সোমবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৮ ইং, ১লা শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

ফারসি ভাষা ও সাহিত্য

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১৫, ২০১৮ 

রাশিদুল ইসলাম ঃ ব
পারসিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ যা ফারসি ভাষা হিসেবে পরিচিত। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনামলে ফারসি ভাষা ছিল রাজভাষা। একারণে বাংলা ভাষায় এখনো প্রচুর ফারসি ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যা বাংলা সাহিত্য ও কবিতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ থেকে শুরু করে আরো অনেকে ব্যবহার করেছেন। প্রতিদিন আমাদের বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অনেক শব্দই যে ফারসি তা অনেকের অজানা। যেমন, ‘আবহাওয়া’ শব্দটির ‘আব’ অর্থ পানি ও ‘হাওয়া’ অর্থ বাতাস। অর্থাৎ পানি ও বাতাস মিলে আবহাওয়া হয়েছে। তেমনি বাবা, পা, দরদ, পিয়াজ, দূর এমন হাজার হাজার শব্দ আমরা বাংলা হিসেবে জানি যা আদতে ফারসি শব্দ।
ফারসি ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার পরিবার থেকে জন্ম হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ফারসি প্রাচীন, মধ্যকাল ও আধুনিকÑ এ তিনভাগে বিভক্ত। প্রাচীন ফারসির উৎপত্তি ধরা হয় তৃতীয় শতাব্দীতে। সেই ব্যবিলনীয় সভ্যতার সময় দানিয়ুস প্রাচীন ফারসি ভাষা আবিষ্কার করেন। এরপর এলামাইট ও একিমিনীয়রা ফারসি ভাষা ব্যবহার করে। জরথুস্ত্রদের ধর্মগ্রন্থ ‘আভেস্তা’ লিখিত ছিল প্রাচীন ফারসি ভাষায়। এরপর নবম শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন ফারসি মধ্যফারসি ভাষা হিসেবে চালু থাকে এবং আধুনিক ফারসি ভাষার ক্রমবিকাশ শুরু হয়। মাঝখানে কিন্তু হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইরানিদের আদি ভাষা ছিল আরবি। মানে ইসলামে খলিফাদের যুগে। অভিযোগ ওঠে বিজয়ী আরবরা পারস্যের প্রাচীন সাহিত্য ধ্বংস করে, কিন্তু গীবন থেকে শুরু করে আরো অনেক ঐতিহাসিক এ অভিযোগ অমূলক প্রমাণ করেছেন। পাহলভি স্ক্রিপ্ট রেখে পারস্যবাসী তখন আরবি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু ফারসি ভাষা হারিয়ে যায় নি। ফারসি ভাষা ইরানের আশে পাশে পারস্য শাসক ও মুসলমান শাসকদের মাধ্যমে অন্যান্য ভাষা, যেমন হিন্দি বা তুর্কি ভাষার ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। যেমন ধীরে বাংলা শব্দটি ‘অহেস্তে’ ফারসি থেকে হিন্দিতে ‘আহিস্তি’ বা বাংলায় আস্তে পর্যন্ত রূপান্তরিত হয়েছে। ফারসি ভাষাই উর্দু ভাষার জনক।
ফেরদৌসী
ফারসি ভাষার প্রাচীন কবি হচ্ছেন রুদাকি যিনি পাহলাভি স্ক্রিপ্ট রচনা করেন। তিনি মারা যান ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে। প্রাচীন ফারসি ভাষার পা-ুলিপির সন্ধান পাওয়া যায় নি। মুখে মুখে এ ভাষায় রচিত কবিতা যুগের পর যুগ টিকে থাকে। তবে ফারসি ভাষা শুনলে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে ‘শাহনামা’র কথা। এখন পর্যন্ত ‘শাহনামা’র যতগুলো হাতে লিখিত অনুলিপি পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন অনুলিপি ১২৭৬ থেকে ৭৭ সালে তৈরি। তার মানে মূল রচনার সাথে এ অনুলিপিটির পার্থক্য আড়াইশ’ বছর। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এর আগের কোনো ‘শাহনামা’ কপি এখনো পাওয়া যায় নি। ‘শাহনামা’কে বলা হয় পূর্বের ‘ইলিয়াড’।
