বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

বৃহৎ শক্তিগুলো ইরানী জনগণের চাওয়ার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে

পোস্ট হয়েছে: জুন ২২, ২০১৬ 

পররাষ্ট্র মন্ত্রী জাওয়াদ যারীফ-
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব মোহাম্মাদ জাওয়াদ যারীফ বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে ৬ জাতি ও ইরানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সমঝোতা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে প্রমাণ করেছে এবং ইরানের নিরাপত্তা বিনাশে যায়নবাদী চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববাসী এ সমঝোতাকে প্রতিপক্ষের যুদ্ধবায নীতির বিরুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের যৌক্তিক অবস্থানের বিজয় হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী গত ২১শে জুলাই (২০১৫) মজলিসে শূরায়ে ইসলামী (পার্লামেন্ট)-এর উন্মুক্ত অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে এ কথা বলেন। বার্তা সংস্থা এন্তেখাব-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনাব যারীফ বলেন, আপনারা ভুলে যাবেন না যে, কোনো বিষয়ে সমঝোতার মানেই হচ্ছে কিছু দেয়া ও কিছু নেয়া। কিন্তু এ সমঝোতা হচ্ছে এমন একটি সমঝোতা যে সম্পর্কে কেউই বলছে না যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
জনাব জাওয়াদ যারীফ ৫+১ জাতি ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা ও ১৪ই জুলাই (২০১৫) তারিখে প্রতিষ্ঠিত সমঝোতা সম্পর্কে মজলিস সদস্যদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুরুতেই প্রতিরোধে অটল, সচেতন ও সতর্ক ইরানী জনগণ ও সম্মানিত জনপ্রতিনিধিগণের উদ্দেশে, ইসলামী বিপ্লবের মহান নায়ক হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.), বিপ্লবের শহীদগণ, চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শহীদগণ ও বিশেষভাবে শহীদ পারমাণবিক বিজ্ঞানিগণের বিদেহী আত্মার প্রতি এবং ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য যাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন ও বিভিন্ন ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাঁদের ও শহীদগণের পরিবারবর্গের প্রতি সালাম জানান এবং তাঁদের সকলের জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে দো‘আ করেন। এছাড়া তিনি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সকলকে মোবারকবাদ জানান, পবিত্র মাহে রমযানে সকলে যে রোযা রেখেছেন ও ইবাদত করেছেন তা কবুল করার জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে আবেদন জানান, তেমনি পারমাণবিক আলোচনা চলাকালে এ আলোচনায় সাফল্যের জন্য বিগত প্রায় দুই বছর যাবৎ, বিশেষ করে মাহে রমযানে প্রতিটি দিনে ও রাতে সকলে আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে যে দো‘আ করেছেন সে কারণে সকল জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
ইরানের উন্নত শির অবস্থা প্রমাণিত হয়েছে
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, এক সপ্তাহ আগে এই দিনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও বাহ্যত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এমন ৬টি দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি এমন একটি সমঝোতা যা সমগ্র বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং যার পরিণতিতে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যায়নবাদীদের চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে সমগ্র বিশ্ববাসী এ সমঝোতাকে প্রতিপক্ষের যুদ্ধবায নীতির বিরুদ্ধে ইরানের বিচারবুদ্ধি সম্মত ও যৌক্তিক অবস্থানের বিজয় হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে গণ্য করেছে। আর বন্ধু ও দুশমন নির্বিশেষে সকলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এ থেকে যা প্রমাণিত হয়েছে তা হচ্ছে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ ও ইসলামী বিপ্লবের দূরদর্শী নেতার সম্মান, আত্মবিশ্বাস, শক্তি, উন্নত শির অবস্থা ও প্রজ্ঞা।
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, আল্লাহ্ তা‘আলার ওপর তাওয়াক্কুল করে ও দেশের জনগণের পৃষ্ঠপোষকতায় বলীয়ান হয়ে আমরা এ দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর আলোচনায় যেভাবে অংশগ্রহণ করেছি তা থেকে আলোচনাকালে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বাহ্যত বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী এমন ছয়টি দেশের সাথে আলোচনা করছে, কিন্তু তাদের সামনে নতি স্বীকার করছে না। এ আলোচনা আরো প্রমাণ করে যে, ইরান কিছুতেই স্বীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও চাওয়া থেকে সরে আসবে না এবং স্বীয় মূল রেড লাইনকে অতিক্রম করে আপোস করবে না।
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সর্বশেষ পারমাণবিক আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান নিষেধাজ্ঞার কঠিনতম পরিস্থিতিতে ও কঠিনতম চাপের মধ্যেও বছরের পর বছর ধরে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত রয়েছে; ইরান দুই বছর ধরে আলোচনা অব্যাহত রাখতে এবং চরম চাপের মুখেও স্বীয় প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু কিছুতেই স্বীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও চাওয়া থেকে সরে যাবে না এবং এতদসংক্রান্ত স্বীয় রেড লাইন অতিক্রম করবে না। এর ফলে শেষ পর্যন্ত আমেরিকার কাছে আরো একবার ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বারের সেই কথাটিই বাস্তব হিসেবে প্রমাণিত হলোÑ যাতে তিনি বলেছিলেন, তারা যেন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আত্মসমর্পণের বিষয়টি কেবল স্বপ্নের ভিতরেই দর্শন করে। জনাব যারীফ বলেন, দৃশ্যত বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী ঐ ছয়টি দেশের ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধির সাথে মহান ইরানী জাতির সন্তানগণ যে আলোচনা চালিয়েছেন তা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, কেউই কখনোই যেন ইরানী জাতিকে হুমকি প্রদান না করে বা তার জন্য হুমকি সৃষ্টি না করে।
কোনো পারমাণবিক স্থাপনা কখনোই বন্ধ হবে না
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, মহান ইরানী জাতির প্রতিনিধিগণ সেই সাথে এটাও সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আমরা যে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ, গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ করছি তা কখনোই বন্ধ হবে না, বরং নীতিগতভাবে আমাদের পারমাণবিক স্থাপনা সমূহের কোনো একটিও কখনোই বন্ধ হবে না। তেমনি তাঁরা আরো স্পষ্ট করে দিয়েছেন এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের মিসাইল কর্মসূচি একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার; এর সাথে অন্য কারোই কোনো সম্পর্ক নেই যে, এ নিয়ে কথা বলবে, তা তারা নিজেদের দাবি অনুযায়ী যতো বড় শক্তিই হোক না কেন।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির জন্য আমেরিকাকে জবাবদিহি করতে হবে
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী আরো বলেন, আলোচনায় আমাদের দেশের প্রতিনিধিগণ আরো স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের অবাঞ্ছিত ঘটনাবলি ও পরিস্থিতির জন্য যদি কাউকে জবাবদিহি করতে হয়ে, তাহলে সে হচ্ছে আমেরিকা ও পাশ্চাত্যজগৎÑ যাদের অস্ত্র দ্বারা ফিলিস্তিনে, ইয়েমেনে ও সিরিয়ায় নিরীহ মানুষদেরকে হত্যা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনগ্রাসী অবৈধ যায়নবাদী সরকার শুধু নিরীহ ফিলিস্তিনি জনগণকেই হত্যা করছে না, অধিকন্তু তার অস্ত্রের দ্বারা ইয়েমেন ও সিরিয়ার নিরীহ জনগণকেও হত্যা করছে।
এ সমঝোতা যায়নবাদী সরকারের অপূরণীয় ক্ষতি করবে
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, এ সমঝোতার কারণে অবৈধ যায়নবাদী সরকারের নেতৃত্বে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের দুশমনরা যে ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হয়েছে তা থেকে বেশ ভালোভাবেই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ও বিশ্বের বুকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সুদৃঢ় শক্তিমত্তা প্রমাণিত হয়েছে। তাই এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছ্ ুনেই যে, আমরা দেখতে পাচ্ছি এ সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যায়নবাদী সরকারের প্রধান মন্ত্রী হৈচৈ ও শোরগোল শুরু করে দিয়েছেন এবং এ সমঝোতাকে বানচাল করার লক্ষ্যে এর বিরুদ্ধে নেতিবাচক রায় দেয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের কাছে ধন্না দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এ সমঝোতা অবৈধ যায়নবাদী সরকারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে বিধায় এ সমঝোতা রোধের জন্য প্রয়োজন হলে তিনি আত্মহত্যা করতেও প্রস্তুত আছেন।
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, যায়নবাদী সরকার এর আগে কখনোই তার মিত্রদের মাঝে এভাবে ও এতোখানি একা হয়ে পড়ে নি। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে, যায়নবাদীদের সর্র্ব বৃহৎ প্রচার লবিটি যায়নবাদীদের জন্য দারুণভাবে ক্ষতিকর এ সমঝোতার অনুমোদন রোধ করার লক্ষ্যে কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছে।
ইরান স্বীয় মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ কাম্য বিষয়গুলো লাভ করেছে
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, পারমাণবিক সমঝোতার বিষয়টিকে বিভিন্ন পেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা চলে। এ বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তেমনি নেতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রতি দৃষ্টিপাত করা চলে। ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার দৃষ্টিকোণ থেকে এবং দীর্ঘ মেয়াদি পারমাণবিক কর্মসূচির দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, কিন্তু আমরা যে কোনো প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করি না কেন, আমরা যেন ভুলে না যাই যে, যে কোনো সমঝোতায়ই কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। প্রত্যেক পক্ষকেই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাওয়াগুলোকে পাওয়ার জন্য কতগুলো চাওয়া থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হয়। তাই দুই পক্ষের মধ্যকার আলোচনা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হয় যতক্ষণ না দুই পক্ষের দেয়া ও নেয়ার বিষয়গুলোর মধ্যে মোটামুটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এমতাবস্থায় স্বভাবতঃই এ প্রশ্ন জাগ্রত হয় যে, ৫+১ জাতির সাথে দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর আলোচনার পর আমরা যে সমঝোতায় উপনীত হয়েছি তাতে নির্ধারিত এই দেয়া ও নেয়ার বিষয়গুলো কী?
তিনি বলেন, আমরা যে মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লাভ করার জন্য আলোচনায় অনড় ভূমিকা পালন করেছি এবং শেষ পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের যেসব চাওয়ার বিষয় যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সম্মানজনক অবস্থান ও শক্তিমত্তার সংরক্ষণ, পারমাণবিক কর্মসূচির স্থিতিশীলতা, বিশেষ করে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ও আরাকের হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর চালু থাকা ও সেগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, নিষেধাজ্ঞাসমূহের অবসান এবং সর্বোপরি জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের সপ্তম অধ্যায়ের আওতায় নিরাপত্তা পরিষদে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে গৃহীত ছয়টি সিদ্ধান্তমূলক প্রস্তাবের অবসান। নিরাপত্তা পরিষদের এ সব প্রস্তাবে ইরানী জাতির বিরুদ্ধে কেবল নিষেধাজ্ঞাই চাপিয়ে দেয়া হয় নি, বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনি ইরানের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির শক্তিশালী করণ প্রতিহত করাকে একটি আন্তর্জাতিক কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, আর এ জন্য প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের উপায়-উপকরণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।
প্রতিপক্ষ নতুন কিছুই লাভ করে নি
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, আলোচনায় আমাদের প্রতিপক্ষের মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া ছিল এই যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হবার চেষ্টা করছে না, তারা পারমাণবিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ ও নযরদারির মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চায়। কিন্তু এত সব রণ সংগীত ও রণ ডঙ্কার পরে শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ এমন কিছু লাভ করেছে যা আগে থেকেই তাদের হস্তগত ছিল। কারণ, এ ব্যাপারে ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী যে ফত্ওয়া দেনÑযাতে দ্বীনী শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটেছেÑতাতে সুস্পষ্টভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করাকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ কারণে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র হস্তগত করার চেষ্টা করে নি এবং এখনো করছে না। সুতরাং সমঝোতায় এ সুস্পষ্ট বিষয়টিতে তাদের জন্য নিশ্চিত হওয়ার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং সে লক্ষ্যে যে কতক সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক নযরদারি মেনে নেয়া হয়েছে তা তাদের জন্য আদৌ কোনো পাওয়া ও সুবিধা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে না। বিশেষ করে এ নযরদারি একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এবং এর সমাপ্তির সুনির্দিষ্ট তারিখ রয়েছে, বিশেষত এর ফলে আমাদের দেশের কোনো ধরনের প্রয়োজন পূরণই বাধাগ্রস্ত হবে না।
ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধ করণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, এ সমঝোতায় এমন কিছু নেই যাতে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তথ্যাদি বিজাতীয়দের হাতে পড়তে পারে। তবে প্রশ্ন করা হতে পারে যে, এ সমঝোতায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সম্মানের সংরক্ষণ ছাড়া আমরা কার্যত আর কী লাভ করেছি? বস্তুত আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে এই যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেÑ নিরাপত্তা পরিষদের বিগত সত্তর বছরের ইতিহাসে যার আর কোনো নযির নেই। তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের সপ্তম অধ্যায়ের আওতায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যে ছয়টি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল তাতে আমাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধ করণ কর্মসূচিকে বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এখন সেই নিরাপত্তা পরিষদই জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের আওতায় নতুন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেবল বৈধ ও আইনসম্মত কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে নি; বরং বিশ্বের সকল দেশের প্রতি ইরানের সাথে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বাণিজ্যিক ও শিল্প সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করলো।
জনাব জাওয়াদ যারীফ দৃঢ়তার সাথে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধ করণ কর্মসূচি এমনকি এক দিনের জন্যও বিরতি ব্যতিরেকেই অব্যাহত থাকবে। সমঝোতায় বর্ণিত ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’তে যে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাতে প্রথম আট বছরের জন্য যে কতক সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়া হয়েছে তার ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল স্থিতি ও স্থায়িত্বেরই অধিকারী হবে না; বরং তাতে যে কার্যকর ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে উন্নত গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মকাণ্ডকে সামনে এগিয়ে নেয়ার বিষয়টিকে অব্যাহত রাখবে। বিশেষ করে এর ফলে সর্বোত্তম সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার করা যাবে এবং সম্ভাব্য ন্যূনতম ব্যয়ে এর সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হবে।
