শুক্রবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইন্তিফাদা

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৭, ২০১৮ 

মুজতাহিদ ফারুকী:  ১৫ মে, ১৯৪৮ সাল। একদিনে লাখো ফিলিস্তিনিকে তাদের হাজার বছরের আবাসভূমি থেকে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দিয়ে, সীমাহীন অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে উৎখাত করা হয়। সেই ভূমিতে বহিরাগত ইহুদিদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় আজকের ইসরাইল। দিনটিকে ফিলিস্তিনিরা ‘বিপর্যয়’ বা ‘নাকবা’ দিবস হিসাবে বিবেচনা করে। এরও আগে ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। তাদের সেই জীবনপণ প্রতিরোধ আন্দোলনের মধ্যেই ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা। সেই থেকে শুরু প্রতারিত, ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, ভাগ্যবিড়ম্বিত ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। গত ৭০ বছর ধরে এই সংগ্রাম বিরতিহীনভাবে চলছে। আরও কত বছর ধরে তাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে তা কেউ বলতে পারে না।
বেলফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা লড়াই শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি দেয় ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার। ফিলিস্তিনিদের জন্যও পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। ১৯৪৭ সালেই জাতিসংঘ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের দেওয়া নিজের প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়। শুধু তাই নয়, আজ ৭০ বছর পরে এসে চক্ষুলজ্জা ভুলে, সব আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, এমনকি জাতিসংঘের ১৯৪৭ সালের ১৮১ নম্বর প্রস্তাবের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেয়।
জাতিসংঘের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে জেরুসালেম একটি আন্তর্জাতিক জোন। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এলাকা। আর পূর্ব জেরুসালেম হলো ইসরাইলের অবৈধভাবে দখল করা ভূমি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেখানেই মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে এনেছে। আর সেটা করেছে সেই ফিলিস্তিনিদের বিপর্যয় বা ‘নাকবা’ দিবসে। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। ১৫ মে’র পর ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজার বিক্ষোভগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ। ইসরাইলের তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা সীমানা প্রাচীরের বাইরে বিক্ষোভ সমাবেশে হাজির হয় লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি। প্রতি বছরের মতো চলতি বছরের ৩০ মার্চ নিজেদের ভূমিতে ফেরার ‘মহান প্রত্যাবর্তন মিছিল’ নামে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৫ মে ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় দিবসের বিক্ষোভ। বিক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে এদিন গাজায় ৬০ জন নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হন।
নতুন করে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ একটি প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থান বা ‘ইন্তিফাদা’য় পরিণত হতে যাচ্ছে কিনা অনেকে সেই প্রশ্ন তুলছেন।
আরবি শব্দ ‘ইন্তিফাদা’র অর্থ হলো গণঅভ্যুত্থান। ইসরাইলের সব রকম জুলুম-নিপীড়ন, গুলি, টিয়ার গ্যাস, জেল-জরিমানা উপেক্ষা করে এর আগে দু’বার দেশটির অবৈধ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে নিরস্ত্র-নীরিহ ফিলিস্তিনিরা। সে বিক্ষোভ ব্যাপকতার দিক থেকে এতটাই তীব্র ছিল যে সেটি কার্যত গণঅভ্যুত্থানের রূপ পেয়েছে।
প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ৮ ডিসেম্বর। ওই দিন গাজার জাবালে শরণার্থী শিবিরের বাইরে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি লরি একটি বেসামরিক গাড়িকে চাপা দিয়ে কয়েকশ’ মানুষের চোখের সামনে চারজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলে মানুষের চাপা ক্ষোভ জ্বলে ওঠে ক্রোধের আগুনে। যে চারজন শাহাদাত বরণ করেন, তাঁদের নামাজে জানাযায় ১০ হাজারের মতো শোকার্ত মানুষ উপস্থিতি হন। সেই জানাযার জামাতে আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। এতে নিহত হয় ১৭ বছরের যুবক হাতেম আবু সিসি, আর মারাত্মকভাবে আহত হয় আরো ১৬ জন।
এই ঘটনায় উত্তপ্ত অবস্থা আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়। প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের জ্বলন্ত লাভা ছড়িয়ে পড়ে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ক্যাম্প থেকে গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমের সমস্ত অঞ্চল জুড়ে। ক্রুদ্ধ ও বেপরোয়া ফিলিস্তিনিরা খুব দ্রুতই বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, শুরু করে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড স্থাপন, যাতে ইসরাইলি সেনাদের ভারি যানবাহনগুলো ঢুকতে না পারে। কোনো রকম অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াই কেবল প্রতিশোধ আর প্রতিরোধের আগুনে ঝলসে ওঠা ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষ-তরুণ-তরুণীরা পাথরের টুকরোকে হাতিয়ারে পরিণত করে। তারা ইসরাইলি সেনা এবং ট্যাংকগুলোর দিকে পাথর ছুড়ে নিজেদের প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়, আর শ্রমিকরা প্রত্যাখ্যান করে ইসরাইলের ভেতরে কারখানায় কাজ করতে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের পুরো প্রতিরোধ আন্দোলনকে ‘দাঙ্গা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রতিরোধকারীদের শায়েস্তা করতে উত্তাল জনতার মিছিলে রাবার বুলেট, তাজা গুলি ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে। তার পরও আপামর জনতার অংশগ্রহণে প্রতিরোধ আন্দোলন আরো তীব্র এবং বৃহৎ আকার ধারণ করে। ডিসেম্বরের ১২ তারিখের মধ্যে সহিংসতায় শাহাদাত বরণ করেন আরো ৬ জন, গুরুতর আহত হন ৩০ জনের মতো।
দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার কোনো লক্ষণই যখন দেখা গেল না, তখন দখলদাররা শুরু করে গণগ্রেফতার কর্মসূচি। পশ্চিম তীরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথম বছরেই ইসরাইলি সরকার ১৬০০ বার কারফিউ জারি করে। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ফিলিস্তিনিদের খামার ও বসতবাড়ি, উপড়ে ফেলা হয় গাছপালা। প্রতিবাদী যেসব ফিলিস্তিনি ট্যাক্স দিতে অস্বীকার করে তাদের সম্পত্তি ও আবাসনের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। সৈন্যদের পাশাপাশি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ইহুদিরা পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর হিংস্র আক্রমণ চালাতে থাকে।
ইউএন রিলিফ এবং ওয়ার্ক এজেন্সি ফর প্যালেস্টাইন রিফিউজির তথ্যমতে, ইন্তিফাদা সূচনার প্রথম বছরেই ৩০০ ফিলিস্তিনি শহীদ হন, গুরুতর আহত হন ২০ হাজার এবং সাড়ে ৫ হাজারের মতে ফিলিস্তিনি কারাবরণ করেন ইসরাইলি দখলদারদের হাতে।
১৯৮৮ থেকে ফিলিস্তিনি নেতারা বাড়তে থাকা এই সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাতে থাকেন। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের দল প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) সহিংসতার লাগাম টেনে ধরতে এবং জাতিসংঘের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টা খুব কমই সফলতার মুখ দেখে। বিপরীতে গাজা উপত্যকায় জন্ম হয় ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস-এর, যারা নিজেদেরকে পিএলও’র বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।
আপসকামিতার পথে না গিয়ে হামাস তার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ঘোষণা করে। এই ঘোষণা আন্দোলনরত যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করে এবং সাহস যোগায় ইসরাইলি দখলদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার।
১৯৮৮ সালে জর্দানের সুলতান হোসেন পশ্চিম তীরের সঙ্গে সব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার আন্দোলন হুমকির মুখে পড়ে। তবে জনগণের মুক্তিকামী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের উপর্যুপরি তরঙ্গাভিঘাত অব্যাহত থাকে, সেই সঙ্গে স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার ডাকও জোরদার হয়। একই বছরে দ্যা প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিল নামের প্রবাসী সরকার ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান গ্রহণ করে।
এতকিছুর মধ্যেও অবিরত চলতে থাকে ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন এবং ইহুদিদের সহিংসতা। ১৯ জনের মতো ইসরাইলি সাধারণ নাগরিক এবং ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের ৬ জন সদস্য নিহত হয়। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট কাউন্সিল ইসরাইলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ৪র্থ জেনেভা কনভেনশন অগ্রাহ্য করার অভিযোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবিত নিন্দা জানানোর খসড়া সিদ্ধান্তে একের পর এক ভেটো প্রয়োগ করে। ইন্তিফাদা অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র পিএলও’কে ফিলিস্তিনের সর্বস্তরের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকার করে নেয়। নরওয়ের আগ্রহে পিএলও এবং ইসরাইলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে, যা পরের বছর অসলো চুক্তির মাধ্যমে পরিণতি লাভ করে। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের উপস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের লনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন এবং পিএলওর চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় নির্ধারণ করা হয়, যে সময়ের মধ্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দখলিকৃত এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে সচল করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে।
এই শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার পরও ইন্তিফাদা চলতে থাকে। ১৯৯৩ সালে যখন ইন্তিফাদা স্তিমিত হয়ে আসছে ততদিনে ১৫০০ ফিলিস্তিনি এবং ১৮৫ ইসরাইলি নাগরিক নিহত হয়েছে; ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি করেছে কারাবরণ।
প্রথম সেই ইন্তিফাদা ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইহুদিবাদী ইসরাইলের ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা দুনিয়াজুড়ে স্পষ্ট করে তোলে। আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলের প্রতি প্রচণ্ড অনাস্থা তৈরি করে। ইন্তিফাদার কারণেই পরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরাইলের প্রতি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে  চলমান সহিসংতা বন্ধের দাবি জানিয়ে ৬০৭ এবং ৬০৮ ধারার প্রস্তাব উত্থাপন সম্ভব হয়।
ঐতিহাসিকদের চোখে যদিও ইন্তিফাদা ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়া সূচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে, কিন্তু গত তিন দশকেও ফিলিস্তিনিদের জন্য শান্তির সেই কপোত ডানা মেলে নি। অসলো চুক্তি একটি ব্যর্থ অধ্যায়ে পর্যবসিত হয়েছে। ইসরাইলি অবৈধ দখলদারিত্বে ফিলিস্তিনিদের নাগরিক, ভৌগোলিক ও মানবাধিকার আগের থেকে আরো বেশি হুমকির মুখে পড়েছে।ফলে একথা বলাই যায় যে, প্রথম ইন্তিফাদা আসলে কখনও শেষ হয় নি; বরং ফিলিস্তিনিরা সর্বাংশে ও সব সময়ই ইসরাইলের দখলদারিত্ব, নিপীড়ন এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাচ্ছে এক অন্তহীন সংগ্রাম।

প্রথম ইন্তিফাদায় ইসরাইলি বাহিনীর আধুনিক সব সমরাস্ত্রের মোকাবিলায় পাথর ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিরা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। সেই ইন্তিফাদার কারণে গোটা বিশ্বের মানুষ আরও বেশি সচেতন হয়ে ওঠে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত জোরদার হয়। বৈরী আরব রাষ্ট্রগুলোর পাশে একটি ‘নাজুক ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে বিশ্বে ইসরাইলের যে ভাবমূর্তি ছিল তা যে সঠিক নয়, বরং ইসরাইলই একটি হিংস্র রাষ্ট্রশক্তি এই সত্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশিত হয়।
ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে। এটি ‘আল আকসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। দখলদার ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন বেশ কিছু সৈন্য সঙ্গে নিয়ে আল আকসা মসজিদে প্রবেশ করলে ফিলিস্তিনিরা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু করে। সেই ইন্তিফাদার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা জানিয়ে দেয়, বিশ্ব মুসলিমের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল আকসা মসজিদের বিষয়ে তারা কোনো ছাড় দেবে না।
আল-আকসা মসজিদ খ্যাত বায়তুল মুকাদ্দাস ইস্যুতে এবার শুরু হয়েছে তৃতীয় ইন্তিফাদা। অবশ্য চলমান ইন্তিফাদা শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল ২০১৫ সালেই। আল-আকসা মসজিদসহ অন্যান্য মুসলিম ঐতিহ্য ধ্বংস করে বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদীদের শহর হিসেবে চিহ্নিত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে জোরালো প্রতিবাদ শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ট্রাম্পের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং ফিলিস্তিনিরা তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু করতে বাধ্য হয়।
এটিও বিগত দু’টি ইন্তিফাদা এবং অতীতের অন্যান্য আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা। ফিলিস্তিনিরা যে তাদের মাতৃভূমি মুক্ত করার আন্দোলন থেকে পিছু হটে নি এবং প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে ফেলে নি এর মধ্য দিয়ে আবারও তা স্পষ্ট হয়েছে।
এদিকে ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের অব্যাহত গতিধারায় একটি নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। তা হচ্ছে ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনী (রহ্.)-এর নেতৃত্বে সংঘটিত ইরানের ইসলামি বিপ্লব। বিপ্লবের পর ফিলিস্তিন ও আল্-কুদ্স্-এর মুক্তির লক্ষ্যে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্কে ঐক্যবদ্ধ করতে ইমাম খোমেইনী (র.) মাহে রমজানের শেষ শুক্রবারকে আল্-কুদ্স্ দিবস ঘোষণা করেন। তখন থেকে বিশ্ব মুসলিম এ দিবসটি পালন করে আসছে।
আল-কুদস দিবসের মর্মকথা হলো কুদ্সের মুক্তি, পবিত্র শহর জেরুসালেমের মুক্তি। বর্তমান ফিলিস্তিনে আপসকামিতাকে বুড়া আঙ্গুল দেখিয়ে হামাসের নেতৃত্বের জেগে উঠেছে ফিলিস্তিনের অযুত মানুষ। আর দক্ষিণ লেবাননে বিপুল শক্তি অর্জন করেছে অকুতোভয় এক লড়াকু সংগঠন হিজবুল্লাহ। তাদের হাতে পর্যুদস্ত হয়ে ২০০৬ সালে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।
২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইল হামাস শাসিত গাজা দখলের জন্য তিন তিন বার সর্বাত্মক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। কিন্তু হামাস কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে প্রতিবারই গাজার ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও ইসরাইল গাজা দখল ও হামাসের পতন ঘটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে হিযবুল্লাহ্ অপরাজেয় হিসেবে পরিগণিত ইসরাইলের ওপর তিন তিন বার শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি চাপিয়ে দেয়।
হামাস ও হিযবুল্লাহ্র সাফল্য প্রমাণ করে, অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের বিলুপ্তি ও সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জুড়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কেবল স্বপ্নমাত্র নয়; বরং আগামী দিনের বাস্তবতা।
তবে এজন্য সব রকম বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে আশা করা যায়, হামাস ও হিযবুল্লাহ্র সাফল্যের ধারায় এগিয়ে গেলে চূড়ান্ত সাফল্য ও বিজয় অবশ্যম্ভাবী।