সোমবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শহিদ মুর্তাযা মোতাহহারীর চিন্তাদর্শন ও ইসলামি জাগরণ

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৭, ২০১৬ 

news-image

ছোট বড় ঘটনা দুর্ঘটনা নিয়েই মানুষের সামাজিক পরিবেশ। এসব ঘটনা কখনো সমুদ্রের ঢেউ, কখনো বা আন্দোলন কিংবা ঝড়ের মতো আসে। সমাজেও এরকম বিচিত্র ঢেউ আসে। চিন্তার ঢেউ, মতবাদের ঢেউ ইত্যাদি।মানব সমাজের সবচেয়ে প্রাণময় ও চিরন্তন একটি ঢেউ হলো ধর্মীয় আন্দোলন।মানবীয় প্রবণতা এবং জীবন থেকেই এর উৎস। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলে মধ্যপ্রাচ্যে যে ইসলামি জাগরণের ঢেউ এসেছে, এই ঢেউ হঠাৎ করে একবারে আসে নি; বরং অনেক আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে এর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।বিভিন্ন দেশ এবং জাতির স্বাধীনতার লক্ষ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী-মনীষী তাঁদের চিন্তা-চেতনা দিয়ে জনগণকে জাগিয়ে তুলেছেন।ধর্মীয় জাগরণের পেছনে জীবন উৎসর্গকারী এরকম একজন চিন্তাবিদ হলেন অধ্যাপক শহিদ মুর্তাযা মোতাহহারী।

শহিদ মুর্তাযা মোতাহহারী ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী পণ্ডিত। ইসলামের দাওয়াতি কাজের শুরু থেকেই তিনি মানবীয় সম্মান-মর্যাদা এবং দ্বীনী জাগরণ নিয়ে ভাবতেন। ব্রিটেনের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন : ‘…একটি সভ্যতাকে যে শক্তিটি অচল করে ফেলে বা মেরে ফেলে, তা হল শাসককুল কিংবা নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে নতুন নতুন সমস্যা ও জিজ্ঞাসার জবাবে সেই পুরনো উত্তরের পুনরাবৃত্তি করা।’

মোতাহহারী সবসময় নতুন নতুন আলোকিত পথের সন্ধানে ছিলেন। ইসলামি দর্শনের ক্ষেত্রে তিনি চেষ্টা করেছেন এই নতুন নতুন পথ উন্মোচন করতে। ফিকাহর ক্ষেত্রে তিনি গবেষণা করতেন এবং ইসলামি আইনের ক্ষেত্রে তুলনা করার চেষ্টা করতেন বা সমন্বয় করার চেষ্টা করতেন। তিনি সবসময় দ্বীনকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে দ্বীন হচ্ছে পানির মতো। পানি যেহেতু মানুষের জন্যে জীবনের মতো, সেজন্যে মানুষ পানিকে সবসময় পূত-পবিত্র ও দূষণমুক্ত রাখার চেষ্টা করে। দ্বীনও ঠিক সে রকম পানির মতো। তাই আমাদের প্রয়োজনেই দ্বীনকে পবিত্র ও দূষণমুক্ত রাখা উচিত। কেননা, এই দ্বীন আমাদেরকে পানির মতো জীবন দেয়।

মোতাহহারী খুব ভালো করেই জানতেন যে, যেসব নতুন নতুন মতাদর্শ দ্বীনের বিরোধিতা করে তারা নিজেদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন নতুন কোনো মাযহাব নিয়ে এসেছে এবং পুরনো ধর্মের পরিবর্তে তা প্রবর্তন করবে। এ ক্ষেত্রে তিনি দুটি বিষয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। এক হলো গোঁড়ামি বা জমাটবদ্ধতা, দুই মূর্খতা। তাঁর ভাষায়: দুটি ভয়ংকর রোগ সবসময় মানুষকে এ ক্ষেত্রে হুমকিগ্রস্ত করে তোলে। গোঁড়ামি রোগ এবং মূর্খতা রোগ। প্রথম রোগের পরিণতি হলো থেমে থাকা, অচলাবস্থা অর্থাৎ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ থেকে দূরে অবস্থান করা। দ্বিতীয় রোগের পরিণতি হলো পতন এবং বিচ্যুতি। গোঁড়ামিপূর্ণ সমাজ যা-ই নতুন, তারই বিরোধিতা করে। তারা পুরনোকেই আঁকড়ে পড়ে থাকতে চায়।

অধ্যাপক মোতাহহারী তাঁর ‘ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির ভূমিকা’ নামক গ্রন্থে ইসলামের খাঁটি এবং শক্তিশালী ব্যবস্থার কুঁড়িগুলোকে ফোটানোর চেষ্টা করেছেন এবং ইসলামকে একটা জীবন্ত দ্বীন, স্বাধীন দ্বীন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এই দ্বীন জনগণ এবং সমাজকে দ্রুত স্বাধীনতা ও মুক্তির দিকে ধাবিত করে। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী পবিত্র দ্বীন ইসলাম এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অগ্রসরমান এবং ইসলামের অনুসারীর সংখ্যাও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ইমানদারদের শক্তিশালী হওয়া, অগ্রগতি এবং ইসলামি আন্দোলনের উন্নয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: … তাওরাতে এদের উপমা এরূপ এবং ইঞ্জিলেও এদের উপমা হচ্ছে এরূপ : যেন ছোট্ট বীজ যা দুটি পত্রফলক বের করে ; তার পরে তা শক্ত হয়, এর পরে তা মজবুত হয় ও কাণ্ডের উপরে দাঁড়ায়, যা চাষীকে বিস্ময় ও আনন্দ বর্ষণ করে। এভাবেই আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা অবিশ্বাসীদের হৃদয় আক্রোশে পূর্ণ করেন। যারা ইমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের ক্ষমার ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।’

একটি সমাজের সক্রিয়তা ও জাগরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটির প্রতি শহিদ মোতাহহারী বেশি বেশি তাকিদ দিয়েছেন, তা হল ব্যক্তিত্বের অনুভূতি। একটি জাতি যদি নিজের ব্যক্তিত্বের বোধই উপলব্ধি না করে, সে জাতি কোনোদিনই বিপ্লব কিংবা জাগরণ ঘটাতে পারবে না। তিনি বলেন: ‘এই বিনিয়োগের চেয়ে বড় আর কোনোকিছুর অস্তিত্বই নেই সমাজে। বিনিয়োগটা হলো নিজের ভেতরে ব্যক্তিত্বের বিষয়টি অনুভব করা এবং ব্যক্তিত্বের মানসিকতা পোষণ করা। নিজের আদর্শের ওপর অটল থাকা এবং অন্য কোনো মতাদর্শের ওপর নির্ভর না করাটাই ব্যক্তিত্ব। একটি সমাজ যখন জানতে পারে যে, তার নিজের জন্য, নিজের জীবনের জন্য স্বাধীন একটি দর্শন রয়েছে, সেই দর্শন তার জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি। ঐ সমাজের উচিত তার নিজস্ব দর্শনের জন্য গর্ব করা। যে সমাজ এ ধরনের উপলব্ধি বা অনুভূতি শক্তি হারায় সে সমাজের জন্যে দুঃখ হয়।’

আলজেরিয়ার অধিবাসীরা যে দেড় শ’ বছর যুদ্ধ করে ফরাসি উপনিবেশবাদকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হলো এবং স্বাধীনতা লাভ করলো, তা এজন্য সম্ভব হয়েছে যে, তারা নিজেদের ভেতরে স্বতন্ত্র একটি অস্তিত্বের মানসিকতা পোষণ করেছিল। বিশ্বের একটি শক্তিশালী ও ধনী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এভাবে সংগ্রাম করার পেছনে তারা এই ব্যক্তিত্বের অনুভূতি লালন করেছিল যে, আমরা বাঁচলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাঁচব অথবা মরে যাব, তবু আমাদের ওপর অন্য কারো শাসন মেনে নেব না।

শহিদ মোতাহহারীর দৃষ্টিতে জাগরণের আরেকটি চালিকা শক্তি হলো দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের শক্তিবলে বলদর্পী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না, এমনকি সমাজে নিরাপত্তা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাতেও কুণ্ঠিত হয় না। যে বিশ্বাস দ্বীন এবং রাজনীতিকে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত বলে মনে করে আর অপমান, বলদর্পিতা, পরনির্ভরতা ইত্যাদিকে যথার্থ বলে মনে করে না। ‘আসল কাজ হলো, মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে, রাজনৈতিক সংগ্রাম তার ধর্মীয় তথা ইমানী একটি দায়িত্ব। এই বোধটি গড়ে উঠলে কেউ আর লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে অলসতা দেখাবে না।’

শহীদ মোতাহহারী ইসলামকে যুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়: ইসলাম নিজেকে সমাজের সকল দুর্দশার মোকাবেলায় দায়িত্বশীল বলে মনে করে… ইসলাম এসেছে সমাজ গঠন করতে, ইসলাম এসেছে সরকার এবং হুকুমাত গঠন করতে, ইসলামের দায়িত্ব হলো বিশ্বের সংস্কার, এ ধরনের একটি দ্বীন নির্বিকার থাকতে পারে না।’

ইরানের ইসলামি বিপ্লব সম্পর্কে শহিদ মোতাহহারী বলেছেন: ‘আমি আস্তে আস্তে এই বিশ্বাস লালন করেছি যে, এই ইসলামি বিপ্লব ইরানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কোটি কোটি মুসলমানের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং ইরানের জন্য তারা গর্ব করবে এজন্য যে, একটি ইসলামি বিপ্লব শুরু হয়েছে এই ইরান থেকে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে সেই বিপ্লব প্রভাবিত করেছে।’

তাঁর এই বিশ্বাস যে কতটা বাস্তব তা আজকের ইসলামি জাগরণ থেকেই অনুমান করা যায়।