সোমবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ১লা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

নাসিবাহ বিনতে কাব- ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় মহিলা

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ৬, ২০১৪ 

news-image

ইসলামের ইতিহাসের একজন প্রখ্যাত মহিলা নাসিবা বিনতে কাবের দুঃসাহসিকতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের উদ্দীপ্ত ও মুগ্ধ করত। তারা একসঙ্গে বসে নাসিবাকে ওহুদের যুদ্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পাশে থেকে তিনি কিভাবে যুদ্ধ করেছেন তা বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করত।

ওহুদের যুদ্ধের কিছু সময় পূর্বে মুসলমানরা প্রথম নাসিবার নাম শুনতে পায়। ইসলাম প্রচার হওয়া সত্ত্বেও তখনো পর্যন্ত অধিকাংশ মহিলা আইয়ামে জাহেলিয়াতের আচার-আচরণের নিগড়ে বন্দি ছিল। ঐ সময় মহিলাদের অস্থাবর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হতো এবং তারা নিজেরাও এর বেশি ভাবত না। ঠিক ঐ সময়ে ওহুদের যুদ্ধে অংশ নেয়ার ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর কাছে একদল মানুষের নেএী হিসাবে ওয়াদাবদ্ধ হতে দেখা গেল একজন মহিলাকে। সত্যিই এটা আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ব্যাপার। সেই মহিলার নাম নাসিবা। তিনি স্বামী, দুই পুত্র ও আরো কিছুসংখ্যক লোককে নিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে এলেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত্য ঘোষণা করলেন ও যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। দলের মুখপাত্র হিসাবে নাসিবা মহানবী (সা.)-এর কাছে কিছু বললেন এবং তাঁকে দোয়া করার অনুরোধ করলেন যাতে বেহেশতে আল্লাহর রাসূলের পাশে তাঁদের স্থান হয়। একথা শোনার পর মহানবী (সা.) হাত তুললেন এবং তাঁদের বাসনা যাতে পূর্ণ হয় সেজন্য দোয়া করলেন।

ওহুদের ময়দানে যুদ্ধ শুরু হলো। নাসিবা কাঁধে তুলে নিলেন পানিভর্তি চামড়ার একটি বড় ব্যাগ। যুদ্ধের ময়দানে ঘুরে ঘুরে তিনি পিপাসার্ত সৈনিকদের পানি পান করাতে থাকলেন নিরলসভাবে। দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধের মধ্যে তিনি আহতদের পাশে গিয়ে হাজির হলেন অকুতোভয়ে এবং সেবা করতে থাকলেন অবিশ্রান্তভাবে। জিহাদের ময়দানে মুসলমানরা লড়াই করতে থাকলেন সাহসিকতার সঙ্গে। তাঁরা প্রথমদিকে বিজয় লাভও করলেন। কিন্তু আইনান পাহাড়ে মোতায়েন একদল মুসলমানের অবহেলা ও ভুলের কারণে তাঁদের সেই বিজয় ধুলায় লুণ্ঠিত হলো। পাহাড় অরক্ষিত রেখে মুসলমানের দলটি ময়দানে চলে এলো। এতে শত্রুরা পিছন দিয়ে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগ পেল। দুই দিক থেকে আক্রমণের শিকার হয়ে মুসলিম বাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ল। এসময় গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নিহত হয়েছেন। এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটল। এসময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে নাসিবা একটি তারবারি হাতে তুলে নিলেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন এবং শত্রুবাহিনীর ওপর কয়েক দফা প্রচ- আঘাত হানেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হন। এক পর্যায়ে নাসিবা মারাত্মকভাবে আহন হন। তিনি কাঁধে আঘাত পান। তাঁর জখমের স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে দেখে মহানবী (সা.) নাসিবার এক পুত্রকে ডাকলেন এবং তার মায়ের জখম স্থানে ব্যান্ডেজ করতে বললেন। ইতিমধ্যে তাঁর অপর পুত্রও শত্রুবাহিনীর হাতে আহত হয়। নিজের আহত স্থানের প্রচ- ব্যথা নিয়েও তিনি তাঁর ছেলের জখম স্থানে দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দেন এবং তাকে পুনরায় যুদ্ধ করতে পাঠান। মহানবী (সা.) নাসিবার পুত্রের ওপর হামলাকারী শত্রুসৈন্যকে চিহ্নিত করলেন এবং নাসিবা তার ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ও মরণ আঘাত হানলেন।

যুদ্ধ শেষ হলে মহানবী (সা.) নাসিবার অবস্থা সম্পর্কে খবর নেয়ার জন্য এক ব্যক্তিকে তাঁর আবাসস্থলে পাঠান। তিনি নাসিবা সম্পর্কে এতই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, নাসিবা বেঁচে আছেন এ খবর শুনেই তিনি খুশি হন। তবে নাসিবার জখম এতই গুরুতর ছিল যে, পরিপূণ সুস্থ হয়ে উঠতে একটি বছর লেগে যায়।

একজন গৃহবধূ ও দুই সন্তানের জননী নাসিবা বিনতে কাব অসীম সাহস ও দৃঢ় বিশ্বাসের জন্য সকলের কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন মুসলিম নারীর সত্যিকার কাজ হচ্ছে আরব সংস্কৃতিতে প্রচলিত ভ্রান্ত বিশ্বাসকে নির্মূল করতে সাহায্য করা।

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)