রবিবার, ১৬ই জুন, ২০১৯ ইং, ২রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ভ্রমণ (ইরানে পাঁচ দিনের সফর)

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১০, ২০১৬ 

এ, কে, এম, বদরুদ্দোজা
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ড. জহিরউদ্দিন মাহমুদ জানালেন ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে ২৩-২৪ নভেম্বর, ২০১৪ চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলন সম্পর্কে একটি বিশ্ব কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। এতে বাংলাদেশ থেকে তিনজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেই তিনজনের মধ্যে আমিও আছি। বাকি দু’জন নিজ নিজ অঙ্গনে স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব প্রফেসর মাওলানা মোহাম্মাদ সালাহউদ্দিন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র অসন্তোষের কারণে প্রফেসর আনোয়ারুল আজিমের যাওয়া হয়নি।
আমাদের সফরসূচি ছিল ২১ থেকে ২৬ নভেম্বর। ২১ নভেম্বর সকালে আমি এবং প্রফেসর মাওলানা সালাহউদ্দিন ধানমন্ডিস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কালচারাল কাউন্সেলর জনাব আসগার খসরুয়াবাদীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হই। তিনি জানান ইরানের দুই বর্ষীয়ান ও নেতৃস্থানীয় ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মাকারেম সিরাজী এবং আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী মুসলিম বিশ্বে চলমান চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলনের বিপদ ও মুসলিম উম্মাহর করণীয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে একটি ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের আয়োজন করেছেন। এতে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল ধর্মীয় নেতা, ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেবেন। কালচারাল কাউন্সেলর ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে যায়নবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নস্যাৎ করতে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম উম্মাহর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
আমাদের ফ্লাইট রাত ৭টায়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে ঢুকে দেখলাম মাওলানা সালাহউদ্দিন নিয়ে ট্রলি এগুচ্ছেন। আমাকে পেয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেন। আমিও স্বস্তি পেলাম। বোর্ডিং কার্ড নিয়ে ইমিগ্রেশন সেরে ইত্তিহাদ এয়ার ওয়েজের আবুধাবীগামী ফ্লাইটে চেপে বসলাম। সহযাত্রীদের অধিকাংশই সংযুক্ত আরব আমীরাতে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিক। বয়সে তরুণদের সংখ্যা বেশি। তাদের অনেকেই মাওলানা মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে চিনে। সেই সুবাদে চলতে থাকে কুশল বিনিময়ের পালা। ৫ ঘণ্টার লম্বা প্লেন জার্নি শেষে গভীর রাতে পৌঁছলাম আবুধাবী বিমানবন্দরে। বিমানবন্দর তো না, যেন বিমানের হাট। বড় মাঝারি ছোট অসংখ্য বিমানের সমারোহ। আবুধাবী বিমানবন্দরও বিশালায়তনের। আমি ও মাওলানা একের পর এক অনেকগুলো চলন্ত পথ পেরিয়ে ইত্তিহাদের ইরানগামী ফ্লাইটের যাত্রী লাউঞ্জে এসে বসলাম। ইত্তিহাদের মাঝারি ধরনের একটা বিমানে চেপে দু’ঘণ্টার পথ পেরিয়ে ইরানের ইমাম খোমেইনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলাম স্থানীয় সময় রাত ৩টায়। টার্মিনালের ভেতরে দু’জন পাশাপাশি হাঁটছি। বেশিদূর এগুতে হলো না। ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের এক তরুণ অভ্যর্থনা কর্মী আমাদের পরিচয় জেনে নিয়ে গেলেন ভিআইপি কক্ষে। সেখানে চা বিস্কুট খেলাম। উদ্যোক্তাদের অনেকেই এসে স্বাগত জানালেন। কুশলাদি বিনিময় হলো। আমাদের সাথে একই ফ্লাইটে ইরানে এসেছেন ইন্দোনেশিয়ার ৭জন প্রতিনিধি। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাদের সাথে একত্রে একটি মাইক্রোবাসে করে রওয়ানা হলাম কোমের পথে। উজ্জ্বল সোডিয়াম বাতির আলোয় উদ্ভাসিত পথ ধরে আমরা যাচ্ছি কোমে। ফজরের নামাযের আযান শুনতে শুনতে গাড়ি থেকে নামলাম। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কোমের ইসতিকলাল হোটেলে। রুমে ঢুকে নামায সেরে নাস্তার জন্য রেস্টুরেন্টে নামলাম। মেলা আয়োজন। ডালের সাথে ছোলা ও বাদামের তৈরি দু’রকম স্যুপ। ইরানী রুটির সাথে জেলি, বাটার, সব্জি, হালুয়া। সাথে কফি, চা, দুধ এবং রকমারি ফলমূল। সেদিন ছিল শুক্রবার। হোটেলের নামায কক্ষে নামায পড়ে লাঞ্চ করতে গেলাম। স্যুপের সাথে ইরানের ঐতিহ্যবাহী কাবাব, সুস্বাদু ভাত, ফ্রায়েড মাছসহ রকমারি খাবার। ডেজার্টও বৈচিত্র্যময়। পুডিং ফিরনি পায়েশ। সেদিন বিকেলে ও রাতে দেখা করতে এলেন কোমের দুই বাংলাদেশী উচ্চতর শিক্ষার্থী মুনীর হোসেন খান ও আনোয়ারুল কবীর আরিফ। তাঁদের কাছ থেকে ইসলামের নামে চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলন সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া গেল।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে কোমের আরেক বাংলাদেশী ছাত্র রাকীবকে নিয়ে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে ‘হারাম’ খ্যাত বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতাদের ও এক তাপসীর কবরস্থান দেখতে গেলাম। এখানেই পর পর শুয়ে আছেন বড় বড় আলেম ও ইমাম রেযার বোন তাপসী ফাতেমা মাসুমা। বিশাল কমপ্লেক্স। বাহারি সিরামিকের তৈরি দেয়াল পরিষ্কার তকতকে। অবিরাম সমাগত হচ্ছেন বিপুল নরনারী। তেলাওয়াত, বয়ান ও দরুদ হচ্ছে। বিশাল কবরস্থান, দশটি কম্পাউন্ডে বিভক্ত। কোথাও নেই জটাধারীদের ভীড়, ন্যূনতম অস্বচ্ছতা। হারাম কমপ্লেক্সের একাধিক চেম্বারে বসেন একদল আলেম- পুরুষ ও মহিলা। দর্শনার্থীরা তাঁদের নিকট থেকে নানা বিষয়ে উপদেশ-পরামর্শ নেন।
শনিবার বিকেলে আবারও আসেন মুনীর। তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ হয় রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগের সৈয়দ মুসা রেযা ও নাছির মাহমুদের সাথে। শুক্র ও শনিবার দু’দিনসহ বেশির ভাগ সময় কাটাই ইসতিকলাল হোটেলে। লবিতে রেস্টুরেন্টে কথা হয় ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, জাপান, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের প্রতিনিধিদের সাথে। জেহাদের নামে চরমপন্থা ও তাকফিরি আন্দোলনের বিপদ নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। সিরিয়া ও ইরাকে আইএস-র নামে আত্মঘাতী যুদ্ধ নিয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি। পাশাপাশি পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর সাথে তালেবানদের লড়াই নিয়েও আছে উদ্বেগ। সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তি বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম থেকে ফোকাস সরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ভাতৃঘাতী যুদ্ধে মুখোমুখি করছে মুসলিম জনতাকে। তাতে মদদ দিচ্ছে ওয়াহাবী মতবাদপুষ্ট আরব রাজন্যবর্গ। এরা প্রথমে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারকে উৎখাতের জন্য আইএসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে বলীয়ান করে। এখন সেই আইএসকে নির্মূল করার নামে এ অঞ্চলে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তানে তালেবান নির্মূলের নামে বিভিন্ন জনপদে চলছে ড্রোন হামলা। অথচ একদিন যুক্তরাষ্ট্রই পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় তালেবান তৈরি করে। বহুল আলোচিত আল-কায়দা নেটওয়ার্কও তাদের মদদে সৃষ্ট। ইসলামে জবরদস্তির স্থান নেই। এটি সৌন্দর্য ও মানবকল্যাণের ধর্ম। অথচ আইএসের মতো তাকফিরি আন্দোলনের দৃষ্টিতে তাদের মুসলিম প্রতিপক্ষ কাফেরদের চেয়েও ঘৃণা ও প্রতিহিংসার পাত্র। তারা সিরিয়া ও ইরাকে এবং হালে লিবিয়ায় মুসলিম ভাইদের রক্তে হাত রঞ্জিত করছে। মহান ধর্ম  ইসলামকে অপমানিত করছে তাদের নৃশংসতা । আইএস যেভাবে ধৃত ব্যক্তিদের নির্মম হত্যার পর তার ভিডিও চিত্র প্রচার করছে তা বিভীষিকাময়। এটা ইসলামসম্মত নয়। আবু জেহেলের স্ত্রী হিন্দা হযরত আমীর হামযা (রা.)-এর কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল। এখন আইএস-ও তাই করছে।
