সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে ব্যক্তি ও সমাজের করণীয়

পোস্ট হয়েছে: মে ৩, ২০১৮ 

news-image

আমিনুল ইসলাম শান্ত: বাংলাদেশে বজ্রপাতে জীবনহানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। জানা গেছে, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বের বুকে বাংলাদেশেই সর্বাধিক। চলতি মওসুমসহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারা দেশে এ দুর্যোগে বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে বজ্রপাতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান এবং জনসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ। এ মওসুমে গত দেড় মাসে বজ্রপাতে সারা দেশে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় সত্তর জন মানুষ। গত আট বছরে বজ্রপাতে বাংলাদেশে মারা গেছে আঠারো শতাধিক মানুষ। যার বেশির ভাগ কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত মানুষ।

বাংলাদেশে মার্চ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত প্রায় চার মাস ভারী বজ্রপাত হচ্ছে বলে গবেষণায় প্রকাশ। বজ্রপাতের কারণে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ দূষণের কারণেও বজ্রপাতের হার বেড়ে গেছে। আবহাওয়াবিদদের কাছে বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও নেই কোনো প্রস্তুতি। বাংলাদেশে বছরের দু’টি মওসুমে বজ্রপাত বেশি হয়। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউ স্মিডলিনের রিস্ক ফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোস্যাল ভারনারেবেলিটি শীর্ষক গবেষণা থেকে দেখা যায়, প্রতি বছর মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। গবেষণায় টমাস দেখান, ঝড় ও বজ্রঝড়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে বাংলাদেশে। তার মতে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হারের চেয়েও অধিক।

ঝড়বৃষ্টির সময় আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানির সাথে সৃষ্ট প্রচণ্ড শব্দই বজ্রপাত। প্রাকৃতিকভাবেই বায়ুমণ্ডলে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়ে মেঘে জমা থাকে। এই বিদ্যুৎ মেঘে দুটি চার্জ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক হিসেবে থাকে। বিপরীত বিদ্যুৎশক্তির দুটো মেঘ কাছাকাছি এলেই পারস্পরিক আকর্ষণে চার্জ বিনিময় হয়। ফলে বিদ্যুৎ চমকায়। মেঘের নিচের অংশে ঋণাত্মক চার্জ বহন করে। আবার ভূপৃষ্ঠে থাকে ধনাত্মক চার্জ। দুই চার্জ মিলিত হয়ে তৈরি করে একটি ঊর্ধ্বমুখী বিদ্যুৎপ্রবাহ রেখা যা প্রচণ্ড বেগে ওপরের দিকে উঠে যায়। ঊর্ধ্বমুখী এই বিদ্যুৎপ্রবাহ উজ্জ্বল আলোর যে বিদ্যুৎপ্রবাহের সৃষ্টি করে তা-ই বজ্রপাত। বজ্রপাতের তাপ ৩০ থেকে ৬০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, আকাশে যে মেঘ তৈরি হয় তার ২৫ থেকে ৭৫ হাজার ফুটের মধ্যে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে বেশি। বজ্রপাতের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মিটার বেগে নিচে নেমে যায়। এই বিপুল পরিমাণ তাপসহ বজ্র মানুষের দেহের ওপর পড়ার সাথে সাথেই তার মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের স্থায়িত্বকাল এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ।

ঠিক এ সময়েই বজ্রপাতের প্রভাবে বাতাস সূর্যপৃষ্ঠের পাঁচগুণ বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। শব্দের গতি আলোর গতির থেকে কম হওয়ায় বজ্রপাতের পরই শব্দ শোনা যায়। বজ্রপাত ভূমিকম্পের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। একটি বজ্রপাতে প্রায় ৫০ হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎশক্তি থাকে। অথচ বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ চলে গড়ে ১৫ অ্যাম্পিয়ারে। একটি বজ্র কখনো কখনো ৩০ মিলিয়ন ভোল্ট বিদ্যুৎ নিয়েও আকাশে জ্বলে ওঠে।

২০০৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নিউজ বজ্রপাতকে আবহাওয়া সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে। বাংলাদেশে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থা ‘ফিউচার ব্রিজ ফাউন্ডেশন’ বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক কাজ করছে বিগত ছয় বছর যাবৎ। তাদের মতে, বাংলাদেশে জনসচেতনতার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার ও শিক্ষামূলক কাজ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বজ্রপতে আক্রান্তের শিকার ৭৬ শতাংশ পুরুষ। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে আশ্রয় গ্রহণকারীরাই বেশি আক্রান্ত হন। খেলার মাঠ, পথ, কৃষি ক্ষেত্রে এবং গাছের কাছে বজ্রপাত বেশি সংঘটিত হয়।

জনসচেতনতার লক্ষ্যে গণমাধ্যম নিতে পারে ব্যাপক ভূমিকা। সর্বাধিক সতর্ক করতে হবে কৃষিকর্মীদের। যে তথ্যগুলো প্রচার করা জরুরি, তা হলো-

ক.কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতকালীন বাইরে বের হওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

খ.আকাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বাসা বা অফিস থেকে বের হতে হবে। বছরের উল্লিখিত মাসগুলোতে সকালে ওয়েদার অ্যাপস, রেডিও, টিভি ও সংবাদপত্র থেকে তথ্য জেনে বের হতে হবে।

গ.খেলার কোচ ও ইভেন্ট অফিসারদের পরিকল্পনা গ্রহণ: আপনি বা আপনার সন্তান বাইরে যদি কোনো ইভেন্টে অংশ নিয়ে থাকে এবং এ সময় বজ্রপাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, তাহলে স্কাউট লিডার, কোচ, আম্পায়ার, রেফারিকে অনুষ্ঠানের পরিবর্তিত তারিখ ঘোষণা করতে বাধ্য করুন। অবশ্যই প্রাধান্যযুক্ত বিষয় হতে হবে জীবনের নিরাপত্তা।

ঘ.যখন মেঘ গর্জন শুরু করে, দ্র্রত ঘরে প্রবেশ করুন। এমনকি বৃষ্টিপাত না হলেও। সর্বশেষ বজ্রপাতের পরও ন্যূনতম ৩০ মিনিট ঘরে অবস্থান করুন। অবশ্যই মনে রাখতে হবে এটি একটি গাইডলাইন। এটি কোনো মহড়া নয়। একটি বজ্রপাতও মাথার ওপর ফলপ্রসূ নয়। কারণ, প্রথম বজ্রপাতটিই আপনার মাথার নিকটে সংঘটিত হতে পারে। মেঘ কালো হতে থাকলেই ঘরে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নিন।

ঙ.জলাশয় এবং পানির স্থাপনা থেকে নিরাপদ দূরে থাকুন। পানিতে সাঁতার, নৌ-ভ্রমণ, মাছ ধরা অথবা পানির কাছে কোনো কার্যরত অবস্থায়, বৈরী আবহাওয়া দেখলে দ্র্রত পানির কাছ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।

চ.দরজা জানালা বন্ধ এবং গ্রহণযোগ্য ও অপেক্ষাকৃত বড় বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নিন।

ছ.যদি গ্রহণযোগ্য ও অপেক্ষাকৃত বড় বিল্ডিং কাছে না থাকে তাহলে বড় যানবাহনে আশ্রয় নিন।

জ.উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। খোলা জায়গায় কোনো গাছ থাকলে তা থেকে অন্তত চার মিটার দূরে থাকতে হবে। এ ছাড়া ফাঁকা জায়গায় কোনো যাত্রীছাউনি বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে।

বর্জন করুণ-

ক. বারান্দা, গ্যারেজ, খেলার মাঠ এবং দরজা-জানালাবিহীন ঘর। খ. যদি কাছে কোনো নিরাপদ আশ্রয় না থাকে, অপেক্ষাকৃত নিচু স্থানে অবস্থান করুন এবং নেমে আসুন যেকোনো উন্মুক্ত উঁচু স্থান থেকে যেমন- গাছ, বৈদ্যুতিক পোল ও টাওয়ার ইত্যাদি থেকে। গ. যেসব মানুষ বাইরে উন্মুক্ত স্থানে কাজ করেন সেখানে অথবা কাছে লম্বা কিছু থাকে ভঙ্গুর অথবা ধাতব তা বজ্রপাতকে দ্র্রত গ্রহণ করবে, সেসব স্থান ত্যাগ করুন। এমন কি গাছের নিচেও আশ্রয় নেয়া যাবে না। ঘ. বৈরী আবহাওয়ায় এমন কোনো কাজ শুরু করা যাবে না- যা সহজে বন্ধ করা যায় না। ঙ. যেসব ইকুইপমেন্ট ব্যবহার ও বর্জন করতে হবে: যেকোনো উঁচু বস্তু, গাছ, ইলেকট্রিক পোল, বিল্ডিংযের ছাদ, বড় ইকুইপমেন্ট যেমন, বুলডোজার, ক্রেন, ট্রাক্টর ইত্যাদি।

চ. সব ধরনের ম্যাটেরিয়ালস, বিদ্যুৎপরিবাহী ধাতব ফ্লোর, ইকুইপমেন্ট, ব্যবহারযোগ্য লাইনগুলো, পানি ও পানির লাইন ইত্যাদি ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হবে। ছ. যেসব অঞ্চলে সায়েন্টিফিক এক্সপ্লোর চলে সেসব অঞ্চল বর্জন করতে হবে বজ্রপাতের সময় । জ. বজ্রপাতের সময় তারযুক্ত ফোনালাপ বর্জন করুন এবং চার্জিং কড থেকে মোবাইল ফোন খুলে নিন। ঝ. ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বজ্র বিদ্যুতের সরাসরি প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে। ঞ. ঝড়ের প্রাক্কালে আউটডোর টিভি ও রেডিও এন্টেনা বন্ধ করতে ভুল করা যাবে না। ট. শাওয়ার এবং গোসল বর্জন করা ভালো। ঠ. ওয়াশিং মেশিন, ওয়াটার হিটার ও ওভেন ব্যবহার বন্ধ রাখুন।

বাংলাদেশে সর্বাধিক ক্ষতির শিকার হন কৃষিক্ষেত্রে কার্যরত কৃষক ও মাঠশ্রমিক। বিদ্যুৎখাতের মাঠকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, ভারী যন্ত্রপাতি চালক, পাইপ ফিটিং বা ক্যাবল ফিটিং ইত্যাদি শ্রমিকেরাও আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

সাধারণত বজ্রপাতের দুর্ঘটনা ঘটে ৫৪ শতাংশ উন্মুক্ত মাঠ, পার্ক ও খেলার মাঠে, ২৩ শতাংশ গাছের নিচে, ১২ শতাংশ সৈকত, নদী ও নৌকায়, ৭ শতাংশ টাওয়ার ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির ওপর এবং ৪ শতাংশ অন্যান্য তথা খোলা জানালা, বেলকনি ও বাইসাইক্লিংসহ প্রভৃতি স্থানে।

বাংলাদেশে বজ্রপাতরে ক্ষতি লাঘবে সরকারের উচিত, বেসরকারি সংস্থাকে সাথে নিয়ে দ্র্রত জনসচেতনতামূলক কাজ বাড়ানো। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা, আবহাওয়া অধিদফতরের মাধ্যমে সতর্ক সঙ্কেত চালু করার ব্যবস্থা এবং নগর ও জনপদে সর্বত্রই বজ্রপাত আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া পরিবেশ সাংবাদিকতাকে অন্যতম অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশ ও আবহাওয়া সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। সূত্র: নয়াদিগন্ত ।