সোমবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ১লা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

বৈদেশিক নীতি প্রশ্নে ইমাম খোমেইনী (র.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ২৬, ২০১৩ 

news-image

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেখা যায়, যখন বিদেশী শক্তির ভাড়াটেরা দুর্বল হয়ে পড়ে তখন বিরোধী নেতৃবৃন্দ সবসময় বিদেশের সঙ্গে আঁতাত ও সম্পর্ক গড়ে তোলার বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনের ওপর জোর দেন। কিন্তু এ নেতৃবৃন্দের হাতে যখন নিজ নিজ দেশের কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা চলে আসে তখন তাঁরা তাঁদের লক্ষ্য ভুলে যান এবং তাঁদের ক্ষমতা যে কত সীমাবদ্ধ তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অধিকাংশ নেতাই প্রথমে জোটনিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতির ঘোষণা দেন। কিন্তু ক্ষমতা লাভের পর ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাঁরা সেই আন্তর্জাতিক শক্তির শিকার হয়ে যান যারা বৃহৎ শক্তিবর্গের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত।

ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের সকল পর্যায়ে এবং ইসলামী বিপ্লবের বিজয় ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকালে এ প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যে, তিনি রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহ সব ধরনের বিদেশী আধিপত্যের বিরোধী। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিবর্গের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় মুসলমান ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষে ভূমিকা পালনের লক্ষ্যেই তাঁর বৈদেশিক নীতি আবর্তিত হয়েছে, তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে এর প্রমাণ দিয়েছেন। শাহের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামেও তিনি একই নীতি অবলম্বন করেছেন।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার পর ইরানের বৈদেশিক নীতি এবং বিভিন্ন দেশের সাথে ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ও পরিবর্তন বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। এর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে :

এক : ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া সব ধরনের সমঝোতা ও চুক্তি বাতিল করা। যেমন, ১৯৫৯ সালে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত চুক্তিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদান করা হয় এবং ১৯২১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পন্ন সমঝোতায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া হয়। বিপ্লবের পরই এ সকল চুক্তি বাতিল বলে ঘোষিত হয়।

দুই : সেন্টো প্যাক্ট থেকে বেরিয়ে আসা।

তিন : যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, মিশরের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।

চার : যে সকল দেশ ইসরাইলকে সমর্থন করে সেগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং অবৈধ ইসরাইল সরকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল কোম্পানির প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।

পাঁচ : আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসনের নিন্দা করা এবং আফগান মুজাহিদদের প্রতি সমর্থন প্রদান।

ছয় : বিশ্বের সকল মুক্তি আন্দোলন এবং ইসলামী মুক্তি আন্দোলনগুলোর প্রতি সমর্থন প্রদান।

সাত : ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কনসোর্টিয়ামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং এর সাথে সংশিষ্ট কর্মচারীদের দেশ থেকে বের করে দেয়া।

আট : জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সাথে জড়িত হওয়া।

নয় : ইমাম খোমেইনী (র.)-এর বৈদেশিক নীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর ‘পূর্বও নয়, পশ্চিমও নয়’ নীতি। তিনি এক বক্তৃতায় বলেন : ‘রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইরানকে আমাদের এমন স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের মতো আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর ওপর আর নির্ভরশীল থাকতে না হয়।’ (১৯৭৯ খ্রি.)

দশ : চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে জড়িত থেকেও ইরান তার নীতির প্রশ্নে অটল থাকে।

এগার : ইমাম সব সময় বৃহৎ শক্তি এবং তাদের ভাড়াটেদের মোকাবিলা করে গেছেন। বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শয়তানে বুজুর্গ’ বা ‘বড় শয়তান’ বলে আখ্যায়িত করেন। ইমাম যখন অসুস্থ ছিলেন তখনও তিনি বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রাম থেকে বিরত হননি। তিনি তখন বলেন : ‘বিশ্বের মজলুম জাতিগুলোকে অহংকারী বিশ্বশক্তির ব্যাপারে আমি হাসপাতাল থেকে সাবধান করে দিচ্ছি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দাম্ভিক শক্তির আধিপত্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের সকল শক্তি দিয়ে আমরা এ সকল অশুভ শক্তির মোকাবিলা করব।’ (১৯৮০ খ্রি.)

ইসলামী দেশের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইমাম খোমেইনী (র.) ক্ষমতাসীন শক্তির চেয়ে জাতির ইচ্ছা-আকাক্সক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা ছিল বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তাঁর গৃহীত একটি বিপ্লবী পদক্ষেপ। এ সম্পর্কে তিনি বলেন : ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধীতা করে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি বলে কেউ কেউ চিন্তা করেন। কিন্তু তাঁদের সে চিন্তা সঠিক নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেশের কথা আমাদের চিন্তা করতে হবে। বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে আমরা ছিলাম বিচ্ছিন্ন। কেননা, তখন অন্যান্য দেশ আমাদের প্রতি দৃষ্টিই দেয়নি। আমাদের জাতীয় ঐক্য এবং মিলিত সংগ্রামের ফলে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী উৎখাত হয়েছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার পর অমুসলমানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত জনগণ আমাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে।’

(নিউজলেটার, মার্চ ১৯৯১)