শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

মারইয়াম মির্যাখানির দেশে ইনফরমেটিক্স অলি¤িপয়াড

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১৫, ২০১৮ 

মোহাম্মদ কায়কোবাদ*

প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রদের নিয়ে আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলি¤িপয়াডের আসর এবার বসেছিল তেহরান শহরে। ইরান এর আগেও পদার্থবিজ্ঞানের অলি¤িপয়াড আয়োজন করেছে ২০০৭ সালে, আবার ২০২৩ সালেও আয়োজন করবে। ইনফরমেটিক্স অলি¤িপয়াডে বাংলাদেশের তিনজন স্কুল ছাত্র তাসমীম রেজা, রুহান হাবিব এবং রুবাব রেদওয়ান এবং নটরডেম কলেজের যুবায়ের রহমানের যাত্রা মারইয়াম মির্যাখানির দেশ ইরানে। ইরান জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তার অবস্থান সুদৃঢ় করেছে বেশ আগেই। প্রতিটি অলি¤িপয়াডে স্বর্ণপদক প্রাপ্তি ঘটছে অহরহ। আন্তর্জাতিক গণিত অলি¤িপয়াড থেকে ইরানের প্রাপ্তি ৪৩টি স্বর্ণ, ৯২টি রৌপ্য এবং ৩৯টি ব্রোঞ্জপদক। দেশভিত্তিক অর্জনে জাপান, তাইওয়ান কিংবা কানাডার থেকে ঢের এগিয়ে। ইনফরমেটিক্স অমি¤িপয়াডে ২২টি স্বর্ণ, ৫২টি রৌপ্য এবং ২২টি ব্রোঞ্জ। পদকের ভিত্তিতে র‌্যাংক করা হলে অষ্টম স্থানে ইরান। পদার্থবিজ্ঞানের অলি¤িপয়াড থেকে ইরানের অর্জন ৩৬টি স্বর্ণ, ৫৪ট রৌপ্য এবং ৩৩টি ব্রোঞ্জ। রসায়নশাস্ত্রের অলি¤িপয়াড থেকে এবার তিনটি স্বর্ণ পেয়েছে ইরান, গতবার পেয়েছিল দুইটি, বায়োলজির অলি¤িপয়াড থেকেও ইরান স্বর্ণপদক পাচ্ছে। জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতায় ইরানের সমকক্ষ কোন মুসলিম দেশ নেইÑ ইরান ঢের এগিয়ে। আন্তর্জাতিক গণিত অলি¤িপয়াড থেকে মারইয়াম মির্যাখানি দুইবার স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন যার মধ্যে ১৯৯৫ সালে পূর্ণ নম্বর পেয়ে। ১৯৯৮ সালে দেশভিত্তিক র‌্যাংকিং এ ইরান হয়েছিল প্রথম। প্রথম দশে ইরান অসংখ্যবার স্থান পেয়েছে।
এবারের আয়োজন আমার দেখা সকল ইনফরমেটিক্স অলি¤িপয়াডের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দলনেতাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে পার্সিয়ান আজাদি হোটেলে, প্রতিযোগীদের জন্য অদূরে অবস্থিত এভিন হোটেল। দুটিই তেহরান শহরের উত্তরে পাহাড় ঘেঁষে দামি জায়গায়। অনেক দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার সুযোগ ছিল, যার মধ্যে মিলাদ টাওয়ারÑ যা ইরানিদের দৃঢ়তার প্রতীক, দৃষ্টিনন্দন ওয়াটার অ্যান্ড ফায়ার পার্ক, আজাদী টাওয়ার, আজাদী স্কয়ার, ইরানের এমআইটি খ্যাত শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়।
পারস্যের সভ্যতা প্রাচীনতম, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ। তাই কখনো পারস্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা যায় নি। এমনকি ইসলাম ধর্মের স্বর্ণযুগেও আরব সভ্যতা পারস্যে বিস্তৃতি পায় নি। ইরানের জনগন আত্মমর্যাদাবোধে অতুলনীয়; বরং তাদের সভ্যতার বিস্তৃতি ঘটেছে ইতালি, গ্রীস, রাশিয়া এবং পূর্ব এশিয়াতে। মানব সভ্যতায় ইরানের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। মিলাদ টাওয়ারের একাধিক তলায় ইরানের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী এবং জ্ঞানতাপসদের জীবন্তসদৃশ ভাস্কর্য রয়েছে, তাও নানা শতাব্দীর। ইরানের