সোমবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

বিশ্বমানবের জন্য (সা.)-এর শিক্ষা

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ১৯, ২০১৬ 

 

বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম্

‘(হে রাসূল!) বলুন : এসো আমি পাঠ করি তা তোমাদের রব্ তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন, তা হচ্ছে এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করো না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ কর এবং দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। বস্তুত আমিই তোমাদেরকে ও তোমাদের ব্যতীত অন্যদেরকে রিয্ক প্রদান করে থাকি। আর তোমরা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনো ধরনের নির্লজ্জতার কাছেও যেও না। আর ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যতীত আল্লাহ্ যাকে হত্যা করাকে হারাম করেছেন এমন কাউকে হত্যা করো না। তিনি তোমাদেরকে এ উপদেশ দিচ্ছেন; আশা করা যায় যে, তোমরা বিচারবুদ্ধি দ্বারা তা উপলব্ধি করবে। আর (তাদেরই) কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে ব্যতীত তোমরা ইয়াতীমের সম্পদের কাছেও যেও না যতক্ষণ না তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আর তোমরা মাপক পাত্র ও তুলাদ-কে ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবহার কর। বস্তুত আল্লাহ্ কারো ওপরে তার সাধ্যের অতীত দায়িত্ব চাপান না। আর তোমরা যখন কথা বলবে তখন ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি বজায় রাখবে, এমনকি তোমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের বেলায় হলেও। আর তোমরা আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ কর। তিনি তোমাদেরকে এ উপদেশ দিয়েছেন, আশা করা যায় যে, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে।’ (সূরা আল্-আন্‘আম : ১৫১-১৫২)
মক্কা শরীফে সফরের উদ্দেশ্যে আগত এক ব্যক্তিকে এই বলে সতর্ক করা হয়েছিল যে, তিনি যেন হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কথা না শোনেন, কারণ, (নিষেধকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী) তাহলে ঐ সব কথা তাঁকে জাদুগ্রস্ত করে ফেলবে। কিন্তু তিনি ছিলেন বিচারবুদ্ধির অনুসরণকারী একজন মুক্ত বিবেক মানুষ। এ কারণে তিনি তাদের এ মন্দ উপদেশ উপেক্ষা করেন এবং মসজিদুল হারামে গিয়ে রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথে দেখা করেন। অতঃপর কোরআন মজীদের উপরিউক্ত আয়াত দু’টি শুনে তিনি সাথে সাথে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং অনুভব করেন যে, এ আয়াত দু’টিতে নিহিত শিক্ষা তাঁর সম্প্রদায়ের সকল গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করবে।
ঐ ব্যক্তিটি মক্কায় সফরে এসেছিলেন মদীনা থেকে- যে শহরটি অচিরেই রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নতুন বাসভূমিতে পরিণত হয়। আর তিনি সেখানে উপরিউক্ত ঐশী ও সুবিচারপূর্ণ মূলনীতিমালা এবং অন্তরঙ্গতার ভিত্তিতে একটি নতুন সম্প্রদায় গড়ে তোলেন।
রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর রবের পক্ষ থেকে মানুষকে এ শিক্ষা দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন যে, তারা যেন একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলা ব্যতীত আর কারো ইবাদত-বন্দেগি না করে এবং তাঁর সাথে আর কাউকে শরীক না করে। তাঁকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হয় যে, তিনি যেন লোকদেরকে পৌত্তলিকতার ন্যায় মানবতার জন্য অবমাননাকর যুলুম থেকে এবং কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। তিনি লোকদেরকে শিক্ষা দেন যে, তারা যেন একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণ করে; সমাজের কাছে নয়, শাসকদের কাছে নয় বা সংখ্যাগুরু জনগণের কাছে নয়, কেবল আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে। তিনি এ শিক্ষা প্রদান করেন যে, আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যেই নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা নিহিত রয়েছে।
মুক্তি ও স্বাধীনতার শিক্ষা দিতে গিয়ে তিনি আমাদেরকে সকল লজ্জাকর গুনাহ্র কাজ পরিহার করার জন্য শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কাছে, আমাদের মূল্যবোধ সমূহের কাছে ও আমাদের আদর্শের কাছে ন্যায়নিষ্ঠ ও আন্তরিক হবার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন এবং আমাদেরকে পাপপ্রবণ প্রবৃত্তির আশা-আকাক্সক্ষার মধ্যেÑ যাতে আমাদের প্রকৃত ও চূড়ান্ত ধ্বংস নিহিত রয়েছে, তাতে নিমজ্জিত হওয়া থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, কোনো ব্যক্তি যখন গুনাহের পথ বেছে নেয় সে ক্ষেত্রে সে যদি এ পথে ধীর পদবিক্ষেপেও অগ্রসর হতে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার ধ্বংস অনিবার্য।
রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আমাদেরকে জীবনের মর্যাদা শিক্ষা দিয়েছেন। আর তিনি এমন এক সময় এ শিক্ষা প্রদান করেন যখন প্রতিশোধমূলক হত্যার ও তথাকথিত মর্যাদা রক্ষার জন্য হত্যার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। তখন অত্যন্ত তুচ্ছ কারণে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে যে কাউকে হত্যা করা হতো। সে পরিস্থিতিতে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) লোকদেরকে শিক্ষা দেন যে, কেবল ন্যায়সঙ্গতভাবে ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি ব্যতীত কাউকে হত্যা করা যাবে না, যদিও ক্ষমা সর্বাবস্থায়ই সর্বোত্তম।
তখন এমন একটি সময় ছিল যখন পিতা কেবল এ কারণে স্বীয় সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুসন্তানকে জীবন্ত কবর দিত যে, সে ভয় করত যে, এ শিশুর ভরণ-পোষণ বহনে সক্ষম হবে না। হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) এ শিক্ষা প্রদান করেন যে, পিতা-মাতা ও সন্তান নির্বিশেষে সকলকে আল্লাহ্ তা‘আলাই রিয্ক্ প্রদান করেন।
বর্তমানে আমরা এমন এক পৃথিবীতে বসবাস করছি যখন প্রতিদিন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিস্ময়কর সংখ্যক প্রাণ বিনষ্ট হচ্ছে। যখন প্রাণসমূহ এমনকি মাতৃগর্ভের নিরাপদ আশ্রয় থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই বিনষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কিছুতেই জীবনের মর্যাদা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আমাদেরকে সুবিচার ও সত্য শিক্ষা দিয়েছেন এবং নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণের ভিত্তিসমূহ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, আসমান ও যমীন সুবিচার বা ভারসাম্যের ওপর ভিত্তিশীল। তিনি সব সময় ও সর্বাবস্থায়ই সুবিচারকে সমুন্নত রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, সর্বাবস্থায়ই সত্য বলতে হবে, এমনকি তা আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও।
তিনি বলেন যে, সুবিচার প্রতিষ্ঠার কাজে এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করা সত্তর বছর (নফল) ইবাদত করার চেয়েও অধিকতর উত্তম।
আমরা সকলেই বেশ ভালোভাবেই জানি যে, অন্যায়, অবিচার ও মিথ্যাচার, বিশেষ করে তা যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে হয়, কীভাবে আমাদের এ বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করতে পারে। তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, ছোট-বড় নির্বিশেষে সকল ক্ষেত্রে সুবিচার ও সত্যবাদিতার ওপর অবিচলতা কীভাবে আমাদেরকে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যাবলির সমাধানে সাহায্য করে।

রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন এমন একজন মহান শিক্ষক যিনি সব সময়ই ব্যক্তিগত আচার-আচরণের ক্ষেত্রে গভীর আন্তরিকতা ও অন্তরঙ্গতার পরিচয় দিতেন। কখনো যদি এমন হতো যে, তাঁর কোনো বন্ধু বা স্বজনের সাথে তিন দিন পর্যন্ত তাঁর দেখা হয় নি তাহলে তিনি তাঁকে দেখতে যেতেন এবং তাঁর খোঁজখবর নিতেন। তিনি চলার পথে যদি কোনো শিশুকেও দেখতে পেতেন তাহলে তার প্রতি হাসিমুখে তাকাতেন এবং তাকে আগে সালাম দিতেন। তিনি যখন তাঁর সাহাবীদের সাথে বসতেন তখন তিনি তাঁদের সকলের প্রতি সমানভাবে দৃষ্টিপাত করতেন যাতে সকলেই নিজেদেরকে সমানভাবে ধন্য মনে করতেন এবং অনুভব করতেন যে, তাঁদেরকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

তাঁর ক্বওমের লোকেরা তাঁর আন্তরিকতা এবং দয়া-অনুগ্রহে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বর্ণিত আছে যে, একবার জনৈকা মহিলা তাঁর পুত্রকে দান হিসেবে কিছু পাবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছে পাঠান। যেহেতু মহিলা জানতেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) খুবই দানশীল ছিলেন এবং এ কারণে কখনো কখনো এমন হতো যে, তাঁর কাছে দান করার মতো কিছুই থাকতো না। সেহেতু মহিলা তাঁর পুত্রকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছে যদি দান করার মতো কিছু না থাকে তাহলে সে যেন তাঁর কাছে তাঁর গায়ের জামাটি চায়। ঘটনাক্রমে সেদিন তাঁর কাছে দান করার মতো কিছুই ছিল না। তাই ছেলেটি তাঁর কাছে তাঁর পরিধানের জামাটি চায়। তখন তিনি তাঁর কক্ষের দরজা বন্ধ করে তাঁর গায়ের জামাটি খুলে দরজার ফাঁক দিয়ে ছেলেটিকে দান করেন। এরপর আরেকটি জামার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর গৃহে আবদ্ধ থাকেন।
আরেক বার তিনি তাঁর চাচাতো ভাই, তাঁর ঘনিষ্ঠতম সাহাবী ও তাঁর ওয়াসী হযরত আলী (আ.)-কে তাঁর জন্য একটি জামা কিনে আনতে বাজারে পাঠালেন। হযরত আলী তাঁর জন্য বারো র্দেহাম মূল্যে একটি জামা কিনে আনলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) অপেক্ষাকৃত কম দামি একটি জামা চাচ্ছিলেন। তাই তিনি হযরত আলীকে সাথে নিয়ে বাজারে গেলেন। তিনি ঐ জামাটি বিক্রেতাকে ফিরিয়ে দিয়ে চার র্দেহাম মূল্যের একটি জামা নিলেন এবং অবশিষ্ট আট র্দেহাম সহ তিনি ঘরে ফিরে আসার পথ ধরলেন। পথে একজন গরীব লোকের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো যার গায়ের জামাটি ছিল ছিন্ন ও মলিন। তখন তিনি তাকে চার র্দেহাম্ দিলেন এবং একটি জামা কিনে নিতে বললেন।
এরপর এক ধনী পরিবারের এক ক্রীতদাসী বালিকার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। মেয়েটির মনিব তাকে চার র্দেহাম্ দিয়ে মুদি দ্রব্যাদি কেনার জন্য পাঠিয়েছিল, কিন্তু সে তা হারিয়ে ফেলেছিল, তাই সে তার মনিবের ভয়ে কাঁদছিল। তখন নবী করীম (সা.) তাঁর অবশিষ্ট চার র্দেহাম্ ঐ মেয়েটিকে দান করলেন। কিন্তু এরপরও সে কাঁদতে লাগল। সে বলল যে, সে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বসে কাঁদছিল এবং এখন দেরীতে ঘরে ফিরলে তার মনিব তাকে দেরী করার কারণে প্রহার করবে। তখন মেয়েটির মনিব যাতে তাকে প্রহার না করে সে জন্য নবী করীম (সা.) তার সাথে তার মনিবের গৃহে গেলেন।
তিনি মেয়েটির মনিবের গৃহের দরজায় পৌঁছে গৃহবাসীদের উদ্দেশে সালাম করলেন। জবাব আসতে দেরী হওয়ায় তিনি তিন বার সালাম করলেন। এরপর তারা জবাব দিল। নবী করীম (সা.) তাদের গৃহে আসায় তারা নিজেদেরকে ধন্য মনে করল এবং তাঁর সম্মানার্থে মেয়েটিকে ক্ষমা করে দিল। শুধু তা-ই নয়, তাঁর সম্মানার্থে তারা ক্রীতদাসীটিকে মুক্ত করে দিল। হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) তিন বার সালাম না করা পর্যন্ত তাদের জবাব না দেয়ার কারণ জানতে চাইলেন। জবাবে তারা বলল : ‘আমরা আপনার কণ্ঠের সুমিষ্ট সম্ভাষণ তিন বার শুনতে চাচ্ছিলাম।’
রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নেতৃত্বের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং বিশ্ববাসীর প্রতি সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অনুগ্রহ ছিল হযরত আলী (আ.)-কে স্বীয় উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীতকরণ। কারণ, নিষ্পাপ ব্যক্তিত্ব হযরত আলী (আ.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ততার জন্য উপযুক্ততম ব্যক্তিত্বÑ যিনি রাসূলুল্লাহ্র নীতিমালা ও শিক্ষাকে সমুন্নত রাখেন, বিশেষ করে তাঁরই মতো সুবিচার ও সত্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বাস্তবায়ন করেন।
হযরত আলীকে যখন মুসলিম উম্মাহ্র নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব ও পরিচালনার সুযোগ দেয়া হয় তখন তিনি বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে জনগণের মধ্যে সামাজিক সুবিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুসলমানদের নেতৃত্বের জন্য পরিপূর্ণ জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করেন। বস্তুত হযরত আলী (আ.) মানব জাতির মধ্যে সুবিচারের কণ্ঠস্বরে পর্যবসিত হন এবং তিনি সত্য ও সুবিচার নিয়েই বেঁচে থাকেন এবং সত্য ও সুবিচার নিয়েই শাহাদাত বরণ করেন।
অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী