রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

মুসলিম কালো আদমি ও মার্কিন মুল্লুকে ইসলাম

পোস্ট হয়েছে: মে ২২, ২০১৩ 

news-image

চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমেরিকার কালো আদমি সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইসলামের পরিচয় ঘটে এমন এক পরিবেশে, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামকে একটি পশ্চাৎপদ ধর্ম প্রমাণের জন্য বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। কারণ, শয়তান জানত যে, পশ্চিমাজগতেও সত্যধর্ম ইসলামের অভ্যুদয় ঘটবে। এ জন্যই যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যজগতে এর প্রবেশের পূর্বেই ইসলামকে বিকৃত করে বিতর্কিত আবেদনহীন বানাবার চেষ্টা করা হয়। এতদ্ভিন্ন ইউরোপীয়রা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কালো আদমিদের বুঝাতে চেষ্টা করে যে, যিশুখ্রিস্ট একজন কোকেশিয়ান ছিলেন, তাঁর আঁখিযুগল ছিল নীল, ঈষৎ স্বর্ণাভ রং-এর ছিল কেশদাম। মার্কিন কালো আদমিদের প্রভাবান্বিত করার জন্য তারা যে পন্থা উদ্ভাবন করেছিল তা হচ্ছে এমনি প্রচারণা যে, ঈশ্বর হচ্ছেন একজন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মানুষ, যাঁর চোখদ্বয় ছিল সবুজাভ নীল রঙের এবং যিনি নিজেকে ‘আল্লাহ্’ বলে পরিচয় দেন এবং নিজেকে কালো আদমিদের শ্রেণিভুক্ত মনে করেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কোকেশিয়ান জালিমরা একজন উজ্জ্বল বর্ণের সবুজাভ নীল চোখের মাস্টার র্ফ্দা মুহাম্মাদকে অনুমতি দিল ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার নামে ইসলামের একটি বিকৃত রূপ উপস্থাপনের জন্য- যে নিজেকে আমেরিকায় ‘আল্লাহ্’ বলে দাবি করত। তাদের আশা ছিল কালো আদমিদের মধ্যে একটি বিভেদের নীতি, একটি আশঙ্কা ও একটি গোপন জুলুম বিরাজমান রাখা, লক্ষ্য ছিল অন্যান্য দেশ থেকে আগত মুসলমানদের সঙ্গে আগত ইসলামের স্বীকৃতি যেন কালো আদমিরা না দেয়।

এ ইষৎ তামাটে বর্ণের লোকটি যুক্তরাষ্ট্রে এলেন এবং বুঝালেন যে, তিনি কালো আদমি এবং তিনিই আল্লাহ্। এলিজা পুল যিনি পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করে হয়েছেন এলিজা মুহাম্মাদ, তাঁকে নবী হিসেবে ঘোষণা করা হলো। এলিজা এ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করলেন এবং এমন অনেক অনুসারী সংঘবদ্ধ করলেন, যাদের ধারণা হলো তারা মুসলমান। কেননা, তারা তো ইসলামেরই দর্শন গ্রহণ করেছে। কালো আদমিরা, বিশেষ করে সে যুগ থেকেই মাস্টার ফার্‌দ মুহাম্মাদ, এলিজা মুহাম্মাদ, এমনকি মন্ত্রী লুই ফারাখানের শিক্ষানুযায়ী এই ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে নিপতিত হয়ে আছে যে, মনুষ্য সমাজের এবং বিশ্বজগতের অধিপতি হচ্ছেন কালো আদমি।

একটি সমস্যা সৃষ্টি হলো। খ্রিস্টান কালো আদমিদের পক্ষে যেখানে পূর্ণ সম্ভাবনা ছিল সত্যিকার ইসলাম গ্রহণের সেখানে তারা তথাকথিত ইসলাম ত্যাগ করল এবং মুসলমান হওয়ার চিন্তাও তাদের মধ্য থেকে উঠে গেল। যার ফলে বিকৃত খ্রিস্টবাদের মধ্যেই তাদের তৃপ্ত থাকতে হলো।

কালো আদমিদের নবতর চেতনার ফলে অনেক তথাকথিত মুসলমান ভাবতে শুরু করল যে, খোদা ও যিশুখ্রিস্ট হচ্ছেন কালো আদমিদের অন্তর্ভুক্ত এবং স্বর্গ ও নরক পৃথিবীতেই ঘটে থাকবে।

অর্থনৈতিক মুনাফার জন্য ইউরোপীয়রা ও ইহুদিরা আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞতাবশত যে ভ্রান্তির সমাবেশ ঘটিয়েছে তাদের তথাকথিত ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটিও ভুল ধারণা ও অসামঞ্জস্য সৃষ্টিতে যথার্থ ভূমিকা পালন করেছে। স্বার্থপ্রণোদিত ও বিকৃত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত এ সকল বিকৃত পুস্তক ছাত্রদেরকে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে এবং প্রকৃত ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে তাদেরকে অজ্ঞ রাখার জন্য আজও কলেজের এবং পাঠাগারের তাকের মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রকৃত ইসলামের দুশমনদের দ্বারা ইসলামের এ ধরনের বিকৃত উপস্থাপনার নিদর্শন আজও দেখা যায়।

ইসলামের সত্যতার যে নিদর্শন কোরআনে ও বিভিন্ন ইসলামি পুস্তকে রয়েছে, যেগুলোর অনুবাদ মুসলমানরাই করছে সেগুলো আজও সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে। আর অমুসলমান, ইসলামের শত্রু এবং অজ্ঞ লোকদের দ্বারাই ইসলামের ঘটনাবলি বিকৃত হয়েছে। বিষয়টির অবনতি ঘটাবার জন্য আমেরিকার কালো আদমি এলিজা মুহাম্মাদ একজন প্রতারক খ্রিস্টান ধর্মগুরুর সহায়তায় মাস্টার ফার্‌দ মুহাম্মাদ এর তথাকথিত ‘ইসলাম’-এর ভ্রমাত্মক তত্ত্ব কালো আদমিদেরকে শিক্ষাদানের সুযোগ গ্রহণ করেন, যার ফলশ্রুতি হচ্ছে কালো আদমিদের জাগৃতি সংস্থার উদ্ভব। সেটিকে সাধারণত ইসলামি জাতির প্রথম পুনরুত্থান বলে অভিহিত করা হয়।

কালো আদমিরা পূর্ব হতেই শোষিত হয়ে আসছিল এবং কোকেশিয়ান জালিমদের বর্ণবাদ, জুলুম ও বৈষম্যের মোকাবিলা করার একটি পথ তারা খুঁজছিল। এ কারণে এ দুই ব্যক্তি এমন অনেক অনুসারী পেল যারা নিজেদের জন্য নতুন পরিচিতি অম্বেষণ করছিল এবং সাদা আদমিদের থেকে নিজেদেরকে একটি পৃথক জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত মনে করছিল। এ নতুন সংস্থার কর্মকর্তাগণ এবং এর বেশ কিছু সমর্থক জানতেন যে, এলিজা এবং মাস্টার ফারদের লোভী প্রশংসাকারী অনুসারী লুই ফারাখান, যিনি নেশন অব ইসলাম অর্গানাইজেশন-এর বিখ্যাত কর্মকর্তা, তাঁর হাতেই ইসলামের মুনাফার চাবিকাঠি।

উপরিউক্ত সব কারণে দি নেশন অব ইসলাম তখনও যেমন কোনো ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করত না, আজও তা করে না। এটা এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার ভিত্তি হচ্ছে বাইবেল ও কোরআনের চিন্তাধারা। এদের কোরআনের ব্যাখ্যার লক্ষ্য ছিল আমেরিকান কালো আদমিদের জাগৃতি। বিপরীত পক্ষে, সত্যিকারের ইসলাম হচ্ছে এমন একটি ধর্ম পবিত্র কোরআনের নির্দেশ মোতাবেক যে এটি শিখে এবং জীবনে বাস্তবায়িত করে সে যেই হোক না কেন, কালো হোক বা অন্য কিছু, সবার জন্যই এটি কল্যাণ বয়ে আনে।

হযরত ঈসা (আ.)-এর মিশন শেষ হওয়ায় প্রায় ৬০০ বছর পর হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমন ঘটে। তিনি ছিলেন শেষ পয়গম্বর, আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বে যাঁর ওপর কোরআন নাযিল হয়েছে। কিন্তু সে কোরআনে বর্ণিত প্রকৃত ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে দি নেশন অব ইসলামের আদর্শের রয়েছে বিরাট বৈপরীত্য। ইসলামের আর্বিভাব পূর্বেকার তথা মূসা (আ.)-এর কিতাব ও ঈসা (আ.) বর্ণিত শিক্ষার পরিসমাপ্তি ঘোষণা এবং সেগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে। আদম, নূহ, ইবরাহীম, লূত, ইউসুফ, ইয়াকুব এমনি হাজার হাজার নবী ও আল্লাহ্‌র পছন্দনীয় ব্যক্তির মাধ্যমেই যে আল্লাহ্্র সব শিক্ষা এসেছে সে বিষয়টি নিশ্চিত করে।

ঈসা (আ.)-এর জন্মের বহু পূর্বে মনুষ্য সমাজের জন্মলগ্ন থেকেই ইসলামের অভ্যুদয় ঘটেছে যা হচ্ছে মানুষের আদি ধর্ম। ইসলামের অর্থ হচ্ছে একজনের ‘ইচ্ছাশক্তিকে’ পূর্ণভাবে আল্লাহ্‌র সমীপে সমর্পণ করা। আর আল্লাহ্ তো অদৃশ্য- না তিনি মনুষ্যজীব, না তার সন্তান। প্রথম মানব, আল্লাহ্‌র নবী আদম (আ.)-এর বিশ্বাস ছিল এটাই। আল্লাহ্‌র কাছ থেকে হযরত আদমের কাছে যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে সে তো ইসলামই। নবিগণের সামনে সকল বিশ্ববাসীর তরে একই ধর্মীয় নির্দেশ প্রেরিত হয়েছে আর ধরণির বুকে মানুষের মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটা চলবে। আল্লাহর নবীরা সবাই সে মহা ঐশী শক্তির আধার কর্তৃকই অনুমোদিত। তাঁদের কেউই পশ্চিম গোলার্ধ থেকে আবির্ভূত হননি, এমনকি তাঁরা পশ্চিম গোলার্ধ ভ্রমণও করেননি। অথচ তাঁদের বাণী সারা জাহানে সকল মানুষের জন্য প্রচারার্থে নির্দিষ্ট হয়েছে। আল্লাহ্‌র সকল নবীই প্রাচ্যে পদার্পণ করেছেন।

মাস্টার ফার্‌দ মুহাম্মাদ এলিজা মুহাম্মাদকে যে দর্শন শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হচ্ছে কালো আদমিদের জাগরণ সম্পর্কিত। আমেরিকায় কালো আদমিদের সেই সংকটকালে তৎকালীন প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যে দার্শনিক ব্যাখ্যা তাদের সম্মুখে উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল সেটাই উপস্থাপন করা হয়েছিল। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য যে, ম্যালকম এক্স, যিনি শাহাদাতের পূর্বে সত্যিকারের ইসলামকে বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর মাধ্যমে এবং বিগত কয়েক দশকে আমেরিকায় বহিরাগত মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে এখন কালো আদমিরা ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা এবং প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে উচ্চতর ধারণা লাভ করেছে। এতসবের পরেও একটি শিক্ষা তথা ব্যক্তিসত্তাকে জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করার বিষয়টি বরাবর ভাবনার অন্তরালে থেকে যাচ্ছে।

অনেক মুসলমান যারা প্রথম পুনরুত্থানের সঙ্গে জড়িত তারা ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলে যে, শয়তান গোরা (সাদা) আদমিভুক্ত এবং তারা তাকে আজও সম্বোধন করে, ‘নীল নয়না শয়তান’ বলে। এই যে বিশ্বাস, এটা আজও অনেকে সমুন্নত করে রাখছে। কারণ, ইতিহাসের সারাটি সময়ে সাদা আদমিরা এমন সব কাজ করেছে যেটা শয়তানিরই নামান্তর। এদদ্ভিন্ন এ জাগরণ এমন একটা সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল যা সামাজিক বিভিন্ন খারাবি থেকে কালো আদমিদের ব্যক্তিসত্তাকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল। যাক, এটা সত্য যে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানী ও ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা তাদের জন্য অদ্যাবধি প্রয়োজন।

