শুক্রবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

পাশ্চাত্য যুব সমাজের উদ্দেশে ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বারের খোলা চিঠি মাধ্যম ছাড়াই ইসলামের সাথে সরাসরি পরিচিত হও

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ৮, ২০১৬ 

ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান রাহ্বার ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ ‘উয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী গত ২১শে জানুয়ারি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার যুব সমাজের উদ্দেশে লিখিত এক খোলা চিঠিতে তাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপকভাবে যে বিকৃত ধারণা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তার স্বরূপ উদ্ঘাটন এবং কোনোরূপ মাধ্যম ব্যতিরেকে সরাসরি ইসলামের সাথে পরিচিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এ খোলা চিঠির পূর্ণ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো :

বিসমিল্লাহির রাহ্মানির রাহীম।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার যুব সমাজ,
ফ্রান্সে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং আরো কোনো কোনো পাশ্চাত্য দেশে সংঘটিত এ ধরনের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আমি তোমাদের সাথে সরাসরি কিছু কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করেছি।
আমি যে তোমাদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে কথা বলছি তার কারণ এ নয় যে, তোমাদের পিতা-মাতাদেরকে উপেক্ষা করছি, বরং এর কারণ এই যে, আমি তোমাদের নিজ নিজ জাতি ও দেশের ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতে দেখতে পাচ্ছি, এছাড়াও সত্যসন্ধানী অনুভূতি তোমাদের মধ্যে অধিকতর জীবন্ত এবং তোমাদেরকে অধিকতর সতর্ক হিসেবে লক্ষ্য করছি। তেমনি আমি আমার এ পত্রে তোমাদের রাষ্ট্রনেতাদের ও নীতি নির্ধারকদেরকে সম্বোধন করব না, কারণ, আমি নিশ্চিত যে, তাঁরা সচেতনভাবেই তাঁদের নীতি নির্ধারণের পথকে সত্য ও সততার পথ থেকে পৃথক করে নিয়েছেন।
আমি তোমাদের উদ্দেশে ইসলাম সম্পর্কে, বিশেষ করে তোমাদের সামনে ইসলামের যে চিত্র ও চেহারা প্রদর্শন করা হচ্ছে সে সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই।
বিগত দুই দশককালেরও আগে থেকেই অর্থাৎ মোটামুটিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধসে পড়ার পর থেকে মহান দ্বীন ইসলামকে পাশ্চাত্যের জন্য একটি ভয়ানক শত্রু হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে অনেক চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, পাশ্চাত্য জগতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইসলামের বিরুদ্ধে ভীতি, আতঙ্ক ও  ঘৃণা-বিদ্বেষের অনুভূতি উস্কে দেয়া এবং এ থেকে সুবিধা হাসিলের অপতৎপরতা দীর্ঘ অতীতের অধিকারী।
এ পর্যন্ত পাশ্চাত্য জাতিসমূহের মনে ইসলাম সম্পর্কে যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে আমি এখানে তার বিবরণ দিতে চাচ্ছি না। কারণ, সাম্প্রতিককালে ইতিহাস নিয়ে যে সমালোচনামূলক গবেষণা হয়েছে তা অধ্যয়ন করলে তোমরা নিজেরাই দেখতে পাবে যে, নতুন ইতিহাসে পাশ্চাত্যের সরকারগুলো অন্যান্য জাতির সাথে ও বিশ্বের সংস্কৃতিসমূহের সাথে আন্তরিকতাবিহীন ও মিথ্যাচার সহকারে আচরণ করার কারণে তিরস্কৃত হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার ইতিহাস দাসপ্রথা ও দাসব্যবসার কারণে লজ্জিত, ঔপনিবেশিক যুগের কারণে নতশির এবং রেড ইন্ডিয়ান ও অখ্রিস্টানদের ওপর যুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে লজ্জায় মাথা নত করেছে। ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ধর্মের নামে এবং জাতীয়তা ও গোষ্ঠীবাদের নামে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে রক্তপাত হয়েছে সে জন্য তোমাদের ঐতিহাসিকগণ গভীরভাবে লজ্জায় মাথা নত করেছেন।
