বৃহস্পতিবার, ২৩শে মে, ২০১৯ ইং, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

নজরুল কাব্যে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব

পোস্ট হয়েছে: মে ২৫, ২০১৭ 

news-image

মুজতাহিদ ফারুকী: কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বাংলা সাহিত্যে এক অনন্যসাধারণ কালজয়ী প্রতিভা। আবহমান বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতা ও সংগীত রচনায় নজরুল সাহিত্য এমনই এক স্মরণীয় সংযোজন যা বাংলা সাহিত্যকে এবং বিশেষত তার কবিতা ও গানকে স্বাদে, সৌরভে, বৈশিষ্ট্যে ও বৈভবে বৈপ্লবিক মাধুর্য ও কালোত্তীর্ণ মহিমা দান করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম এক বহুমাত্রিক বিপ্লবী প্রতিভা। এই বিপ্লব তাঁর সাহিত্য সাধনায়, কর্মজীবনে ও জীবন-সংগ্রামে।

নজরুল বাংলা কাব্য-সাহিত্যে প্রবেশ করেন যখন মধ্যাহ্ন মার্তণ্ডের মতন বাঙালির সাহিত্য ও কাব্যে রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববিজয়িনী প্রতিভা সমস্ত দিক, সমস্ত আকাশ, সমস্ত সাহিত্যিক চেতনাকে পরিব্যাপ্ত করে ছিল। সেই সর্বগ্রাসী রবীন্দ্রপ্রভাববলয়ের বাইরে গিয়ে নিজে স্বতন্ত্র সূর্য-প্রতিভা হয়ে উঠতে পারাই নজরুলের অনন্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব।

সব কবির মতোই নজরুল সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এবং বৈশ্বিক চিন্তা-চেতনার আলোয় আলোকিত হয়েছেন। গ্রহণ-বর্জনের ধারায় নিজেকে করেছেন সমৃদ্ধ। তাঁর মধ্যে নিজ ধর্ম ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী, সুফিবাদী চিন্তাধারা যেমন মূর্ত হয়ে উঠেছে তেমনই প্রতিবেশী হিন্দুধর্ম ও দর্শনের প্রভাবও সমানভাবে দ্রষ্টব্য। তিনি একাধারে যেমন ইসলামি সংগীত রচনা করেছেন তেমনই শ্যামা সংগীতও রচনা করেছেন। সেইসঙ্গে ফারসি সাহিত্য বিশেষ করে মহাকবি হাফিজ এবং ওমর খৈয়াম তাঁকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। এই প্রভাব কখনও দার্শনিক চিন্তায়, কখনও কাব্যের অলংকারে, চিত্রকল্পে বা ছন্দের কারুকাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

কবি নজরুলের কাব্যে ফারসি সাহিত্যের এবং বিশেষ করে সুফিবাদের কী প্রভাব পড়েছে সেটি আমরা নানা উদ্ধৃতির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

মহাকবি হাফিজের সঙ্গে নজরুলের কালগত ব্যবধান কয়েক শতাব্দীর। তবে উপমহাদেশে ফারসি ভাষা প্রচলনের সুবাদে হাফিজ তাঁর সমকালেই বাংলায় ব্যাপক পরিচিত ছিলেন ফারসি সাহিত্যের অমর কবি হিসেবে। হাফিজকে বাংলায় পরিণত ঐশ্বর্য সম্পদে রূপান্তর করেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে নজরুল নিজেই বলেন-

‘আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে আজ ইংরেজি ১৯১৭ সালের কথা। সেইখানে প্রথম আমার হাফিজের সাথে পরিচয় হয়। আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন পাঞ্জাবী মৌলবী সাহেব থাকতেন। একদিন তিনি দীওয়ান-ই-হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। শুনে আমি এমনই মুগ্ধ হয়ে যাই যে, সেইদিন থেকেই তাঁর কাছে ফার্সি ভাষা শিখতে আরম্ভ করি। তাঁরই কাছে ক্রমে ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত কাব্যই পড়ে ফেলি।

তখন থেকেই আমার হাফিজের ‘দীওয়ান’ অনুবাদের ইচ্ছা হয়। কিন্তু তখনো কবিতা লিখবার মত যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। এর বৎসর কয়েক পরে হাফিজের দীওয়ান অনুবাদ আরম্ভ করি। অবশ্য তাঁর রুবাইয়াৎ নয়- গজল। বিভিন্ন  মাসিক পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছিলো।’

‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ নজরুল ইসলাম অনূদিত বাংলা ভাষায় বহুল প্রচারিত ও পঠিত একমাত্র সফল অনুবাদ কাব্য। পারস্যের মরমি কবি হাফিজকে জানতে হলে বাংলা ভাষাভাষী পাঠককের জন্য ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ অবশ্যই পড়া দরকার যা একটি সংক্ষিপ্তাকারের পরিপূর্ণ গ্রন্থ।

নজরুল ইসলাম শুধু পারস্যের মহাকবি হাফিজই নন, অন্যান্য কবির অমর কাব্যমহিমা দ্বারাও বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তার অপর অমর দৃষ্টান্ত নজরুলের ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’। কবি অসুস্থ হওয়ার ১৬ বছর পর ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

পারস্যের এই দুই মহাকবিই নজরুল ইসলামকে বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁদের মনন-মেধা, সুর-চেতনা দ্বারা নজরুল এতটাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁর অনেক গজল-গানে, ধর্মীয় আধ্যাত্মিক সংগীতে তাঁদের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ‘নজরুল-গীতিকা’, ‘সুর-সাকী’, ‘জুলফিকার’, ‘বন-গীতি’, ‘গুল-বাগিচা’, ‘গীতি শতদল’ ও ‘গানের মালা’র অনেক কবিতা-গানে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব লক্ষণীয়। ‘নজরুল গীতিকা’তে তো ‘ওমর খৈয়াম-গীতি’ ও ‘দীওয়ান-ই-হাফিজ-গীতি’ নামে আটটি করে কবিতা গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, ফারসি সাহিত্য তথা পারস্যের মহাকবি হাফিজ দ্বারা নজরুল কতটা অনুপ্রাণিত ছিলেন!

বহুমুখী প্রতিভার দৃষ্টান্ত দিতে বলা হলে বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাসে যাঁদের নাম উপেক্ষা করা কঠিন ওমর খৈয়াম তাঁদের অন্যতম ও শীর্ষস্থানীয়। ফারসি কাব্য-জগতে ওমর খৈয়াম এক বিশেষ চিন্তাধারা ও বিশ্বদৃষ্টির পথিকৃৎ। তিনি জীবন এবং জগতের ও পারলৌকিক জীবনের রহস্য বা দর্শন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এসব প্রশ্ন শুধু তাঁর মনেই নয়, যুগে যুগে জ্ঞান-তৃষ্ণার্ত বা অনুসন্ধানী মানুষের মনের প্রশান্ত সাগরেও তুলেছে অশান্ত ঝড়। দার্শনিকরা এ ধরনের প্রশ্নই উত্থাপন করেছেন। দর্শনের যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু বোঝানো সম্ভব হলেও তারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। দর্শন বা বিজ্ঞান দিয়ে যে ভাব তুলে ধরা যায় না খৈয়াম তা কবিতার অবয়বে তুলে ধরতে চেয়েছেন। আর তাই যুক্তি ও আবেগের করুণ রসের প্রভাবে ওমর খৈয়ামের চার লাইনবিশিষ্ট কবিতাগুলো কবিতা জগতে হয়ে উঠেছে অনন্য।

ওমর খৈয়াম অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সংলাপ তুলে ধরেছেন তাঁর অনেক চতুষ্পদী কবিতায়। হওয়া বা সৃষ্টি, অতীতে বিরাজিত এবং মৃত্যু বোঝাতে তিনি মাটির কলসী বা পাত্র ও মাটিকে রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। আল্লাহকে জানতে হলে আগে নিজেকে জানা প্রয়োজন এমন ইসলামি বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-

‘বিশ্ব-দেখা জামশেদিয়া পেয়ালা খুঁজি জীবন-ভর

ফিরনু বৃথাই সাগর গিরি কান্তার বন আকাশ-ক্রোড়।

জানলাম শেষ জিজ্ঞাসিয়া দরবেশ এক মুর্শিদে

জামশেদের এই জাম-বাটি এই আমার দেহ আত্মা মোর।’

 

মহান আল্লাহর দয়া সম্পর্কে খৈয়াম প্রার্থনাসূচক রুবাইয়ে লিখেছেন-

‘দয়া যদি কৃপা তব সত্য যদি তুমি দয়াবান

কেন তবে তব স্বর্গে পাপী কভু নাহি পায় স্থান?

পাপীদেরই দয়া করা সেই তো দয়ার পরিচয়

পুণ্যফলে দয়া লাভ সে তো ঠিক দয়া তব নয়।’

 

আমরা দেখি বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুলও বলেছেন অনেকটা একই ধরনের কথা-

‘বিচার যদি করবে কেন রহমান নাম নিলে?

ঐ নামের গুণে তরে যাব কেন এ জ্ঞান দিলে?

…   …

রোজ হাশরে আল্লাহ আমার কোরো না বিচার।’

 

নজরুল ইসলামের ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যে তাঁর সুফি তত্ত্বজ্ঞানের গভীর পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়। ‘নতুন চাঁদ-এর ‘অভেদম্’ কবিতায় সুফি তত্ত্বের পরম পুরুষকে অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। কবিতাটির প্রথম স্তবক এরকম :

‘দেখিয়াছ সেই রূপের কুমারে, গড়িছে যে এই রূপ?

রূপে রূপে হয় রূপায়িত যিনি নিশ্চল নিশ্চুপ!

কেবলই রূপের আবরণে যিনি ঢাকিছেন নিজ কায়া

লুকাতে আপন মাধুরী যেজন কেবলি রচিছে মায়া!

সেই বহরূপী পরম একাকী এই সৃষ্টির মাঝে

নিষ্কাম হয়ে কিরূপে সতত রত অনন্ত কাজে।

পরম নিত্য হয়ে অনিত্য রূপ নিয়ে এই খেলা

বালুকার ঘর গড়িছে ভাঙিছে সকাল সন্ধ্যা বেলা।

আমরা সকলে খেলি তারই সাথে, তারই সাথে হাসি কাঁদি

তারই ইঙ্গিতে পরম ‘আমি’রে শত বন্ধনে বাঁধি।

মোরে ‘আমি’ ভেবে তারে স্বামী বলি দিবাযামী নামি উঠি,

কভু দেখি-আমি তুমি যে অভেদ, কভু প্রভু বলে ছুটি।’

সুফি দর্শনের এবং বৈষ্ণব রূপাভিব্যক্তির গভীরে প্রবেশ না করলে কারও পক্ষেই অভেদতত্ত্ব বর্ণনা করা সম্ভব নয়। প্রেমের লীলার মধ্য দিয়ে যেখানে পরম পিতা এবং মানুষ একীভূত হয়ে গেছে প্রেমের ব্যঞ্জনায় তারই একটি পরিচয় পাই নজরুলের কবিতায়। নজরুল ইসলাম সুফি রসতত্ত্ব এবং বৈষ্ণব রূপতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই ‘অভেদম্’ কবিতাটি লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে নজরুল ইসলাম উদাসী মানুষদের সান্নিধ্যে পেয়েছেন এবং তাদের গভীর ইচ্ছাকে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন।

‘নতুন চাঁদ’-এর আরেকটি কবিতায় সুফিতত্ত্বের গভীর ও প্রত্যক্ষ প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাটির নাম ‘আর কতদিন?’ এর দ্বিতীয় স্তবকটি উদ্ধৃত করছি :

‘আমি ছিনু পথ-ভিখারিনী, তুমি কেন পথ ভুলাইলে,

মুসাফির-খানা ভুলায়ে আনিলে কোন্ এই মঞ্জিলে?

মঞ্জিলে এনে দেখাইলে কার অপরূপ তস্বির,

‘তসবি’তে জপি যত তার নাম তত ঝরে আঁখি-নীর!

‘তশবিহি’ রূপ এই যদি তার ‘তনিজহি’ কিবা হয়,

নামে যার এত মধু ঝরে, তার রূপ কত মধুময়।

কোটি তারকার কীলক রুদ্ধ অম্বর-দ্বার খুলে

মনে হয় তার স্বর্ণ-জ্যোতি দুলে ওঠে কুতূহলে।

ঘুম-নাহি-আসা নিঝ্ঝুম নিশি-পবনের নিঃশ্বাসে

ফিরদৌস-আলা হতে যেন লালা ফুলের সুরভি আসে।

চামেলী জুঁই-এর পাখায় কে যেন শিয়রে বাতাস করে,

শ্রান্তি ভুলাতে কী যেন পিয়ায় চম্পা-পেয়ালা ভরে।’

