সোমবার, ১০ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

নজরুল-সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য

পোস্ট হয়েছে: মে ২৮, ২০১৮ 

news-image

প্রতিটি মানুষ ভিন্ন ভিন্ন জীবন দর্শনে অনুপ্রাণিত। নজরুলও একটি সত্য দর্শনের ওপর ভিত্তি করে সাহিত্য সাধনা করেছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী ধারার অপূর্ব সংযোজন ঘটিয়েছেন সুনিপুণভাবে। নজরুলের চিন্তাধারা ছিল ব্যাপক, যা তার সাহিত্যকর্মে প্রস্ফুটিত হয়েছে। তার চিন্তা-চেতনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে বিদ্রোহ। কিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ। তার সাহিত্যকর্মে বিদ্রোহী চেতনার পাশাপাশি প্রেমপ্রীতি, আনন্দ দুঃখ-বেদনাসহ সব মানবিক অনুভূতি স্থান পেয়েছে সমমর্যাদায়। তাই তার সাহিত্য বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় মহিমান্বিত, অপার সৌন্দর্যে সুশোভিত, অভিনব অলঙ্করণে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের পদচারণে অসাধারণ, যা বিস্ময়ের উদ্রেক করে, তার অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে অনবদ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে। বাংলা সাহিত্য চিরঋণী তার কাছে। যিনি জাগরণের প্রতীক হিসেবে বাঙালি জাতীয়তার মন্ত্রদাতা অগ্রদূত। যদি তার বিদ্রোহের দিকটা আলোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই তিনি বুলবুল, তার আকার অসাধারণ, কণ্ঠ সুমধুর। তিনি শুধু গান গেয়ে যান গানের পাখির মতো অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ নিপীড়ন ও মানব-বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তাই তার কবিতায় মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, অত্যাচারিতের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার বাণী ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে নির্ভেজাল নির্ভীক কণ্ঠে। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও যেকোনো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তার বিদ্রোহী কবিতার পেছনে যে দর্শন কাজ করেছিল, তা হলো- তিমির রাতকে বিদূরিত করে আলোকে উদ্ভাসিত নব প্রভাতের অরুণোদয় ঘটালো। পরাধীনতার জিঞ্জির ভেঙ্গে স্বাধীনতার মুক্তির বর্তা বয় আনতে তিনি প্রাণবন্ত কর্মী, সাধক ও ব্রতী। তাই নজরুলের কবিতা, গান ও প্রবন্ধে উচ্চারিত হয়েছে বিদ্রোহী মনোভাবের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। ১৯২৭ সালে এক সাহিত্য সভায় তিনি ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভন্ডামি আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।’

নজরুলের সাহিত্যে কঠোরতা আর কোমলতার অসাধারণ মিশ্রণ ঘটেছে। তার কাব্যে উচ্চারিত হয়েছে সাম্য আর মৈত্রীর বাণী। সমাজের উঁচু-নিচু সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সাহসী বিদ্রোহী। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামে এডুকেশন সোসাইটি আয়োজিত সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ধনীর ধন-দৌলতে, জ্ঞানীর জ্ঞান ভান্ডারে সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। আমার ক্ষুধার অন্নে তোমার অধিকার না থাকতে পারে, কিন্তু আমার উদ্বৃত্ত অর্থে তোমার নিশ্চয়ই অধিকার আছে।’ সর্বহারা অনাহারক্লিষ্ট মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম দরদ আর মমতার পরিচয় মাত্র একটি বাক্যে প্রকাশিত। এটি তার সাম্যবাদী ভাবধারা ও আদর্শের অপূর্ব নিদর্শন। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-প্রীতি, বিরহ-মিলন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। নজরুল তার জীবনে প্রেম-প্রীতি, সুখ-দুঃখকে গ্রহণ করতেন অন্তরের নিভৃত কোণে। তার সম্ভাবনাময় বুলবুলের মৃত্যু, নারগিসের প্রেম ও পরবর্তীতে বিরহ তার সাহিত্য সাধনায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে- যার প্রমাণ আমরা তার সাহিত্যকর্মে পাই।

জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ নজরুল ছিলেন জ্ঞানী। তার জ্ঞানের পরিধি ছিল বিশাল। তিনি তার ব্যতিক্রমধর্মী সাহিত্যে বহু ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। যা অন্যান্য সাহিত্যিকদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার সাহিত্যে উর্দু, ফার্সি, ইংরেজি, ল্যাটিন ইত্যাদি ভাষার শব্দ প্রয়োগের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। গ্রিক, ইংরেজি পারসিক, ফার্সি কবি, যেমন- কীটস, বায়রন, মিলটন, শেলি প্রমুখ কবির কবিতা অধ্যয়ন করে তিনি নিজেকে একজন অনন্য কবি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। আর তাই নজরুলের জাদুস্পর্শে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করে। নজরুল ছিলেন মুক্ত আর তারুণ্যে ভরা প্রাণদীপ্ত জীবন ধারণায় বিশ্বাসী। তিনি মনেপ্রাণে যৌবন তারুণ্যকে ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। তিনি তরুণদের জাগরণী মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। তরুণকে কবি ‘তিমির বিদারী’, ‘আলোর দেবতা’ বলে অভিহিত করেছেন। কবি তাই ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জের মুসলিম যুব সমাজের অভিনন্দনের উত্তরে তাদের উদ্দেশে যে প্রাণোচ্ছল ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি বলেন, ‘ধর্ম আমাদের ইসলাম কিন্তু প্রাণের ধর্ম আমাদের তারুণ্য।’ তিনি তারুণ্যকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে প্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সকল রক্ষণশীলতা, সংস্কারাচ্ছন্নতা, জড়তা, পশ্চাৎপদতাকে প্রতিহত করে নতুন করে জগৎ রচনার সাধনায় নিজেকে তিনি উৎসর্গ করেন। তার ভাষ্য, ‘আমাদের কবিদের বাণী বহে ক্ষীণভীরু ঝর্ণাধারার মতো। ছন্দের দুকূল প্রাণপণে আঁকড়িয়া ধরিয়া সে সংগীত গুঞ্জন করিতে করিতে বহিয়া যায়।’ তার কবিতা ছিল জ্বালাময়ী, তেজস্বী, সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামী প্রতিবাদ। তার সাহিত্য সকল প্রকার সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। তার কাজেকর্মে, সাহিত্য কখনো ধর্মান্ধতা স্থান পায়নি। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী, তার সাহিত্য ছিল সাধারণ মানুষদের নিয়ে। ধর্মের নামে ব্যবসা করার মতো হীন প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি ধর্মকে সর্বান্তকরণে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। হীন স্বার্থবাদী ও ধর্মের অপব্যাখ্যা দানকারীদের তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন। তাই তিনি ফতোয়াবাজি বা ধর্মের নামে সংকীর্ণতার বিষবাষ্প ছড়াতে নারাজ ছিলেন। নজরুল সর্বকালীন, সর্বজাতিক কবি। তার সাহিত্যে ধর্মীয় চেতনাবোধ সমুজ্জ্বল। তিনি সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণমাত্রায় আস্থা রাখতেন। তার কবিতা নাস্তিকতা, নিরীশ্বরবাদী ভাবধারা থেকে বহির্ভূত। তাই তো তিনি বলেন, ‘আমার কবিতা আমার শক্তি নয়, আল্লাহ দেওয়া শক্তি, আমি উপলক্ষ মাত্র।’

নিঃসন্দেহে এবং সংশয়হীনভাবে বলা যায়, নজরুল আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতোই নজরুলের আবির্ভাব। অনিরুদ্ধ প্রতিভার ঝলকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সচেতনতার এক অভিনব চমক লাগানো জাদুকর। তিনি নব দিগন্তের বাণী উচ্চারণ করেছিলেন বিভিন্ন ভঙ্গিমায়। বাল্যকালে ও কৈশোরে নজরুল ছিলেন বিশ্ববিদ্রোহী চাঞ্চল্য চাতুর্যের প্রতীক। নিত্যদিন তিনি গড়েছিলেন শব্দের তাজমহল। তার শব্দ চয়ন ও প্রয়োগ ঝংকারে বিশাল হিমালয়ও নতশির। তার চোখে জ্বলে জ্ঞানের মশাল, বুকে সঞ্চিত শব্দভান্ডার, তার কণ্ঠে কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের আহ্বান। এমন ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের সমাহার দুর্লভ, তার এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশারী আর অন্য হাতে রণতূর্য, তারই সঙ্গে সৌন্দর্যের অনাবিল সুষমা একাকার। ধূমকেতুর প্রদীপ্ত শিখায় তার সাহিত্য ঝলমল, রঙধনুর রঙিন রশ্মির মতো আলোকোজ্জ্বল। তিনি দুঃসাহসী চিরবিদ্রোহী বীর। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ও মহাকালের পাতায় নজরুলের নাম চিরস্মরণীয়। তার সাহিত্য শিল্প সত্য, সার্থক মানবতার কল্যাণে অবিনাশী-অনির্বাণ চেতনার ধারক। যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াবার শক্তি পাই। হে উদ্বাস্তু মানব, তোমাদের পাশে আমরা আছি এবং থাকব।- নয়াদিগন্ত।