প্রধান ভাষা পার্সিয়ান হলেও উত্তর পশ্চিমে আযারবাইজানের ভাষা, পশ্চিমে কুর্দি, উপসাগরীয় এলাকায় আরবি এবং কিছু এলাকায় বালুচ, আর্মেনিয়ান এবং জর্জিয়ান ভাষা অল্প পরিসরে চালু আছে। পার্সিয়ান সাহিত্য গ্যেটেসহ অনেক ইউরোপীয় বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিককে অনুপ্রাণিত করেছিল। ভারতবর্ষেও পারস্যের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রভাব কম নয়। এখানে কুলীন সমাজে ফারসি ভাষায় কথা বলা কিংবা ফারসি সংস্কৃতির চর্চা করার ঐতিহ্য ছিল। ইরানের সিনেমা গত দশ বছরে তিন শতটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে; আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মাজিদ মাজিদি কিংবা জাফর পানাহির নাম আন্তর্জাতিক সিনেমাজগতের সকলেই জানে। ইরানের সুস্বাদু সুগন্ধযুক্ত খাবারের কথা কে না জানে! আমার মনে হলো বাজারের এক তৃতীয়াংশ দোকানই নানা জাতীয় মসলায় ভরা। রুটির মধ্যে নান, হামির খুব জনপ্রিয়। চেলো হরেশ, শিশ কাবাব, চেলো কাবাব এবং মিষ্টির মধ্যে বাদাম দিয়ে বাক্লাভা, পানীয়ের মধ্যে শরবাতে পোর্তেকাল বেশ জনপ্রিয়।
ইরানের অনেক ঠিকানাÑ শেখ সাদীর দেশ ইরান, ওমর খৈয়ামের দেশ ইরান, হাফিযের দেশ ইরান, জালালুদ্দিন রুমির দেশ ইরান। ক¤িপউটার বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো এলগরিদমÑ এই নামের সূচনাও কিন্তু পারস্যের গণিতবেত্তা ও জ্যোতির্বিদ আল খারিজমির নাম থেকে এসেছে, যেমন হয়েছে ‘এলজেবরা’ শব্দের উৎপত্তি আলখারিজমির বই ‘ইল্ম আল জাব্র ওয়াল মুকাবালা’ থেকে। ‘ফাজি লজিক’ এর জনক লতফি জাদেহর নাম কে না জানে? সুতরাং জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইরানের অবদান প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। পৃথিবীর ব্যাসার্ধ হিসাব করে বের করেছেন আল বিরুনী, ইবনে সীনা এবং ওমর খৈয়ামও বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এরপরও আমার শিরোনাম কিছুটা ভিন্ন, কিন্তু বর্তমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র কিংবা জীববিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার থাকলেও গণিত কিংবা ক¤িপউটার বিজ্ঞানে এই পুরস্কার নেই। কানাডিয়ান গণিতজ্ঞ জন চার্লস ফিল্ড্সের অর্থায়নে ১৯৩৬ সালে গণিতের নোবেল পুরস্কার খ্যাত এই পুরস্কারটির সূচনা । এখন প্রতি চার বছরে দুই, তিন কিংবা চারজন অনূর্ধ্ব চল্লিশ বছর বয়সী বিজ্ঞানীকে এই পুরস্কার দেয়া হয় । ২০১৪ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মত এই পুরস্কার একজন ইরানি মহিলা গণিতজ্ঞ পান, যাঁর নাম মারইয়াম মির্যাখানি। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু এতটাই জটিল ছিল যে, সেক্ষেত্রটি শক্তিশালী গণিতবেত্তারাও এড়িয়ে গেছেন। তাঁর ফিল্ড্স মেডেল প্রাপ্তির সংবাদটি তিনি এমনকি তাঁর পিতামাতাকেও জানান নি। তবে তাঁরা যখন জিজ্ঞাসা করলেন না জানানোর কারণ কী তখন মারইয়াম বলেছিলেন, ‘এটা এমন বড় কিছু নয়।’ প্রচার সব সময়ই তিনি এড়িয়ে চলেছেন। ফিল্ড্স মেডেল গ্রহণের ক্ষেত্রে বলেছিলেন, এই পুরস্কারটি যাতে মহিলাদের অনুপ্রাণিত করে এজন্যই তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন। অবশ্যই প্রথম মহিলা ফিল্ড্স মেডেল বিজয়ী হিসেবে তিনি বহুবার শিরোনাম হতেই পারেন। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে স্ট্যানফোর্ডের এই অধ্যাপকের গত ১৪ জুলাইতে মহাপ্রয়াণের ঘটনা। প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও গণিতসহ টেকনোলজির বাইরে অন্যান্য বিষয়ও সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অতি সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এর গণিত ফ্যাকাল্টির নাম মির্যাখানির নামে করা হবে। ইরান তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উপযুক্ত স্বীকৃতি দিচ্ছে, গুণী মানুষের কদর করছে। স্বতঃস্ফূর্ত গণশোক হয়েছে নানা পার্কে এবং গুরুত্বপূর্ণ অডিটোরিয়ামে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে। তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করা হবে, তাঁর মেয়েকে কীভাবে ইরানি নাগরিকত্ব দেয়া যায় তা নিয়ে আইন পাশ হবে পার্লামেন্টে।
বিজ্ঞানের প্রতি ইরানিদের যে ভালোবাসা, তা টের পেলাম ইনফরমেটিক্স অলি¤িপয়াডে এসে। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের ছবিসহ আবিষ্কারের নানা তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে তোরণ যাতে কোন বিদেশির দৃষ্টি না এড়ায়। এক মেয়ে স্বেচ্ছাসেবককে জিজ্ঞাসা করলাম মির্যাখানিকে চেনে কিনা। অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করলো আমরা একই বিভাগের ছাত্রী। এমনকি এই অলি¤িপয়াডেও আমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন প্রোগামিং প্রতিযোগিতা করা স্বাস্থ্যগত কারণে হুইল চেয়ারের বাসিন্দা অধ্যাপক ঘোদসীকে যে সম্মান জানানো হলো তাতে অভিভূত হয়ে গেলাম।
আমার বদভ্যাস তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীকে দেখলেই সমস্যা দেয়া। বিদেশ বিভুঁইয়ে এর ব্যতিক্রম হলো না। শরীফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবয়বে ছোটোখাটো এক ছাত্রী স্বেচ্ছাসেবককে এরকম একটি সমস্যা দিলাম। প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও শেষাবধি সমাধান বের করে ফেললো। তারপর আবার আরেকটি সমস্যা চাইল। আরেকটি সমস্যা দিলাম। সেটাও সে কিছুক্ষণ পরে করে নিয়ে আসলো আবার আরেকটি সমস্যা চাইতে। আমি তাকে বললাম আনন্দ-ফূর্তি কর, সমস্যা সমাধানের এত দরকার কী! জানালো সমস্যা সমাধান করতে তার বেশ ভালো লাগে। ভাবলাম হয়তো বা ইরানের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়েটির সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। তাই একজন লম্বা ছেলেকেও একটি সমস্যা দিলাম। দেখলাম সেও পারে। আমি এই ছেলেমেয়েদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি ইরানীদের অন্যরকম আকর্ষণ, অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধ। নানারকম অলি¤িপয়াড প্রতিযোগিতায় ইরানের যে সাফল্য তার থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা কঠিন নয় যে, আগামীতে ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিশ্বে তার অবস্থান আরো শক্তিশালী করবে, পারস্যের হৃত সোনালি দিন আবার ফিরে আসবে। আমার নিজের নাম পারস্যের একটি রাজবংশের এক রাজার নাম থেকে ধার করা বলে নিজেও ইরানের জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার সাফল্যে বেশ একটু গর্ববোধ করছি।

*অধ্যাপক, ক¤িপউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়