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী আরো বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যে কেবল সুদক্ষ ইরানী বিজ্ঞানীদেরকে কাজে লাগানো হবে তা নয়; বরং সেই সাথে বিশ্বের উন্নততম বৈজ্ঞানিক অর্জন সমূহও ব্যবহার করা হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে, এ ক্ষেত্রে পনর বছর মেয়াদি যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে তা প্রয়োজন পূরণের জন্য এমন সামর্থ্যরে অধিকারী হবেÑ যা পাঁচটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট হবে। তিনি বলেন, যে সুবিধা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই অপূরণীয় আকাক্সক্ষার পর্যায়ে রয়েছে ইরানের পক্ষে আজ তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, যদিও আমি ঐসব দেশের নাম উল্লেখ করতে চাই না, তবে বিশ্বের বুকে আমেরিকার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতার অধিকারী এমন অনেক দেশ রয়েছে যারা এমনকি মাত্র একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিও গ্রহণ করতে পারে নি; বরং এ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছে এবং আজকে তারা তাদের আকাক্সক্ষা বুকে চেপে রেখে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বীর জনগণের দৃঢ়তা ও অটলতার শুভ পরিণতির দিকে দৃষ্টিপাত করছে।
সকল নিষেধাজ্ঞার অবসান
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে এই যে, ঘটনা কেবল এখানেই শেষ নয়, বরং ইরানের আরেকটি চাওয়া পূরণ হয়েছে, আর তা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত সমঝোতা বাস্তবায়নের দিনেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর থেকে নিরাপত্তা পরিষদ, আমেরিকা ও ইউরোপের পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং মাত্র কয়েক বছর মেয়াদি সাময়িক সীমাবদ্ধতার কাঠামোর আওতায় অন্যান্য নিষেধাজ্ঞাও উঠে যাবে। অর্থাৎ ইরান এ ক্ষেত্রে কেবল সুবিধাই লাভ করে নি, বরং দ্বিগুণ সুবিধা অর্জন করেছে, আর তা হচ্ছে সমস্ত রকমের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার অবসান, যদিও শুরু থেকেই এসব নিষেধাজ্ঞা আইন বহির্ভূত ও অবৈধ ছিল এবং তা আরোপ করাই উচিত ছিল না।
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, আমরা কখনো এরূপ দাবি করি নি এবং এখনো করছি না যে, যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে ইরানের স্বার্থের অনুকূল। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমি আবারো বলছি যে, আলোচনা মানেই হচ্ছে দেয়া ও নেয়া এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না উভয় পক্ষই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তাদের চাওয়ায় উপনীত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সুতরাং অবশ্যই আমাদেরকে আমাদের চাওয়া সমূহের ব্যাপারে স্থিতিস্থাপকতা ও নম্রতার পরিচয় দিতে হবে। তবে এ স্থিতিস্থাপকতা অবশ্যই উদ্দেশ্যমুখি এবং হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে হয়েছে, আমাদের মহান রাহ্বার যেমন উপমা দিয়েছেন, ঠিক যেভাবে একজন কুস্তীগীর প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত স্থানে ও কালে কিছু ছোট ছোট সুবিধা হাতছাড়া করে থাকে। কিন্তু সকলেই জানে যে, চূড়ান্ত ফলাফলই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এ-ও জানে যে, বিজয়ের নিদর্শন সহকারে একজনের হাত উত্তোলিত হয়ে থাকে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন, আমেরিকার একজন বিখ্যাত সাংবাদিক এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করেন, ‘ছয়টি বিশ্বশক্তি আলোচনার টেবিলের এক পাশে ছিল এবং অন্যপাশে ইরান ছিল একা; এমতাবস্থায় কেন আমরা এ সুযোগকে এমনভাবে কাজে লাগাতে পারি নি যার ফলে আমরা ইরানের আগামী দশ বছরের মধ্যে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী একটি দেশে পরিণত হওয়ার দোরগোড়ায় উপনীত হওয়ার সম্ভাবনাকে দূরীভূত করে দিতে পারতাম? কেন আমরা ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধ করণ অবকাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারি নি?’ আর এ হচ্ছে এমন একটি প্রশ্ন যা আজ সারা বিশ্বে উত্থাপিত হচ্ছে।
বৃহৎ শক্তিগুলো ইরানী জনগণের চাওয়ার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আজ বিশ্বে কেউই বলে না যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আত্মসমর্পণ করেছে। বরং আত্মসমর্পণের কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলতে হবে যে, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মহান ও বীর জনগণের চাওয়ার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। সেই সাথে নেতানিয়াহুর জন্য এবং আমেরিকার উগ্রপন্থীদের জন্য এক আতঙ্কজনক দুঃস্বপ্ন তৈরি হয়েছে, আর তাতে যে কেবল তাদের তৈরি ইসলাম-আতঙ্ক, শিয়া-আতঙ্ক ও ইরান-আতঙ্ক একবারে ও একত্রে তাদের জন্য কেলেঙ্কারিতে পর্যবসিত হয়েছে শুধু তা-ই নয়, বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সকল অবকাঠামো সংরক্ষিত থাকছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মতৎপরতা যুক্তি সঙ্গত গতিতে অব্যাহত থাকছে। আমাদের বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে এবং অচিরেই আমাদের দেশ যথাযথ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকারী একটি দেশে পরিণত হবে। আর লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, এ পথচলা অব্যাহত রেখেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ফাইল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বাইরে চলে আসবে এবং সকল অন্যায় নিষেধাজ্ঞার বিলুপ্তি ঘটবে। সমঝোতার সূচনাতেই কতক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে যাবে এবং কতক নিষেধাজ্ঞার কার্যকরিতা স্থগিত হয়ে যাবে।
মজলিসের অধিবেশনে উপস্থিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান ড. সালেহীর প্রতি ইঙ্গিত করে জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, যেহেতু আমি ও আলোচক প্রতিনিধি দলের সদস্যগণের সকলেই আমাদের প্রিয় ও সম্মানিত ভাই ড. সালেহীর চেষ্টা-তৎপরতা, বিশেষজ্ঞত্ব ও মহানত্বের কাছে ঋণীÑ যিনি এ অধিবেশনে উপস্থিত আছেন, তিনি আলোচনার কৌশলগত দিকগুলো সম্বন্ধে বিজ্ঞানী সুলভ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পেশ করবেন, সেহেতু আমি সেদিকে যাচ্ছি না, বরং আমি নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে এবং বিগত কয়েক দিনে যে কয়েকটি অস্পষ্ট বিষয়ের কথা উপস্থাপন করা হয়েছে সে সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলব।
বিদেশে আটককৃত অর্থ ফেরত আসবে
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আমেরিকার অনায় ও বেআইনি নিষেধাজ্ঞার ফলে বিগত কয়েক বছর যাবৎ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের তেল বিক্রয়লব্ধ ও অন্যান্য আয়ের খাত থেকে অর্জিত বহু বিলিয়ন ডলার অর্থ আটক হয়ে আছে; প্রতিষ্ঠিত সমঝোতার ফলে আমাদের বড় ধরনের অর্জন সমূহের অন্যতম হচ্ছে এই যে, এ অর্থ দেশের কোষাগারে ফেরত আসবে এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে যাবে।
সকল প্রকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার অবসান
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বাহানা করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকা ইরানের ব্যাঙ্কিং, ফাইন্যান্সিং, তেল, গ্যাস, পেট্রো-রসায়ন শিল্প ও সামগ্রী, বীমা, যোগাযোগ ও পরিবহন ক্ষেত্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও ফাইন্যান্সিং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে; সমঝোতার শুরুতেই কতক ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি তুলে নেয়া হবে এবং কতক ক্ষেত্রে তা স্থগিত হয়ে যাবে। এছাড়া সভ্য সুলভ রীতিনীতি ও আচরণের বরখেলাফে ইরানের ছাত্রছাত্রীদের পারমাণবিক শক্তিসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে ঐসব দেশে পড়াশুনার ওপরে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল তা পুরোপুরি উঠে যাবে। এছাড়া ইরান কর্তৃক যাত্রীবাহী বিমান ক্রয়ের ওপর দীর্ঘ তিন দশক যাবৎ যে অন্যায় নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রাখা হয়েছিল তা ইতিমধ্যেই উঠে গিয়েছে এবং আমাদের এয়ারশিপগুলোর পুনঃনির্মাণের সম্ভাবনা ও ইরান এয়ারের ফ্লাইটসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে।
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, এ সমঝোতার ফলে ইরানের কার্পেট ও শুকনা ফল পুনরায় বিশ্বের বাজারে রপ্তানি শুরু হবে এবং দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন, সাধারণ আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং তৎপরতা, বীমা, ফাইন্যান্সিং সেবা, ইরানের সাথে ব্যবসাসংশ্লিষ্ট আর্থিক সেবা, নিঃশর্ত ঋণ, মূল্যবান ধাতব, হীরক, মুদ্রা, জাহায শিল্প, যোগাযোগ ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট শিল্প এবং অন্যান্য শিল্প আরোপিত নিষেধাজ্ঞার জোয়াল থেকে মুক্তি লাভ করবে, আর সকল কিছুর ক্ষেত্রেই রপ্তানি ও আমদানির পথ উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
জনাব যারীফ আরো বলেন, এ সমঝোতার ফলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইসলামী প্রজাতন্ত্র শিপিং কোম্পানি, ইরান জাতীয় তেল কোম্পানি, জাতীয় তেল পরিবহন কোম্পানি, ইরান এয়ার ও তার আওতাধীন কোম্পানিসমূহ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, ইরানের ব্যাংকসমূহ, দেশের অন্যান্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে এবং দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ আটশ’ ব্যক্তিত্ব ও পদাধিকারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল তাঁদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। সেই সাথে ইরানের পক্ষে অধিকাংশ বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক অঞ্চল ও সংস্থায় ইরানের প্রবেশ ও অংশগ্রহণ সহজ হয়ে যাবে। এছাড়া এই প্রথম বারের মতো আমেরিকা ইরানে আমেরিকান কোম্পানিসমূহের শাখা খোলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। অধিকন্তু আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ব্যাপারে মতৈক্যে উপনীত হয়েছে যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে বিরত থাকবে এবং নতুন নামে অতীতের নিষেধাজ্ঞা সমূহ কার্যকর করা হতেও বিরত থাকবে। এমনকি তারা যেখানে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ইরানের সাথে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল এবং এ সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হবার একদিন আগেও এ ধরনের সহযোগিতাকে বেআইনি গণ্য করতো, আজ তারা এ ব্যাপারে ইরানের সাথে সহযোগিতা করার জন্য সকল দেশকে উৎসাহিত করছে এবং ইরানকে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সহকারে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও অত্যাধুনিক গবেষণা রিঅ্যাক্টরের অধিকারী হবার ক্ষেত্রে এবং নতুন জ্বালানিসহ পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তথা গোটা পারমাণবিক ক্ষেত্রে ইরানের সাথে সহযোগিতা করার কথা ঘোষণা করেছে।
অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও উঠে যাবে
ইরানী পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে চায় নি এবং চাচ্ছে না। এছাড়া এ সমঝোতা আমাদের মিসাইল কর্মসূচির ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করবে না। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং কতক ক্ষেত্রে তা এমনভাবে পরিবর্তিত হবে যার ফলে প্রতিরক্ষা সামগ্রী আমদানি ও রফতানির পথ উন্মুক্ত হয়ে যাবে। অন্যদিকে যে সব বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা পরিবর্তিত হবে তা মেনে না চললে তার ফলে ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’র অনুসরণ প্রভাবিত হবে না। অধিকন্তু সংশ্লিষ্ট সীমাবদ্ধতা পাঁচ বছর পর পুরোপুরিভাবে উঠে যাবে। তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার আলোচনার জন্য যে রেড লাইন ও কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠিত সমঝোতায় তার সব কিছুই অনুসৃত হয়েছে।
জনাব যারীফ বলেন, বিগত কয়েক মাসে আলোচনা যখন শেষ হওয়ার দিকে এগোচ্ছিল এবং আলোচিত বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছিল তখন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রেড লাইনও অধিকতর নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করছিল এবং আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও দৃঢ়তার সাথে কাজ চালিয়ে যাই। আল্লাহ্র রহমতে, আজ আমরা আপনাদের সামনে ঠিক সেভাবে প্রতিবেদন পেশ করতে সক্ষম হচ্ছি যেভাবে ইতিপূর্বে মহান রাহ্বারের খেদমতে পেশ করেছিলাম। তা হচ্ছে, আমরা সম্ভব সর্বোচ্চ মাত্রায় ও এমনভাবে আমাদের রেড লাইন বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি যে, বলা চলে, তা পুরোপুরি বজায় রাখতে পেরেছি।
জনাব যারীফ উল্লেখ করেন যে, সমস্ত রকমের পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা সমঝোতার দিনে নীতিগতভাবে পুরোপুরি উঠে যাবে এবং সমঝোতার বাস্তবায়নের দিনে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে যাবে। তিনি বলেন, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও মিসাইল নিষেধাজ্ঞা প্রথমে সীমিত হয়ে যাবে ও একটি সনির্দিষ্ট মেয়াদের পর তা পুরোপুরি তুলে নেয়া হবে। অন্যদিকে এসব নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হলে তা সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে পরিগণিত হবে না। এছাড়া দ্বৈত উদ্দেশ্যে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা-ও উঠে যাবে।
পারমাণবিক নযরদারিতে সামরিক ও নিরাপত্তা তৎপরতায় হস্তক্ষেপ হবে না
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ও ইরানের মধ্যে অবশিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে ইরানের নিরাপত্তা এবং সামরিক স্থানসমূহের ও বিজ্ঞানীদের সংরক্ষিত অবস্থানসহ ইরানের নির্ধারিত রেড লাইন পুরোপুরি মেনে চলা হয়েছে এবং ইরানের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিবালয়ের নযরদারিতে এ সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে; এর ফলে এতে ইরানের সংশ্লিষ্ট সমস্ত স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে। জনাব যারীফ বলেন, আগামীতেও পারমাণবিক স্থাপনাসমূহে আইএইএ-র সকল নযরদারি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণে ও এতদসংক্রান্ত প্রোটোকলে বর্ণিত পন্থায় অনুষ্ঠিত হবে। ৬ জাতি ও ইরানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সমঝোতায় অন্তর্ভুক্ত যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নযরদারির আবেদন সমূহ ইরানের সার্বভৌমত্বের অধিকারের প্রতি দৃষ্টি রেখে ও ন্যূনতম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে করা হবে এবং এ কাজের মাধ্যমে ইরানের সামরিক তৎপরতায় ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তৎপরতায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা হবে না।
ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সীমাবদ্ধতার মেয়াদ নির্ধারণ সংক্রান্ত আলোচনার সময় ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বারের নির্ধারিত রেড লাইন অতিক্রম না করার ওপর জোর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তিনি নির্ধারণ করে দেন যে, সীমাবদ্ধতার মেয়াদ অবশ্যই দশ বছরের নিচে হতে হবে। আর এটি ছিল দু’পক্ষের মধ্যকার মতপার্থক্যের ও বিতর্কের মৌলিকতম বিষয় এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বিতর্ক অব্যাহত ছিল। কিন্তু, আপনারা যেমন ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’তে দেখতে পাচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক সমৃদ্ধ করণের ওপর সীমাবদ্ধতার মেয়াদ আট বছর বলে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্বাভাবিক গতিতে ও যুক্তিসঙ্গতভাবে বাণিজ্যিক ও শিল্প রূপ পরিগ্রহ করার দিকে এগিয়ে যাবে।
সমৃদ্ধকৃত পারমাণবিক উপাদান ব্যবহার ও বিক্রি করা যাবে
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, ইসলামী বিপ্লবের মহান রাহ্বার ও মহান ইরানী জনগণ যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’তে সে উদ্বেগেরও অবসান ঘটেছে; কারণ, সীমাবদ্ধতার এ পুরো মেয়াদে পারমাণবিক গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ যথারীতি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, বরং এ সময়ে যুক্তিসঙ্গত বিভিন্ন ধাপে আমাদের উন্নততম সেন্ট্রিফিউজের গবেষণা ও উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। তিনি আরো বলেন, শুধু তা-ই নয়, আমাদের সঞ্চিত সমৃদ্ধকৃত পারমাণবিক উপাদান সমূহ এ সময় বিনষ্ট হবে না; আমরা তা দেশের ভিতরে ইউরেনিয়ামে পরিণত করতে পারব বা চাইলে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম লাভের বিনিময়ে বিদেশে বিক্রি করতে পারব। এভাবে ইরান হবে সমৃদ্ধকৃত পারমাণবিক উপাদান বিক্রির একচেটিয়া বাজারে প্রবেশকারী একমাত্র দেশ। সেই সাথে ইরানের কাছে পারমাণবিক উপাদান বিক্রির ওপরে বিগত তেত্রিশ বছর ধরে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশে তা-ও তুলে নেয়া হবে।
ইরানী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান স্বীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হেফাযত, যে কোনো ধরনের আগ্রাসনের মোকাবিলাকরণ এবং সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী হুমকির মোকাবিলার লক্ষ্যে স্বীয় প্রতিরক্ষা সামর্থ্য শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখবে।
ইরান সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদের মনোভাবে মৌলিক পরিবর্তন
জনাব যারীফ বলেন, গতকাল (২০শে জুলাই ২০১৫) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে একটি নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এ প্রস্তাবে অনেক কিছু দেয়া ও নেয়ার কথা বলা হয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় কথা, এতে ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’কে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আর এর মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধ করণ কর্মসূচিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বস্তুত এ প্রস্তাবটি হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাসে একটি অনন্য প্রস্তাব। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাসে এটিই প্রথম যে, একটি দেশ জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের সাত নং অধ্যায়ের আওতায় নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত ছয়টি প্রস্তাবÑযেগুলোর বাস্তায়ন ছিল বাধ্যতামূলকÑবাস্তবায়ন না করেও যুদ্ধ ছাড়াই কেবল আলোচনার মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞা থেকে এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের নযরদারি থেকেও রেহাই পাচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক ইতিপূর্বে ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের সপ্তম অধ্যায়ের আওতায় গৃহীত ছয়টি প্রস্তাবের বরখেলাফে বর্তমান প্রস্তাবটি ৪১ নং ধারার পরিবর্তে ২৫ নং ধারার আওতায় গ্রহণ করা হয়েছে। তবে যেহেতু ইতিপূর্বেকার প্রস্তাবসমূহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল সেহেতু বর্তমান প্রস্তাবের শেষে ৪১ ধারার আওতায় গৃহীত পূর্ববর্তী প্রস্তাবসমূহ উল্লেখ করে তা তুলে নেয়ার কথা ও তুলে নেয়া সংক্রান্ত বিধি-বিধানসমূহ ৪১ ধারার আওতায় উল্লেখ করা উচিত ছিল। কিন্তু তার মানে এ নয় যে, জাতিসংঘোর ঘোষণাপত্রের সাত নং অধ্যায়ের ও ৪১ নং ধারার অধীনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। কারণ, এবারে গৃহীত প্রস্তাবের ভূমিকার সাত নং প্যারাগ্রাফে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, এ প্রস্তাব হচ্ছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদের মনোভাবের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ।
জনাব জাওয়াদ যারীফ আরো বলেন, এছাড়াও নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাসে এটিই প্রথম যে, নিরাপত্তা পরিষদ যে দেশ সম্পর্কে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে সে দেশের সাথে পরামর্শ ও আলোচনা করে প্রস্তাবের বক্তব্য প্রস্তুত করেছে। এ হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাসে একটি নযির বিহীন পদক্ষেপ। তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ তার এ প্রস্তাবে ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’কে সংযোজনী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে স্বীয় অতীত প্রস্তাবসমূহের বরখেলাফে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছে ও স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এ প্রস্তাবে, এমনকি প্রস্তাবের কোনো সংযোজনীতেও, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বলতে কোনো কিছুর আর অস্তিত্ব নেই।
ইরানের আঞ্চলিক নীতিতে পরিবর্তন ঘটবে না
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, এর মানে হচ্ছে এই যে, ইসলামী বিপ্লবের মহান রাহ্বার যেভাবে বলেছেন ঠিক সেভাবেই, দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার সক্ষমতা পুরোপুরি সংরক্ষিত হবে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আঞ্চলিক নীতিতে কোনোরূপ পরিবর্তন সাধিত হবে না; মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার লক্ষ্যে আমরা আমাদের মিত্রদেরকে সহায়তা প্রদানের নীতি অব্যাহত রাখব। তিনি বলেন, মোট কথা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নং প্রস্তাবে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ পথপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যাতে এ পথপরিকল্পনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত পদক্ষেপের, এমনকি তাতে আরোপিত সীমাবদ্ধতার অবসানের কথা এবং এ বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার সমাপ্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য কথায়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে এটি হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদের শেষ প্রস্তাব।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাবর্তিত হলে ইরান অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে না
জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যেমন ঘোষণা করেছে তেমনি নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে কোনো কারণেই হোক না কেন, নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক ইতিপূর্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা যদি পুরোপুরি বা অংশত পুনঃপ্রত্যাবর্তন করে সে ক্ষেত্রে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান স্বতঃস্ফূর্তভাবে ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’তে যেসব অঙ্গীকার করেছে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে না। তিনি বলেন, আমরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিবৃতির পাঠে আরো যোগ করেছি, এমতাবস্থায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র সাথে সহযোগিতার বিষয়টি সম্পর্কে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি
জনাব জাওয়াদ যারীফ উল্লেখ করেন যে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাষ্যকারগণের সকলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ‘যৌথ পদক্ষেপের সামগ্রিক কর্মসূচি’ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থানকে প্রমাণ করেছে এবং স্থিতি দিয়েছে ও সুদৃঢ় করেছে। তিনি বলেন, ইরান এমন একটি শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে যে স্বীয় মৌলিক নীতিমালার অনুসরণ অব্যাহত রেখে আধিপত্যবাদী শক্তিসমূহের মোকাবিলায় শান্তিপূর্ণ পন্থায় ও কেবল আলোচনার মাধ্যমে বৃহত্তম ও সর্বাধিক দীর্ঘকালীন আন্তর্জাতিক সঙ্কট সমূহের সমাধান করতে সক্ষম। অথচ একই সাথে ইরান স্বীয় পারমাণবিক কর্মসূচির সামর্থ্যরে সংরক্ষণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অধিকারী হয়ে অধুনাতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসমূহের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ও শিল্প সামর্থ্যে উপনীত হবার লক্ষ্যে শান্তি ও স্বস্তি সহকারে একটি যৌক্তিক পথে স্বীয় পথচলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী ঈদুল ফিত্রের নামাযের খোত্বায় যে বক্তব্য দিয়েছেন তার প্রতি ইঙ্গিত করে জনাব জাওয়াদ যারীফ বলেন, মহান রাহ্বার যেমন বলেছেন, বিগত প্রায় বারো বছর যাবৎ বিশ্বের ছয়টি বৃহৎ দেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে তার পারমাণবিক শিল্পের কাজ অব্যাহত রাখা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে আসছিল এবং অনেকের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক শিল্পের নাট-বল্টুসমূহও খুলে নিতে চাচ্ছিল, আজ তারা কয়েক হাজার সেন্ট্রিফিউজসহ ইরানের পারমাণবিক গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ অব্যাহত রাখার বিষয়টি মেনে নিতে ও সহ্য করে নিতে বাধ্য হয়েছেনÑ যার একমাত্র তাৎপর্য হচ্ছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শক্তিমত্তা।
অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী