বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

বিজাতীয়দের প্রতি আশার দৃষ্টিতে তাকাবেন না

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ৮, ২০১৬ 

হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ উযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের ও  সরকারের প্রতি বিজাতীয়দের প্রতি আশার দৃষ্টিতে না তাকানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গত ৭ই জানুয়ারি (২০১৫) ইরানের অন্যতম ধর্মীয় নগরী কোমে এক বিশাল জনসমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে এ আহ্বান জানান।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী উল্লেখ করেন যে, বিজাতীয়রা ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারির ঘটনাসহ ইসলামী বিপ্লব চলাকালীন ঘটনাবলি এবং ২০০০ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের ঘটনাসহ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর বাস্তবতাকে বিকৃত করা ও সেগুলোকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, বিজাতীয়দের এ ধরনের অপচেষ্টাকে অবশ্যই মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, ইরানী জাতির সাথে বলদর্পী শক্তিবর্গের দুশমনির কোনো শেষ নেই। এমতাবস্থায় দেশের দায়িত্বশীলদের ও সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তির সহায়তায় আস্থার অযোগ্য শত্রুর চাপিয়ে দেয়া নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত করা। তিনি বলেন, তাদেরকে প্রকৃতই যে বিষয়গুলো সুস্পষ্ট সেগুলোর প্রতি আশা পোষণ করতে হবে এবং ইসলামী বিপ্লবের ও ইরানী জাতির প্রোজ্জ্বল আশা-আকাক্সক্ষাগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহ পালন করে যেতে হবে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ.)-এর জন্মদিবস উপলক্ষে সকলকে অভিনন্দন জানান এবং ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারির গণঅভ্যুত্থানকে একটি বিরাট ও ভাগ্য নির্ধারণী ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের ও বিগত তিন দশকের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো ও বড় বড় ভাগ্যনির্ধারণী ঘটনাগুলো ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যে অপচেষ্টা চলছে তার পেছনে দুশমনদের বিরাট অসদুদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। কিন্তু এ জাতি যতদিন জীবিত আছে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার অধিকারী হৃদয়ের ও সত্যভাষী যবানের অধিকারী মুমিন জনগণ যতক্ষণ ময়দানে হাযির আছেন ততক্ষণ এ ধরনের দুর্ঘটনা সংঘটিত হবে না।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারির ঘটনা, ১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ইসলামী বিপ্লবের বিজয় ও ইসলামী বিপ্লব চলাকালীন অন্যান্য ঘটনা এবং এবং ২০০০ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের ঘটনাকে ইরানী জাতির জন্য ক্রান্তিকালীন ও ভাগ্য নির্ধারণী ঘটনাবলি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এসব ঘটনায় জনগণের অংশগ্রহণকে জিহাদস্বরূপ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের প্রতিপক্ষ ফ্রন্ট বিপ্লবের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের প্রতি আশার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল এবং ধারণা করেছিল যে, তাদেরকে বিপ্লবের প্রতি বিমুখ করে তুলতে পারবে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের এই তৃতীয় প্রজন্মের যুবকরাই ২০০০ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের বিরাট ঘটনা সংঘটিত করেছিল এবং যারা ইসলামী বিপ্লবের চলার পথকে বিভ্রান্ত করতে ও বিপথে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল তাদের চেহারার ওপরে দৃঢ় মুষ্টাঘাত হেনেছিল।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারি তারিখে কোম নগরীতে সংঘটিত ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ৯ই জানুয়ারির ঘটনা ছিল দেশব্যাপী এক বিরাট আন্দোলনের সূচনাÑ যার ফলে গোটা ইরানী জাতি তাগূতী সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত যালেমশাহী এ দেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়।