হাজার বছর কেটে গেছে। তারপরও মর্মর সৌধের মত ‘শাহনামা’ এক অলৌকিক প্রতিভার স্বাক্ষর বহর করছে। এ কাব্যের জন্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য প-িতরা ফেরদৌসীকে ‘ইরানের হোমার’ বলে অভিনন্দিত করেছেন। ‘শাহনামা’ পৃথিবীর মহাকাব্যসমূহের অন্যতম। সাতটি বড় খ-ে বিভক্ত মহাকাব্যটি ষাট হাজার শ্লোকে সমাপ্ত। ফেরদৌসী অবিমিশ্র ফারসি ভাষায় ‘শাহনামা’ রচনা করেন।
প্রাগৈতিহাসিক শাসনামল থেকে আরবদের কর্তৃক পারস্য বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত পারস্যের গৌরবময় পুরাবৃত্ত কাব্যের মধ্য দিয়ে ‘শাহনামা’য় বর্ণিত রয়েছে। লোকগাথা, গল্প, উপাখ্যান, কিংবদন্তি, ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে এর উপকরণ নেয়া হয়েছে। ‘শাহনামা’র ঘটনাবলির বিস্তৃতিকাল তিন হাজার আটশ’ চুয়াত্তর বছর এবং এতে উনচল্লিশটি রাজবংশের শাসনকালের বিস্তৃত বিবরণী রয়েছে। প্রথম তিন হাজার বছরের কাহিনী নিছক উপাখ্যানভিত্তিক। পরবর্তী নয় শতাব্দীর ঘটনাবলি ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত।
ফেরদৌসী ৯৪১ সালে সমরখন্দের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার প্রচুর জমিজমা ছিল। ভালো লেখাপড়া করেছিলেন ফেরদৌসী। ছোট বেলা থেকে কবিতা লিখতেন। যৌবনে একান্তভাবে কবিতাচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর একটি মাত্র কন্যাসন্তান ছিল যাকে নিয়ে তাঁর উচ্চাভিলাষ ছিল যে তাকে তিনি উপযুক্ত যৌতুক দিয়ে বিয়ে দেবেন। যৌতুকের অর্থ সংগ্রহে তিনি ‘শাহনামা’র কবিতা রচনা শেষ করেন। তার পর সুলতান মাহমুদ গজনীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান এ কাব্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ‘শাহনামা’র ষাট হাজার শ্লোকের জন্যে ষাট হাজার রৌপ্য মুদ্রা দেন। কিন্তু কবির আশা ছিল আরো বেশি, নেহাত স্বর্ণমুদ্রা হলেও তিনি হয়ত খুশি হতেন। জীবনের সেরা ৩০টি বছর এ কবিতার পেছনে ফেরদৌসীর অতিবাহিত হয়েছে। তার মূল্য রৌপ্যমুদ্রা? অভিমানে তিনি এসব মুদ্রা তাঁর শরবত বিক্রেতা, হাম্মাম খানার তত্ত্বাবধায়ক ও পুরস্কার বহনকারীদের বিতরণ করে দিয়ে তিনি গজনী ত্যাগ করেন।
ফেরদৌসীর বয়স তখন ৭০/৭১ বছর। এরপর তিনি ৮/৯ বছর বেঁচে ছিলেন। ১০২০ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তুস নগরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ‘শাহনামা’র উপসংহারে তিনি লিখেছিলেন, এ কাব্য অনেক শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের এক উজ্জ্বল আলেখ্য। এ কাহিনী ইরানের প্রত্যেক চিত্তকে জাগ্রত করবে এবং এর সুর তাদেরকে গৌরবজনক কাজের দিকে প্রেরণা দেবে। একজন লজ্জাবতী ললনাও যদি এ কাব্য পাঠ করে, সে একজন সাহসী যোদ্ধায় পরিণত হবে।

বৃদ্ধ বয়সে ফেরদৌসী ‘ইউসুফ জুলেখা’ নামে ১৮ হাজার পদবিশিষ্ট আরও একটি কাব্য রচনা করেন।
রোস্তম-সোহরাব কাহিনী
বীরশ্রেষ্ঠ রোস্তম ছিলেন ইরানের সেনাপতি। পারস্যের বীরত্বগাথা সাহিত্যে তাঁর প্রভাবশালী চরিত্র অনন্য নজির স্থাপন করে আছে। দাস্তানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাতৃগর্ভে রোস্তমের অস্বাভাবিক আকারের জন্য তাঁর জন্ম হয় সিজারিয়ান পদ্ধতিতে। কথিত আছে, একটি অলৌকিক পাখি তাঁর পরিবারকে সবসময় সাহায্য করত। বালক বয়স থেকে তাঁর বীরত্ব ও সাহসের কথা চারপাশে ছড়িয়ে যায়। রোস্তমের বয়স যখন মাত্র ৮ বছর তখন এক ক্ষিপ্ত বন্য হাতিকে তিনি পরাস্ত করেন।