এলিজা মুহাম্মাদ নিজের এবং দি নেশন অব ইসলামের সমর্থনে এসকল বিকৃত ইসলামি বক্তব্য ব্যবহার করতেন, উদ্দেশ্য ছিল ভয়াবহ নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য কালো আদমিদের সচেতন করা। তাঁর অনেক আত্মনিবেদিত অনুসারী ছিলেন। যেমন শাহাদাত লাভের পূর্বে ম্যালকম এক্স, ফারাখান, এলিজার পুত্র ওয়ালেক দীন মুহাম্মাদ- যিনি পরবর্তী পর্যায়ে নাম পরিবর্তন করে নামধারণ করেছিলেন ওয়ারিস (যার অর্থ হচ্ছে উত্তরাধিকারী)। মৃত্যুর পূর্বে ম্যাকলম এক্স কোরআনভিত্তিক ইসলামের সত্যিকার শিক্ষার বিষয়ে কঠোর অধ্যাবসায় নিয়ে অধ্যয়ন করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত হন। আল্লাহ্‌র অপার কৃপায় গুপ্তঘাকতের হাতে নিহত হওয়ার পূর্বে তিনি সত্যিকারের ইসলামকে চিনতে পেরেছিলেন এবং ভুল পথে পরিচালিত মুসলমানদেরকে জাগাতে চেষ্টা করেছিলেন। এটি ছিল এমনি এক জাগতিক প্রচেষ্টা যা তাঁর জন্য শাহাদাত ডেকে আনে। ধূলি-ধূসরিত বসুন্ধরা ত্যাগের পূর্বে মুসলমান হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এক দায়িত্ব হজ সমাপনের জন্য আরবের মক্কায় গমনের সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন। সে সময়ই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন প্রকৃত ইসলামের পরিচয়।

তাঁর এ সত্য উপলব্ধি সমসাময়িক মুসলিম কালো আদমিদের সংস্থার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হলো। কিছু কিছু লোক ভাবল ম্যালকম এক্স ক্ষমতালাভের প্রত্যাশী ছিলেন। তারা ভেবেছিল যে, তিনি নেতা হতে চাইছেন। অন্যরা সরলতার সঙ্গে বিশ্বাস করছিল যে, তিনি উন্মত্ততায় ভুগছিলেন। কারণ, তিনি এলিজার শিক্ষা অনুসরণে বিরত হয়েছিলেন। তবে কিছু কিছু লোক এটা বুঝতে পেরেছিল যে, যা সত্য সেটাই তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছেন, কিন্তু তারা চাচ্ছিল না যে, মুসলিম কালো আদমিরা সেটা জ্ঞাত হোক। হকের বিরোধী শক্তির লালসা চরিতার্থ করার জন্য কালো আদমিদের অজ্ঞতার অন্ধকারে রেখে তাদের শোষণ করার হীন অভিপ্রায়ে রচিত এটা ছিল আর এক ধরনের ষড়যন্ত্র।

জুলুম এবং জাহেলিয়াতের মোকাবিলায় ইসলাম সচেতন করে তোলে। ইসলাম মানবসন্তানদের সত্যের আলো ও আধ্যাত্মিক চেতনার দিকে ঐক্যবদ্ধ করে। আর সে আলো সে চেতনা তো আল্লাহ্‌র নূরের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়।

এলিজার মৃত্যুর পর মুসলিম কালো আদমিরা শতধাবিভক্ত হলো। সঠিক হোক আর না হোক কেউ কেউ এলিজার শিক্ষায় দৃঢ় রইল, কেননা, তারা তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে বুঝতে পেরেছিল যে, কালো আদমিদের জাগরণ ও স্ব-সহায়তার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যাক এটা অবশ্যই হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, মুসলমানদের প্রথম পুনরুত্থানের দর্শন ‘চক্ষু উন্মোচন’ মাত্র, সেটা কোনো ধর্ম নয়, যদিও সেটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলাম’ এবং তার অনুসারীদের বলা হয় ‘মুসলমান’। কোরআনের স্পষ্ট জ্ঞান না থাকার দরুন ভবিষ্যতেও তারা নিজেদেরকে ইসলামের অনুসারী এবং মুসলমান বলে ভাববে। কিন্তু প্রথম পুনরুত্থান-এর সমর্থকগণ ম্যালকম এক্স-এর নেতৃত্ব নতুন ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করল।

কিছু কিছু অনুসারী আবার বিভ্রান্ত  হলো। তারা তাদের অনেক ধর্মীয় এবং আচার-অনুষ্ঠানই ত্যাগ করল এবং গাফেল থাকল সত্যিকার ইসলাম থেকে, অথচ এরপরও তারা মুসলমানত্বেরই দাবিদার। অপর পক্ষে, অনেকেই হেদায়াত লাভের জন্য প্রার্থনা করছিল এবং সঠিক ইসলামি পথও তারা পেয়েছিল। ম্যালকম এক্স-এর শাহাদাতপ্রাপ্তির পর অনেকেই নিজেদের ঈমান ও কোরআনি শিক্ষার ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। এটা সম্ভব হয়েছিল কোরআনে গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার ফলেই। বিদ্যার্জন ও ব্যবসায়িক কারণে অনবরত যারা আমেরিকায় পদার্পণ করছিল তাদের সংস্পর্শে এসে মুসলিম কালো আদমিদের অনেকের মধ্যকার বিভ্রান্তি ও গলদ দূর হয়ে যায়।

