মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৯ ইং, ১লা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

পবিত্র আশুরার চেতনা

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ২১, ২০১৭ 

আবদুল মুকীত চৌধুরী
‘পবিত্র আশুরার চেতনা’ সম্পর্কে যে কোন আলোচনার সূচনা ইলাহী কালাম ও মহানবী (সা)-এর বাণীর আলোকেই হবে এবং তা হবে নবী-পরিবার তথা আহলে বাইত প্রসংগে। আহলে বাইতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় নবী-পরিবারের মাসুমত্ব ঘোষিত হয়েছে কুরআন মজীদে :
‘…. হে নবী পরিবার। আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের হইতে অপবিত্রতা দূর করিতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করিতে।’ -সূরা আল-আহযাব ৩৩ : আয়াত ৩৩, আল-কুরআনুল করীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা।
“ ..….and God only wishes/To remove all abomination/From you, ye Members/Of the Family, and to make/You pure and spotless.- (Sura Ahyab 33 : Verse 33, The Holy QurÕan Translation and Commentary by A. Yusuf Ali)

হয়রত ইবরাহীম (আ.) – এর সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ.) এর কারবানি প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেই আয়াত উল্লেখ করছি, যেখানে আল্লাহ তা’আলা বলেন:  “ আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক বড় ও মহান কুরবানীর বিনিময়ে।’’ ( সূরা সাফফাত ৩৭: ১০৭, আল কুরআনুল করীম, ই.ফা. ঢাকা।)

‘‘ And we ransomed him with a momentous sacrifice.’’ (Sura Saffat 37: Verse 107, The Holy Quran Translation and Commentary by A. Yusuf Ali)

অনুবাদক, ভাষ্যকার আল্লামা ইফসুফ আলী হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর কুরবানী তথা চিরস্মরণীয় ত্যাগ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন এবং পরবর্তীকালে বিশ্বনবী (সা)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের শাহাদতে সেই কুরবানীর সাযুজ্য বর্ণনা করেছেন :

‘‘ The adjective qualifying ÔsacrificeÕ here ÔayimÕ (great, momentous) may be understood both in a literal and figurative sense. In a literal sense it implies that a fine sheep or ram was substituted symbolically. The figurative sense is more important. It was indeed a great and momentous occasion, when two men, with concerted will, Ôranged themselves in the ranksÕ of those to whom self sacrifice in the service of God was the supreme thing in life. This was a type of the service, which Imam Husain performed, maû years later….’’ (The Holy Quran Translation and Commentary)

ধৈর্য ধারণ, ইহজীবনে পরকালীন নাজাত ও চিরশান্তির জন্য নিবেদিত ও সচেষ্ট থাকার জন্য ইমাম হোসেনকে উপদেশ হযরত আলী (রা)-র এবং অবৈধ অত্যাচারী খোদা-দ্রোহী শক্তির সাথে চূড়ান্ত মুকাবেলায় আধ্যাত্মিক পর্যায়ে দৃশ্যমান ভাবী শাহাদতের ইঙ্গিত সম্বলিত কাব্যকথা :
“ধৈর্যের চাদর পরো সঙ্কটের কালে
শুভ ফল পাবে পূর্ণ ধৈর্যের তা হলে।
সর্বত্র ধৈর্য ধরো–করবে সবর
কারণ ধৈর্য ভাল বন্ধু সহচর।”

-হুসায়ন (রা.)-কে উপদেশ : ঐ

“পরিজনসহ যেন আমি কারবালায়
কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে গেছি (হায়!)
যেভাবে বিয়ের কনে পরিধেয় বসন রাঙায়
তেমনি আমার দাড়ি রক্তে রাঙা করা হচ্ছে (হায়!)”

“এই দৃশ্যাবলী দেখি : চাক্ষুষ তা নয় যে আমার
আমাকে প্রদত্ত হলো সে সকল চাবি দরজার।
এমন বিপদ কিন্তু তোমার উপর আসবেই,
প্রস্তুতি নিয়ে নাও, সেজন্য আসার আগেই।”

“হে হুসায়ন-
আমার, তোমারও হন্তা তাঁর হাতে হবে গ্রেফতার
কাজেই তাদের দেয়া কষ্টে করো সবর এখতিয়ার।”
-নয়নমণি হুসায়ন (রা)-কে উপদেশ, ঐ

আশুরার চেতনা সর্বব্যাপী। বাতিলের উত্থানের বিপরীতে হক ইনসাফের সুরক্ষা ও সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠা এবং কুরআন সুন্নাহ ঘোষিত সে রাষ্ট্রব্যবস্থার পতাকা সমুন্নত রাখার সংগ্রাম প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষেত্রে। এ প্রেক্ষিতে সামগ্রিক ও চিরন্তন শপথতুল্য উচ্চারণ :
“প্রতিটি দিনই আশুরা
প্রতিটি ময়দানই কারবালা।”
-ইমাম জাফর সাদেক (র)
আহলে বাইতকে নাজাতের ওসিলা বলেন মুসলিম উম্মাহ্র অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিক্্হবিদ ইমাম শাফিঈ (র)। তাঁর কাব্য পংক্তিমালা :
“নবী পরিবার মাধ্যম আমার,
তাঁরা ওসিলা দরবারে আল্লাহ্র।
তাঁদের কারণে আশা কেয়ামতে
আমল আমার পাবো ডান হাতে।”
-ইমাম শাফি‘ঈ (র)
ভাবানুবাদ : হাফিদ কলন্দর
এজিদের আনুগত্য গ্রহণ না করে ইমাম হোসেন (রা) শাহাদত কবুল করে কলেমায়ে শাহাদতের নব-ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করলেন-সুলাতানুল হিন্দ খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী (র)-এর সাক্ষ্য :
‘শাহ আস্ত হোসাইন, বাদশাহ আস্ত হোসাইন
দ্বীন আস্ত হোসাইন, দ্বীন পানাহ আস্ত হোসাইন।
সার দা’দ নাদা’দ দাস্ত দার দাস্তে ইয়াযীদ
হাক্কাকে বেনায়ে লা ইলাহা আস্ত হোসাইন।’

“বাদশাহ বলো আর শাহ্ বলো
হুসাইনকেই মানায় তা;
দীন ও দীনের আশ্রয় হলো
হুসাইনের কোলেই তা।

হাত না দিয়ে মাথা দিলেন
হাতে বর্বর এযীদের,
নবভিত্তি এতে হলো
কালেমায়ে শাহাদাতের।”
-খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী (রহ)
ভাবানুবাদ : হাফিদ কলন্দর
হোসাইনী কাফেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পতাকাবাহী ইরানের বিশ্ববিখ্যাত মর্সিয়াখানির কবি শামসুস্ শোয়ারা মুহতাশেম কাশানী (র)। তাঁর কাব্যের মাতম রোনাজারি মর্সিয়া সাহিত্য ও আশুরার অন্যতম প্রতিপাদ্য। এজিদী অত্যাচার ও ইমাম হোসেনের শাহাদতে গোটা সৃষ্টিজগতের কান্না ও আকুতি বাক্সক্ষয় হয়েছে মুহতাশেম কাশানীর কাব্য-পংক্তিমালায় :
“গোটা দুনিয়ার সৃষ্টিলোকে এ কোন্ ফরিয়াদ জাগলো ফের
এ কোন্ শোক মাতম ওঠে, হায়, নওহায় করুণ রবের!

“যদি বলি রোজ কিয়ামত পৃথিবীতে, নয় রঞ্জন
সর্বব্যাপী উত্থান পুন, এর নাম যে মুহররম।”

“আকাশ-মাটির সূর্য তিনি, পুব ও পশ্চিমের আলো
রাসূলেরই কোল থেকে সেই হুসাইনী নূর ছড়ালো।”

“নওহার করুণ সুরধ্বনি ষড় দিক পানে ছড়িয়ে যায়
সাত আকাশের ফেরেশতাকুল তাঁদের কাঁদনে সুর মেলায়।”

-আরশে আযীম ছুঁয়ে যায়, শামসুশ্ শোয়ারা মুহ্তাশেম কাশানী
(মুহরররম উপলক্ষে মুহতাশিমের বারো স্তবক)
ভাষান্তর : মুহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস বাদশা, কাব্যরূপ ও সম্পাদনা : আবদুল মুকীত চৌধুরী

ইসলামী ন্যায় ইনসাফ, সাম্য, মানবতার পতাকা সমুন্নত রাখতে ইমাম হোসেনের শাহাদত সম্পর্কে বিশ্ব বিখ্যাত লেখক চার্লস ডিকেন্স লিখেছেন :

-“If Husain had fought to quench his worldly desire then I do not understand why his sister, wife and children accompanied him. It stands for reason therefore, that he sacrificed purely for Islam.”  –Charles Dickens

“তওহীদ কি আমানত সিনোঁ মে হ্যায় হামারা
আঁসা নেহি মিটানা নাম ও নিশাঁ হামারা”
পবিত্র কালামে ইলাহী “তোমরা হীনবল হইও না এবং দুঃখিত হইও না ; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা আলে ইমরান ৩ : আয়াত ১৩৯, আল কুরআনুল করীম) এ আয়াতের প্রতিফলন-দীপ্ত এই উজ্জীবনী কাব্যের মহাকবি আল্লামা ইকবালের কাব্যে ইমাম হোসেন (রা)-এর অনন্য আত্মদান ও তাঁর সাথী শাহীদানের মাহাত্ম্যকথা :

“জিস্ তারাহ মুজকো শাহীদে কারবালা সে প্যায়ার হায়
হক তা‘আলা কো ইয়াতিমুঁ কী দুআ সে প্যায়ার হ্যায়।”
-“যেভাবে শহীদে কারবালার প্রতি আমার ভালবাসা রয়েছে,
(অনুরূপ) এতিমের দুআর প্রতিও আল্লাহতা‘আলার ভালবাসা রয়েছে।”
-মহাকবি আল্লামা ইশবাল
ভারতের ‘জাতির জনক’ মহাত্মা গান্ধী ইমাম হুসাইনকে মূল্যায়ন করেছেন ‘মহান শহীদ’ রূপে। খিলাফতের ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর ইমামতী আত্মদানকে তিনি ভারতের ‘বিজয়ী রাষ্ট্র’ হওয়ার জন্য ‘আদর্শ’ মনে করেন এবং ‘অনুসরণ করতে হবে’ বলেছেন।
“আমি ইমাম হুসাইন তথা ইসলামের এ মহান শহীদের জীবনী মনোযোগ সহকারে পাঠ করেছি এবং কারবালার পৃষ্ঠাগুলোর প্রতি অধিক মনোনিবেশ করেছি। আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ভারত যদি একটি বিজয়ী রাষ্ট্র হতে চায়, তা হলে ইমাম হুসাইনের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে।” -মহাত্মা গান্ধী

কারবালার শাহাদতের উজ্জীবনী ও বিজয়ী চেতনার মূল্যায়নে কবি মুহাম্মদ আলী জওহরের বহুল উচ্চারিত কাব্য পংক্তিদ্বয় :

“কাত্লে হুসাইন আসল মেঁ মরগে ইয়াযীদ হ্যায়
ইসলাম যিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কে বা‘দ”,

“হুসাইনের হত্যাকান্ডের মধ্যেই ইয়াযীদের মৃত্যু ;
(আর) প্রতিটি কারবালার পরই ইসলাম জীবিত হয়।”
-মুহাম্মদ আলী জওহর

মযলুমের সাহায্যকারীর প্রতি কবি ফয়েয আহমদ ফয়েযের সালাম। আমাদের স্মরণে পবিত্র কুরআনের আয়াত : “তোমাদের কী হইলো যে তোমরা যুদ্ধ করিবে না আল্লাহ্র পথে এবং অসহায় নরনারী এবং শিশুগনের জন্য, যাহারা বলে হে আমাদের প্রতিপালক ! এই জনপদ যাহার অধিবাসী জালিম, উহা হইতে আমাদেরকে অন্যত্র লইয়া যাও, তোমার নিকট হইতে কাহাকেও আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট হইতে কাহাকেও আমাদের সহায় কর।” (সূরা নিসা ৪: আয়াত ৭৫, আল-কুরআনুল করীম)” যে অত্যাচারের বিপরীতে ভূমিকা রাখে না, কবি তাকে ‘দীন অস্বীকারকারী’ বলছেন :

“ইনসাফ কে নেকী কে মুরাওয়াত কে তারাফদার
জালেম কে মুখালেফ হেঁ তু বেকাস কে মাদাদগার
জো জুলুম পার লানত না কারে আপ লায়ি হ্যায়
জো জাবার কা মুনকির নাহিঁ ওহ মুনকিরে দীন হ্যায়”।

