শুক্রবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শিশুদের সাথে ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১১, ২০১৬ 

news-image

আল্লাহতায়ালা শিশুদের সাথে প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যেমন- আল্লাহর এক নবী হযরত ইসমাইল (আ.) সম্পর্কে  বলেছেন, “স্মরণ করো, এই কিতাবে উল্লেখিত ইসমাইলের কথা। সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল ও নবী।” (সূরা মরিয়ম : ৫৪)।
একজন ধর্মপ্রাণ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ তাঁর কৃত যে কোন প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা রক্ষা করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদেরকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সব ধরনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার আদেশ দিয়ে বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূরণ করবে।” (সূরা মায়িদা : ১)।
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ এবং যারা নিজেদেরকে নামাজে যতœবান থাকে।” (সূরা মুমিনুন : ১ ও ৯)। পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে, “এবং প্রতিশ্রুতি পালন করবে; প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সূরা বনী ইসরাইল : ৩৪)
কোন ব্যক্তি যদি তার কৃত ওয়াদা পূরণ না করে তাহলে তার উপর থেকে অন্যের আস্থা বিনষ্ট হয়। কোন সমাজে বা সামাজিক জীবনে এমনটি ঘটলে ঐ সমাজ বা সামাজিক জীবনের জন্য তা হবে আত্মঘাতী।

প্রতিশ্রুতি পূরণ শিশুদের আস্থা অর্জনের উপায়
হে পিতা-মাতাগণ! আপনাদের সন্তানদের দীপ্তিমান চক্ষুযুগল আপনাদের আচরণ প্রত্যক্ষ করে এবং আপনারা যে সব শব্দ উচ্চারণ করেন, সন্তানদের কান তা শুনতে পায়। ছোট ছোট নিষ্পাপ বাচ্চারা আজকে যে পরিবেশে গড়ে উঠছে এবং তাদের সাথে যে ব্যবহার করা হচ্ছে আগামী দিনে তারই প্রতিফলন ঘটবে তাদের জীবনে।
তাদের দৃষ্টিতে আপনাদের চেয়ে অধিক মহৎ ও অধিক জ্ঞানী আর কেউ নেই। তারা আপনাদের উপর আস্থা রাখে। সেই সাথে আপনারা যা করেন এবং যা বলেন সে ব্যাপারেও তারা মনোযোগী থাকে।
পিতা-মাতাকে তাদের সন্তানদের সাথে সকল কাজ ও আচরণে সৎ হতে হবে এবং তাদের সাথে কৃত সকল প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। শিশুরা যখন বুঝবে যে, তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে, তখন তারা তাদের দুষ্টুমি বন্ধ করবে। শিশুরা মনে মনে ভাবে মিথ্যা বলা, রাগান্বিত ও মেজাজী হওয়া, জিদ করা বা কথা ভঙ্গ করা, কোন নৈতিক ত্রুটি নয়। তাই এর বিপরীতে পিতা-মাতাকে সৎ ও প্রতিশ্রুতি পূরণকারী হতে হবে এবং কখনই মিথ্যা বলা চলবে না। মহানবী (সা.) জনসাধারণকে তাদের সন্তানদের ভালবাসতে, তাদের সাথে সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদেরকে দেয়া সকল প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে বলেছেন। (তাফসিল ওয়াসা’ইলুস শিয়া, তৃতীয় খ-, পৃষ্ঠা-১৩৪)
বাট্রান্ড রাসেল বলেছেন, “যে সব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের সাথে সদাচারণ করেন, তারাই তাদের আস্থা অর্জন করেন। শিশুরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, বড়রা তাদেরকে যা বলে তা সব সত্য এবং সত্যিকার অর্থেই বড়রা শিশুদেরকে যা বলেছে তা সত্য বলে যদি তারা বুঝতে পারে, তাহলে খুব সহজেই বড়দের উপর আস্থাশীল হবে।
কথিত আছে যে, একবার এক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এক সরকারী কর্তৃত্বশালী ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিল ঐ কর্তৃত্বশালী ব্যক্তির এক পুত্র। রাষ্ট্রদূত ছেলেটিকে বলেছিলেন, তিনি তার হাতঘড়ির সোনার চেইনটি তাকে দিয়ে দেবেন। কিন্তু রাষ্ট্রদূত তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেননি।
ছেলেটি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রদূত বুঝতে পারেন না ছেলেটি কেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরে ছেলেটির পিতা এসে বলেন, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন এটি দেখার জন্যই সে দাঁড়িয়ে আছে। কেননা কেউ প্রতিশ্রুতি দিল অথচ তা পূরণ হলো না, এমনটি সে কখনো দেখেনি। রাষ্ট্রদূত এই মৃদু সমালোচনায় লজ্জাবোধ করলেন।
বাট্রান্ড রাসেল বলেছেন, পিতা-মাতা বা বড়দের অত্যন্ত খারাপ একটি মনোভাব হলো শিশুদের শাস্তি দেয়ার হুমকি দেয়া। অথচ আপনি নিজেই প্রকৃতপক্ষে তাকে সাজা দিতে আগ্রহী নন।
ড. বেলার্ড তাঁর এক গ্রন্থে বলেছেন, পরিবর্তনীয় কঠোরতা কখনও কাউকে কোন কিছুতে ভীতু বা হুমকিগ্রস্ত করে না। আপনি যদি কোন কঠোরতা দেখান তাহলে তা বজায় রাখুন।

শিশুদের সাথে বিতর্ক করবেন না এবং তাদের সাথে নিজস্ব ভাষায় কথা বলুন
মহানবী (সা.) বলেছেন, শিশুদের সাথে এমনভাবে কথা বলা উচিত যাতে তারা বুঝতে পারে। শিশুদের সাথে আচরণে সহনশীল ও দয়াপরবশ হও এবং তাদেরকে বুঝতে চেষ্টা করো।
রুশো বলেন, শিশুদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতে হবে তাদের ধারণা ও বোধগম্যতার মধ্যে থেকে। অন্যথায় তারা আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন লক পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুদের সাথে এমন সব যুক্তি সহকারে কথা বলতে হবে যা নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনাবলীর মতো সহজ। রুশো এ ধরনের পরামর্শ নাকচ করে দিলেও তা প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে বলে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, যে শিশুর সামনে বেশী যুক্তি উপস্থাপন করে তার মতো বোকা পৃথিবীতে নেই।
মানবকুলের মানসিক প্রতিভা, যুক্তি-তর্ক, অন্যান্য প্রতিভার সমন্বয়ে সর্বশেষ যে ধারণা গড়ে ওঠে তা অধিক কঠিন। তাই যুক্তি-তর্ক মানুষের প্রতিভার বিকাশ ঘটায় এমনটি ধারণা করা পুরোপুরি সঠিক নয়।
শিশুদের গড়ে তোলার সর্বোত্তম শিক্ষা হচ্ছে তাদেরকে যুক্তিগ্রাহ্য করা। কিন্তু এমনভাবে কথা বলা, যাতে তারা বুঝতে পারে।” (তাফসির ওয়াসা’ইলুস শিয়া ৩য় খ-, পৃষ্ঠা-৩১৫)
কথিত আছে যে, একদা মহানবী (সা.) তাঁর কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর দৌহিত্র ছোট বালক ইমাম হোসাইন (আ.) কে তাঁরই বয়সী একটি মেয়ের সাথে ছুটাছুটি করতে দেখলেন। মহানবী (সা.) তাঁর কাছে গেলেন। কিন্তু তিনি এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে লাগলেন। মহানবী (সা.)ও শিশুসুলভ দৌড় দিয়ে তার দৌহিত্রকে হাসিয়ে তুললেন। তিনি তাঁর একটি হাত শিশু হোসাইনের থুতনির নীচে এবং একটি তার মাথার উপর রেখে বলেন, “আমি হোসাইন থেকে এবং হোসাইন আমা থেকে। আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং তিনি আল্লাহকে ভালোবাসেন।” (আল খুলকুল কামিল, দ্বিতীয় খ-, পৃষ্ঠা-১৮৩) মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, “যারা তাদের জ্ঞানের বাইরে জনসাধারণের সাথে কথা বলে, তাদের সে সব কথা তাদের কারো কারো কাছেই বিপরীতার্থক হতে পারে।”