তৎকালীন পাহ্লাভী সরকারের আমলের বাস্তবতা ও ঘটনাবলিকে পরিবর্তিত রূপে তুলে ধরার জন্য যারা অপচেষ্টা চালাচ্ছে এর পেছনে তাদের যেসব অসদুদ্দেশ্য রয়েছে সে সম্পর্কে উল্লেখ করে হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী পাহ্লাভী সরকারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর তিনি বলেন, পাহ্লাভী সরকার ছিল একটি কলঙ্কিত একনায়কতান্ত্রিক সরকার, আর তার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল নিষ্ঠুরতম কর্মপন্থার অনুসরণ এবং শ্বাসরুদ্ধকর কারাগারগুলোতে রাজবন্দিদের ওপর পৈশাচিকতম যুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়নের আশ্রয় গ্রহণ। কিন্তু এতদসত্ত্বেও, আজকের দিনে যারা নিজেদেরকে মানবাধিকারের পতাকাবাহী বলে দাবি করে তারা সেদিন সর্বশক্তি দিয়ে পাহ্লাভী সরকারের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছিল।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার ধ্বংসপ্রাপ্ত শাহী সরকারের জাহান্নামতুল্য গুপ্ত পুলিশী সংস্থা সাভাক্-এর প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং সারা দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে যায়নবাদী ইসরাঈল সরকারের ও আমেরিকানদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, সাম্প্রতিককালে আমেরিকায় সেখানকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র গোপন কারাগারসমূহের অস্তিত্ব ও সেগুলোতে নির্যাতনের যেসব ঘটনা ফাঁস হয়েছে তা থেকেও প্রমাণিত হয়েছে যে, আমেরিকানরা যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার সমর্থক বলে নিজেদেরকে দাবি করে থাকে বাস্তবতার সাথে তার সামান্যতমও মিল নেই।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বাইরের শক্তিসমূহের প্রতি লজ্জাজনক নির্ভরতাকে প্রাক্তন পাহ্লাভী সরকারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, সে যুগে বিজাতীয় শক্তিসমূহের স্বার্থ, বিশেষ করে আমেরিকার স্বার্থ যা কিছু দাবি করত পাহ্লাভী সরকার তার অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নীতি ও আচরণে তা-ই বাস্তবায়ন করতÑ যার ফলে ইরানী জাতি গুরুতরভাবে লাঞ্ছিত ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হতো।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার আরো বলেন, আমেরিকানরা যে ইরানী জাতি ও ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে সীমাহীন আক্রোশ, হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষা ও দুশমনি পোষণ করছে তার কারণ এই যে, ইরানের মতো বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও অবস্থানের অধিকারী একটি দেশ ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বিগত পাহ্লাভী সরকারের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন যে, ঐ সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের লোকেরা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের যৌন অনাচার এবং রাজনৈতিক ও নৈতিক-চারিত্রিক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ঐ নোংরা ও দুর্নীতিবাজ সরকার দেশের জনগণকে মোটেই হিসাব করত না এবং জনগণের রায় ও মতামতকে আদৌ কোনো গুরুত্ব দিত না। বস্তুত তখন জনগণ ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতি দৃষ্টি না দেয়া, জনগণের মধ্যে নিজ জাতিকে ছোট করে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলার অপচেষ্টা, পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে বড় ও মহান করে দেখানো, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পুনরুজ্জীবনের পরিবর্তে জনগণের মধ্যে আমদানিকৃত পণ্য ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং দেশের কৃষিব্যবস্থা ও জাতীয় শিল্প ধ্বংসকরণকে পাহ্লাভী সরকারের কালো আমলনামার অন্যান্য দিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের সচেতন জনগণ যখন নিজেদের প্রতি এ ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য, লাঞ্ছনা, যুলুম ও নির্যাতন-নিপীড়ন এবং অনাচার-দুর্নীতি প্রত্যক্ষ করে তখন তারা একজন আল্লাহ্ওয়ালা মানুষের অর্থাৎ হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ের অধিকারী হয়।