মঙ্গলবার, ২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

English

শহীদ-সম্রাটের শাহাদাতের চেহলাম বা চল্লিশা পালনের তাৎপর্য

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ৮, ২০২০ 

news-image

বিশে সফর ইমাম হুসাইন (আ)’র অনন্য শাহাদতের চল্লিশা বা চেহলাম-বার্ষিকী। শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ) এমন এক বিশাল ব্যক্তিত্বের নাম যে কোনো নির্দিষ্ট স্থান, কাল বা পাত্রের সাধ্য নেই তাঁকে ধারণ করার।

এ এমন এক প্রদীপ দিনকে দিন বিশ্বজুড়ে বাড়ছে যার নুর ও বহুমুখী চৌম্বকীয় আকর্ষণ। ইমাম হুসাইন (আ) সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা) বলেছেন, হুসাইন আমার থেকে এবং আমি হুসাইন থেকে। তিনি আরও বলেছেন, হুসাইন আমার সন্তান,আমার বংশ ও মানবজাতির মধ্যে তাঁর ভাই হাসানের পর সে-ই শ্রেষ্ঠ। সে মুসলমানদের ইমাম, মুমিনদের অভিভাবক, জগতগুলোর রবের প্রতিনিধি বা খলিফা, … সে আল্লাহর হুজ্জাত বা প্রমাণ পুরো সৃষ্টির ওপর,সে বেহেশতের যুবকদের সর্দার, উম্মতের মুক্তির দরজা। তাঁর আদেশ হল আমার আদেশ। তাঁর আনুগত্য মানে আমারই আনুগত্য করা। যে-ই তাঁকে অনুসরণ করে সে আমার সাথে যুক্ত হয় এবং যে তাঁর অবাধ্য হয় সে আমার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।

মহানবী আরও বলেছেন, নিশ্চয়ই হুসাইন বিন আলীর মূল্য আকাশগুলো ও জমিনগুলোর চেয়ে বেশি এবং নিশ্চয়ই তাঁর বিষয়ে আল্লাহর আরশের ডান দিকে লেখা আছে : হেদায়াতের আলো, নাজাতের নৌকা, একজন ইমাম, দুর্বল নন, মর্যাদা ও গৌরবের উৎস, এক সুউচ্চ বাতিঘর এবং মহামূল্যবান সম্পদ। (মিজান আল হিকমাহ নামক হাদিস গ্রন্থ)

ইমাম হুসাইন (আ)’র জন্মের পর এই নবজাতক শিশু সম্পর্কে বিশ্বনবী বলেছিলেন, ‘হে ফাতিমা! তাঁকে নাও। নিশ্চয়ই সে একজন ইমাম ও ইমামের সন্তান। সে নয়জন ইমামের পিতা। তারই বংশে জন্ম নেবে নৈতিক গুণ-সম্পন্ন ইমামবৃন্দ। তাঁদের নবম জন হবেন আল-কায়েম তথা মাহদি।’ ইমাম হুসাইনের মহাবিপ্লবের কারণে ইসলাম বিকৃতি ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বলেই মহানবী (সা) নিজেকে তাঁর নাতির থেকে বলে সম্মান জানিয়েছেন।

ইমাম হুসাইনের জন্য শোক প্রকাশ প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সা) বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক মু’মিনের হৃদয়ে হুসাইনের শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হবে না। তিনি আরও বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত চোখ কিয়ামতের দিন কাঁদতে থাকবে, কেবল সেই চোখ ছাড়া যা হুসাইনের বিয়োগান্ত ঘটনায় কাঁদবে, ঐ চোখ সেদিন হাসতে থাকবে এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ ও বিপুল নেয়ামত দান করা হবে।’

ইসলামের শত্রুরা মহানবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইতকে ও তাঁদের পবিত্র নামকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল চিরতরে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে এর উল্টো। কারণ, মহান আল্লাহ নিজেই তাঁর ধর্মের নুরকে রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন এবং এই আলোকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা কাফির-মুশরিকদের কাছে তা যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন। বর্তমান যুগে কোটি কোটি শোকার্ত মানুষ ইমাম হুসাইনের চেহলাম-বার্ষিকী পালন করছেন।

ইমাম জাফর আস সাদিক (আ) বলেছেন, ‘আমাদের ওপর তথা মহানবীর আহলে বাইতের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে তার কারণে যে শোকার্ত তার দীর্ঘশ্বাস হল তাসবিহ এবং আমাদের বিষয়ে তার দুশ্চিন্তা হল ইবাদত।… হাদিসটি বর্ণনা শেষে তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই এ হাদিসটি স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখা উচিত।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সপরিবারে শাহাদাত বরণের জন্য শোক ও মাতম করার মূল প্রোথিত রয়েছে ইতিহাসের গভীরে। মহান আম্বিয়ায়ে কেরাম, এমনকি আসমানের ফেরেশতাকুলও নিজ নিজ পন্থায় এ শহীদ ইমামের জন্যে মাতম করেছেন। রেওয়ায়েত অনুযায়ী আশুরার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরে চারদিকে আঁধার নেমে আসে এবং কারবালার আকাশ কালো ধুলোয় ভরে যায়। আর সেখানকার নুড়ি পাথরগুলো, এমনকি পানির মাছগুলো চল্লিশ দিন ধরে ইমামের শোকে ক্রন্দন করতে থাকে। তারিখে ইবনে আসিরের তৃতীয় খণ্ডের ২৮৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মুসিবতে আকাশ চল্লিশ দিন ধরে ক্রন্দন করে।’

হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র জন্য বিশ্বনবী (সা) ছাড়াও হযরত আদম (আ) ও হযরত জাকারিয়া নবীর মত মহান নবীদের আগাম ক্রন্দনের কথা জানা যায় ইসলামী বর্ণনায়। বলা হয় বিশ্বনবী (সা)’র একই চাদরের নীচে জড়ো হওয়া তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের নাম জানতে চেয়েছিলেন হযরত জাকারিয়া নবী। মহান আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাইল ফেরেশতা তাঁদের নাম শিখিয়ে দেন এই মহান নবীকে। তিনি যখন হযরত আলী, হযরত ফাতিমা ও হযরত ইমাম হাসানের নাম উচ্চারণের পর হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র নাম উচ্চারণ করছিলেন তখন অজানা এক শোকে তাঁর গলা প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়ছিল এবং তিনি কাঁদতে থাকেন। এরপর একদিন জাকারিয়া (আ) ইবাদতের ঘরে ইবাদত ও প্রার্থনার পর এই কান্নার রহস্য জানতে চান মহান আল্লাহর কাছে। মহান আল্লাহ তাঁকে ওহিযোগে কারবালার সেই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো জানিয়ে দেন। হযরত জাকারিয়াকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অক্ষরের মাধ্যমে জানানো হয় পুরো ঘটনা। অক্ষরগুলো হল: ‘কাফ হা ইয়া আইন ও সোয়াদ’ যা সুরা মারিয়ামেরও প্রথম আয়াত। কাফ অর্থ কারবালা, হা অর্থ শেষ নবীর সন্তানের শাহাদাত, ইয়া অর্থ ইয়াজিদ, আইন অর্থ ইমাম হুসাইনের পরিবারবর্গের তৃষ্ণা ও ক্ষুধা এবং সোয়াদ হচ্ছে ইমামের সবর বা ধৈর্য।

হযরত জাকারিয়া (আ) কারবালার শোকাবহ ঘটনাগুলো জানতে পেরে এতোই ব্যথিত হন যে তিনি কয়েক দিন ধরে ইবাদতের ঘর থেকে বের হননি এবং লোকজনকেও ওই কয়েক দিনের জন্য নিষেধ করে দেন তাঁর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে। তিনি ইমাম হুসাইনের শাহাদতের স্মরণে কান্না করে মহান আল্লাহর কাছে বলেন: হে আল্লাহ আপনি আপনার নবী মুহাম্মাদ মুস্তাফার হৃদয়কে পরীক্ষা করবেন মুসিবত ও শোকের মাধ্যমে যাতে বিশ্বের জনগণের কাছে ইসলামের নীতিমালা ও বিধান ছড়িয়ে দেয়া যায়! ইমাম আলী আর ফাতিমাও শোক প্রকাশ করবেন ও ইমাম হুসাইনের শাহাদতের কারণে তাঁরা কালো পোশাক পরবেন।

মোটকথা ইমাম হুসাইন (আ.) এর জন্য শোক পালন একটি প্রাচীন রীতি এবং আল্লাহ্ ও রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে প্রবর্তিত বিষয়। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইমাম হুসাইনের ঠোঁটে এবং গলায় চুম্বন দিতেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বলতেন :

‘আমি তলোয়ারের জায়গাগুলোতে চুম্বন করছি।’

ইবনে আসিরের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আলীও মাতম ও ক্রন্দন করেছেন। এছাড়া ফাতিমা যাহ্‌রা মহানবীর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ইমাম হুসাইনের দোলনা দোলানোর সময় থেকে নিজের শাহাদাতের মুহূর্ত পর্যন্ত সবসময় হুসাইনের মজলুম হওয়া ও নির্মমভাবে শহীদ হবার কথা স্মরণ করে কাঁদতেন। আর কন্যা যাইনাবকে উপদেশ দিতেন যেন এ দুঃসময়ে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গী হন।

ইমাম হুসাইন (আ) নিজেও একাধিকবার কারবালার পথ অতিক্রম করার সময় মহা বিপদ সংঘটিত হওয়া মর্মে তাঁর প্রিয় নানা ও পিতার ভবিষ্যদ্বাণীর আলামতগুলো দেখে কেঁদেছিলেন। আশুরার রাতে সঙ্গী-সাথী ও পরিবারবর্গের মাঝে শোক অনুষ্ঠান করেন, সন্তানদের থেকে বিদায় নেন। তিনি বনি হাশিমের একেক জন যুবকের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং কাঁদছিলেন।

ইমাম হুসাইন (আ) পবিরারবর্গকেও বলেছিলেন তাঁর জন্য কাঁদতে। বিশেষ করে বোন যাইনাব ও প্রাণপ্রিয় পুত্র যাইনুল আবেদীন (আ.)-কে নির্দেশ দেন তাঁর শাহাদাতের পর যেন বন্দী অবস্থায় চলার পথে যেখানেই যাত্রাবিরতি করা হবে, সেখানে তাঁর মজলুম হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয় এবং জনগণের বিশেষ করে শামের জনগণের কানে তা পৌঁছানো হয়।

এছাড়াও ইমাম হুসাইন (আ) তাঁর অনুসারীদের আশুরার শোক ও ব্যাপক কান্নাকাটি বা মাতম অনুষ্ঠান করার মাধ্যমে তা ভবিষ্যতের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার নির্দেশ দেন। শোকাশ্রু বিসর্জন করা এবং আশুরার দিনে তাঁর মুসিবতের কথা স্মরণ করে শোক প্রকাশ বা আযাদারি পালন করার মধ্যে যে বার্তা নিহিত রয়েছে, সেটা বুঝাতে তিনি বলেছেন :

‘আমি অশ্রুর শহীদ, আমি নিহত হয়েছি চরম কষ্ট স্বীকার করে, তাই কোন মুমিন আমাকে স্মরণ করলে ক্রন্দন না করে পারে না।’ (বাজনা)

তাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন ও শোক প্রকাশের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসের ভেতরে এবং বিভিন্ন রেওয়ায়েত মোতাবেক এর অশেষ প্রভাব ও বরকত রয়েছে। তার মধ্যে উৎকৃষ্টতম প্রভাব হল তা আমাদের অন্তরগুলোর মরিচা দূর করে, আমাদের জীবনকে উন্নত করে এবং সত্যের পথে অকুতোভয় ও বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দুর্নিবার মানসিকতা দান করে। ফলে আল্লাহ্‌র রহমত সকলের ওপরে অবারিত হয়। শোকের এ শক্তি কত জালিমকে উৎখাত করেছে, কত মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে, ইসলামকে কতবার যে ধ্বংসের কবল থেকে উদ্ধার করেছে তা কেবল ইতিহাসই বলতে পারে। তাই ইমাম যাইনুল আবেদীন (আ.) তাঁর পিতার শাহাদাতের পর ইবনে যিয়াদের কাছে যেসব দাবি তুলে ধরেন তার অন্যতম ছিল, একজন বিশ্বাসভাজন লোককে কাফেলার সাথে পাঠাও যাতে সে পথিমধ্যে যেসব জায়গায় যাত্রা বিরতি করা হবে, সেখানে শোক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে দেয়। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় সেদিন দুশমন এ শর্তটি মেনেও নেয় এবং নোমান ইবনে বাশীরকে কাফেলার সাথে পাঠায়।

কাফেলা যেখানেই যাত্রাবিরতি করছিল, নোমান সেখানেই তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছিল যাতে ইমাম-পরিবার শোক অনুষ্ঠান করতে পারে। সেখানে ইমাম হুসাইনসহ কারবালার শহীদদের কঠিন বিপদ ও দুর্দশার কথা বর্ণনার মাধ্যমে একদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইমাম পরিবার সম্পর্কে সহানুভূতি সৃষ্টি, অপরদিকে জালেম ইয়াযিদ ও তার দোসরদের মুখোশ খুলে দিতে সক্ষম হন। স্বয়ং নোমান ইবনে বাশীর, যে নিজে ইমাম পরিবারকে মনেপ্রাণে ভালবাসত, দীর্ঘ এ যাত্রাপথে ইমাম যাইনুল আবেদীন ও হযরত যাইনাবের বয়ান শুনে উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে।

এরপর কাফেলা যখন মদীনায় পৌঁছে, তখন নোমান সবার আগে ছুটে গিয়ে মদীনায় প্রবেশ করে এবং প্রচণ্ডভাবে ক্রন্দন করতে করতে একটি কাসিদার মাধ্যমে আহলে বাইতের মুসিবতের কথা মদীনার জনগণের কাছে বর্ণনা করে। কাসিদাটির অংশবিশেষ নিম্নরূপ : ‘হে মদীনাবাসী! তোমাদের জন্য আর কোন থাকার জায়গা রইল না। কারণ, হুসাইন কতল হয়েছেন। গায়ের জামাগুলো ছিঁড়ে ফেল, কেননা, তাঁর পবিত্র দেহ কারবালার ময়দানে টুকরো টুকরো হয়েছে। আর তাঁর কাটা মস্তক এখন বর্শার মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে।’ মদীনার জনগণ এ খবর শুনে নিজ নিজ ঘর ছেড়ে ছুটে বের হয়ে উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে এবং মদীনার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে এমন এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় যা মদীনা কোনদিন দেখেনি। সকলে পাগলপারা হয়ে নবী পরিবারের কাফেলার দিকে ছুটে যায়। এ খবর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। মুমিনের ঘরে ঘরে শোক-প্রকাশ এবং কান্নার রোল পড়ে গেল। একটি তাঁবু বসানো হয় ইমাম যাইনুল আবেদীন (আ.)-এর জন্য। শোকার্ত মানুষ তাঁকে ঘিরে রেখেছিল, সান্ত্বনা দিচ্ছিল এবং তাঁর হাতে-পায়ে ভক্তিভরে চুম্বন করছিল।

মদিনার পুরুষরা উচ্চস্বরে কাঁদছিল ও ফরিয়াদ তুলছিল। আর নারীরা তাদের মুখ, বুক চাপড়াচ্ছিল। কাফেলা যখন শহরে প্রবেশ করে, তখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ইয়াতিম বাচ্চাগুলোকে মদীনার নারীরা বুকে টেনে নেন। আর পুরুষরা ইমাম যাইনুল আবেদীনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।

ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পর বিখ্যাত সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ আল আনসারী কারবালা প্রান্তরে যান। সেখানে তাঁর বুকফাটা ক্রন্দন এবং সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইনের কবর-পার্শ্বে তাঁর আকুলতার ভাষাগুলো যে কোন মুমিনের অন্তরে শোকের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বৃদ্ধ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানো এ মহান সাহাবী তাঁর প্রিয় ইমাম হুসাইনের কবরে আছড়ে পড়ে তিনবার ‘ইয়া হুসাইন’ বলে ডাক দেন এবং অজ্ঞান হন। এরপর তিনি পরম ভক্তির সাথে হুসাইন (আ.)-এর স্মৃতিগুলো স্মরণ করতে থাকেন। আর এ ঘটনার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলোও উচ্চারণ করতে থাকেন।

এভাবে শোক ও মাতমের মজলিসের বিস্তার ঘটতে ঘটতে গোটা দুনিয়া জুড়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর স্মরণে শোক ও মাতম এক আদর্শে রূপ নেয়। এ শোক পালনের ফলে সত্য সবসময় সমহিমায় হতে থাকে উদ্ভাসিত। ইমাম হুসাইনের প্রতি অনুরাগ ও প্রেম মানুষকে যোগায় মহাবিপ্লব করার শক্তি। শোক থেকে পাওয়া এ শক্তি অর্জনের ফলে সংগ্রামীরা আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। প্রকৃত হুসাইন প্রেমিক সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠাকে নিজ জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ফলে এ লক্ষ্যে নিজের জীবন ও নিজ পরিবার-পরিজনকে উৎসর্গ করাটাও তার জন্য খুবই সহজ হয়ে পড়ে। আসলে সমাজে এমন বিপ্লবী সংস্কৃতি চালু হওয়ার ফলেই ধর্মদ্রোহী উমাইয়্যারা ও ইয়াযিদরা ধর্মব্রতী সেজে আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। হুসাইনী হয়ে বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি-মাখা এসব শোক অনুষ্ঠান এমন সব অসাধ্য সাধনের প্রেরণা যুগিয়েছে যে, স্বীকার করতে হবে, ইসলামের ইতিহাসে অনেক নজিরবিহীন বীরত্ব-গাঁথার জন্ম হয়েছে এখান থেকেই। ইরানের ইসলামী বিপ্লব, ৮ বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধে ও দখলদার ইসরাইলের মোকাবেলায় লেবাননের হিযবুল্লাহর সাফল্যও এক্ষেত্রে আধুনিক যুগে হুসাইনি আদর্শেরই সুফল।

মুমিনদের আত্ম পরিচয় খুঁজে পাওয়ার এবং উন্নত মনোবৃত্তির সব শিক্ষা জড়িয়ে আছে আশুরা বিপ্লবের শোক মাতমের মধ্যে। যতদিন এ মহান ইমামের মহান আত্মত্যাগের স্মরণে অন্তরে ভক্তি ও ভালবাসা থাকবে, আর জিহ্বায় থাকবে তার সাহসী প্রকাশ, ততদিন এ রক্তাক্ত শাহাদাতের বাণী সমুন্নত ও চিরন্তন থাকবে, পৌঁছে যাবে পরবর্তী বংশধরদের কাছে।

সবাইকে আবারও গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে শেষ করছি আজকের এ আলোচনা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আরবাঈন পালনের উদ্দেশ্য তথা ইমাম হুসাইনের আদর্শের অনুসারী হওয়ার তৌফিক দিন। পার্সটুডে