ম্যালকম ও এলিজার তিরোধানের পর মুসলিম কালো আদমিদের অধিকাংশ এলিজার পুত্র ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের নেতৃত্বাধীনে চলে যায়। এটা ছিল ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভ। যাক, তিনি ছিলেন পশ্চাৎপদ ইসলামের অনুসারী। সাম্প্রতিককালে তাঁর অনেক অনুসারী মার্কিন জাতীয়তাবাদের মোকাবিলায় টিকতে পারছে না এবং ইসলামি পরিচয় সমুন্নত রাখতেও চাইছে না, অনেক অঞ্চলে তারা ইসলামের অটল অনড় জীবনপ্রণালি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এটা এজন্য হতে পারে যে, ওয়ারিস উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর পিতার কাছ থেকে নেতৃত্ব লাভ করেছেন। তাই আপোসের পথ ধরেছেন যা একজন জন্মগত নেতৃপ্রতিভাধর ব্যক্তির প্রকৃতির বিপরীত স্বভাব। কিন্তু এটা অন্ধ আনুগত্যের দোষ থেকে কাউকে রেহাই দিচ্ছে না।

ম্যালকম এক্সের শিক্ষা এবং প্রায় প্রত্যহ আগত মুসলিম অভ্যাগত ও ইসলামি পুস্তকাদি থেকে অধিকাংশ লোক প্রকৃত ইসলামকে জানতে পারে। বিভেদ এবং অনৈক্যের কারণে ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের অনেক অনুসারী মার্কিন জাতীয়তাবাদের শিকারে পরিণত হলো এবং এর ফলশ্রুতিতে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় প্রতারিত হলো। এভাবে আজও কোনো লোক ফারাখানের শিক্ষার এবং তথাকথিত প্রথম পুনরুত্থানের অনুসারী। আবার কেউ বা ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের দ্বিতীয় পুনরুত্থান দর্শনের সমর্থক। এমন অনেক আমেরিকান মুসলমান আছে যারা এ দুদলের কোনোটির অন্তর্ভুক্ত নয়। এ সকল মুসলমান আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে নিজেদের অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে ইসলামের মধ্যে সত্যতা খুঁজে পেয়েছে এবং এটিকে তাদের জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেছে।

প্রথম পুনরুত্থানের শিক্ষা কালো আদমিদের মধ্যে অধিকতর আত্মশক্তি ও আত্মবিশ্বাস অর্জনে সহায়তা করেছে এবং এর ফলে তারা বুঝতে পেরেছিল যে, তারা ছিল অত্যাচারিত। তখন তারা এর বিরুদ্ধে গঠনমূলক কিছু করা শুরু করল। এটা একটা সৌভাগ্য, কেননা, তখনও অগণিত কালো আদমি নৈরাশ্যের শিকার হয়ে অত্যাচারিতের জীবনকেই বরণ করে নিয়ে চলছে। তারা না নিজেরা কিছু করেছে, না তাদের সন্তানদেরকে সে শিক্ষা দিয়েছে- যে শিক্ষার বলে উত্তর আমেরিকার কালো আদমিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জুলুম থেকে তারা রেহাই পেতে পারে।

ইসলামকে জানতে হলে অবশ্যই পবিত্র কোরআনের শব্দরাজি অধ্যয়ন ও হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। তিনি পুরুষ হোন আর নারীই হোন, সত্যিকারের মুসলমান হতে গেলে কোরআনের শিক্ষাকে তাঁর জীবনে বাস্তবায়িত করতে হবে। এটা ফারাখান অথবা ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের মধ্যস্থতা ছাড়াও সম্ভব। কেউ যদি ইসলাম সম্বন্ধে অধ্যয়ন করেন তবে সে অবশ্যই অধুনা প্রচলিত বাইবেলের মিথ্যা ও ভুল-ত্রুটিগুলো আবিষ্কার করতে পারবেন। এখন সেটার শিক্ষাও কিছু নির্দিষ্ট শোষকের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বিকৃত করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআন আল্লাহ্‌র প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ। এর আদি ভাষা পরিবর্তিত হয়নি। যার জন্য এতেই রয়েছে প্রভুর স্পষ্ট পথনির্দেশ।