– “ইনসাফের নেকী চরিত্রের অধিকারী,
জালেমের বিরুদ্ধে তুমি অসহায়ের সাহায্যকারী;
যে জুলুমকে আভিশাপ দেয় না, সে নিজেই অভিশপ্ত ;
যে অত্যাচারকে অস্বীকার করে না, সে দীনকে অস্বীকারকারী।”
-কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যের একাংশ ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ ভিত্তিক ও প্রাসংগিক। এরই অংশবিশেষ আহলে বাইত ও শানে জেহাদে কারবালা। হযরত মঈন উদ্দীন চিশতীর ‘সর দাদ’-এর মতোই তাঁর কাব্যে ‘হাঁকে বীর শির দেগা, নেহি দেগা আমামা।’ দ্রষ্টব্য : ‘আমামা’ অর্থ ‘পাগড়ি’, ‘শিরস্ত্রাণ’। এখানে অত্যাচারী এজিদের আনুগত্যে আত্মসমর্পণ না করা এবং ইসলাম তথা কুরআন সুন্নাহ্র রাষ্ট্রব্যবস্থা সমুন্নত রাখার প্রতীক স্বরূপ এই ‘আমামা’র উচ্চারণ। এর অর্থ ইমাম শির দিচ্ছেন ; কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার আদর্শ বিসর্জন দেবেন না। মহানবী পরিবারের সবার প্রতি নজরুলের কাব্য ও সংগীতের শ্রেষ্ঠ ও অনন্য নযরানা। ‘এজিদী মুসলমানে’র বিপরীতে ‘শহীদী ঈদগাহে’ তাঁর ‘জমায়েত ভারী’ ও ‘ইসলামী ফরমান জারি’র আহবান। আহলে বাইতের পদধূলি-ধন্য মাটি সুর্মা করে তাঁর চোখে মাখার আকুতি :
“দ্রিম দ্রিম বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর, ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা’।”

“কত মোর্হরম এলো, গেল চলে বহু কালÑ
ভুলিনি তো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!
মুসলিম তোরা আজ ‘জয়নাল আবেদীন,’
‘ওয়া হোসেনা–ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন।”

“হাসানের মত পিব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মত নিব বুকে ছুরি কহরের;
আসগর সম দিব বাচ্চারে কোরবান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান!”
-মোর্হরম, নজরুল ইসলাম : ইসলামী কবিতা,
সম্পাদক : আবদুল মুকীত চৌধুরী

“ঐক্য যে ইসলামের লক্ষ্য, এরা তাহা দেয় ভেঙে।
ফোরাত নদীর কূল যুগে যুগে রক্তে উঠেছে রেঙে
এই ভোগীদের জুলুমে। ইহারা এজিদী মুসলমান,
এরা ইসলামী সাম্যবাদেরে করিয়াছে খানখান।”
-মোর্হরম, ঐ

“আঁজলা ভ’রে আনল কি প্রাণ
কারবালাতে বীর শহীদান,
আজকে রওশন জমীন-আসমান
নওজোয়ানীর র্সুখ্ নূরে।”
-ভোরের সানাই, সন্ধ্যা, নজরুল ইসলাম : ইসলামী গান

“নব জীবনের ‘ফোরাত’ কূলে গো কাঁদে ‘কারবালা’ তৃষ্ণাতুর,
ঊর্ধ্বে শোষণ-সূর্য, নিম্নে তপ্ত বালুকা ব্যথা মরুর।
ঘিরিয়া যুরোপ-এজিদের সেনা এপার, ওপার, নিকট, দূর,
এরি মাঝে মোরা ‘আব্বাস’ সম পানি আনি প্রাণপণ করি।”

“আজো নম্রুদ ইব্রাহীমেরে মারিতে চাহিছে সর্বদাই
আনন্দ-দূত মোরা সে আগুনে ফোটাই পুষ্প-মঞ্জরী।”
-তরুণের গান, ঐ

“খাতুনে জান্নাত আমার মা,
হাসান-হোসেন চোখের জল;
ভয় করি না রোজ-কেয়ামত
পুল-সিরাতের কঠিন পুল।”
-বক্ষে আমার কাবার ছবি, ঐ

“আন মহিমা হযরতের
শক্তি আন শেরে খোদার,
কোরবাণী আন কারবালার,
আন্ রহম মা ফাতেমার।”
-খুশী লয়ে খোশরোজের, ঐ

“হাসান হোসেন সে কোথায়, কোথায় বীর শহীদান
কোরবাণী দিতে আপনায় আল্লার মুখ চাহি”।

-কোথায় তখ্ত তাউস, জুলফিকার, ঐ

“এস শেরে খোদা ফিরিয়া আরবে
ডাকে মুসলিম ‘ইয়া আলী’ রবে
হয়দারী-হাঁকে তন্দ্রা-মগনে
কর কর হুঁশিয়ার”।।
-খয়বর-জয়ী আলী হাইদার, ঐ

“শহীদী ঈদগাহে দেখ্ আজ জমায়ত্ ভারি।
হবে দুনিয়াতে আবার ইসলামী ফরমান জারি।।
তুরান ইরান হেজাজ মেসের হিন্দ্ মোরোক্কা ইরাক,
হাতে হাত মিলিয়ে আজ দাঁড়ায়েছে সারি সারি।।
-শহীদী ঈদ্গাহে দেখ্, জুলফিকার, ঐ

“তোর হৃদয়ের কারবালাতে বইবে ফোরাত নদী,
শহীদের র্দজা তোরে দেবেন আল্লা হাদী,
দুনিয়াদারী করেই পাবি বেহেশতেরি স্বাদ।”
-আল্লা ব’লে কাঁদ্, ঐ

“কত ছেলে মোর শহীদ হয়েছে মরুতে কারবালার।
আমি নন্দিনী মা ফাতেমার”
-মুসলিম যুবা মুসলিম নারী (ডুয়েট), ঐ


“হাসান হোসেনে তব উম্মত তরে, মাগো
কারবালা প্রান্তরে দিলে বলিদান,
বদলাতে তার রোজ হাশরের দিনে
চাহিবে মা মোর মত পাপীদের ত্রাণ।”
-খাতুনে জান্নাত, ঐ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, ইসলামী মানবিকতার কবি ফররুখ আহমদ। আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসার নযরানা-ঋদ্ধ তাঁর কাব্য ‘সিরাজাম মুনীরা’। ইসলাম প্রেম, মানবপ্রেম, মানুষের প্রতি একাত্মতার অনন্য কবিকণ্ঠ ফাররুখ। ‘আলী হায়দর’, ‘জেহাদে কারবালা’ কবিতায় হযরত আলীর শৌর্য-বীর্য ও ইমাম হোসেনের করুণ শাহাদত-গাথা ও উজ্জীবলী কাব্য পংক্তিমালা :

“আট কেল্লার রুদ্ধ প্রাকার আজিকে হয়েছে গুঁড়া,
কুল মখলুক হতে দেখা যায় আল হেলালের চূড়া,
তার তকবীর শোনা যায় পিছে ওঠে জনতার স্বর;
আলী হায়দর! আলী হায়দর! আসে আলী হায়দর!”

-আলী হায়দর, সিরাজাম মুনীরা, ফররুখ আহমদ

“ঝাঁজরা সিনা, তবুও সিংহ জয় করে নিল ফোরাত তীর,
আঁজলা ভরিয়া মুখে তুলে নিল ফোরাত নদীর শীতল নীর।
লাগলো আবার তীরের আঘাত পানি ফেলে দিয়ে দাঁড়ালো বীর;
হাহাকার করে উঠলো সভয়ে ফোরাত নদীর মুক্ত তীর।
জাগে রণবাজা এজিদের দলে তলোয়ার তীর নেজার ছায়,
জাগে শংকার কাঁপন আকাশে, লাগে মৃত্যুর রঙ ধুলায়,
সে রণভূমিতে ক্লান্ত সিংহ চলে একা বীর মরণাহত;
ক্ষত তনু তাঁর তীরের আঘাতে লুটালো বিশাল শিলার মত।
জীবন দিয়ে যে রাখলো বাঁচায়ে দীনী ইজ্জত বীর জাতির
দিনশেষে হায় কাটলো শত্রু সীমার সে মৃত বাঘের শির।
তীব্র ব্যথায় ঢেকে ফেলে মুখ দিনের সূর্য অস্তাচলে,
ডুবে ইসলাম রবি এজিদের আঘাতে অটল তিমিরতলে,
কলিজা কাঁপায়ে কারবালা মাঠে ওঠে ক্রন্দন লোহু সফেন
ওঠে আসমান জমিনে মাতম কাঁদে মানবতা হায় হোসেন।”

-জেহাদে কারবালা, সিরাজাম মুনীরা, ফররুখ আহমদ

[সংকলনটি গত ৬ অক্টোবর ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ‘আশুরার বার্তা বহনে কবিদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা ও কবিতা পাঠের আসরে উপস্থাপিত হয়।]

(লেখাটি প্রবন্ধ-আংগিকে নয় ; বলা যেতে পারে উদ্ধৃত কথা-কাব্য-গীতি-নকশা। কথা, কাব্য বা গানের কোন কোনটির উৎসে রয়েছে পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ্র সূত্র।