সেনাপতি রোস্তম শিকারে বের হয়ে তুরান দেশের এক অরণ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন তাঁর প্রিয় ঘোড়া ‘রুখ্শ’ চুরি হয়ে গেছে। ঘোড়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি অরণ্য থেকে বের হয়ে এসে শামিঙ্গনের রাজধানীতে পৌঁছান। তাঁকে চিনতে পেরে দেশটির রাজা তাঁর ঘোড়া খুঁজে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। রাজগৃহে অবস্থানের সময় রাজার পরমা সুন্দরী কন্যা তাহমিনার প্রেমে পড়েন রোস্তম। তাঁদের বিয়ে হয়। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর তাঁর ইরানের কথা মনে পড়ে। তাহমিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরেন। তাহমিনাকে একটি মোহর দিয়ে বলেন, তাঁর নামাঙ্কিত এ মোহরটি পুত্রসন্তান হলে যেন তার বাজুবন্ধে বেঁধে দেওয়া হয়Ñ যা তার পিতৃপরিচয় দেবে।
তাহমিনার পুত্রসন্তান হলে তার নাম রাখলেন সোহরাব। পুত্রকে নিয়ে যাবেন রোস্তম, এই ভয়ে তাহমিনা তাঁর স্বামীর কাছে খবর পাঠালেন যে, তাঁর কন্যাসন্তান হয়েছে। রোস্তম নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। এভাবে কুড়ি বছর চলে গেল। পিতৃপরিচয় নিয়ে সোহরাবের বন্ধুরা তাঁকে নানাধরনের বিদ্রƒপ করত। পিতার কীর্তি তাঁকে প্রেরণা যোগাত। পিতৃখোঁজে সোহরাব বের হন সহ¯্রাধিক সৈন্য নিয়ে। তাঁর বাসনা পিতাকে খুঁজে বের করে ইরানের সিংহাসনে বসাবেন। পথিমধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হল। সোহরাব একের পর এক যুদ্ধে জয়লাভ করে ইরান পৌঁছলেন। ইরানস¤্রাট কায়-কায়স সোহরাবের পরিচয় রোস্তমের কাছে গোপন করে তাঁদেরকে যুদ্ধের ময়দানে কৌশলে মুখোমুখি করে দিলেন। দিনের পর দিন পিতা ও পুত্রের মধ্যে যুদ্ধ হয়। কেউ পরাস্ত হয় না। কেউ কারো পরিচয় স্বীকার করে না। এক পর্যায়ে সোহরাব মল্লযুদ্ধে রোস্তমকে পরাস্ত করেন। কিন্তু পারস্য যুদ্ধের রীতি অনুযায়ী প্রথমবার পরাস্ত করলেও পুনরায় যুদ্ধে চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার নিয়ম। তাই ফের পিতা-পুত্রের লড়াই চলতে লাগল। দিন কয়েক এভাবে চলার পর এবার পরাস্ত পুত্র পিতাকে বললেন, ‘আপনি তো বললেন, প্রথম পরাস্ত করাই চূড়ান্ত বিজয় নয়। আরেকবার লড়াই হোক।’ কিন্তু পিতা রোস্তম সে সুযোগ না দিয়ে পুত্র সোহরাবের বক্ষ খঞ্জরে বিদীর্ণ করলেন। মুত্যুর আগে দু’জনই দু’জনের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সোহরাব তাঁর বাজুবন্ধে বাঁধা রোস্তমের নামাঙ্কিত মোহরটি দেখালে মৃতপ্রায় পুত্রকে কোলে টেনে নেন পিতা। শেষ মুহূর্তে পিতাপুত্রের যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখ সমরে লিপ্ত থাকার কথা শুনে তাহমিনা যখন এসে পৌঁছলেন ততক্ষণে সোহরাব তাঁদেরকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
পারস্যের সাহিত্য বা ফারসি ভাষা যেমন বীরত্ব কাহিনীতে ভরপুর তেমনি ইতিহাস ঐতিহ্যে এ ভাষা মিষ্টি মধুর ও সহজবোধ্য। অলঙ্করণের জন্য ফারসির এ স্বাদ দেশ থেকে দেশান্তরে খুব সহজে ছড়িয়ে পড়েছিল। আধ্যাত্মিকতা সহজেই এ ভাষার ওপর ভর করে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মরমি সাধকদের মনে ও প্রাণে। মাত্র একটি লাইনেই ফারসি ভাষায় জীবন ও জগতের গভীর থেকে গভীরতর মর্মবাণী বা গভীর কোনো চিন্তা সহজবোধ্য হয়ে ধরা দেয়। আবার আধুনিক ফারসি কবিতা সর্বশ্রেষ্ঠ ছন্দোময় সংগীতময়তা ও শব্দের মিশুক অর্থ মিলে অসাধারণ কাব্যময় হয়ে ওঠে। পূর্ববতী সংগীতময়তার সঙ্গে ভাষাগত কমনীয়তা মিলে এক অত্যাশ্চর্য দ্যুতির সৃষ্টি করে। ঐতিহ্যবাহী পারস্য কাব্য থেকে শুরু করে কাসিদা, মসনভি, গযল ও রুবাইয়াৎÑ কোনোটির তুলনা কোনোটির সঙ্গে চলে না। ওমর খৈয়াম, সাদি, হাফেজের মত মহাকবিরা এ ফারসি ভাষায় তাই বিশ্ব শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, মহাকাব্য রচনা করেছেন মেধা, মনন ও প্রবল বাগ্মীতায় অনায়াসে। বিজ্ঞান সাধনা, গণিতের জটিল সূত্রের উদ্ভাবন ও বিভিন্ন সমস্যার উপমা ও ছক তৈরি করেছেন ফারসি ভাষায়।
ওমর খৈয়াম
ওমর খৈয়াম জন্মগ্রহণ করেন ১০৪৮ সালে খোরাসানের নিশাপুরে। ‘খৈয়াম’ শব্দের অর্থ তাঁবু প্রস্তুতকারক। পুরো নাম গিয়াস উদ্দিন আবুল ফাত ওমর ইবনে ইবরাহিম নিশাপুরি।
ওমর খৈয়ামের বয়স যখন ২৫ বছর তখন সংগীত ও বীজগণিতের ওপর তাঁর দুটি বই বাজারে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ১০৭০ সালে ওমর খৈয়াম প্রখ্যাত আইনজীবী আবু তাহেরের আমন্ত্রণে সমরখন্দে যান এবং সেখানে বীজগণিতের সমস্যা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত বই ‘টিরেটাইজ অন ডেমোস্ট্রেশন অব প্রবলেম অব অ্যালজেব্রা’ রচনা করেন। এরপর ইসফাহানে ওমরখৈয়াম স্থাপন করেন বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এরপর তিনি মার্ভে চলে যান। যা আজকে তুর্কমেনিস্তান হিসেবে পরিচিত। সেই সময় মার্ভ ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণা জন্য বিখ্যাত ছিল। তিনি গণিতের বিভিন্ন বিভাগ, যেমন কিউবিক ফরমুলা বা জ্যামিতির বৃত্ত সম্পর্কিত নানা ধরনের জটিল সমীকরণের সমাধান করেন। অনুপাত ও সমানুপাত নিয়েও গণিতের বিভিন্ন ফয়সালা দেন খৈয়াম। কবিতার জন্য যতটা বিখ্যাত হয়ে আছেন ওমর খৈয়াম, বিজ্ঞান ও গণিত সাধনার জন্যও তিনি সমানভাবে বিখ্যাত। ওমর খৈয়াম ১১২৩ সালে নিশাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পশ্চিমা দুনিয়ায় সাহিত্যকর্মের জন্য অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শূন্য থাক, দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে, মাঝখানে যে বেজায় ফাঁকা’Ñ এমন অসংখ্য চরণ ও সাহিত্যকর্ম দেশকাল অতিক্রম করে আজো মানুষের মনে অনুরণিত হচ্ছে। ওমর খৈয়াম রচিত ‘রুবাইয়াৎ’ পাশ্চাত্য জগতে দারুণ সাড়া ফেলে।
ফরিদুদ্দিন আত্তার
আবু তালেব মুহম্মদ ফরিদউদ্দিন আত্তার এক আতর ব্যবসায়ীর গৃহে ১১৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এজন্য তাঁর উপাধি আত্তার। তিনি ওষুধ বিক্রি করতেন। শৈশবেই আত্তার ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষার অনুরাগী। কৈশোরে তিনি ইমাম রেযা (আ.)-এর মাযারে চলে যান। তারপর দেশভ্রমণে বের হন। হেকিম হিসেবে তিনি ছিলেন প্রখ্যাত। কাব্য রচনা, দার্শনিক চিন্তা, বিপুল বৈভব ও খ্যাতি নিয়ে ভালোই ছিলেন তিনি। একদিন তাঁর দোকানের সামনে কোথা থেকে এক ভিক্ষুক এসে ওষুধপত্রের দিকে তীক্ষè দৃষ্টি ফেলে। আত্তার বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘যাও আগে বাড়ো।’ ভিক্ষুক এই অবমাননায় ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘আমি তো যাচ্ছি, তুমি তোমার নিজের দিকে নজর দাও।’ সেখানেই তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগ করলেন ভিক্ষুকটি। এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আত্তার বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তিনি বুঝলেন যে, যা কিছু অর্জন করেছেন তা খুবই সামান্য। কি সেই শক্তি যার বলে মানুষ ইচ্ছামাত্রই নিজেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে? পা-িত্যভিমান, সংসার ও অনিত্য বৈভব, সবকিছুর মায়া কাটিয়ে সেই যে ঘর থেকে শাশ্বত সত্যের অন্বেষণে আত্তার বের হলেন, অন্তত ৪০ বছর পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করলেন।
মুসলিম জগতে সফর পবিত্র বিষয়। অন্তত সেই যুগে সফর না করলে মানুষের শিক্ষা পরিপূর্ণ হত না। আত্তার রেই, কুফা, মিসর, দামেস্ক, মক্কা, জুডা, তুর্কিস্তান, ভারতবর্ষ সহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে সাধু ও দরবেশদের কাছ থেকে নানা শিক্ষামূলক রচনাব সংগ্রহ করেন। দীর্ঘস্থায়ী অধ্যাবসায় ও আধ্যাত্মিক চর্চা তাঁর জীবনকে পূতস্নিগ্ধ ও উন্নত করে। এরপর তিনি লেখায় মনোনিবেশ করেন। ১১৪টি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। তার মধ্যে ৩০টির হদিস পাওয়া যায়। ‘তাযকিরাতুল আওলিয়া’, ‘পান্দনামা’, ‘লিসানুল গায়েব’ মত অসংখ্য বই লিখলেও জীবনে তিনি কখনো কারো স্তুতিগাথা রচনা করেন নি। মহাকবি জালালউদ্দীন রুমি যাঁকে ‘সুফি জগতের রুহ’ বলে অভিহিত করেছিলেন সেই আত্তারকেও ধর্মান্ধদের খপ্পরে পড়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাসনে চলে যেতে হয়েছিল। ১২২১ সালে তিনি মোগলদের হাতে নিহত হন।
নেজামি
১১৪০ সালে নেজামি গাঞ্জা বা আজকের আযারবাইজানে জন্মগ্রহণ করেন। যিনি ‘লাইলি-মজনু’, ‘খসরু-শিরী’, ‘এস্কেন্দারনামা’র মত অসংখ্য অমর কাব্য গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর পুরো নাম নেজাম উদ্দিন আবু মুহাম্মদ ইলিয়াস। হাকিম হিসেবে তাঁর সুপরিচিতি ছিল। সাহিত্য ও ধর্মশাস্ত্রে তিনি ছিলেন সুপ-িত। সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন নেজামি। তিনি ১২০৯ সালে মারা যান।
জালালুদ্দিন রুমি
জালালুদ্দিন মোহাম্মদ রুমি ‘মৌলানা’ হিসেবে পরিচিত, যার অর্থ হচ্ছে পথপ্রদর্শক। রুমি ছিলেন ইরানের অন্যতম মহাকবি ও সুফিসম্রাট। আজকের আফগানিস্তানের বাল্খ এলাকায় ১২০৭ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রুমির বয়স যখন ১২ বছর বয়স তখন মঙ্গলদের আগ্রাসনের কারণে তাঁর পরিবার তুরস্কে চলে যায়। শৈশবে তিনি তাঁর পিতার বন্ধু বিখ্যাত সাধক বোরহানুদ্দিনের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সিরিয়ার আলেপ্পো ও দামেস্কে বেশ কয়েক বছর রুমি জ্ঞান সাধনায় মগ্ন থাকেন। অধ্যাপনাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁর স্ত্রী খেরা খাতুন বলেছেন, ‘পাঠগৃহে এক মানুষ উঁচু একটি দীপাধার ছিল। তার পাশে দাঁড়িয়ে রুমি সারারাত জ্ঞান সাধনা করতেন।’ রুমি মহাসাধক শাম্স তাবরীযের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সাধনার সৌন্দর্যে সংগীতের প্রচলনের জন্য রুমির সমালোচনা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু রুমির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী। পরিচ্ছন্ন পোশাক, লাল রংয়ের আবা ও চোগা পড়তে ভালবাসতেন রুমি। ১২৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর রুমি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল আশাবাদ। পাপময় এ সংসারে মানুষ জীবন সংগ্রামে জয়ী হবেÑ এ সম্পর্কে তিনি কখনো তাঁর লেখায় সন্দেহ ও নৈরাজ্যের ছায়াপাত করেন নি। ‘মসনভি’ ও ‘দিওয়ান’ তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ। ‘দিওয়ান’-এ প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্লোক রয়েছেÑ যার সবগুলোই গযল। ইশ্ক বা প্রেম এসব গযলের বিষয়বস্তু। এসব গযল উপস্থাপনে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হতো।

শেখ সা’দী
ইরানের বিশ^বিখ্যাত আরেকজন কবির নাম শেখ সা’দী। শেখ সা’দী একাধারে কবি ও সাহিত্যিক। তিনি পদ্যে যেমন জগতসেরা, তেমনি গদ্যেও অতুলনীয়। তাঁর জন্ম সাল ১২০৪ বা ১২১২ খ্রিস্টাব্দ। আর মৃত্যু ১২৯১ বা ৯২ খ্রিস্টাব্দ।
শেখ সা’দীর পুরো নাম আবু মুহাম্মদ মুশররফ উদ্দীন মুসলেহ ইবনে আবদুল্লাহ। সা’দী তাঁর কবিনাম। তৎকালীন মুসলিম বিশে^র শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসায় তিনি অধ্যয়ন করেন। এরপর বক্তা হিসেবে বিশে^র দিকে দিকে, যেমন হেজাজ ও সিরিয়া সফর করার পর জন্মভূমি শিরাজে ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু শিরাজেই অবস্থান করেন। তিনি পারস্যের আতাবক বংশীয় রাজাদের বিশেষ করে সাআদ ইবনে আবু বকরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। তাঁর সমাধি ইরানের শিরাজ নগরীতে অবস্থিত। মহাকবি হাফেযও এই শিরাজেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
ফারসি ভাষার ওপর সা’দী যে প্রভাব বিস্তার করেন তা কালজয়ী। এ কারণে বর্তমান ইরানে প্রচলিত ভাষার সাথে সা’দীর রচনাবলির চমৎকার মিল পাওয়া যায়। ইরানে প্রচলিত অধিকাংশ প্রবাদ সা’দীর রচনাবলি হতেই মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হয়ে আসছে। সা’দী তাঁর সমসাময়িক বা তাঁর আগের অনেক লেখকের বিপরীতে সহজ সরল ভাষায় ও ইঙ্গিতে কথা বলার শিল্পকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সা’দী তাঁর জীনদ্দশাতেই ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁকে ‘চিরন্তন কথাশিল্পী’ ও ‘কথা সাহিত্যের বাদশাহ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর রচনাবলি ‘কুল্লিয়াতে সা’দী’ বা সা’দী রচনা সমগ্রের মধ্যে সন্নিবেশিত আছে। তবে ‘গুলিস্তান’ ও ‘বুস্তান’ কিতাব দু’টি আলাদাভাবে ছাপা হয়ে থাকে এবং এই দু’টি কিতাবের খ্যাতি বিশ^জনীন। ‘গুলিস্তান’ পদ্য ও গদ্যের মিশেলে একটি অতুলনীয় নীতিশাস্ত্রীয় সাহিত্যকর্ম। কিন্তু ‘বুস্তান’ শুধু কবিতায় লেখা। উভয় কিতাবের খ্যাতি জগতজোড়া। সা’দীর গযলকাব্যের উপজীব্য জাগতিক প্রেম। তাতে তিনি অনেকগুলো নীতিশাস্ত্রীয় ও আধ্যত্মিক গযলও রচনা করেছেন। সা’দী শরীয়তের গ-ির বাইরে যেকোনো ধরনের চিন্তাদর্শনকে গোমরাহি বলে সাব্যস্ত করেন। তাঁর মতে সর্বাবস্থায় কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনাকে বিবেচনায় রেখে চলতে হবে। সা’দীর নীতিশাস্ত্রীয় উপদেশগুলো কাল ও স্থানের গ-ি ছাড়িয়ে মানবসভ্যতাকে সুবাসিত করে রেখেছে। সেই বিবেচনায় তাঁর দু’টি গ্রন্থের নাম ‘গুলিস্তান’ ও ‘বুস্তান’ যথার্থ ও সার্থক। উভয় নামের অর্থ যথাক্রমে ফুলের স্থান ও সুবাসের স্থান। সা’দী একদিকে তাসাওওফ ও সুফিদের প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে ভ-দের তীব্র সমালোচনা ও কটাক্ষ করেছেন।

মহাকবি হাফেয শিরাজি
ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি মহাকবি হাফেয শিরাজি। তাঁর জন্মসাল ১৩২৫ বা ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দ। ইরানের শিরাজ নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অন্তিম শয়ানও শিরাজে এবং ১৩৮৯ বা ১৩৯০ সালে। ঐতিহাসিক শিরাজ নগরীর মুসল্লা মহল্লায় তাঁর মাযার এখনো দুনিয়ার প্রেমিক ও কবিদের যিয়ারতগাহ বা তীর্থভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধ। জানা যায়, তিনি কাব্যচর্চায় তাঁর পূর্ববর্তী কবি সানায়ী, আনোয়ারী, নিযামী, সা’দী, খাকানী, আত্তার প্রমূখ কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। আর পরবর্তী যুগের সকল ফারসি কবি ও জার্মান কবি গ্যাটে তাঁর দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
কবি হাফেযের মূল নাম মুহাম্মদ। উপাধি শামসুদ্দীন আর কবিনাম হাফেয। হাফেযের পিতার নাম বাহাউদ্দীন বা কামাল উদ্দীন ছিল বলে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে তাঁর দাদার নাম ছিল গিয়াস উদ্দীন। বর্ণিত আছে, হাফেযের পিতা ইসফাহানের বাসিন্দা ছিলেন। পরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে পরিবার-পরিজনসহ দেশ ছেড়ে শিরাজ চলে আসেন। তাঁর মায়ের আদি নিবাস কাযরুনে এবং তিনি শিরাজের কাযরুন মহল্লায় থাকতেন। পিতার মৃত্যুর পর হাফেয এর মা সন্তানদের নিয়ে অর্থনৈতিক দৈন্যের শিকার হন। ফলে হাফেয রুটির দোকানে চাকরি নেন এবং ফাঁকে ফাঁকে পাশর্^বর্তী মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। পরবর্তীকালে শিরাজের নামকরা জ্ঞানীগুণিদের শিষ্যত্ব গ্রহণের সুযোগ হয়। অল্প বয়সে কুরআনে হেফ্য করার সুবাদে তিনি হাফেয নামে খ্যাত হন।
হাফেযের জীবনকালে ইরানে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। শিরাজে সিংহাসনের দাবিতে খুনাখুনি ছিল নিত্যকার ঘটনা। এর মধ্যেই হাফেয বিস্ময়করভাবে জ্ঞানচর্চা ও কবিতাচর্চায় সিদ্ধি লাভ করেন।
হাফেয তাঁর জন্মস্থান শিরাজকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন । সে কথা তাঁর কবিতায় একাধিকবার ব্যক্ত হয়েছে। একই কারণে তিনি কোথাও সফর পর্যন্ত করেন নি। মাত্র দু’বার তিনি অল্প সময়ের জন্য ইয়ায্দ ও হরমুজ সফর করেন। তাঁর একটি ছেলেসন্তান অল্প বয়সে ইন্তিকাল করেছেন মর্মে তাঁর ‘দিওয়ান’ বা ‘কাব্য’ থেকে জানা যায়।
কুরআন তাফসীরের জ্ঞানে গভীর পা-িত্যের পাশাপাশি কাব্যচর্চায় হাফেযের অসধারণ দক্ষতা তাঁর সময়েই ইরানের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। যে কারণে ভারতের দাক্ষিণাত্যের শাসক মাহমুদ দক্ষিণী তাঁকে দাক্ষিণাত্য সফরের আমন্ত্রণ জানান। কিন্ত হাফেয হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত গিয়ে জাহাজে আরোহণের পর সমুদ্রে ঝড়তুফান দেখে ভয় পান এবং শিরাজে ফিরে আসেন। তৎকালীন বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহের সাথে হাফেযের পত্রালাপ ছিল। ‘দিওয়ানে হাফেয’ এর একটি বিখ্যাত গযলে বাঙ্গালা এবং সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহের মজলিসে উপস্থিত হওয়ার জন্য কবির কান্নাজড়া উদ্দীপনার কথা ব্যক্ত হয়েছে।
৭৯১ হিজরিতে মহাকবি হাফেজ শিরাজী এই নশ^র জগৎ ত্যাগ করেন। কবি হাফেযের একমাত্র কাব্যের নাম ‘দিওয়ানে হাফেয’। এতে রয়েছে গযল, কাসিদা, কিতআ ও রূবায়াতের সন্নিবেশ। হাফেয নিজে তাঁর ‘দিওয়ান’ গ্রন্থিত করে যান নি, বরং তাঁর সমসাময়িক বন্ধু মুহাম্মদ গুলান্দাম ফারসি সাহিত্যের এই অমূল্য গ্রন্থটি সংকলন করেন। মুহাম্মদ গুলান্দামের বর্ণনা অনুযায়ী, হাফেয ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ্ ও তাফসীরশাস্ত্র ছাড়াও জ্যামিতি ও সংগীতে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি তাফসীরে কাশশাফের টীকা লিখেছেন বলেও কথিত আছে।
হাফেযের কবিতার মূল প্রতিপাদ্য প্রেম। মানবজীবনের দুঃখ-বেদনা ও বিরহ-বিচ্ছেদ তাঁর কবিতায় বাঙ্ময় হয়েছে। হাফেযের প্রেম মানুষের চিন্তাকে শেষ পর্যন্ত আধ্যাত্মিক প্রেমের দিকে ধাবিত করে। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের এমন জয়গান যুগপৎভাবে আর কোনো কবি গাইতে পারেন নি, এখানেই হাফেযের শ্রেষ্ঠত্ব। এ কারণে বিজ্ঞজনেরা তাঁকে ‘অদৃশ্যের কণ্ঠস্বর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। হাফেয এখনো ইরানের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়।

ইরানের সমকালীন শ্রেষ্ঠকবি শাহরিয়ার
ইরানের সমকালীন শ্রেষ্ঠ কবি শাহরিয়ার। পুরো নাম সাইয়্যেদ মুহাম্মদ হুসাইন বাহজাত তাবরিযী। কবি নাম শাহরিয়ার। তিনি ইরানের আযারবাইজান প্রদেশের অধিবাসী। ফারসি ও আযারি ভাষায় সমান দক্ষতার সাথে তিনি কাব্যচর্চা করেন।
১২৮৫ ইরানি সাল মোতাবেক ১৯০৬ সালে আযারবাইজানের কারাহচামান অঞ্চলে শাহরিয়ার জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল অতিবাহিত করেন পৈত্রিক ও মাতৃনিবাস পূর্ব আযারবাইজানের বুস্তানাবাদ জেলার পল্লিগাঁয়ে। বাবার নাম ছিল মীর আগা খোশগনাভী। তাবরিযে তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
শাহরিয়ার তাবরিযে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে উচ্চতর পড়ালেখার উদ্দেশ্যে ১৩০০ ইরানি সালে (১৯২১ খ্রি.) তিনি তেহরানে আসেন। ১৩১৩ সালে (১৯৩৪) খোরাসানে থাকাকালে তাঁর পিতা ইন্তিকাল করেন। ১৯৩৬ সালে কৃষি ব্যাংকে চাকরি নিয়ে তিনি তাবরিয চলে যান।
তাঁর বিখ্যাত কাব্যের শিরোনাম ‘হায়দার বাবায়া সালাম’। এটি তুর্কি আযারবাইজানি ভাষায় রচিত এবং ১৩৩৩ (১৯৫৪) সালে প্রকাশিত। হায়দার বাবা একটি পাহাড়ের নাম, যে পাহাড়ের পাদদেশে কবি শাহরিয়ারের শৈশবকাল অতিবাহিত হয়েছে। কবি এই কাব্যে গ্রামীণ জীবনের নিসর্গ আর শৈশবের স্মৃতিকে মনের মাধুরি মিশিয়ে চিত্রিত করেছেন।
তাবরিয বিশ^বিদ্যালয়ের সাহিত্য ফ্যাকাল্টির পক্ষ হতে তাঁকে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৫৩ সালে মায়ের ইন্তিকাল হয় এবং একই সালে আযিযা আমীদ খালেকী নামে এক নিকটাত্মীয়ার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। শাহরিয়ারের দুই মেয়ে শাহ্রযাদ, মারইয়াম এবং ছেলে হাদী। কবি শাহরিয়ার ১৯৮৮ সালে ৮৩ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মৃত্যুর পর তাঁকে তাবরিযের মাকবিরাতুশ শোয়ারা বা কবিদের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
শাহরিয়ার কাসিদা, মসনবী, গযল, কিতআ ও নিমাঈ রীতির কবিতায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত একটি গযল হযরত আলী (আ.)-কে সম্বোধন করে লেখা, যার প্রথম কলি ‘হে আলী! হে রহমতের বিহঙ্গপাখি।’
তিনি ইরানি বিপ্লবের নেতাদের প্রশংসায় কবিতা রচনা করেন। যেমন ইমাম খোমেইনী, রাহবার খামেনেয়ী ও হাশেমী রাফসানজানীর নামে তাঁর কবিতা সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাহবার সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর উপস্থিতিতে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন।
শাহরিয়ার মহাকবি হাফেযের বড় আসক্ত ও হাফেযের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি বলেন, নিজের কবিনাম চয়নের সময় তিনি দু’রাকাত নামায পড়ে কবি হাফিযের ‘দিওয়ান’ নিয়ে বিশেষ নিয়মে ফাল দেখেন। সে ভিত্তিতে তিনি তাঁর কবি নাম ধারণ করেন ‘শাহরিয়ার’। হাফেযের মতো শাহরিয়ারের কবিতায় বিরহ-বিচ্ছেদ, প্রেমের আকুতি ও মনের স্বচ্ছতার উদ্ভাস চিরভাস্বর। ইরানে ফারসি ২৮ মেহের কবি শাহরিয়ার স্মরণে দিবসটি কবিতা ও ফারসি সাহিত্য দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হয়।