শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

রাহবার আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ীর হজবাণী

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৬, ২০১৬ 

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ দ্বীনী ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ উয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী এবারের হজ উপলক্ষে মক্কা মু‘আয্যামায় গমনকারী হজযাত্রীদের উদ্দেশে প্রদত্ত এক বাণীতে তাঁদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব-কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে তাঁদেরকে ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা সম্পর্কে সচেতন করে দেন।
রাহ্বারের বাণীর পূর্ণ বিবরণ নিচে দেয়া হলো :
বিস্মিল্লার্হি রাহ্মানির রাহীম ওয়াল্-হাম্দু লিল্লাহি রাব্বিল্ ‘আলামীন্, ওয়াছ¡্্-ছ¡ালাতু ওয়াস্-সালামু ‘আলা সাইয়্যিদিল্ খাল্ক্বি আজ্মা‘ঈীন্ মুহাম্মাদিউঁ ওয়া আলিহিত্ব-ত্বাহিরীন্, ওয়া ছ¡াহ্বিহিল্ মুন্তাজাবীন্, ওয়া ‘আলাত্-তাবি‘ঈনা লাহুম্ বি-ইহসান্ ইলা ইয়াওমিদ্দীন।
তাওহীদের ঘাঁটি মহান কা‘বার প্রতি সালাম- যে কা‘বা মুমিনদের তাওয়াফের স্থান ও ফেরেশ্তাদের অবতরণস্থল! সালাম মাসজিদুল হারামের প্রতি। আরাফাতের ময়দান, মাশ্‘আর ও মিনার প্রতি সালাম! একইভাবে বিনয়ী অন্তরগুলোর প্রতিও সালাম। সালাম যিক্র ধ্বনিময় মুখগুলোর প্রতি, উন্মুক্ত অন্তর্দৃষ্টির অধিকারীদের প্রতি, সঠিক পন্থার দিশারি চিন্তাধারার প্রতিও সালাম। সালাম হজ পালনকারী সেই সৌভাগ্যবানদের প্রতি যাঁরা আল্লাহ্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘লাব্বায়িক’ বলার তাওফীক লাভ করেছেন এবং ঐশী নে‘আমতে পরিপূর্ণ দস্তরখানে বসার সুযোগ পেয়েছেন।
সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো এই সর্বজনীন, ঐতিহাসিক ও বিশ্বজনীন ‘লাব্বায়িক’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। ‘ইন্নাল্ হাম্দা ওয়ান্-নি‘মাতা লাকা ওয়াল্-মুল্ক্, লা শারীকা লাকা লাব্বায়িক।’ সকল প্রশংসা এবং সকল কৃতজ্ঞতা শুধু তাঁরই জন্য, সকল নে‘আমত তাঁরই পক্ষ থেকে এসেছে এবং সকল রাজত্ব ও সকল ক্ষমতার মালিক তিনিই। একজন হজ পালনকারীর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই গূঢ় অর্থপূর্ণ ঐশী হুকুম বা বিধান পালনের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত।
এই ফরয বিধান পালনের ধারাবাহিকতায় একজন হাজীকে হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলোর সাথে মিশে যেতে হবে। তাহলেই হজ পালনকারী হজের অবিস্মরণীয় ও অবিনশ্বর শিক্ষাগুলো আত্মস্থ করতে পারবেন এবং সেই সব শিক্ষার আলোকে নিজের জীবনের কর্মসূচিগুলো সাজিয়ে নিতে পারবেন। হজের দাবি এটাই। এ মহান শিক্ষা অর্জন করার পর তদনুযায়ী আমল করা হলে জীবনটা এমনই বরকতপূর্ণ হয়ে উঠবে যে, একজন মুসলমান সেই রহমত ও বরকতের সাহায্যে নিজের জীবনকে জীবন্ত, প্রাণবন্ত এবং আনন্দময় করে তুলতে পারবেন। জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো এ সময় তো বটেই, সব সময়ের জন্যই তিনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
আত্মপূজা বা ভোগবিলাসের মূর্তি, গর্ব-অহঙ্কার ও কামনা-বাসনার মূর্তি, আধিপত্য মেনে নেওয়া এবং আধিপত্যকামিতার মূর্তি, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ ও বলদর্পিতার মূর্তি, দায়িত্বহীনতা এবং অলসতার মূর্তি, মানবজীবনের মূল্যকে তুচ্ছ করে তোলার মূর্তি ইত্যাদি সকল মূর্তি অন্তরের গহীন থেকে আসা ইবরাহিমী এই উচ্চ ধ্বনির মাধ্যমে ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যাবে। ক্লান্তি, অবসন্নতা, দুরবস্থা, পরনির্ভরশীলতা ইত্যাদির পরিবর্তে জীবনে নেমে আসবে প্রশান্তি, সম্মান, মর্যাদা এবং স্বাধীনতার সুখ ও আনন্দ।
হজ পালনকারী প্রিয় ভাইবোনেরা! আপনাদের যিনি যে দেশ থেকেই কিংবা যে জাতি থেকেই এসে থাকুন না কেন আপনাদের উচিত ঐশী পরম জ্ঞানপূর্ণ এ কথাগুলো নিয়ে একবার ভালোভাবে চিন্তা করা এবং তারই শিক্ষার আলোকে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার সমস্যাগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া। সেই সাথে সবার উচিত যার যার ব্যক্তিগত ও পারিপার্শ্বিক সামর্থ্য অনুযায়ী কর্তব্য নির্ধারণ করে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করা।
আজ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দুষ্ট নীতি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জনগণের জন্য বয়ে এনেছে যুদ্ধ, রক্তপাত ও ধ্বংসলীলা, সৃষ্টি করেছে উদ্বাস্তু সমস্যা, দারিদ্র, পশ্চাদপদতা এবং মাযহাবী ও জাতিগত বিরোধ। অন্যদিকে ফিলিস্তিনে যায়নবাদী ইসরাইলের অপরাধযজ্ঞ ও বর্বর আচরণ নৃশংসতা ও নির্দয়তার চরমে পৌঁছেছে।
যায়নবাদীরা বার বার মসজিদুল আকসার অবমাননা করছে। পাশাপাশি তাদের দমন-পীড়নে নির্যাতিত ফিলিস্তিনী জনগণের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। আমেরিকা ও যায়নবাদী ইসরাইলের এ ঘৃণিত আচরণ আজ গোটা মুসলিম জাহানের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনাদের উচিত এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং এর মোকাবিলায় ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের কর্তব্য নির্ধারণ করা।
এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের আলেম সমাজ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ববর্গের কর্তব্য অনেক বেশি; কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁদের বেশিরভাগই গভীর ঘুমে বিভোর রয়েছেন। আলেমদের জন্য মাযহাবী বিভেদের আগুন জ্বালানো বর্জন করা কর্তব্য, রাজনৈতিক নেতাদের উচিত শত্রুর মোকাবিলায় ভাবলেশহীনতা পরিহার করা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের উচিত আনন্দ-ফুর্তিতে গা ভাসিয়ে দেয়া বন্ধ করা। আর তাঁদের সকলের উচিত মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেদনা চিহ্নিত করে তা উপশমের ব্যবস্থা করা। কারণ, আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের দরবারে একদিন তাঁদেরকে এই কর্তব্য পালনের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রন্দন উদ্রেককারী ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাযা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার আরো কতক দেশের ঘটনাবলি বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সঙ্কট। এ সব সঙ্কটে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র খুঁজে বের করে তা নস্যাতের উপায় নিয়ে ভাবতে হবে। মুসলিম জাতিগুলোকে তাদের সরকারগুলোর কাছে এ দাবি জানাতে হবে এবং সরকারগুলোকে তাদের গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
হজের মহা আড়ম্বরপূর্ণ সমাবেশ হচ্ছে এই ঐতিহাসিক কর্তব্য পালনের ক্ষেত্র সৃষ্টি ও দায়িত্ব বণ্টনের সর্বোত্তম স্থান। বারাআত বা মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হচ্ছে হজের মহাসম্মিলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতাÑ যা সকল দেশের সকল হাজীরই গুরুত্ব সহকারে পালন করা উচিত।
এ বছর মাসজিদুল হারামের দুঃখজনক ও প্রাণহানিকর ঘটনা হজযাত্রীদের পাশাপাশি মুসলিম জাতিগুলোকে বেদনাসিক্ত করেছে। এই দুঃখজনক ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা নামায ও তাওয়াফসহ অন্যান্য ইবাদতে মশগুল ছিলেন এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের আকাক্সক্ষা নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। কাজেই পৃথিবীর নিরাপদতম স্থানে বসেই তাঁরা সৃষ্টিকর্তার দীদার লাভ করে থাকবেন, ইন্ শাআল্লাহ্।
এটি মহাসৌভাগ্যের বিষয় এবং তাঁদের নিকটজনদের জন্য এটিই সান্ত¡না। তবে যাঁরা আল্লাহর ঘরের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এর মাধ্যমে তাঁদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি ও গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেনÑ এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

ওয়াসসালামু আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন

সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী
৪ যিলহজ ১৪৩৬ হিজরি মোতাবেক ২৭ শাহরিভার ১৩৯৪ ফারসি সাল।