সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

বুদ্ধিমান প্রেমিক

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ২৫, ২০১৯ 

অনুবাদ ঃ কামাল মাহমুদ

সে অনেকদিন আগের কথা। এক দেশে এক রাজা ছিলো আর তার ছিলো এক অতিব সুন্দরী কন্যা। এই রাজকন্যাকে অনেকেই বিয়ে করতে আগ্রহী ছিলো।
কখনো কখনো রাজার এক বন্ধু এ বিষয়টি নানাভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতো এবং বক্তব্যের উদ্দেশ্য বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে শেষ করতো। এমন কারো নাম উল্লেখ করতো যে যুবক যথাযথভাবে রাজকন্যার যোগ্য বলতো তার এই যোগ্যতা আছে ঐ যোগ্যতা আছে এবং সে রাজকন্যার মতো এমন মেয়েকেই বিয়ে করতে চায়। কিন্তু আবার ভয় পেতো সত্যি সত্যি যদি রাজার মেয়েকে সে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাহলে সে হয়তো সেটা ভালোভাবে নাও নিতে পরে, হয়তো এর জবাবে কটু কথা শুনতে হতে পারে। সকলে রাজার কথায় অংশগ্রহণ করে এবং তার কথাবার্তায় সম্মতি জানায়। মনে হয় যেন প্রত্যেকেই জামাই নির্বাচন করার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিয়েছে।
রাজা নিজেও বিষয়টি বুঝতো। এ কারণেই সে কারো কথার জবাবে তেমন কোন কথা বলতো না। মেয়েটিও বলতো: ‘আমি এমন স্বামী চাই যে আমাকে মনে প্রাণে চায়, শুধু রাজার জামাই হতে চায় এমন ছেলে আমি চাইনা।’
এভাবে চলতে থাকলো; এক ঈদের দিনে সকল সভাসদ, বন্ধু-বান্ধব ও নিকাটত্মীয়রা রাজার কাছে জমায়েত হলেন। এরপরে কথাবার্তার এক পর্যায়ে আবার এ বিষয়টি আসলো। রাজা বললেন: এ পর্যন্ত এ বিষয়ে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু যে কোন কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দরকার। এখন আমি এবং আমার কন্যা এ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রস্তুত। আমার মেয়ের প্রেমিকদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচণ করবো, এ বিষয়ে আর বেশি কথা বলতে চাইনা’। আমি আমার কণ্যাকে আগামীকাল বউ সাজিয়ে এবং কারো হাতে তার হাত রাখার ব্যবস্থা করবো যে তাকে আমার কন্যাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে। এজন্য যারা আমার কন্যাকে বিয়ে করতে চায় তারা যেন আগামীকাল এখানে উপস্থিত হয়। আমি তাদেরকে আমার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য শর্তগুলো বর্ণনা করবো, আমার মেয়ে তার জীবন সঙ্গী দেখবে এবং আগামীকালই বিয়ের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হবে।’
সকলে ঐ দিনের মতো চলে গেলো এবং যে সকল প্রেমিক রাজকন্যাকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিদের কাছে খবর পৌঁছে দেয়া হলো এবং বলা হলো: ‘যারা রাজার মেয়েকে বিয়ে করতে চায় তারা যেন আগামীকাল উপস্থিত থাকে যাতে আমরা রাজার জামাইকে দেখতে পারি। কিন্তু রাজার মনে কি খেয়াল তা কে জানে? আমরা এরকম জামাই নির্বাচনের প্রতিযোগিতা ইতোঃপূর্বে আর দেখিনি।’
পরের দিন রাজার বাড়ীর সামনে মাত্র তিনজনকে দেখা গেলো। প্রেমিকরা ভয় পাচ্ছিলো না জানি রাজা তাদেরকে অপমান করেন? তারা প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিলো। রাজা ঐ তিনজন প্রেমিককে অভ্যর্থনা জানালেন। তাদের পরিচিতি জানার পরে মেয়েকে তাদের সামনে হাজির করে বললেন: ‘আমার মনে হয় তোমরা তিনজনই আমার মেয়ের সত্যিকারের প্রেমিক’। এই আমার মেয়ে, একে ভালভাবে দেখো, আমার মেয়ে রাজী হলে আজকেই বিয়ের আয়োজন করবো। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে আমি রাজা, আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হলে কিছু শর্তাদি পালন করতে হবে। আমি শর্তাবলী বলার পরে তোমাদেরকে আধা ঘন্টা সময় দেবো, এরপর তোমরা তোমাদের মতামত কাগজে উপর লিখে দেবে এরপর আমি এবং আমার কন্যা সিদ্ধান্ত নেবো এরপর যা ভালো মনে হয় করবো । আমার শর্ত হলো: ‘আমার মেয়ের প্রেমিকদেরকে একটিই পিলারের সাথে বেধে ইচ্ছেমতো আঘাত করবো এরপর যদি বেঁচে থাকে, তারপর আমরা যাকে মনে করবো যে তার সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেবো। তাকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করা হবে এই শর্তে যে- সে কোনদিন এই বাড়ীতে পা রাখতে পারবেনা। সে জীবনে আমার নামে কোন অভিযোগ করতে পারবেনা। কোন কাজের জন্য আমার কাছে আসতে পারবেনা। সে আমার কাছে কোন কিছু চাইতে পারবেনা। আমার মেয়ে যদি তার সাথে খারাপ আচরণও করে এমনকি যদি তার শরীর থেকে চামড়া তুলে নেয় তবুও। যদি এ রকম কোন অবস্থা তৈরী হয়, যদি কেউ এ শর্ত মেনে নিজেকে প্রস্তুত করতে রাজী না হয় তাহলে তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে এ শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে আর কোনদিন এ শহরে পা রাখতে পারবেনা। সে আমার এবং আমার কন্যার নাম মুখে নিতে পারবেনা। আর যদি এর ব্যত্যয় ঘটে তাহলে আমি জানিনা যে আমি তার সাথে কি আচরণ করবো’।
‘এই নাও তিনটুকরো কাগজ। হাতে সময় আধা ঘন্টা, এই কাগজের উপর তোমাদের মতামত লিখে সই করবো যাতে আমি বুঝতে পারি কার কাছে আমার মেয়েকে সমর্পন করবো’।
এই বলে রাজা তিনজনের কাছে তিনটুকরো কাগজ দিয়ে তিনজনকে আলাদা আলাদা রুমে রাখলেন এবং দরজা বন্ধ করে দিলেন।
আধা ঘন্টা পরে রাজা, তার মেয়ে, কাজী, মৌলভী এবং বিবাহের রেজিস্টার নিয়ে আসলেন এবং ঐ কাগজগুলো আনার নির্দেশ দিলেন। তাদের মধ্যে একজন যুবক তার লেখা রাজার হাতে দিলেন। রাজা সেটি হাতে নিয়ে বললেন-এতো একটি, পরের জন তার লেখা দিলো রাজা সেটি হাতে নিয়ে বললেন- এতো দুইটি। তৃতীয় লেখাটি নিয়ে বললেন-‘এবার তোমাদের একে একে পরীক্ষা করবো’।
প্রথম যুবক লিখেছে-‘এটা খুবই কঠিন যে, আমি আমার ভালোবাসা ভুলে যাবো, কিন্তু যেহেতু রাজার হুকুম তাই চেষ্টা করবো যাতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে শহর ছেড়ে যেতে পারি। আশা করি রাজা এবং তার আত্মীয় স্বজনরা আমার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করবেন না। কেননা আমি তার একমাত্র প্রেমিক ছিলাম এবং এর মধ্যে কোন পাপ ছিলোনা’।
রাজা এবং তার মেয়ে ঐ লেখা দেখে মুচকি হাসলেন। রাজা বললেন-বেশ ভালো! এটা বোঝা গেল যে, সে প্রকৃত প্রেমিক নয়। সে তো ধূর্ত, দুর্বল ও পলায়মান। সে মেয়েকে বিয়ে করে রাজার সান্নিধ্যে আসতে চেয়েছিলো। ভালোবাসার ব্যাপারে তার কোন মাথাব্যথা ছিলোনা। এ ব্যক্তি জানেনা যে, কোন কিছু অর্জন করতে অনেক মসিবত অতিক্রম করতে হয়। সে তার সমস্ত জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে চেষ্টা করে কিছু হাসিল করতে না পারলে মাঝপথে পলায়ন করে। এই যুবক ভীতু এবং বুদ্ধিহীন কেননা সে চিন্তা করে কোন পথ বের করার কোন চিন্তাই করেনি। সব সময় মানুষ নিজেকে সবচেয়ে ভালো চেনে এবং এই পলাতক প্রেমিকে আমাদের কোন কাজ নেই বরং তার চলে যাওয়াই ভালো। সে যেন পিছনের দিকে ফিরে না চায়। আমরা তাকে ভুলে যাবো যাতে সে তার মতো করে ভালো থাকতে পারে’। পলায়নপর প্রেমিককে মুক্ত করে দেওয়া হলো। এবার দ্বিতীয় জনের পালা।
দ্বিতীয় জন লিখেছে- আমি রাজা এবং তার কন্যার সকল শর্ত গ্রহণে রাজি এবং তা বাস্তবায়ন করতেও প্রস্তুত। যদি আমি মারধরের পরে জীবিত থাকি তাহলে আমি আমার লক্ষ্যে পৌছুতে পারবো আর যদি জীবিত না থাকি তাহলে পরজগতে তার জন্য কাঁদবো কেননা আমার জীবনে আমি আর কিছু চাইনা হয় মৃত্যু অথবা এই রাজকন্যা।
রাজা এ লেখা পড়ার পরে কন্যাকে বললেন- এর ব্যাপারে তোমার মতামত কি?
রাজকন্যা বললো- আমি পাগল স্বামী চাইনা।
রাজা বললেন- মাশাআল্লাহ মা, তুমি ঠিকই বলেছো। এই যুবক পিলারের সাথে বাঁধা অবস্থায় মার খেতে রাজি এরপর আমার একজন আদেশের গোলাম হতে চায় এবং সে আমার থেকে দূরে থাকতে চায় সে আমাকে ভয় করে কেননা যদি শেষ পর্যন্ত রাজার তরবারি তার মাথাকে শরীর থেকে আলাদা করে দেয় সেজন্যও সে প্রস্তুত। কিন্তু আমার মেয়ে অন্যান্য মেয়েদের থেকে কত আলাদা? সে প্রেমের বিনিময়ে এই দুই জনের দূর্ভাগ্য কিনতে চায়নি। আমিও এটা বিশ^াস করতে পারছিনা যে, এই লোক এক সময় সুস্থ জ্ঞানবান হবে। এই যুবককে পাগলা গারদে বা মানসিক হাসপাতালে পাঠানো উচিত যাতে সে নিজের চিকিৎসা করতে পারে। আর সে যেন দ্বিতীয়বার আমার মেয়ের নাম নিতে না পারে। এই যুবক প্রেমিক নয়, সে পাগল। পাগল জামাই দিয়ে আমার কাজ নেই। সে খুব দ্রুতই আমাদেরকে ভুলে যাবে তাই আমাদেরও উচিত তাকে ভুলে যাওয়া, যাতে সে শান্তিতে থাকতে পারে।
তৃতীয় যুবকের লেখা পড়বার পালা। সে লিখেছে- আমার একটি চাচাতো বোন আছে যার কোন দোষ আমার চোখে ধরা পড়েনি। তবুও আমি রাজার মেয়েকে অধিক ভালোবাসি এবং স্বপ্ন দেখি যে, আমরা অধিকতর সুখী হবো। আমি শহর থেকে বাইরে যাবোনা, যদি আমাকে বাধ্য করা হয় তাহলে তা হবে আমার উপর জুলুম। কেননা আমি একজন নিরীহ মানুষ। কিন্তু রাজ কন্যাকে বিবাহের জন্য চাবুক খাওয়ার শর্ত এবং পরবর্তীতে বেচে থাকা জীবনে নিপীড়ন সেটাও আমি পছন্দ করিনা, কেননা এতে স্বয়ং রাজকন্যার জীবনেও শান্তি এনে দিবেনা, আমি এমন প্রেমিক ও আগ্রহি যাতে রাজকন্যাও আমাকে পছন্দ করে এবং রাজাও তার শর্ত শিথীল করেন। আর তা যদি না হয় তাহলে আমার চাচাতো বোন কি দোষ করেছে? আমি মনে করি সকল সমস্যা সমাধানের তৃতীয় কোন পথ আছে। আশা করি রাজা আমার এ লেখাকে অক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করবেন না। কেননা আমার কারো সাথে কোন বিবাদ নেই। কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাই এবং ভালোভাবে জীবন যাপন করতে চাই এবং সব সময় রাজকন্যাকে খুশী দেখতে চাই।
রাজা কন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন- এর ব্যাপারে তোমার কী মতামত?
রাজকন্যা বললো: আপনার যা মর্জি। আর তো কেউ অবশিষ্ট নাই।
রাজা মুচকি হেসে বললেন- ‘খুব ভালো! এই যুবক বুদ্ধিমান। সে জানে যে, তার চাচাতো বোনের সাথে আমার মেয়ের কোন পার্থক্য নাই। কিন্তু আমার মেয়েকে বেশি ভালোবাসে এবং চিন্তা করে যে তোমার জীবন সুন্দর হোক। এই যুবক বুদ্ধিমান এজন্য যে, সে শহর থেকে বের হওয়ার ভয় করেনা এবং সময়ের কাছে সে আত্মসমর্পণ করেনা এবং সে তৃতীয় কোন পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। আমার শর্তাবলী ছিলো শুধু পরীক্ষার জন্য। আমারও কারো সাথে কোন বিবাদ নেই। আমিও আমার মেয়ের কল্যাণ ও সুখ চাই। এখন এই যুবকের অধিকার আছে আমার মেয়েকে বিয়ে করার। যদি সে রাজি থাকে তবে শর্তহীনভাবে আজকেই বিয়ের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করবো। আর যদি সে রাজি না থাকে তবে বুঝবো সে তার চাচাতো বোনের সাথেই ভালো থাকবে। আমরাও তার বিবাহ অনুষ্ঠানে যাবো এবং তাদেরকে শুভেচ্ছা জানাবো। হে যুবক! এখন তোমার শেষ কথা বলো’।
যুবক বললো- ‘আমি এ মেয়ের সাথে বিবাহের জন্যই অধিকতর আগ্রহি’।
রাজকন্যা বললো- ‘আমিও….’
রাজা বললেন- ‘আমিও তোমাদের শুভেচ্ছা জানাই এবং সৌভাগ্য কামনা করি, আশা করি তোমরা সুখী হবে।’