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী জোর দিয়ে বলেন, ইরানী জাতি যে বর্তমানে বিরাট উন্নতি-অগ্রগতি ও সাফল্যের অধিকারী হয়েছে এবং সচেতনতার অধিকারী হয়েছে, আর সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে শ্রেষ্ঠতম অবস্থানের অধিকারী হয়েছে তার সবকিছুই কেবল যালেম, নিপীড়ক ও দুর্নীতিগ্রস্ত পাহ্লাভী সরকারের ন্যায় বিরাট বাধা অপসারিত হওয়ার কারণে সম্ভব হয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর বলদর্পী দাম্ভিক শক্তিবর্গের ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ইরানী জাতির বিরুদ্ধে দুশমনি শুরু হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, এ দুশমনরা ইরানী জনগণের বিরুদ্ধে যে নোংরামি ও দুশমনি শুরু করেছে তা থেকে হাত গুটিয়ে নেবে বলে যেন কেউ মনে না করেন।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেন, আপনারা যদি কখনো দুশমনের মোকাবিলায় উদাসীন হন এবং তার ওপরে আস্থা স্থাপন করেন তাহলে দুশমন এ দেশে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য সুযোগ ও অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু আপনারা যদি শক্তিশালী হন ও প্রস্তুত থাকেন এবং দুশমনকে ঠিকভাবে চিনতে পারেন তাহলে দাম্ভিক বলদর্পী শক্তি নিরুপায় হয়েই ইরানী জাতির বিরুদ্ধে তার দুশমনি থেকে হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
বর্তমানে বিশ্বের বলদর্পী শক্তিগুলোর সম্মিলিত ফ্রন্ট ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যে চাপ সৃষ্টি করছে সে সম্পর্কে ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার বলেন, এ হচ্ছে এমন এক ধরনের দুশমনি থেকে উদ্ভূত যা কখনো শেষ হবার নয়। এরপর তিনি বলেন, যদিও সামাজিক সুবিচার ও ইসলামী চরিত্র ইত্যাদি ইসলামী বিপ্লবের আশা-আকাক্সক্ষাসমূহের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো আমাদেরকে আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, তবে ইরানী জাতির অসামর্থ্য সম্বন্ধে কিছু লোক যে কোনোরূপ হিসাব-নিকাশ ব্যতিরেকেই ভ্রান্ত কথাবার্তা বলে থাকে তাদের ধারণার বিপরীতে এ জাতি স্বীয় আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথে অভিযাত্রায় অনেক ক্ষেত্রেই বিরাট সাফল্যর অধিকারী হয়েছে।
যেসব লোক বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাফল্যসমূহ দেখেও না দেখার ভান করে তাদের সমালোচনা করে ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের যেসব সাফল্যকে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক কেন্দ্রসমূহও স্বীকৃতি দিয়েছে কেন তোমরা সেগুলো অস্বীকার করছ এবং দেশের জনগণ যে গৌরবময় চলার পথ অতিক্রম করেছে- এমনকি দুশমনরাও যেসব সাফল্যের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছে- কেন তোমরা তোমাদের নির্বুদ্ধিতামূলক ও ভ্রান্ত কথাবর্তার দ্বারা সে পথে চলার ক্ষেত্রে জনমনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছ?
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী ইসলামের প্রথম যুগের কথা উল্লেখ করে বলেন, সে যুগেও সকল আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে, লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের পথে অভিযাত্রা ও তৎপরতা অব্যাহত ছিল। আর আজকেও, ইরানী জাতি গৌরব, শক্তিমত্তা ও আপোসহীনতা সহকারে সে পথে স্বীয় অভিযাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার তাঁর বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় দেশের ও সমাজের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং জাতীয় ঐক্য ও মতৈক্যকে আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যে কোনো বাহানায় বা যে কোনো যুক্তিতেই হোক, জনগণের মধ্যে অনৈক্য ও দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি জাতীয় স্বার্থের বিরোধী এবং জাতির আশা-আকাক্সক্ষারও বিরোধী।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী সরকার ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে সহায়তা করাকে সকলের দায়িত্ব বলে অভিহিত করেন। তিনি ভিতরের দিকে দৃষ্টিপাত করার জন্য পুনরায় গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদেরও জেনে রাখা দরকার যে, একমাত্র যা তাঁদেরকে তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেয়ার ক্ষেত্রে সক্ষম করতে পারে তা হচ্ছে জনগণ ও অভ্যন্তরীণ শক্তি।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুলুমমূলক নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বলেন, এতে সন্দেহ নেই যে, নিষেধাজ্ঞাসমূহ দেশের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেছে, কিন্তু দুশমন যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য ইসলাম, স্বাধীনতা ও বৈজ্ঞানিক উন্নতিসহ বিভিন্ন মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার সাথে জড়িত বিষয় থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার শর্ত আরোপ করে, তাহলে নিঃসন্দেহে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির আত্মমর্যাদাই তা গ্রহণ করতে পারে না।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী আরো বলেন, অবশ্য দুশমন আপাতত সুস্পষ্ট ভাষায় আমাদের জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলছে না। কিন্তু পশ্চাদপসরণ করা হলে পরে তারা আমাদের জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষাসমূহের দিকেও হাত বাড়াবে। সুতরাং আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দুশমনদের প্রস্তাবসমূহ, কথাবার্তা ও পদক্ষেপসমূহ পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করতে হবে। তিনি নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলায় ইরানকে নিরাপদ করাকে দুশমনের শক্তির মহড়াকে সীমিত করে ফেলার একমাত্র পন্থা বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, প্রতিরোধমূলক অর্থনীতির প্রকৃত তাৎপর্য এটাই। আর এ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যের বাস্তবায়নই হচ্ছে দেশের সরকারের ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আসল দায়িত্ব।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার ইতিপূর্বেও যে দেশকে তেল বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভরতা থেকে বের করে আনার ওপর বার বার গুরুত্ব আরোপ করেছেন তার উল্লেখ করে বলেন, দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ও সরকার যেন বিজাতীয়দের প্রতি আশার দৃষ্টিতে না তাকান; তাঁদেরকে মনে রাখতে হবে যে, তাঁরা যদি এমনকি এক কদমও পশ্চাদপসরণ করেন তাহলে তার ফলে তা দুশমনকে এগিয়ে আসতে সাহায্য করবে। সুতরাং মৌলিক চিন্তা করতে হবে এবং জাতি ও অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর নির্ভর করে এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে দুশমন নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলেও উন্নয়ন, অগ্রগতি, দীপ্তি ও জনগণের কল্যাণের ওপর কোনো আঘাত না আসে।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী এ ব্যাপারে আরো বলেন, দুশমনের হাত থেকে নিষেধাজ্ঞার অস্ত্রকে কেড়ে নিতে হবে। কারণ, আপনারা যদি দুশমনদের প্রতি আশার দৃষ্টিতে তাকান তাহলে নিষেধাজ্ঞা একইভাবে বহাল থাকবে, ঠিক যেভাবে আমেরিকানরা এখন পুরোপুরি নির্লজ্জতার সাথে বলছে যে, ইরান যদি পারমাণবিক ইস্যুতে নতি স্বীকার করে তথাপি সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে না এবং যেগুলো তুলে নেয়া হবে তা-ও একবারে তুলে নেয়া হবে না। তিনি প্রশ্ন করেন, বাস্তব অবস্থা যেখানে এই, এমতাবস্থায় এ ধরনের দুশমনের ওপর কি আদৌ আস্থা রাখা সম্ভব?
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার আরো বলেন, আমি আলোচনার বিরোধী নই। কিন্তু আমি মনে করি যে, প্রকৃতই যেসব বিষয় আশার সঞ্চারকারী কেবল সেসব বিষয়ের প্রতিই আশার দৃষ্টিতে তাকাতে হবে, কাল্পনিক বিষয়াদির প্রতি নয়।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী তাঁর এ ভাষণের সমাপ্তি পর্যায়ে বলেন, আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ তাঁদের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন এবং সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে সরকারকে সাহায্য করা। কিন্তু সরকারে যাঁরা আছেন তাঁদেরকেও সতর্ক থাকতে হবে। তাঁরা যেন কোনো ক্ষেত্রেই দায়িত্বহীনতার পরিচয় না দেন এবং এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা ও তার মাধ্যমে বিভক্তি সৃষ্টির কারণ ঘটানো থেকে বিরত থাকেন; তাঁরা যেন জাতির ঐক্য, ঈমান ও হিম্মতকে সঠিকভাবে কাজে লাগান।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ভবিষ্যৎ প্রোজ্জ্বল বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহে ইসলামী বিপ্লবের ও ইরানী জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার গৌরবময় পথে অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং দেশের যুবসমাজ এমন একটি দিনের দেখা পাবে যখন উদ্ধত বলদর্পী ও যালেম দুশমন তাদের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে।

অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী