বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

মোস্তফা চামরান

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৭, ২০১৮ 

কামাল মাহমুদ
মোস্তফা চামরান ইরানের এক মহান বিজ্ঞানী ও সংগ্রামী যোদ্ধা। যিনি একাধারে পদার্থবিজ্ঞানী, রাজনীতিবীদ, গেরিলা কমান্ডার। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইরানের পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তিনি ইরানি পার্লামেন্টারি ফোরামের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি একজন আদর্শ সংগ্রামী। যিনি অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার তথা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞানীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবীদের সহায়তার জন্য প্যালেস্টাইন, লেবানন, মিশরে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে ছুটে গিয়েছেন। ঠিক একইভাবে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ক্ষেত্রেও তিনি দায়িত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ করেছেন। বলা হয়ে থাকে ইরানের বীর পুরুষদের বিষয়ে কোনো কিছু লিখলে যদি শহীদ মোস্তফা চামারানের বিষয় না লেখা হয় তাহলে এটি অন্যায় করা হবে। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ৩৮ বছর আগে, কিন্তু আজো তিনি ইরানের মানুষের মনে জাতীয় বীর হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত আছেন। তিনি তাঁর কাজে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী, ন্যায়নিষ্ঠ, বন্ধুবৎসল এবং অনুজদের প্রতি স্নেহশীল। যে কাজ করতেন সেজন্য মরণপণ চেষ্টা করতেন। তাইতো তিনি পাভে প্রান্তরে ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে নিজ জীবনকে উৎসর্গ করে জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। এমন একজন সাচ্চা মুসলিমকে স্মরণ করবে অনাগত শত কোটি মুসলিম। যারা নিজের জীবনের চাইতে ইসলাম ও দেশের মর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তার বিখ্যাত বাণী ‘কাপুরুষ মৃত্যুর পূর্বেই বহুবার মরে, কিন্তু সাহসী বীরেরা শুধু একবারই মরে।’
কৈশোর ও শিক্ষাজীবন
চামরান ১৯৩২ সালের ৮ মার্চ তেহরানের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা তাঁর জন্মের পর ফুটফুটে চেহারা দেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। ছয় ভাই, মা-বাবা, দাদি ও ফুফু এই নয়জন ছিল তাঁর পরিবারের সদস্য। তাঁদের নিজেদের কোনো ঘর ছিল না। একটি ভাড়া ঘরে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। কিন্তু তাঁর ঘরে পড়ার উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। কখনো কখনো বাড়ির ছাদে গিয়ে পড়াশোনা করতেন। অথচ ক্লাসের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো তিনি অনায়াসে সম্পাদন করে শিক্ষকদের চমকে দিতেন। তিনি আয়াতুল্লাহ তালেকানী ও আয়াতুল্লাহ মোরতাজা মোতাহ্হারীর নিকট ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে আলবোর্জ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। তেহরান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইলেক্ট্রো ম্যাকানিক্স’ বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চ শিক্ষার্থে আমেরিকায় যান। তিনি টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস ডিগ্রি লাভ করেন। এরপরে ১৯৬৩ সালে ইরান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ব্রেকলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘প্লাজমা ফিজিক্স’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘বেল ল্যাবরেটরীজ’ এবং নাসার ‘জেট প্রোপালশান ল্যাবরেটরীজ’-এ স্টাফ সাইনটিস্ট হিসেবে চাকরি করেন।
রাজনৈতিক কার্যক্রম
মোস্তফা চামরান মেহেদী বাজারগানের নেতৃত্বে মুক্তি আন্দোলনের সদস্য ছিলেন। গ্রাজুয়েশনের পরে তিনি কিউবাতে মিলিটারি প্রশিক্ষণের জন্য যান। তিনি মিশরের জামাল আবদুল নাসেরের হাতে দুই বছর গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে সেরা নির্বাচিত হন। তিনি শাহ এর বিরুদ্ধে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। শাহ সরকার তাঁর শিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে দেয়। ১৯৬৫ সালে তিনি আমেরিকায় চলে যাওয়ার পর ১৯৬৮ সালে মুসলিম ছাত্রদের নিয়ে একটি সংগঠন তৈরি করেন। যার নাম ‘মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা’ (এমএসএ) যার নেতৃত্বে ছিলেন ইবরাহীম ইয়ায্দী। পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সেও এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে তিনি লেবানেনে যান এবং ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’ এ যোগদান করেন এবং ‘প্যালেস্টাইন আমল মুভমেন্ট’-এও কাজ করেন। তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্য রেভুলেশনারি মুভমেন্ট’ এর সদস্য ছিলেন। সেখানে তিনি মূসা সাদরকে সহায়তা করেন। তিনি মূসা আল সাদর এর ‘ডানহাত’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। লেবাননে ‘হিজবুল্লাহ’ গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য তাঁর হাতেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইন চিফ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ ড. চামারানের ছাত্র হিসেবে গর্ববোধ করেন।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব আরম্ভ হলে ২১ বছর পর চামরান ইরানে প্রত্যাবর্তন করেন। বিপ্লবের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারে মাহদী বাজারগানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীদের দমনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সময়কালে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে তেহরান থেকে ইরানের পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি সুপ্রিম কাউন্সিল অব ন্যাশনাল ডিফেন্স এর উপদেষ্টা মনোনীত হন।
ব্যক্তিগত জীবন
চামরান আমেরিকান মুসলিম তামসেন হেইমানকে ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন। তাঁদের রৌশান নামে ১টি মেয়ে ও আলী, জামাল ও রহিম নামে তিনটি ছেলে রয়েছে। ১৯৭৩ সালে তামসেন চামরানকে ছেড়ে চলে যান। এরপর চামরান এক লেবাননী নারীকে বিয়ে করেন যাঁর নাম ‘গ্বাদে জাবের’।
শাহাদাত
চামরান ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় পাভে প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁকে ‘বেহেশতে যাহরা’ কবরস্থানে দাফন করা হয়। যুদ্ধের সময় তাঁর বাম পায়ে মর্টারের গোলা লাগে, তবুও তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যান নি। ১৯৮১ সালের ২১ জুন তিনি এ নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে মহান আল্লাহর সাথে মিলনের মনোবাসনা পূর্ণ করার সুযোগ লাভ করেন।
ড. মোস্তফা চামরান ইরানের বিখ্যাত ও গর্বিত কমান্ডার । ইরান ও লেবাননে বিভিন্ন রাস্তা ও ভবন তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। ২০১৩ সালে তাঁর নামে একটি পতঙ্গের* নাম রাখা হয়। নিক রবীনসন ‘নট এ নিউ লাইফস্টাইল ফর দোস হু থার্স্ট ফর হিউম্যানিটি’ নামে জীবনী গ্রন্থসহ অন্য লেখকরা তাঁর বায়োগ্রাফি লিখেছেন। ২০১৪ সালে তাঁর জীবনী নিয়ে একটি ফিল্ম প্রচারিত হয় যার নাম ‘চে’।

ক্স প্রজাপতি জাতীয় এই পতঙ্গ ২০১২ সালে রাজাভী খোরাসান প্রদেশের বিনোলুদ পাহাড়ে পাওয়া গিয়েছিল।