অবশ্য ঐতিহাসিকদের এ ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এ দীর্ঘ ইতিহাসের সামান্য অংশবিশেষ সম্পর্কে আমি যে আভাস দিয়েছি তার উদ্দেশ্য পাশ্চাত্যের ইতিহাসকে তিরস্কার করা নয়; বরং আমি চাই যে, তোমরা তোমাদের সমাজের বুদ্ধিজীবীদের কাছে প্রশ্ন কর যে, কেন পাশ্চাত্য জগতের সর্বজনীন বিবেক সব সময়ই কেবল কয়েক দশক বা কোনো কোনো সময় কয়েক শতককাল দেরীতে জাগ্রত ও সচেতন হয়? কেন তাদের সর্বজনীন বিবেক দূর অতীতের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, চলমান সমস্যাবলির প্রতি দৃষ্টিপাত করে না? কেন ইসলামী সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সাথে আচরণের ধরনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বজনীন সচেতনতা সৃষ্টিকে প্রতিহত করা হয়?
তোমরা বেশ ভালো করেই জান যে, অন্যদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ আর কাল্পনিক ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি সব সময়ই যুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়নমূলক সুবিধা সন্ধানের জন্য সাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এখন আমি চাচ্ছি, তোমরা নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করো যে, কেন অতীতের ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ানোর নায়করা এবং ঘৃণা-বিদ্বেষ বিস্তারকারীরা নতুন করে এবং নজিরবিহীনভাবে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে? কেন বর্তমান বৈশ্বিক শক্তি কাঠামো ইসলামী চিন্তা-চেতনাকে পাশে ঠেলে রাখার ও প্রতিক্রিয়াশীলে পরিণত করে রাখার জন্য চেষ্টা করছে? প্রশ্ন হচ্ছে, কোন্ বাধা ও ইসলামের কোন্ কোন্ মূল্যবোধ বৃহৎ শক্তিবর্গের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অসুবিধা সৃষ্টি করেছে এবং তারা যে ইসলামের ভুল চিত্র তৈরি করছে তা থেকে তাদের কোন্ স্বার্থ হাসিল হচ্ছে? সুতরাং তোমাদের কাছে আমার প্রথম আবেদন হচ্ছে এই যে, তোমরা এভাবে ইসলামের ওপর কলঙ্ক লেপনকৃত চিত্র প্রদর্শনের পেছনে নিহিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন কর এবং তা উদ্ঘাটন কর।
তোমাদের কাছে আমার দ্বিতীয় আবেদন এই যে, ইসলাম সম্পর্কে যে কাল্পনিক মতামত ব্যক্ত করা হয় ও নেতিবাচক প্রচার চালানো হয় তার প্রতিক্রিয়ায় কোনো রকমের মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি এ দ্বীনের সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করো। সুস্থ বিচারবুদ্ধি ও যুক্তির দাবি হচ্ছে এই যে, তোমাদেরকে যা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলা হচ্ছে তোমরা অন্তত জানবে যে, আসলে তা কী এবং তার প্রকৃতি কী।
আমি তোমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে আমার বা অন্য যে কারো গৃহীত তাৎপর্যকে গ্রহণ করে নেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছি না, বরং বলছি যে, তোমরা কাউকে এ সুযোগ দিয়ো না যে, গতিশীল ও আজকের দুনিয়ায় প্রভাব বিস্তারক এ বাস্তবতাকে তোমাদের সামনে অসদুদ্দেশ্যে ও নোংরা লক্ষ্যে পরিচিত করানো হবে। তোমরা কাউকে এ সুযোগ দিয়ো না যে, তোমাদের সামনে মিথ্যা প্রদর্শনীর লক্ষ্যে তাদেরই নিয়োগকৃত সন্ত্রাসীদেরকে ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করানো হবে।
তোমরা ইসলামকে তার মৌলিক তথ্যসূত্র ও মূল উৎস থেকে জানার চেষ্টা কর। তোমরা কোরআনের মাধ্যমে এবং ইসলামের মহান নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনচরিতের সাহায্যে ইসলামের সাথে পরিচিত হও।
এখানে আমি তোমাদের কাছে প্রশ্ন করতে চাই যে, তোমরা কি এ পর্যন্ত কখনো সরাসরি মুসলমানদের মূল দ্বীনী গ্রন্থ কোরআন অধ্যয়ন করে দেখেছ? তোমরা কি ইসলামের মহান নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর শিক্ষাসমূহ, বিশেষ করে তাঁর মানবিক ও চারিত্রিক শিক্ষাসমূহ অধ্যয়ন করেছ? তোমরা কি এ পর্যন্ত কখনো প্রচারমাধ্যম ব্যতীত অন্য কোনো উৎস থেকে ইসলামের বাণী লাভ করেছ? তোমরা কি কখনো নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করেছ যে, এই ইসলাম কীভাবে এবং কোন্ কোন্ মূল্যবোধের ভিত্তিতে সুদীর্ঘ বহু শতাব্দীকাল যাবৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্ঞান-বিজ্ঞানগত ও চিন্তাগত সংস্কৃতিকে লালন করেছিল এবং শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞানী, মনীষী ও চিন্তাবিদগণকে গড়ে তুলেছিল?
তোমাদের কাছে আমার আবেদন এই যে, তোমরা কাউকে এ সুযোগ দিয়ো না যে, ইসলাম সম্পর্কে মনগড়া দুর্বল ও হীন-নীচ চিত্র তৈরি করে তোমাদের ও বাস্তবতার মাঝে ভাবাবেগের বাধার দেয়াল তৈরি করে দেবে এবং তোমাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষভাবে বিচার- বিশ্লেষণের ক্ষমতা হরণ করে নেবে।
বর্তমানে তো যোগাযোগমাধ্যম ভৌগোলিক সীমান্তসমূহের বাধার দেয়ালকে চুরমার করে দিয়েছে, এমতাবস্থায় তোমরা কাউকে এ সুযোগ দিয়ো না যে, তোমাদেরকে কৃত্রিম ও মনস্তাত্ত্বিক সীমান্তের মধ্যে বন্দি করে রাখবে। যদিও ইতিমধ্যেই যে ফাটল তৈরি হয়েছে তা কোনো এক ব্যক্তির পক্ষেই মেরামত করা সম্ভব নয়, কিন্তু তোমাদের প্রত্যেকেই নিজের ও স্বীয় পারিপার্শ্বিকতার চিন্তা-চেতনাকে সমুজ্জ্বল করার লক্ষ্যে এ সব ফাটলের ওপর একেকটি চিন্তাগত ও সুবিচারের সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম।
যদিও ইসলাম ও তোমাদের মতো যুবকদের মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সৃষ্ট এ চ্যালেঞ্জ খুবই অসহনীয়, তবে তা তোমাদের অনুসন্ধিৎসু মন-মগযে কতগুলো নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে। এ সব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদের জন্য নতুন বাস্তবতা ও প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটনের একটি বিরাট সুযোগ এনে দিতে পারে। সুতরাং পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ধারণা ব্যতীতই ইসলামকে সঠিকভাবে অনুধাবনের এ সুযোগকে তোমরা হাতছাড়া করো না। তাহলে আশা করা যায় যে, তোমরা সত্য ও প্রকৃত বিষয়ের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং তা করলে তার বদৌলতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মসমূহ পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যকার আন্তঃক্রিয়ার ইতিহাসের এ অধ্যায়টি অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট স্বীকার করে এবং নিশ্চিন্ত বিবেক সহকারে লিপিবদ্ধ করতে সক্ষম হবে।

সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী
১লা বাহ্মান্ ১৩৯৩ ইরানী সাল
(২১শে জানুয়ারি ২০১৫)
অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী