সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর কর্মপদ্ধতি

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬ 

অধ্যাপক মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খান*

বর্তমান বিশ্বের যে কোন মানুষ, বিশেষ করে যে কোন মুসলমানই একবাক্যে স্বীকার করছেন যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন শতাব্দীশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও নেতা। যাঁরা আরো গভীরভাবে তাকান ও বুঝেন, তাঁরা নিশ্চিত যে, ইমাম খোমেইনী বিংশ শতকে আল্লাহ তাআলার এক অনন্যসাধারণ সৃষ্টি ও নেয়ামত। বিংশ শতকের নির্জীব, নিষ্প্রাণ, হতভাগ্য ও মযলুম মুসলিম উম্মাহর জন্য তো অবশ্যই তিনি এসেছেন রাসূলুল্লাহর তাওহিদী পতাকা হাতে অলৌকিক দিশারি হিসাবে। ইমাম খোমেইনীর জীবনচরিত, তাঁর ধর্মীয়, রাজনৈতিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক রচনাবলি, তাঁর নির্ভীক-নিরলস সংগ্রাম, তাঁর বাণী ও বক্তৃতাসমূহ, তাঁর নেতৃত্বাধীন ইসলামী বিপ্লব এবং ইরানের বুকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থা সবই প্রকারান্তারে ইসলামের সূচনা কালের পুনরাবৃত্তি এবং আল্লাহর রাসূল, তাঁর আহলে বাইত ও সাহাবাগণেরই পদাঙ্ক অনুসরণ আর সেই তাওহিদী নির্ভেজাল মুহাম্মাদী ইসলামের পুনঃমঞ্চায়ন।

ইসলামের সোনালি যুগের অবসানের পর গত চৌদ্দশ’ বছর যাবৎ ইসলামের পুনঃজাগরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বহু সংগ্রাম ও প্রচেষ্টা চলে এসেছে সত্য। কিন্তু ইমাম রুহুল্লাহ আল-মুসাভী আল-মুস্তাফাভী আল-খোমেইনী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নেতৃত্বে যে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রজাতন্ত্র ও তাওহিদী সমাজ ইরানের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার নজির আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। ইমাম বলেছেন, এ বিপ্লব আসমানি নূরের বিস্ফোরণ তথা তাজাল্লী। চৌদ্দশ’ বছর পর নবীজী ও তাঁর আহলে বাইতের ভবিষ্যদ্বাণী ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে ইরানে বাস্তবায়িত হয়েছে ও হচ্ছে।
বিশ্ববাসী, বিশেষ করে বিশ্বের মযলুম-মুস্তাযাফ জনতা এবং মুসলিম জনসাধারণ ইমাম খোমেইনীকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন তাঁর আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ উন্নত গুণাবলির কারণে। তবে আফসোসের বিষয় হলো যখনই কেউ ইমামকে গভীরভাবে জানতে, ভালোবাসতে ও অনুসরণ করতে চান তখনই নফসানি ও শয়তানি জাহেরি-বাতেনি শক্তিগুলো বাধা হয়ে দাঁড়ায় ও চক্রান্ত শুরু করে দেয়। মাযহাবী দ্বন্দ্বের শিয়া-সুন্নির বিষাক্ত তরবারি এসে উম্মতের ঐশী ভালোবাসার পথে মারণাস্ত্র হিসাবে দাঁড়ায়। চৌদ্দশ’ বছর যাবৎ উমাইয়্যা-আব্বাসী রাজতন্ত্রীদের এ বিষাক্ত তরবারি যেমন উম্মাহকে শতধাবিভক্ত করে রেখেছিল তেমনি বিংশ ও একবিংশ শতকের মুনাফেকী শক্তি ও সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির নেতৃত্বে ও চক্রান্তে একই অস্ত্র প্রয়োগ করে চলেছে। উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলা যে নিয়ামত ইসলামী উম্মাহ ও বিশ্বের মযলুম মুস্তাযাফ মানবজাতিকে নাজাতের উপায় হিসাবে দান করেছেন তা যেন কেউ লাভ করে সৌভাগ্যবান হতে না পারে। মযলুম-মুস্তাযাফ মানুষের মুক্তির পথে ইমাম খোমেইনী ও তাঁর অনুসারী বাহিনী যে বিপ্লব, আন্দোলন, লড়াই ও দিশা দিচ্ছেন তা এ যামানার নমরুদ, ফিরআউন, আবু লাহাব, আবু জাহেলদের পতন ঘটিয়ে বিশ্বের দিকে দিকে নাজাতের তাওহিদী পথ খুলে দেবে ও দিচ্ছে। এ কারণেই নফসানি ও শয়তানি শক্তিবর্গ আমাদেরকে ইমাম খোমেইনীর কাছাকাছি ও গভীর জীবন-দর্শন এবং দিক-নির্দেশনার পরশে যেতে দিতে চায় না। এটাই সত্য ও বাস্তব কথা।
আমি সুদীর্ঘ দশ বছর ইমাম খোমেইনীর আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছায়াতলে কাটিয়েছি এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে প্রায় দুই যুগের কাছাকাছি সময় খেদমত করার সৌভাগ্য লাভ করেছি। ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভের সময়কাল এবং পরবর্তী সময়ে ইমামের সব বক্তৃতা ও বাণী অনুসরণ, অনুধাবন ও অনুবাদ করে প্রচারেরও বিশেষ তাওফিক অর্জন করি।
এ কারইে আমি দাবি করে বলতে পারি, কেউ যদি এ যুগে সত্যিকারের আল্লাহপ্রেমিক ও রাসূলপ্রেমিক মুসলমান হতে চায়, এমনকি প্রকৃত সুন্নাতের অনুসারী হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই ইমাম খোমেইনীর চিন্তা-দর্শন, আচরণ ও পদাঙ্ক গভীর মনোযোগ সহকারে অনুসরণ করতে হবে।

বিশেষ করে ইমাম খোমেইনীর আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক ওসিয়তনামা নিয়মিত পাঠ ও অনুসরণ করা নেহায়াত জরুরি। তাছাড়া তাঁর রচিত অতি উচ্চ মূল্যমানের আধ্যাত্মিক গ্রন্থসমূহ, যেমন র্সিরুস সালাত, আদাবুস্্ সালাত, আরবাঈন হাদিস, তালাব ওয়া ইরাদা, মিসবাহুল হিদায়া প্রভৃতি গ্রন্থ বারবার গভীর মনোনিবেশ সহকারে পাঠ করা প্রয়োজন। এটাও মনে রাখতে হবে যে, চোর, ডাকাত, দুর্নীতিবাজ, স্বৈরাচারী, স্বেচ্ছাচারী, ব্যভিচারী, পুঁজিবাদী, ভোগবাদী, উপনিবেশবাদী, সা¤্রাজ্যবাদী এবং ইবলিস শয়তানই কেবল ইমাম খোমেইনী (রহ.) এবং তাঁর পথের বিরোধী যেমন করে এরা প্রকৃত ইসলামেরও বিরোধী।
পরিশেষে আমি বলব, ইমাম খোমেইনীকে গভীরভাবে ভালোবাসা ও তাঁকে অনুসরণ করা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার যা কেবল আল্লাহপাকই দয়াপরবশ হয়ে তাঁর খাঁটি বান্দাদের দিতে পারেন। আমরা আল্লাহর কাছে মুনাজাত করছি তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের দলে পরিচালিত করেন এবং ইসলামী উম্মাহর মাঝে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর মতো আরো আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা দান করেন। তাহলেই বিশ্বব্যাপী ইসলামের ন্যায়-ইনসাফ ও ভ্রাতৃত্ব-সাম্য এবং মায়া-মমতার প্রতীক হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামের একক বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: পরিচালক, ইউআইটিএস রিসার্চ সেন্টার,
ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)