সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

মানবজাতির অনন্য গৌরব ইমাম হুসাইন (আ.)

পোস্ট হয়েছে: মে ৩, ২০১৭ 

news-image
হিজরি চতুর্থ সনের তৃতীয় শাবান মানবজাতি, বিশেষ করে ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য ও অফুরন্ত খুশির দিন। কারণএই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দ্বিতীয় নাতি তথা বেহেশতী নারীদের নেত্রী হযরত ফাতিমা (সা.) ও বিশ্বাসীদের নেতা তথা আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর সুযোগ্য দ্বিতীয় পুত্র এবং ইসলামের চরম দুর্দিনের ত্রাণকর্তা ও শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর প্রাণপ্রিয় নাতি হযরত হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে নিজের সন্তান বলে অভিহিত করতেন। এ ছাড়াও তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই হাসান ও হুসাইন জান্নাতে যুবকদের সর্দার।” (জামে আত-তিরমিজিহাদিস নং-৩৭২০)
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্মলগ্নে তাঁর মায়ের সেবা করছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর ফুপু সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব। রাসূল সে সময় তাঁর ফুপুর কাছে এসে বলেনহে ফুপুআমার ছেলেকে আমার কাছে কাছে আনুন। তখন সাফিয়া বললেনআমি তাঁকে এখনও পবিত্র করিনি। বিশ্বনবী (সা.) বললেন, “তাঁকে তুমি পবিত্র করবেবরং আল্লাহই তাঁকে পরিষ্কার ও পবিত্র করেছেন।” ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্মের পর তাঁর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইক্বামত পাঠ করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.)। মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি এই শিশুর নাম রাখেন হুসাইন। এ শব্দের অর্থ সুন্দরসতভালো ইত্যাদি।
হযরত ইমাম হুসাইন বিন আলী (আ.) ছয় বছরেরও কিছু বেশি সময় পর্যন্ত নানা বিশ্বনবী (সা.)-এর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। হযরত সালমান ফারসি (রা.) বলেছেনএকদিন দেখলাম যেরাসূল (সা.) হুসাইন (আ.)-কে নিজের জানুর ওপর বসালেন ও তাঁকে চুমু দিলেন এবং বললেন,
” তুমি এক মহান ব্যক্তি ও মহান ব্যক্তির সন্তান এবং মহান ব্যক্তিদের পিতা। তুমি নিজে ইমাম ও ইমামের পুত্র এবং ইমামদের পিতা। তুমি আল্লাহর দলিল বা হুজ্জাত ও আল্লাহর হুজ্জাতের পুত্র এবং আল্লাহর নয় হুজ্জাতের (বা নয় ইমামের) পিতাআর তাদের সর্বশেষজন হল মাহদী।” 
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও ইমাম হুসাইনের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও খোদায়ী সম্পর্কের সর্বোচ্চ বর্ণনা ও সবচেয়ে আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মহানবীর এই হাদিসে: ‘হুসাইন আমা থেকে এবং আমি হুসাইন থেকে।’
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেনযে-ই চায় আকাশগুলোর বাসিন্দা ও পৃথিবীর বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিকে দেখতেতাহলে তার উচিত হুসাইনের দিকে তাকানো। (মিজান আল হিকমাহহাদীস নং ৪৩২)
রাসূল (সা.) বলেছেন, ” আর হুসাইনের বিষয়েসে আমার থেকেসে আমার সন্তানআমার বংশমানবজাতির মধ্যে তার ভাইয়ের পরে শ্রেষ্ঠ। সে মুসলমানদের ইমামমুমিনদের অভিভাবকজগতসমূহের রবের প্রতিনিধিতাদের সাহায্যকারী যারা সাহায্য চায়তাদের আশ্রয় যারা আশ্রয় খোঁজেসে আল্লাহর দলিল বা প্রমাণ গোটা সৃষ্টিজগতের জন্যসে বেহেশতের যুবকদের সর্দারউম্মতের নাজাতের দরজা। তার আদেশই হল আমার আদেশতার আনুগত্য করা হল আমারই আনুগত্য করা। যে-ই তাকে অনুসরণ করে সে আমার সাথে যুক্ত হয় এবং যে তার অবাধ্য হয় সে আমার সাথে যুক্ত হতে পারে না।” (মিজান আল হিকমাহহাদিস নম্বর-৪২৮)
বারাআ ইবনে আযিব বলেছেনআমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি ইমাম হুসাইন (আ.)-কে বহন করছেন এবং বলছেন, ” হে আল্লাহনিশ্চয়ই আমি তাকে ভালবাসিতাই আপনিও তাকে ভালবাসুন।” (মিজান আল হিকমাহহাদিস-৪২৯বুখারিহাদিস-২১৫০মুসলিমহাদিস-৬০৭৭)
হাকিমের আমালি‘-এর সূত্রে নাক্কাশের তাফসির থেকে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা এসেছে যেতিনি বলেছেনএকদিন আমি রাসূল (সা.)-এর সামনে বসেছিলাম। এ সময় তাঁর ছেলে ইবরাহীম তাঁর বাম উরুর ওপরে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর ডান উরুর ওপরে বসা ছিলেন। রাসূল (সা.) তাঁদের একজনের পর আরেকজনকে চুমু দিলেন। হঠাত জিবরাইল অবতরণ করলেন ওহি নিয়ে। যখন ওহি প্রকাশ শেষ হল তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ” আমার রবের কাছ থেকে জিবরাইল এসেছিলেন এবং আমাকে জানিয়েছেন যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং বলেছেন যেতিনি এ দুই শিশুকে একত্রে থাকতে দিবেন না এবং একজনকে অপরজনের মুক্তিপণ (বিনিময়) করবেন।”
রাসূল (সা.) ইবরাহীমের দিকে তাকালেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, ” তার মা একজন দাসী (মারইয়াম-মিশরীয় কিবতি)যদি সে মারা যায় আমি ছাড়া কেউ বেদনা অনুভব করবে নাকিন্তু হুসাইন হল ফাতিমা এবং আমার চাচাতো ভাই আলীর সন্তান এবং আমার রক্ত-মাংস। যদি সে মারা যায় শুধু আলী এবং ফাতিমা নয় আমিও ভীষণ ব্যথা অনুভব করব। তাই আলী ও ফাতিমার শোকের চেয়ে আমি আমার শোককে বেছে নিচ্ছি।
ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেনআমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষাতে গিয়েছিলাম যেখানে উবাই বিন কাব তাঁর সঙ্গে ছিলেন। রাসূল (সা.) আমাকে বললেন, ‘স্বাগতম! হে আবা আবদিল্লাহহে আকাশসমূহ ও পৃথিবীসমূহের সৌন্দর্য।‘ এতে উবাই বললহে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আপনি ছাড়া অন্য কারো জন্য এটি কি করে সম্ভব যে সে আকাশ ও পৃথিবীসমূহের সৌন্দর্য হবে?তিনি বললেনহে উবাইআমি তাঁর শপথ করে বলছি যিনি আমাকে তাঁর অধিকার বলে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেননিশ্চিতভাবেই হুসাইন বিন আলীর মূল্য আকাশ ও পৃথিবীসমূহের চেয়ে বেশি এবং নিশ্চয়ই (তার বিষয়ে) আল্লাহর আরশের ডান দিকে লেখা আছে : হেদায়াতের আলোনাজাতের তরীএকজন ইমামদুর্বল নয়মর্যাদা ও গৌরবের (উতস)এক সুউচ্চ বাতিঘর এবং মহামূল্যবান সম্পদ।‘ (মিজান আল হিকমাহহাদিস নম্বর ৪৩৩)
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন সম্মানদয়াবীরত্বশাহাদতমুক্তি ও মহানুভবতার আদর্শ। তাঁর আদর্শ মানবজাতির জন্য এমন এক ঝর্নাধারা বা বৃষ্টির মত যা তাদের দেয় মহত জীবনগতি ও আনন্দ। মানুষের জীবনের প্রকৃত মর্যাদা ও প্রকৃত মৃত্যুর সংজ্ঞাকে কেবল কথা নয় বাস্তবতার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়ে অমরত্ব দান করে গেছেন এই মহাপুরুষ। বিশেষ করে আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও শাহাদাতকে তিনি দিয়ে গেছেন অসীম সৌন্দর্য। তাই যুগে যুগে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে হুসাইন (আ.) হয়ে আছেন গৌরবময় জীবন ও মৃত্যুর আদর্শ এবং আল্লাহর পথে শাহাদাতের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় রূপকার। আধুনিক যুগের বিস্ময় ইরানের ইসলামি বিপ্লবসহ যুগে যুগে ন্যায়বিচারকামী বহু বিপ্লব ও জুলুমবিরোধী আন্দোলনের মূল প্রেরণা হল ইমামের রেখে যাওয়া কারবালা বিপ্লব। বিশ্বের প্রকৃত মুমিন ও বিপ্লবীদের একটি প্রধান স্লোগান হল, ‘প্রতিটি ময়দান কারবালা ও প্রতিটি দিনই আশুরা’কিংবা প্রতিটি কারবালার পরই পুনুরুজ্জীবিত হয় ইসলাম।
কারবালার মহাবিপ্লবের রূপকার ইমাম হুসাইন (আ.) মানবজাতির ওপর ও বিশেষ করে  প্রকৃত মুমিন মুসলমানদের ওপর যে গভীর প্রভাব রাখবেন সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.)। তিনি বলেছেন, ” নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে হুসাইনের শাহাদাতের ব্যাপারে এমন ভালোবাসা আছে যেতার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হয় না। ” (মুস্তাদরাক আল-ওয়াসাইলখণ্ড-১০পৃষ্ঠা-৩১৮)