নজরুল ইসলামের মধ্যে আমরা উপলব্ধির গভীরতা লক্ষ্য করি। তিনি আপন চৈতন্যে সুফি সাধনার মূল রসাবেশটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুফিতত্ত্ব খুব সহজবোধ্য জিনিস নয়, গভীর উপলব্ধি না থাকলে কোনো ব্যক্তিই সুফিদের ধ্যানলোক বা সমাধিকে আবিষ্কার করতে পারে না। সুফিরা বলে থাকেন যে, আপনাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তাঁরা মহাশক্তিকে স্পর্শ করেন। নজরুল ইসলাম বলছেন, এই পরম শক্তিই পৃথিবীতে প্রথম ঈদের চাঁদরূপে প্রকাশ পেয়েছিল। কথাটি রূপক। কবি বলতে চাচ্ছেন, প্রকৃতির যে লীলা-বৈচিত্র্য এবং আকাশের নক্ষত্র এবং সূর্য যেগুলো আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে, সেগুলোর মধ্য দিয়ে বিধাতা আত্মপ্রকাশ করেন। জীবন যাপনের দৃষ্টান্তের মধ্যে আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে কর্মময় জীবন দেখি। নজরুল ‘নতুন চাঁদ’-এর একটি কবিতায় ‘কেন জাগাইলি তোরা’-এর মধ্যে তার জাগরণের বক্তব্য তুলে ধরেছেন :

‘মহা সমাধির দিকহারা লোকে জানি না কোথায় ছিনু

আমরা খুঁজিতে সহসা সে কোন শক্তিরে পরশিনু-

সেই সে পরম শক্তিরে লয়ে আসিবার ছিল সাধ-

যে শক্তি লভি এল দুনিয়ায় প্রথম ঈদের চাঁদ-

তারি মাঝে কেন ঢাকঢোল লয়ে এলি সমাধির পাশে

ভাঙাইলি ঘুম? চাঁদ যে এখনো ওঠেনি নীল আকাশে।’

নজরুল বিশ্বাস করতেন সুফিবাদের উদ্ভব হয়েছিল ইসলামের মহানবীর নবুওয়াত প্রাপ্তির সঙ্গে-সঙ্গেই। কেননা, তাঁর একটি জনপ্রিয় গানে নজরুল বলেছেন :

‘হেরা হতে হেলেদুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়

সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়

সে যে আমার কামলিওয়ালা।’

যিনি হেরা পর্বতের গুহা থেকে হেলেদুলে নেমে আসছেন, অর্থাৎ ইসলামের নবী- তিনি একজন কামলিওয়ালা অর্থাৎ সুফি। তা হলে বোঝা যায় নজরুলের চিন্তায় সুফিবাদের উদ্ভব ইসলামের মহানবীর নবুওয়াত প্রাপ্তির সঙ্গে-সঙ্গেই। অনেক ইসলামি চিন্তাবিদই অবশ্য এমনটি ভেবেছিলেন।

নজরুলের কবিতায় ফারসি সাহিত্যের প্রভাব প্রসঙ্গে আলোচনায় আরেকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘নজরুলের কবিতায় ফরাসি কবিতার প্রভাবের কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টির উল্লেখ করতে হবে, সেটি ফারসি কবিতার কার্লাড ইমেজ বা রঙিন চিত্রকল্পের কথা। নজরুলের কবিতায় এই রঙিন চিত্রকল্পের রূপ দেখা যায়।’ যেমন-

‘নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া!

আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।” (মোহররম)

অথবা

‘লাটে তোমার ভাস্বর টীকা

বস্রা গুলের বহ্নিতে লিখা;

এ যে বসোরার খুন-খারাবী গো রক্ত গোলাপ মঞ্জুরীর।’ (শাত-ইল-আরব)

নজরুল তাঁর এই রঙিন চিত্রকল্পের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে বা গীতিকবিতায়। হাফিজ বা ওমর খৈয়ামের চিত্রকল্পময় রুবাইয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লেই নজরুলের চিত্রকল্পের অনন্য বৈশিষ্ট্য সহজে বোধগম্য হয়ে ওঠে।

কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বিদ্রোহের কবি, তেমনি প্রেমের কবি, ব্যথিতের কবি, প্রকৃতির কবি, দার্শনিক কবি এবং সাধক কবি। তাঁর কলম যেমন প্রতিবাদের ভাষায় মুখর ছিল, তেমনি প্রেমের কথাও বলেছে অত্যন্ত সার্থকভাবে। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহ যেমন টগবগে দুলদুলের মতো হয়েছে আগুয়ান, প্রেমও তেমন ¯স্নিগ্ধ রূপ পেয়েছে, প্রকৃতি হয়েছে জীবন্ত আর সুফির শুদ্ধ উচ্চারণ পেয়েছে পরিপূর্ণতা।

কাজী নজরুল যেমন পারদর্শী ছিলেন দ্রোহে-প্রেমে তেমনই সার্থক ছিলেন তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে সুফি ভাবধারাকে জীবন্তরূপে উপস্থাপনে।

(এই নিবন্ধ তৈরিতে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের অনলাইন সংস্করণ ও ব্লগে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রবন্ধ ও নিবন্ধের সহায়তা নেয়া হয়েছে।)