বিশেষ করে হযরত ঈসা (আ.)-এর পরবর্তীকালে, অন্ধকার যুগে যখন কোনো পথনির্দেশ ছিল না তখন সকল খ্রিস্টান ও তথাকথিত আনুগত্যশীলদের জন্য খ্রিস্টপূর্ব এবং পরবর্তীকালীন প্রত্যাদেশসমূহের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে এ কিতাব ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। ইহুদিগণ এ সময়টিতে নিজেদের দুষ্ট স্বভাবের দরুন যিশুখ্রিস্টের বাণীসমূহ গোপন করে ফেলে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের কিতাবের বাণীই সমাজে প্রচলন ও প্রচার করবে এবং আজও তারা তাই করছে। এ জন্য আজ ৯৫ ধরনেরও বেশি বাইবেলের অনুবাদ দৃষ্ট হয়, কিন্তু পবিত্র কোরআন একটিই এবং মনুষ্যসমাজের সম্মুখে একটি নিদর্শন রাখার জন্য পবিত্র কোরআনে কোনো বিকৃতি ঘটতে দিবেন না আল্লাহ্ তাআলা। এটা হচ্ছে শেষ অবতীর্ণ কিতাব। আর কোনো কিতাবও আসবে না, অন্য কোনো নবীরও আগমন ঘটবে না।

মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন ইসলামের বিধান ও মৌল বিষয়গুলোর অনুসরণ এবং ঈমান, ইসলামি চেতনাবোধ বৃদ্ধি করা ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করা। তিনি যে ব্যক্তিই হোন না কেন, যদি ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা না দেন তবে তাঁকে অনুসরণের কোনো প্রয়োজন নেই। আর সে ব্যাখ্যা তো হবে শেষ ঐশী বাণীসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল যা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।

আজ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে মুসলমানদের নেতা হিসেবে ইমাম খোমেইনীর অভ্যুদয় ঘটেছে। তিনি পবিত্র কোরআন মুতাবিকই নির্দেশ দিচ্ছেন, যদিও অনেকের পক্ষে তা হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু তিনি ইরানবাসী এবং কালো আদমিদের অন্তর্ভুক্ত নন (এখানে যে নেতৃত্বের কথা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার মুক্তি ও কল্যাণের পথনির্দেশ দেওয়ার নেতৃত্ব, কোনো বিশেষ ইসলামি দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে ইরানের সঙ্গে একদেহে লীন হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে না), অতএব, তিনি কালো আদমিদের নেতা হতে পারেন না। কিন্তু এ ধরনের মন্তব্য অজ্ঞতা থেকেই উদ্ভূত।

এটা ভেবে দেখলে অনেকের জন্য সহায়ক হতে পারে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিনিধি ৪ কোটি আমেরিকাবাসীর দুরবস্থার বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং মার্কিন সমাজে এ জুলুম ও বৈষম্যের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করেছেন। ইনসাফকামী ইরানি জনতা যারা নিজেরাই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত, এরপরও তারা অপর মজলুম ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে, যে ভাইয়েরা আশায় বুক বেঁধে আত্মসাহায্যের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

উপসংহারে বলতে চাই, বিচারের দিনে আমরা অবলোকন করব কে অপরাধী ছিল। আল্লাহ্ তো আমাদের স্বেচ্ছাকৃত পাপের জন্যই শাস্তি বিধান করবেন, অনিচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য নয়। এখন যেহেতু আমরা ইসলাম সম্বন্ধে অবহিত, এজন্য অবশ্যই আমাদেরকে কোরআন পাক অধ্যয়ন করতে হবে, এর নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে এবং সাবধান থাকতে হবে যে, শয়তান যেন আমাদের ওয়াসওয়াসা দিতে না পারে। আল্লাহ্‌র কাছে পথনির্দেশ প্রার্থনা করুন। তিনি হচ্ছেন রাহমানুর রাহীম। সর্বশ্রেষ্ঠ মার্জনাকারী আমাদেরকে সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন।

(সূত্র : নিউজলেটার, এপ্রিল ১৯৮৬)