ইমাম জাফর আসসাদিক্ব (আ.) বলেছেন, “আমাদের (তথা রাসূল সা. র) আহলে বাইতের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে তার কারণে যে শোকার্ততার দীর্ঘশ্বাস হল তাসবীহ এবং আমাদের বিষয়ে তার দুশ্চিন্তা হল ইবাদত এবং আমাদের রহস্যগুলো গোপন রাখা আল্লাহর পথে জিহাদের পুরস্কার বহন করে।” এরপর তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই এ হাদিসটি স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখা উচিত।
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) কেবল জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও মুক্তিকামী মানুষেরই আদর্শ ছিলেন নাসর্বোত্তম জিহাদ তথা আত্ম-সংশোধন ও পরিশুদ্ধিরও মূর্ত প্রতীক। অন্যদেরকে সতকাজের দিকে ডাকার ও অসত কাজে নিষেধ বা প্রতিরোধের শর্ত হলসবার আগে নিজেকেই পরিশুদ্ধ করা।
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সাতান্ন বছরের জীবনের প্রতি সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি দিলে দেখা যায়ইমাম ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিনম্রতাদয়াক্ষমাশীলতাপরোপকার এবং খোদাভীরুতা ও খোদাপ্রেমের ক্ষেত্রেও মানবজাতির জন্য শীর্ষস্থানীয় আদর্শ। নামাজ আদায়কুরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া ও ইস্তিগফারের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন পিতা ও বিশ্বনবী(সা.)-এর ধারার স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি। হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)  দিন ও রাতে কয়েক শত রাকাত নামাজ আদায় করতেন। এমনকি জীবনের শেষ রাতেও তিনি দোয়া ও প্রার্থনা থেকে হাত গুটিয়ে নেননি। কারবালায় শত্রুদের কাছ থেকে সময় চেয়েছিলেন যাতে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে একাকী প্রার্থনায় বসতে পারেন। তিনি বলেছিলেনআল্লাহই ভাল জানেন যেআমি নামাজকুরআন তিলাওয়াতঅত্যধিক দোয়া-মুনাজাত ও ইস্তিগফারকে কত ভালোবাসি!
ইমাম হুসাইন (আ.) অনেকবার পদব্রজে কাবা গৃহে ছুটে গেছেন এবং হজ পালন করেছেন। ইমাম শাহাদাত বরণ করলে জনগণ তার পবিত্র পিঠে কিছু পুরনো দাগ দেখতে পায়। এর কারণ সম্পর্কে ইমাম আলী বিন হুসাইন আস সাজ্জাদ (আ.)-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনএগুলো হল সেইসব খাদ্যের বস্তার ছাপ যা আমার পিতা রাতের বেলায় কাঁধে করে বিধবা মহিলা ও ইয়াতিম শিশুদের ঘরে পৌঁছে দিতেন।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা ও সার্বিকতা প্রসঙ্গে মিশরিয় চিন্তাবিদ আবদুল্লাহ আলায়েলি বলেছেন, “ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মহত্ত্ব ও মর্যাদা এক বিশাল জগত জুড়ে ঘিরে আছে যার নানা দিক এতই ব্যাপক ও অশেষ যে এর প্রতিটি দিকই ইতিহাসে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। তাই মনে হয়তিনিই সব উচ্চ মর্যাদা ও শীর্ষস্থানের সমষ্টি।”
মহান আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি যে তিনি মানব জাতিকে এমন একজন মহামানব উপহার দিয়েছেন। এবারেইমাম হুসাইন (আ.)-এর কয়েকটি অমর বাণী তুলে ধরব:
বেহেশত ছাড়া অন্য কিছু মানুষের জীবনের মূল্য হওয়া উচিত নয়। তাই জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুর বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করো না।
শাস্তির ভয়ে বা পুরস্কারের লোভে যে ইবাদত তা ব্যবসায়ীর বা দাসত্বের ইবাদত। সর্বোত্তম ইবাদত হল শোকর আদায়ের ইবাদত এবং এই ইবাদত হল মুক্ত মানুষের ইবাদত।
– পরীক্ষা বা ক্ষতির মুখোমুখি হলে খুবই কম মানুষই ধর্মের পথে অবিচল থাকে।