২৩ মার্চ রোববার কোমের একটি সুবিশাল ধর্মীয় স্থাপনায় উদ্বোধন হয় চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলনবিরোধী ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মাকারেম সিরাজী চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলনের উত্থান ও বিপদ সম্পর্কে তথ্যবহুল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীল নকশায় তাকফিরি আন্দোলনের উত্থান হয়েছে বলে জানান। রোববার বিকেলে সম্মেলনে ৮৩টি দেশ থেকে আগত ৩১৮ জন প্রতিনিধি ৪টি কমিশনে বিভক্ত হয়ে কংগ্রেসের প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করে নানা রকম প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ৪ নম্বর কমিশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় মসজিদের খতিব প্রফেসর মাওলানা সালাহউদ্দিন। তিনি সূচনা বক্তব্যে ধর্মে কোন বাড়াবাড়ি ও জোরজবরদস্তির স্থান নেই বলে উল্লেখ করে প্রাসঙ্গিক কোরআনের আয়াত ও হাদীস থেকে উদ্ধৃতি দেন।  এই কমিশনে আমিও সংক্ষেপে বক্তৃতা দেই। বক্তৃতায় আমি বলি যে, বুলেট দিয়ে কোন আদর্শ কায়েম করা যায় না। একটি বুলেট একজন মানুষের প্রাণ হরণ করতে পারে, কিন্তু একটি আইডিয়া  বা আদর্শ দিয়ে লাখো মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। বিশ্বে কোন আদর্শ গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তেমন হলে তায়েফে কাফেরদের হাতে প্রহৃত হবার পর আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ (সা.) তাদের জন্য আল্লাহর গজব চাইতে পারতেন। তিনি তা না করে ভবিষ্যতে তাদের হেদায়াতের জন্য প্রার্থনা করেন। আমি ইসলামের নামে চরমপন্থা ও তাকফিরি আন্দোলনের বিপদ সম্পর্কে যুব সমাজকে সচেতন করার এবং তাদের সাথে নিরন্তর সংলাপের আহ্বান জানাই। সম্মেলনে চারটি ভাষায় বক্তব্য অনুবাদের ব্যবস্থা থাকায় অনেকে আমার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। সম্মেলন স্থলটির কথা না বললেই নয়। বিশাল গম্বুজের নিচে মূল মিলনায়তনের ধারণক্ষমতা এক হাজার। মিলনায়তনের বিভিন্ন স্থানে খচিত আল্লাহর পবিত্র কালাম। মূল মিলনায়তন ছাড়াও আছে আরো অনেকগুলো সভাকক্ষ, লাইব্রেরি, আইটি রুম এবং সুপরিসর মসজিদ। সম্মেলন চলাকালে আমরা এই মসজিদেই আছর ও মাগরিবের নামায আদায় করি। ইরানে মাগরিবের নামায শেষে স্বল্প বিরতির পর এশার নামায অনুষ্ঠিত হয়। নামাযের আঙ্গিকও আমাদের মতোই। কেবল চার রাকাতের নামাযে দু’রাকাত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে ক্ষণিকের জন্য দু’হাত তুলে প্রার্থনাটাই আলাদা।
কংগ্রেসের দ্বিতীয় দিন ২৪ মার্চ সোমবার বিভিন্ন দেশের অর্ধ শতাধিক প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেন। ইরাকের একজন ধর্মীয় নেতা মর্মস্পর্শী ভাষায় আইএসের নির্মমতার বিবরণ দেন। বিকেলের অধিবেশনে সঞ্চালকের দায়িত্ব নেন ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলী আকবর বেলায়েতী। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় উপভোগ্য হয়ে ওঠে জটিল ও সারগর্ভ আলোচনা। সমাপনী অধিবেশনে আরেক প্রবীণ ইরানী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী মুসলিম বিশ্বে চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি কংগ্রেস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ ও স্মারকের মোড়ক উন্মোচন করেন। সম্মেলন চলাকালে একটি বিষয় আমাকে বিস্মিত করে। সাধারণভাবে একটি প্রচারণা আছে যে, শিয়া অধ্যুষিত ইরানে রাসূলে পাক (সা.)-এর বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হয় না? অথচ সম্মেলনে যখনই কোন বক্তা নবী করিম (সা.)-এর নাম নিয়েছেন তখনই গোটা মিলনায়তন প্রকম্পিত করে ধ্বনি ওঠে ‘আল্লাহুমা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ’। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। কংগ্রেসের প্রতিটি অধিবেশনের শুরুতে পবিত্র কোরআনের সুললিত তেলাওয়াত মন কেড়ে নিত। সমাপনী অনুষ্ঠানের শেষ উপস্থাপনাও ছিল তেলাওয়াত। আল কোরআনের দোয়া সম্বলিত একাধিক আয়াতের মর্মস্পর্শী তেলাওয়াতে মিলনায়তন জুড়ে পিনপতন নীরবতার মধ্যে ক্রন্দনের রোল ওঠে।

২৪ নভেম্বর গভীর রাতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানী তেহরানের আলীশান হোটেল আজাদীতে। একুশ তলায় একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিল আমাদের জন্য। ভোরে নামায ও গোসল সেরে জানালার পর্দা টেনে সরালাম। কী অপূর্ব দৃশ্য! অদূরে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ আলবোর্য পর্বতমালা। সবুজ পাহাড়ের মাথায় সাদা বরফের টুপি। ছিমছাম পরিচ্ছন্ন তেহরানের রাস্তাঘাট চওড়া, ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে মেটাল বার দিয়ে। নির্মাণাধীন বেশকিছু বহুতল ভবন চোখে পড়ল। সেগুলো লোহার ফ্রেমে তৈরি  হচ্ছে। আমাদের মতো রড সিমেন্টের বালাই নেই। কোমে প্রাচীন জনপদে বহু ইট-সুরকির বাড়ি দেখেছি। তেহরান তেমনটি নয়।
২৫ নভেম্বর আমাদের নেওয়া হলো ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা তথা রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর দফতরে। আমরা বসে আছি কনফারেন্স রুমে। সামনে ছোট একটি মঞ্চ, তার ওপর একটি চেয়ার, সাইড টেবিলে একটি মাইক্রোফোন। কানে হেডফোন লাগিয়ে অপেক্ষা করছি। বেলা ১১টায়  রাহবার এসে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভ্যাগতদের হাত তুলে স্বাগত জানালেন। তারপর তেলাওয়াত ও কংগ্রেস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন উপস্থাপিত হলো। রাহবার আমাদের উদ্দেশে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রাখলেন। মনে হলো তাঁর বক্তব্য না শুনলে কংগ্রেসে যোগদান অসম্পূর্ণই থাকত। তিনি ইসলাম ও জেহাদের নামে চরমপন্থী ও তাকফিরি আন্দোলনের বিপদ সম্পর্কে বলেই ক্ষান্ত হলেন না। আশাবাদের কথাও শোনালেন। বললেন যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ইরানকে পদানত করতে পারেনি। তারা ২০০৬ সালে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে হারাতে পারেনি। ২০১৪ সালে গাজায় হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি। ইনশা আল্লাহ আগামীতেও আমরা গালিব বা বিজয়ী হব। রাহবারের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হোটেলে ফিরলাম।
বিকেলে রেডিও তেহরানের পক্ষে আমার সাক্ষাৎকার নিলেন নাছির মাহমুদ। তিনি তাকফিরি আন্দোলন, আইএস ও ওয়াহাবী আন্দোলন সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেন। আমি বলার চেষ্টা করি যে, ইসলাম কেবল অনুশাসন ও বিধিনিষেধের ধর্ম নয়। ওয়াহাবী মতবাদ ইসলামের রুহানী ও উন্নত সংস্কৃতির সৌন্দর্যের পরিবর্তে নিছক বিধিনিষেধের ওপর জোর দেয়। তারা নারীর জন্য নানা রকম নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল তৈরি করে। একজনকে খলিফা ঘোষণার মাধ্যমে খেলাফতের মতো মহান প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে তামাশা করা হচ্ছে।
২৫ নভেম্বর দিনশেষে মধ্যরাতে বাক্সপেটরা গুছিয়ে আবার ফিরতি পথে যাত্রা। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকায় পা রাখি। ৫ দিন ইরান সফরকালে একটি সুশৃঙ্খল জাতির চেহারা দেখেছি। দেখেছি এক পরিকল্পিত রাষ্ট্র। ইরানে ধর্ম রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ব্রতমালা নয়। এখানে ইসলাম প্রোথিত হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে। গোটা দেশকে দৃঢ় ও সুসংহত করেছে ধর্মীয় আবেগ আর সংস্কৃতি। কী আশ্চর্য ব্যাপার! ৩৬ বছরেও একটু খানি মরিচা ধরেনি ইসলামী বিপ্লবে।

এডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট