ্ছে ইরানিদের পক্ষ থেকে সারা বিশ্বের জন্য শান্তি, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বাণী।

 

নওরোয হচ্ছে ইরানিদের সমৃদ্ধ সভ্যতার, জাতীয় চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের ও ইতিহাসের একটি শক্তিশালী সাক্ষ্য। নওরোয এটাই প্রমাণ করেছে যে, কীভাবে একটি জাতি তার অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে, এমনকি ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে বিপর্যয়, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, কঠিন পরিস্থিতি ও নির্যাতিত হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় দৃঢ়তাকে ধরে রাখতে পারে, শুধু তা-ই নয়, অধিকন্তু বিকাশ লাভ করতে পারে।

 

ইরানি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার পথে আগত প্রতিটি চ্যালেঞ্জের কালো অধ্যায়কে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে নওরোযের চেতনাকে কাজে লাগিয়েছে। এ চেতনা নওরোয উদ্যাপনকে কেবল একটি নতুন বছরের আগমনকে অভ্যর্থনা জানানোর মধ্যে সীমিত রাখে নি; বরং ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে তা ইরানি জাতিকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে।

নওরোয হচ্ছে সুপ্রাচীন কালের যা কিছু এখনো বর্তমান আছে তার অন্যতম। এটি হচ্ছে প্রচীন কালের কাহিনীর, বিশেষত প্রাচীন কালের বীরত্বগাথাসমূহের অন্যতম; প্রকৃতির নব যৌবন প্রাপ্তির ও মানবমনের নতুন সতেজতার পুনরাবৃত্তি।

নওরোযে বসন্তের আগমন ঘটেছে এবং বিগত বছরটি তার ভালো ও মন্দ নির্বিশেষে সমস্ত ঘটনাসহ অতীত হয়ে গিয়েছে। আর নতুন করে জন্ম নেয়া আশা-আকাক্সক্ষা নতুন নতুন সাফল্যের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে এসেছে।

বস্তুত নওরোযের উৎসব ও অনুষ্ঠান দু’টি সুপ্রাচীন কালের ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে, তা হচ্ছে বিগত বছরের সমাপ্তি ও নতুন বছরের সূচনায় নতুন জীবন।

ফারসি ‘নোওরুয’ কথাটির মানে হচ্ছে ‘নতুন দিন’। এ দিনটি ঐতিহাসিক বৃহত্তর ইরানের অন্তর্ভুক্ত দেশ ও অঞ্চলসমূহের জনগণের অর্থাৎ বর্তমান ইরান, আফগানিস্তান, আযারবাইজান ও মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলোর জনগণের জন্য নতুন বছরের সূচনার দিন। এটি প্রতি বছর বসন্তের প্রথম দিনে-অধিকাংশ বছরই ২১শে মার্চ তারিখে আগমন করে।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী নওরোযের সূচনা ঘটে সুপ্রাচীন কালেÑ এখন থেকে ১৫ হাজার বছর আগে।

অবশ্য এটা পুরোপুরি নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয় যে, নওরোযের উৎসব ঠিক কখন শুরু হয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, প্রকৃতিতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এ উৎসবের উদ্ভব ঘটেছিল। কিন্তু অনেকে এটিকে একটি জাতীয় উৎসব হিসেবে গণ্য করেছেন, আবার অনেকে এটিকে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলেও মনে করেছেন।

যরথুস্ত্রীদের মতে, ইরানি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ‘র্ফার্ভাদীন’-এর উৎপত্তি ‘ফারাভাশিশ্’ (আত্মা) থেকে। তাঁদের মতে, প্রতি বছর বছরের শেষ দশ দিনে আত্মাসমূহ বস্তু জগতে ফিরে আসে। তাই লোকেরা তাদের মৃত স্বজনদের আত্মাসমূহকে সান্ত¡না দেয়ার উদ্দেশ্যে এ দশ দিনকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। তবে বর্তমানে ইরানের ব্যাপক মুসলিম জনগণ যরথুস্ত্রীদের ন্যায় বছরের শেষ দশ দিনকে সম্মান প্রদর্শন করে না; বরং বছরের সর্বশেষ বৃহস্পতিবার কবরস্থানসমূহ যিয়ারত করে থাকে। আর তারা বিশেষ দোয়া সহকারে ইসলামসম্মত নিয়মে নওরোযকে তথা নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে ইতিহাসে নওরোয অনুষ্ঠানের বিভিন্ন রূপ পরিবর্তনের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

স্বনামখ্যাত ইরানি অভিধানবিদ মীর্যা আলী আকবার দেহ্খোদার মতে, প্রাচীন কালের ইরানিরা র্ফার্ভাদেগান (বা র্ফার্ভাদিয়ান) নামে ভোজোৎসব সহ একটি উৎসব উদ্যাপন করতো এবং এটা দশ দিন যাবত চলত।

র্ফার্ভাদেগান্ বছরের শেষে পালন করা হতো এবং দৃশ্যত এটি ছিল একটি শোক পালনের অনুষ্ঠান; এটি প্রকৃতির নতুন জীবন লাভকে স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠান উদ্যাপন ছিল না। প্রাচীন কালে এ অনুষ্ঠানটি র্ফার্ভাদিন মাসের প্রথম দিনে শুরু হতো, কিন্তু এভাবে কতদিন চলেছিল তা সুস্পষ্ট নয়। তবে শাহী দরবারে এ অনুষ্ঠানটি এক মাসব্যাপী চলত বলে জানা যায়।

কতক ডকুমেন্ট অনুযায়ী এ অনুষ্ঠানটি র্ফার্ভাদিন মাসের পাঁচ তারিখ পর্যন্ত চলত এবং এরপর মাসের শেষ পর্যন্ত বিশেষ উৎসব পালিত হতো। সম্ভবত র্ফার্ভাদিন মাসের প্রথম পাঁচ দিন ছিল সর্বসাধারণের উৎসব এবং তার প্রকৃতি ছিল জাতীয় এবং মাসের বাকি দিনগুলোর উৎসব ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের, আর তার বৈশিষ্ট্য ছিল রাজকীয়।

এতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই যে, নওরোয উৎসব একটি সুপ্রাচীন উৎসব এবং এটি ইরানিদের একটি জাতীয় উৎসব।

কয়েক হাজার বছর গত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ইরানিরা এবং আরো নয়টি দেশের জনগণ প্রতি বছর নওরোয উৎসব পালন করে থাকে। তারা তাদের বয়স, ভাষা, গোত্র, জাতীয়তা, সামাজিক অবস্থানের বিভিন্নতা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এ উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। ফলে এ উৎসবটি একটি সীমান্ত অতিক্রমকারী বা বহুজাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

নওরোয সম্পর্কিত প্রাচীনতম পুরাতাত্ত্বিক দলিলপত্রাদি যা পাওয়া গিয়েছে তা এখন থেকে আড়াই হাজার বছর আগেকারÑ হাখামানেশী যুগের। তারাই এ অঞ্চলে সর্বপ্রথম একটি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল; দক্ষিণ ইরানে যে পার্সেপোলিস সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে তা-ও তাদেরই গড়া ছিল। পার্সেপোলিসের সভ্যতার এ নিদর্শনসমূহ, যার মধ্যে বিশালায়তনের শাহী প্রাসাদ ও উপাসনালয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল তা আলেকজান্ডার কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

পারস্য সভ্যতাকে বিভিন্ন সময়ে বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করতে হয়েছে; পারস্যবাসীদেরকে গৃহযুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাসহ বহু বার কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। কিন্তু সর্বাবস্থায়ই ইরান মানবিক সভ্যতার শীর্ষ অবস্থানে থেকেছে এবং নওরোযের চেতনার ভিতর দিয়ে বহু বৈজ্ঞানিক ও সামরিক সাফল্যের অধিকারী হয়েছে।

নওরোযের এ ধরনের ঐক্যবদ্ধকারী চেতনার কারণে ইরানের পুরো ইতিহাস জুড়েই বিভিন্ন সময় নওরোয বিজাতীয় আগ্রাসনকারীদের ও জাতীয় বিরোধীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

বলা হয় যে, সম্রাট জাম্শীদ্ সর্ব প্রথম নওরোয উৎসবের প্রবর্তন করেন। এর বারো শতাব্দী পরে খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৭ অব্দে হাখামানেশী রাজবংশের মহান সম্রাট দরিউস্ তাঁর নির্মিত পার্সেপোলিস শহরে নওরোয উৎসব পালন করেন। সেদিন দর্শক-শ্রোতায় পরিপূর্ণ বিশালায়তনের শাহী হলঘরের অবজারভেটরি হয়ে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে উদীয়মান সূর্যের প্রথম আলো পতিত হয়েছিল। আর এটা ছিল এমন একটি ঘটনা প্রতি চৌদ্দশ’ বছরে যার পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে।

হাখামানেশী সম্রাটগণ পার্সেপোলিসে নওরোয উপলক্ষে তাঁদের সুবিশাল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মেহমানদেরকে অভ্যর্থনা জানাতেন। বিশাল প্রাসাদের দেয়ালগুলোতে অঙ্কিত চিত্রসমূহে এ উৎসবের দৃশ্য প্রতিফলিত হয়েছে।

আমরা জানি যে, পার্থিয়ান্ রাজবংশের শাসনামলে ইরানিরা নওরোয উৎসব পালন করত। যদ্দূর জানা যায়, তারা এ উৎসবের ক্ষেত্রেও হাখামানেশী রাজবংশের রীতিনীতিরই অনুসরণ করত। আর সাসানি রাজবংশের শাসনামলে নওরোয উদ্যাপনের জন্য এ দিনের ২৫ দিন আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হতো।

এ যুগে বছরের বারো মাসের স্মরণে শাহী দরবারে মাটি ও ইট দ্বারা বারোটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হতো। এসব স্তম্ভের মাথায় বিভিন্ন ধরনের শাক-সব্জিজাতীয় উদ্ভিদের বীজ বপন করা হতো। এসব বীজের মধ্যে থাকত গম, বার্লি, মশূরের ডাল, সীমজাতীয় উদ্ভিদ ইত্যাদি। এগুলো এমন সময়ে বপন করা হতো যে, এগুলো থেকে নওরোযের দিনে সবুজ চারা গজাতো এবং এক ধরনের সবুজের উৎসবের পরিবেশ তৈরি হতো।

এ উপলক্ষে সম্রাট জনগণকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং সকলের আগে সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ যাজক তাঁকে অভিনন্দন জানাতেন। তাঁর পরে সরকারি কর্মকর্তাগণ সম্রাটকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসতেন। প্রত্যেকেই সম্রাটকে একটি উপহার দিতেন এবং সম্রাটের কাছ থেকে উপহার লাভ করতেন।

এভাবে উপহার প্রদান ও উপহার গ্রহণের ধারাবাহিকতা একাধারে পাঁচ দিন যাবত চলত। এ ক্ষেত্রে একেকটি দিন একেক ধরনের পেশার লোকদের জন্য নির্ধারিত থাকত। এরপর আসত ষষ্ঠ দিনÑ যেদিনকে বৃহত্তর নওরোয বলা হতো। এদিনে সম্রাট বিশেষ বিশেষ লোকদেরকে অভ্যর্থনা জানাতেন। এদিনে তিনি শাহী পরিবারের সদস্যদেরকে এবং তাঁর বিশেষ পারিষদবর্গকে অভ্যর্থনা জানাতেন। এছাড়া এ উপলক্ষে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হতো এবং তাতে ছোটখাট অপরাধের জন্য শাস্তিপ্রাপ্তদের দণ্ড মওকুফ করে দেয়া হতো।

নওরোয উপলক্ষে তৈরি করা স্তম্ভগুলো ষোলতম দিনে অপসারণ করা হতো এবং এভাবে নওরোযের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটত। দেশের সাধারণ জনগণও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এ উৎসব উদযাপন করত।

ইরানে ইসলামের আগমনের পর প্রথম দুই শতাব্দী কালে সামাজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের কারণে নওরোয উৎসব তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। পরে উমাইয়াহ্ খলীফারা নওরোয উৎসবকে উপহারাদি গ্রহণের মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধির একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে মনে করে পুনরায় নওরোয উৎসবের প্রবর্তন করে।

তবে শাসকদের এ ধরনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও ইরানের সাধারণ জনগণ সব সময়ই, বিশেষ করে বৈদেশিক শাসনে থাকাকালে, তাদের নওরোয উৎসবকে ধরে রাখার চেষ্টা করে।

উমাইয়াহ্ শাসকরা তাদের অন্ধ গোত্রপ্রীতির কারণে কুখ্যাত ছিল। তারা তাদের বিজিত অঞ্চলগুলোর ঐতিহ্য সমূহ ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সমূহ বিলুপ্ত করার জন্য চেষ্টার ক্ষেত্রে কোনোই ত্রুটি করে নি। তাই তারা ইরানিদের নওরোয উৎসব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বীয় অর্থভাণ্ডারকে সমৃদ্ধতর করার চেষ্টা করে। ঐতিহাসিক জর্জ যেইদান্ লিখেছেন যে, বনি উমাইয়াহ্র শাসনামলে নওরোয উৎসব পালনের অনুমতি লাভের জন্য ইরানিরা প্রতি বছর পাঁচ থেকে দশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা সরকারি তহবিলে জমা দিতে বাধ্য হতো। তবে এভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদানে বাধ্য হওয়া সত্ত্বেও ইরানিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নওরোয উৎসব পালন করত। উমাইয়াহ্ শাসকরা সব সময়ই তাদের ধনসম্পদের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধতর করার এবং তাদের আধিপত্যকে অধিকতর মজবুত করার চেষ্টা করত, যদিও বাহ্যত তারা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইসলামের আশ্রয় গ্রহণ করত।

বস্তুত অতীতে নওরোয উৎসব ছিল এমনই জমকালো এবং এ উপলক্ষকে এমনই পবিত্র গণ্য করা হতো যে, এমনকি নিষ্ঠুরতম শাসকরাও এ উপলক্ষে বন্দি ও অপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করত। যরথুস্ত্রীদের কাছে নওরোযের মর্যাদা যে কত বেশি ছিল তা এ দিনটি সম্পর্কে তাদের ধর্মীয় সূত্রে বিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ থেকেই বুঝা যায়; বলা হয়, নওরোয সম্পর্কে আর্হু মায্দা (স্রষ্টা) বলেন : ‘র্ফার্ভাদিনের (প্রথম) দিনে এমনকি দোযখবাসীরাও এ পার্থিব জগতে ফিরে আসার ও তাদের পরিবারের লোকদের কাছে আসার সুযোগ লাভ করে।’

নওরোয অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এ উপলক্ষে বিশেষ কতগুলো জিনিস দিয়ে একটি দস্তরখান সাজানো হয়। এতে এমন সাতটি জিনিস রাখা হয় যেগুলোর নামের প্রথম বর্ণ হয় ফারসি ‘সীন্’ হরফ; এ কারণে এটিকে ‘হাফ্ত্ সীন্’ (সাত সীন্) বলা হয়ে থাকে। এতে সাধারণত সাত ধরনের কৃষিজাত দ্রব্য রাখা হতোÑ যেগুলোকে ইসলাম-পূর্ব যুগে প্রাণসঞ্জিবনী সাতটি উপকরণের প্রতিনিধিত্বকারী বলে গণ্য করা হতো। পরবর্তী কালে এতে ধাপে ধাপে পরিবর্তন সাধিত হয়।

বর্তমানেও হাফ্ত্ সীনের দস্তরখান সাজানো হয়, তবে তার উপকরণসমূহে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং এতে ব্যবহৃত সাত উপকরণের প্রাচীন কালীন উপকরণাদির সাথে তেমন একটা মিল নেই। বর্তমানে হাফ্ত্ সীনের দস্তরখানে প্রাচীন কালের মতোই প্রবৃদ্ধির নিদর্শন হিসেবে গম বা বার্লি রাখা হয়। সেই সাথে যোগ করা হয় কাচের আধারে রক্ষিত মাছÑ যা সহজেই সংগ্রহ করা যায়। তেমনি পানিও রাখা হয়। তাছাড়া আগুনের মতো উপকারী জিনিসের নিদর্শনস্বরূপ মোমবাতি জ্বালানো হয়। বর্তমানে তাতে আয়নাও রাখা হয়, তবে এটা কখন কীভাবে যুক্ত হয় তা জানা যায় নি।

প্রাচীন কালে হাফ্ত্ সীনের দস্তরখানে ব্যয়বহুল দ্রব্যাদি রাখা হতো এবং তার কতক দ্রব্য হতো চকচকে ধাতবের তৈরি। অবশ্য এমনটা মনে করা ঠিক হবে না যে, প্রতিটি পরিবারই তার হাফ্ত্ সীনের দস্তরখানে অভিন্ন জিনিস রাখত। বর্তমানে যরথুস্ত্রীরা তাদের হাফ্ত্ সীনের দস্তরখানে আয়নার সামনে জ্বালানো মোমবাতি রাখে। অতীতে তাদের দস্তরখানে সব সময়ই মদ রাখা হতো। যেহেতু ইসলামে মদ হারাম সেহেতু বর্তমানে তার পরিবর্তে ভিনের্গা রাখা হয়।

হাফ্ত্ সীনের দস্তরখানের অন্যতম উপাদান হচ্ছে ডিম। কারণ, ডিম হচ্ছে পৃথিবীর উর্বরতা ও জন্মদানে সক্ষমতার প্রতীক। রসূন রাখা হয় এতে নিহিত বিবিধ কল্যাণের কারণে। বর্তমানে সামানু নামক এক ধরনের বাদামি রঙের আটাজাতীয় খাদ্যদ্রব্যও রাখা হয়। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য, এ কারণে এটি ভোজোৎসবেও রাখা হয়। ধন-সম্পদ ও উন্নতি-অগ্রগতির নিদর্শন হিসেবে ধাতব মুদ্রা, ফলমূল ও বিশেষ ধরনের খাদ্য-উপকরণও রাখা হয়।

ইরানের স্বনামখ্যাত বিশ্ববিশ্রুত মহাকবি র্ফেদৌসী তাঁর শাহ্নামা কাব্যগ্রন্থে নওরোয উৎসবের কথা উল্লেখ করেছেন ও এর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :

‘জাম্শীদের প্রতি যখন জনগণের মণিমুক্তা-রত্নাদি প্রবাহিত হতো/ তারা তাঁকে ফরিয়াদ করে জানাতো যে, নতুন বছর আলোক বিক্ষেপণ করেছে/ র্ফার্ভাদিন্ র্হমূযের এ সমুজ্জ্বল নতুন বছরে/ ব্যথা-বেদনা থেকে শরীরগুলো মুক্ত হতো, হৃদয়গুলো মুক্ত হতো ভয়-ভীতি থেকে?/ নতুন বছরে যেন নতুন বাদশাহ্, তাই পৃথিবী দান করেছে সমুজ্জ্বলতা/ তিনি সমাসীন হয়েছেন সমুজ্জ্বলতা সহকারে সিংহাসনে আলোকিত দিনে।’

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ইউনেস্কো ২০১০ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি মানবজাতির অন্যতম অবিস্মরণীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে আন্তর্জাতিক নওরোয দিবসকে তালিকাভুক্ত করেছে।

*লেখিকা ইরান রিভিউ ডট্ অর্গ্-এর ডেপুটি এডিটর।

 

অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী