বুধবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

পুষ্পিত সৌন্দর্যের কবি শেখ সাদী

পোস্ট হয়েছে: মে ৬, ২০১৮ 

news-image

হাসান হাফিজ : মহান কবি শেখ সাদী সম্পর্কে আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা বিস্তারিত জানি, এমন কথা বলা চলে না। বিশ্বসাহিত্যের অমর এই প্রতিভার চিরন্তন কাব্যদ্যুতি, শিল্পসুষমা, মরমী ও শাশ্বত আবেদন মনস্ক ও বোদ্ধা পাঠকের হৃদয় খুব সহজেই ছুঁয়ে যায়। আবিষ্ট ও আপ্লুত করে। ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত একটি প্রবাদ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। ওই প্রবাদে বলা হয়েছে “সাত জন কবির সাহিত্যকর্ম রেখে যদি বাকি সাহিত্য দুনিয়া থেকে মুছে ফেলা হয়, তবু ফারসি সাহিত্য টিকে থাকবে। এই সাত জন কবি হচ্ছেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী, ফেরদৌসী, হাফেজ, নিজামী, শেখ সাদী, রুদাকি এবং জামি।”

মহাকবি শেখ সাদীর অনন্য গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ লিখিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাত শ’ বছর আগে। পদ্য ও গদ্যের সংমিশ্রণে লিখিত গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’এ বিধৃত সৌন্দর্যসুষমা, নৈতিকতা, অলঙ্কার উপমা আভরণ যেভাবে শৈল্পিক বিন্যাসে শোভিত ও আয়ুষ্মান, তা সত্যিই বিস্ময়কর। মহানবী হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের প্রতি নিবেদিত অমর উজ্জ্বল পঙ্ক্তিমালার অনুরণন, শিহরণ বিশ্বমানবের প্রিয়তা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে। শেখ সাদী তাঁর গুলিস্তান গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেনঃ

বালাগাল উলা বিকামা’লিহি

কাশাফাদ দুজা বি’জামালিহি

হাসুনাত জামিয়ু খিসালি’হি

সাল্লু আলাইহে ওয়া আ’লিহি।

শাশ্বত আবেদনঋদ্ধ এসব পঙ্ক্তিমালার বাংলা অনুবাদ বেশ কয়েকজন করেছেন। বলা হয়, এর যথার্থ ও সঠিক অনুবাদ করা সম্ভবপর হয়নি। বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী লাবণ্যলালিত্যে সমৃদ্ধ ফারসি ভাষা থেকে অনেক কিছুই অনুবাদ করেছেন বাংলায়। তিনি লিখছেন,“গুলিস্তান এর ভূমিকায় বিধৃত এই পঙ্ক্তিমালা শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় মাহফিলগুলোতে রাসুলে পাকের আশেকগণ ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অবনত কণ্ঠে সমস্বরে পাঠ করে অনাবিল তৃপ্তি ও নির্মল আনন্দ পান।

এই অনুপম পঙ্ক্তিমালার যথার্থ অনুবাদের অনেক চেষ্টা বাংলা ভাষায়ও হয়েছে। কিন্তু কেউ দাবি করতে পারেননি সঠিক ও যথার্থ অনুবাদ হয়েছে বলে। মোটামুটি এভাবে তার অনুবাদ করা যায়Ñ

সুউচ্চ শিখরে সমাসীন তিনি নিজ মহিমায়

তিমির-তমসা কাটিল তাঁর রূপের প্রভায়,

সুন্দর আর সুন্দর তাঁর স্বভাব-চরিত্র তামাম

পড়ো তাঁর ও তাঁর বংশের ’পরে দরূদ সালাম।”

উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে জানা যাচ্ছে-

কবি শেখ সাদীর জন্ম ১২১০ খ্রিস্টাব্দে; ইরানের শিরাজ-এ। আবার এটাও বলা হয়েছে জন্মসাল ১২০৮ বা তারও অল্প আগে। তিনি ইন্তেকাল করেন ১২৯১ অথবা ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে। কবির পুরো নাম আবু মুহাম্মদ মুসলিম আল দীন বিন আবদাল্লাহ শিরাজী। সাদী তার পেন নেম অর্থাৎ কলমী নাম। শৈশবেই তিনি পিতৃহীন হয়েছিলেন। তিনি ইরাকের রাজধানী বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিষয়ে অধ্যয়ন করেন, তার মধ্যে ছিল ইসলামী বিজ্ঞান, আইন, শাসন, ইতিহাস এবং আরবী সাহিত্য। ছাত্রাবস্থায় তিনি বৃত্তি লাভ করেছিলেন।

মহাকবি শেখ সাদীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে বুস্তান ও গুলিস্তান। বুস্তান লেখা সম্পূর্ণ হয় ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে। আর গুলিস্তান রচনাকাল হচ্ছে তার পরের বছর ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন তেহরান সফরে গিয়ে বলেছিলেন, জাতিসংঘ সদর দফতরের প্রবেশপথে রয়েছে জমকালো দৃষ্টিনন্দন একটি কার্পেট। আমার মনে হয় জাতিসংঘের যত কার্পেট আছে, তার মধ্যে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড়। এটি  জাতিসংঘের দেয়ালকে সুশোভিত করে রেখেছে।  কার্পেটটি ইরানের জনগণের দেয়া প্রীতি ভালোবাসার উপহার। ওই কার্পেটের পাশেই উৎকীর্ণ রয়েছে ফারসি সাহিত্যের মহান কবি শেখ সাদীর চমৎকার নান্দনিক একটি কবিতার বর্ণোজ্জ্বল পঙ্ক্তিসমূহ –

All human beings are members of one frame,

Since all, at first from the same essence came.

When time afflicts a limb with pain

The other limbs at rest cannot remain.

If thou feel not for other’s misery

A human being is no name for thee.

পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার প্রশস্তি দিয়ে  শুরু হয়েছে সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’। বেহেশতের সংখ্যা আট, সে অনুসারে মোট আটটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে গুলিস্তানকে। ভূমিকায় রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের স্তুতি ও মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের তারিফ। প্রথম অধ্যায়ের বিষয় রাজা বাদশাহদের জীবনচরিত। তৎকালে কাব্য ও সাহিত্যচর্চা মানেই ছিল স¤্রাট নৃপতিদের স্তুতি ও চাটুকারিতা। সমালোচনার কোনো প্রশ্নই ছিল না। বিরুদ্ধে বলা মানে  নিজের অনিবার্য মৃত্যু ডেকে আনা। শেখ সাদী কৌশলে প্রত্যাশিত কাজটি করলেন। অতীতের রাজা বাদশাহরা কেন কী কারণে পরাস্ত ও ধ্বংস হয়েছিলেন, তার সরস বর্ণনা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি তিনি ন্যায়বান শাসকদের প্রশংসা করেছেন। এই কুশলী পন্থায় তিনি বর্তমান ও অনাগত কালের শাসকদের সমঝে চলার শৈল্পিক পরামর্শ দিয়ে গেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে দরবেশদের আখলাক। তৃতীয় অধ্যায়ের বিষয় অল্পে তুষ্টির ফজিলত বা মাহাত্ম্য। ‘নীরবতার সুফল’ চার নম্বর অধ্যায়ের প্রসঙ্গ। আর পঞ্চম অধ্যায়ে বিবৃত হয়েছে প্রেম ও যৌবনের প্রসঙ্গ। ষষ্ঠ অধ্যায়ে রয়েছে দুর্বলতা ও বার্ধক্যের কথা। সপ্তম অধ্যায়ের বিষয় কাহিনি হলো শিক্ষা দীক্ষার প্রভাব। গবেষকরা বলেন, এই গ্রন্থের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী অংশ হলো অষ্টম অধ্যায়- যার বিষয় হলো সাহচর্যের আদব ও শিষ্টাচার।

শেখ সাদীর রচনা বাংলায় আরো বেশিমাত্রায় অনুবাদ হওয়া দরকার। মহান এই কবির জীবনদর্শনও সম্যকভাবে জানা প্রয়োজন। চিরন্তন এই সাহিত্যের রস আস্বাদনের সুযোগ আমাদের উপকৃত, আনন্দিত করবেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্ব ক্ল্যাসিক রচনা সব কালে সব সময়েই মানবসমাজকে উদ্দীপিত, প্রাণিত, আলোকিত করে। ড.মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত একটি প্রবন্ধের নাম ‘ফুলের সুবাসে চির অম্লান শেখ সা’দীর গুলিস্তান’। এই লেখায় তিনি বলেছেন, “…গুলিস্তান এর বাচনভঙ্গি অপূর্ব, প্রাঞ্জল,গতিময়, প্রাণচঞ্চল। গদ্যে-পদ্যে শব্দে শব্দে ঝঙ্কার, ভাবের তরঙ্গ, আনন্দের উচ্ছলতা,তত্ত্বের সমাহার। মনে হবে, দুনিয়ার কোনো কাব্য বা পদ্য সা’দীর সমকক্ষতায় আসতে পারবে না। কিন্তু যখন গদ্যের মাঝে শ্লোক, খণ্ড কবিতা প্রভৃতি পদ্যের সুন্দর সংযোজন দেখবেন, মনে হবে গদ্য-পদ্যের সকল সীমা চুরমার করে দিয়েছে ‘গুলিস্তান’। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শ্লোক মুখস্ত রাখার মত। তাই ইরানীদের মুখে মুখে চর্চিত ‘গুলিস্তান’এর এসব বাক্য। কথায় কথায় উদ্ধৃতি টানে সা’দীর উক্তির। অফুরন্ত জ্ঞান,তত্ত্ব ও উপদেশ উপচে পড়ে ‘গুলিস্তান’এর প্রতিটি বাক্য বিন্যাসে।

… নজরুল যেভাবে বাংলায় ফারসি-আরবির  সুন্দর হৃদয়গ্রাহী মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, শেখ সা’দী তার চেয়েও  মোহনীয়ভাবে কুরআন, হাদীসের শিক্ষা ও শব্দ সম্ভারের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন ফারসিতে। ফলে মহান আল্লাহর তাওহীদের বাণী ও শিক্ষা বুকে ধারণ করায় ফারসি হয়েছে অপরিবর্তনীয়, অক্ষয়। একই সুবাদে ‘গুলিস্তান’ও দাবি করতে পারে কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠানের। ‘গুলিস্তান’ আমাদের দেশেও পড়ানো হয় মাদ্রাসাগুলোতে। তাও আবার নিচের ক্লাসে। ফলে সাহিত্য ও বাক্যালঙ্কারের উচ্চ মার্গের অভিজ্ঞতা না থাকায় এ পর্যায়ের ছাত্ররা ‘গুলিস্তান’এর শিল্প মাধুর্যের কিছুই বুঝতে পারে না। আমাদের দেশে মাদ্রাসায় ‘গুলিস্তান’ এর কিছু কিছু গল্পই বুঝানো হয় ক্লাসে। তাও এখন বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এর প্রতিটি বাক্য ও  শিক্ষার আবেদন কীরূপ কালজয়ী তা সাহিত্যের বোদ্ধা ছাড়া বোঝা ও বোঝানো অসম্ভব। তাই ইরানে ‘গুলিস্তান’ পড়ানো হয় ফারসি সাহিত্যের বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের।”