মঙ্গলবার, ১৮ই জুন, ২০১৯ ইং, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শহীদ রাজাই- ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ৬, ২০১৪ 

news-image

৩০ আগস্ট হচ্ছে ইরানের শহীদ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ আলী রাজাই এর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদের চক্রান্তে প্রেসিডেণ্ট ভবনে এক বোমা বিস্ফোরণে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

বিভিন্ন গুণের অধিকারী প্রেসিডেণ্ট রাজাই পার্থিব এবং শয়তানি লোভলালসা থেকে নিজেকে মুক্ত করে তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল আধ্যাত্মিকতা, বিনয়, আন্তরিকতা এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তিনি জনগণের মধ্য থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপটে এসেছিলেন। ধৈর্য, সহনশীলতা, অধ্যাবসায়, নিরলস প্রচেষ্টা, দৃঢ় সংকল্প এবং মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণে তিনি ফুটপাতের সাধারণ ফেরিওয়ালা থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। তিনি বহু কষ্ট, সমস্যা এবং বাধার মোকাবিলা করেছেন। তিনি কখনো কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে থেমে পড়েননি।

ইসলামের এই মহান সৈনিক শহীদ রাজাই ১৯৩৩ সালে কাজভিনের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৪ বছর তখন তিনি পিতৃহারা হন। তাঁর মা অনেক কষ্টে তাঁকে লালন-পালন করেন। প্রথমে তিনি বাড়ির নিকটবর্তী একটি স্কুলে ভর্তি হন এবং ইলিমেণ্টারি গ্রেড পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। পরে তাঁর চাচার দোকানে চাকরি নেন এবং এক বছর পর তেহরান চলে যান। সেখানে তিনি একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ফেরিওয়ালার চাকরি নেন। তিনি সেই দোকানের জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি করতেন। 

এক সময়ে তিনি বিমান বাহিনীতে ভর্তি হন। বিমান বাহিনীতে প্রবেশের কয়েকমাস পরই তিনি ফেদাইনে ইসলামের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরে এতে যোগ দেন এবং এর গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। বাজারে কাজ করার সময় রাজাই নৈশকালীন ইসলামী শিক্ষা ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন শহীদ আমানী। বিমান বাহিনীতে থাকাকালেও তিনি প্রচুর পড়াশুনা করতেন। ১৯৫৫ সালে বিশেষ কারণে তিনি বিমান বাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি তেহরানের টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পরীক্ষা দেন এবং পাস করেন। বিমান বাহিনীতে যোগদান করার সময় মোহাম্মাদ আলী রাজাই আয়াতুল্লাহ তালেকানীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং প্রতি বৃহস্পতিবার হেদায়াত মসজিদে সমবেত হতেন এবং প্রতি শুক্রবার তালেকানীর খানে আবাদে বেকার হাউসে একটি প্রশিক্ষণ বৈঠকে বসতেন। যেখানেই মরহুম তালেকানীর কোন ট্রেনিং অধিবেশন থাকত সেখানেই তিনি অংশ নিতেন এবং তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতেন। তাঁর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি শিক্ষকতা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

এক সময় তিনি পরিসংখ্যান বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রি ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে রাজাইকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কিছুদিন পর তিনি মুক্তি পান। তিনি কামাল হাইস্কুলে ৫ বছর শিক্ষকতা করার পর তেহরানের পাহলভী হাই স্কুলে বদলি হন। ১৯৭৪ সালে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন।

১৯৬৭ সালে জনাব রাজাই জালালউদ্দিন ফারসি ও জাভেদ বাহোনারসহ কতিপয় বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হয়ে সংযুক্ত গ্রুপনামে একটি দল গঠন করেন। সংযুক্ত গ্রুপের প্রধানদের সমন¦য়ে জুমা নামাযের সদর দফতর গঠন করা হয়। জনাব রাজাই শফিক, জাভেদ বাহোনার এবং তাঁর কতিপয় বন্ধুসহ ইসলামী কল্যাণ এবং পারস্পরিক সাহায্য ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থার দায়িত্বশীল ছিলেন। জনাব রাজাই ১৯৬২ সালে বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধর্মের ওপর দৃঢ় আস্থাশীল মহিলা।

তিনি রাফাহ স্কুলে এক বছর কাজ করার পর বিদেশে গিয়ে জামালউদ্দিন ফারসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এক মাস পর ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ইরান প্রত্যাবর্তন করেন। ইরানে পৌঁছে তিনি দেখতে পেলেন রাফাহ স্কুলের সকল পুরুষ শিক্ষক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন।

১৯৭৪ সালে ড. আয়াতুল্লাহ বেহেশতীর একটি গোপন ট্রেনিং অধিবেশন থেকে ফেরার পথে সাভাকের এজেন্টরা জনাব রাজাইকে গ্রেফতার করে ও কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তাঁর ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। একটানা ১৪ মাস তাঁর ওপর এভাবে নির্যাতন চালানোর পর বিচারের জন্য তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। বিচারে তাঁর ৫ বছরের কারাদ- হয়। বিচারের পর কাউকে নির্যাতন করার নিয়ম না থাকলেও সাভাকের এজেন্টরা রাজাইয়ের মুখ থেকে কথা বের করার জন্য অমানুষিক নির্যাতন চালায়।

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি টিচার্স ইসলামিক এসোসিয়েশনে যোগদান করেন। বিপ্লবের সময় বিপ্লবের কেন্দ্র রাফাহ স্কুলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। বিপ্লবের সাফল্যের পর তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। এক পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীও নির্বাচিন হন।

প্রেসিডেণ্ট পদ থেকে বনি সদরকে বহিস্কারের পর জনাব রাজাই ৩ সদস্যের প্রেসিডেন্সিয়াল পরিষদের সদস্য হন। ১৯৮১ সালের ২রা আগস্ট তিনি ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি ভোট পেয়ে ইরানের দ্বিতীয় প্রেসিডেণ্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। পূর্ববর্তী প্রেসিডেণ্ট সম্পর্কে জনগণের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা ছিল। এজন্য তারা এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট বানাল যিনি তাদের মধ্য থেকে এসেছেন, আমেরিকা ও শাহ কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে অন্ধকার সেলে কারাজীবন কাটিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টরা জনাব রাজাইকে বরদাশত করতে পারেনি। তাই প্রেসিডেণ্ট হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার অল্প কিছুদিন পর ১৯৮১ সালের ৩০ আগস্ট প্রেসিডেণ্ট ভবনে এক বোমা বিস্ফোরণের ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

শহীদ রাজাই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)