শনিবার, ২৪শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৯ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

মানব সভ্যতা ও ধর্ম

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২৬, ২০১৬ 

news-image

বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আদর্শগত এক শূন্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে বাস্তবতা থেকে মানুষকে দুর্নীতির ঘূর্ণাবর্তে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের জটিল আদর্শ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে যতই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ততই ধর্মভিত্তিক চিন্তা ও সংস্কৃতির বিপুল ঐশ্বর্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ। এভাবে মানুষের সৃষ্টিশীল প্রতিভার অপচয় ঘটছে। বর্তমানের হতাশাগ্রস্ত ও বিক্ষিপ্ত প্রজন্মের সামনে এমন সব ধারণা তুলে ধরা হচ্ছে যা এসেছে সংকীর্ণমনা, মূর্খ দার্শনিক ও পণ্ডিতদের কাছ থেকে। এসব চিন্তা ও ধারণা বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণে সচেষ্ট তবে জীবনের উদ্দেশ্য বা অর্থ বুঝাতে ব্যর্থ। আধুনিক ধ্যান-ধারণার অন্তর্নিহিত এক মাত্রিক চিন্তাধারা আজকালকার অতি সংবেদশনশীল মন-মানসিকতার উপযুক্ত খোরাক নয়। যেহেতু বুদ্ধি এবং যুক্তি এখনো টিকে আছে আমাদের মাঝে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানব ইতিহাসের সকল অসাম্য, হিংসা-বিদ্বেষ, ঘাত-প্রতিঘাত এবং অনিয়ম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে পারস্পরিক মত দ্বৈধতার কারণে।

আমরা বিশ্বাস করি ইসলাম এবং এর আদর্শ তাহওহীদের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এতে রয়েছে বস্তুজগতের সুগভীর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং অদৃশ্য জগতের বাস্তবতার উপলব্ধি। এই ইসলামী আদর্শ তার মনুষ্যত্বের সকল দিক সম্পর্কে জ্ঞান দান করে। মানুষের মধ্যকার সকল মতবিরোধ এবং অসংগতির সুষ্ঠু সমাধানের এবং মানুষকে তার ভবিষ্যৎ জীবনের নিশ্চয়তা বিধানের নিমিত্ত যথাযথ সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের প্রতি পরিচালিত করার সামর্থ্য এর রয়েছে।

বিশ্বজনীন আদর্শ ও চিরন্তন মূলনীতি থাকলেও প্রতিটি ধর্ম বিশ্বাসেরই প্রয়োজন রয়েছে যুগোপযোগী প্রতিটি প্রজন্মের প্রয়োজনে নিজেদের উপস্থাপনা করা। আধুনিক বাজে দর্শনের এবং বৈজ্ঞানিক নবচেতনার মোকাবেলায় মৌলিক বিষয়াদির আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। যে সকল আধ্যাত্মিক সাধক ও চিন্তাবিদ এ ব্যাপারে সম্যক ওয়াকেবহাল তাঁদের অবশ্যই উচিত ইসলামের উৎস থেকে এসব প্রশ্নের সুষ্ঠু এবং বিশদ জবাব দানে সচেষ্ট হওয়া। ইসলামের উন্মুক্ত এবং প্রগতিশীল আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে জ্ঞানীদেরকে সত্য তুলে ধরতে হবে এবং বিশ্বের কাছে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতিসমূহ তুলে ধরতে হবে।

মানুষের ধর্মচেতনার উৎপত্তি এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবহতির জন্য পণ্ডিতবর্গ এবং গবেষকবৃন্দ ব্যাপক গবেষণায় রত। প্রকৃতপক্ষে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ধর্ম বিশ্বাস মানব সমাজের গঠন প্রকৃতির অন্যতম অংশ হিসাবে বিদ্যমান। অতীতে বা বর্তমানে এমন কোন মানব সমাজ দৃষ্টিগোচর হয় না যেখানে ধর্মীয় ব্যাপার উত্থাপিত হয়নি।

কুরআনুল করীমের বিভিন্ন আয়াতে এই ঐতিহাসিক সত্যের অবতারণা করে বলা হয়েছে অতীতের বিভিন্ন জাতির কাছে আল্লাহর নবী-রাসূলগণ এসেছেন দীনের বাণী প্রচার করতে এবং মানব সভ্যতার উন্নয়নে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।

প্রাচীন ইতিহাস এবং মানুষের জীবন বৃত্তান্তের ইতিহাস অধ্যয়ন করে জানা যায় মানুষ তার সভ্যতা বিকাশের আগে থেকেই ধর্মীয় ব্যাপারে সচেতন ছিল। মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রথম সময়কালটি আদি ধর্ম বিশ্বাসের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি। বরং এটা দাবি করা যায় যে, ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে মানুষ যতটা মাথা ঘামিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার জন্য ততটা মাথা ঘামায়নি। মানব ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাবের চেয়ে এই সব ধর্ম বিশ্বাসের প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। কারণ, এই অতিপ্রাকৃতিক বাস্তবতাই মানুষের বিজ্ঞান ও শিল্প চিন্তার পিছনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

নিঃসন্দেহে বলা যায় ধর্মবিরোধী এবং খোদাদ্রোহী দলগুলোর আবির্ভাবের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল কিছু কিছু ধর্মানুসারীর ভুল শিক্ষালাভ, পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব এবং বিকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক মানসিকতা। মানুষ কেন ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হলো তার কারণ অনুসন্ধান করতে  হলে সর্বাগ্রে প্রতিটি ধর্মের বিবিধ বৈচিত্র্য এবং আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবশ্যই আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে।

মানব জাতির বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে প্রায়ই কোন না কোন দিক দিয়ে ধর্মের একটা যোগ দেখা যায়। ধর্ম যদি বুনিয়াদি কোন ব্যাপার না হতো তাহলে আজকাল তাকে বস্তুজগতের চার দেয়ালেই আবদ্ধ হয়ে থাকতে হতো। যাই হোক এমন কি জিনিসের দ্বারা বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যত্ত্বিত্ব নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলে এতো বেশি দৃঢ় ও আস্থাশীল থেকেছেন? তা কি ছিল নিছক পার্থিব স্বার্থ হাসিল ও ব্যক্তিগত উপকার লাভের খায়েশ? কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা দেখতে পাই তাঁরা ধর্মীয় আদর্শের জন্য নিজেদের আরাম-আয়েশ, ধন-সম্পদ সবই অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। এমনকি এ জন্য নিজেদের জীবনকেও উৎসর্গ করেছেন। আসলে কি জিনিস বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে সেটা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। এটা করতে গেলে প্রথমেই আমাদের আধুনিক বিশ্বে ধর্ম কি কি ভূমিকা পালন করে তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তারপর আমরা ধার্মিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান পৃথিবীর প্রকৃত অবস্থা পর্যালোচনা করতে পারি।