রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

নওরোজ : উৎসবের রঙিন দুয়ার

পোস্ট হয়েছে: মে ১৪, ২০১৮ 

মুমিত আল রশিদ: ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত ইরান ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পারস্য, র্পাস বা র্ফাস নামেই অভিহিত হতো। পাহলাভি শাসনামল (১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ-১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) থেকে ইরান নামধারণ করে। ইরান নামটি অ্যারিয়ান (আর্য জাতি) শব্দ থেকে আগত। একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি গুটিকতক জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব প্রাচীন সংস্কৃতিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি আর উগ্রবাদের হিংস্র ছোবল থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে ইরান তাদের অগ্রভাগে অবস্থান করছে। সমৃদ্ধ এক উৎসবকে তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছে হাজার হাজার বছর ধরে। এমনি একটি উৎসব নওরোজ বা নববর্ষ।
২১ মার্চ থেকে শুরু হয় ইরানি জনগণের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘নওরোজ’ (নববর্ষ)। ঐতিহ্যবাহী, পবিত্র, উপচেপড়া আনন্দ, উৎফুল্ল জীবন্ত ও প্রকৃতপক্ষে সর্বাপেক্ষা অলংকৃত এবং ইরানিয়ান জনগণের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত এই উৎসব। নওরোজ উৎসবটি সর্বপ্রথম উত্তর ইরান, উত্তর-পূর্বে অবস্থানকারী আর্য জাতি এবং পূর্ব ইরানে অবস্থানকারী এই অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন অধিবাসীদের দ্বারা প্রচলনের খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে ইরানিয়ান, খাওয়ারেযমি, সোগদি ও ইন্দো-ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ইরানে গ্রীষ্মকালের প্রথম দিনে নওরোজ উৎসব শুরু হতো। আবু রায়হান আল বেরুনি তাঁর বিখ্যাত বই ‘অসারুল বাকিয়্যাহ’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বিখ্যাত পারস্য লেখক তাকি যাদেহ মাদ রাজত্বকালে (৭০৮ খ্রিস্টপূর্ব-৫৫০/৫২৯ খ্রিস্টপূর্ব) বাবেল বা বর্তমান ইরাক, তুরস্ক, আযারবাইজান, আফগানিস্তান ও বর্তমান ইরানসহ এতদঞ্চলে তিনটি ঈদ পালনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন : ঈদে নওর্সাদ (নওরোজ উৎসব), তার ইয়াস কাই (তিরগান বা গ্রীষ্মকালীন উৎসব) এবং মেহরানকাই (হেমন্তকালীন উৎসব)। তবে নওরোজ উৎসবটি অভিজাত, জাঁকজমকপূর্ণ ও চাকচিক্যময় আকার ধারণ করে হাখামানশি রাজত্বকালে (৫৫২ খ্রিস্টপূর্ব-৩৩০/৩২৭ খ্রিস্টপূর্ব)। ফরাসি লেখক রোমান গ্রিস্ম্যান (জড়সধহ এযরৎংযসধহ) তাঁর বই ‘হোনারে ইরান দার দোওরে মাদ ও হাখামানশি’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘তাখ্তে জামশিদ (পারসেপলিস) নামক বিখ্যাত মহলটি তৈরি হয়েছিল শুধু নওরোজ উৎসবটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালনের জন্য! যেহেতু হাখামানশি সাম্রাজ্য তৎকালীন দুনিয়ার সর্ববৃহৎ রাজ্য ছিল, তাই নওরোজ উৎসবে শামিল হতে সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধিগণ ঐ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ উপঢৌকনসহ এই মহলে হাজির হতেন। অধিকাংশ লেখক নওরোজ-এর উৎপত্তিকাল তারিখ গণনাপূর্ব সময়ের ইরান তথা সমগ্র বিশ্বে রূপকথার যুগ বা পিশদাদইয়ান রাজত্বের চতুর্থ রাজা জামশিদের সময় বলে উল্লেখ করেছেন। মহাকবি ফেরদৌসী প্রথম কোনো ইরানি ব্যক্তি যিনি তাঁর বিখ্যাত বীরত্বগাথা ‘শাহনামা’-তে নওরোজকে পরিচিত করেছেন এবং বাদশাহ জামশিদের সময় উৎসবমুখর নওরোজের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে অনেকে নওরোজকে জরাথ্রুস্ট ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে চাইলেও জরাথ্রুস্টীয় ধর্মগ্রন্থ ‘আভেস্তা’ এ বিষয়ে পুরোপুরি নীরব! কেননা, হাখামানশি রাজা-বাদশাহগণ জরাথ্রস্টীয় ধর্ম বা আভেস্তা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না এবং কেরমানশাহ প্রদেশের জাগরোস পর্বতের কুহে বিসতুনের গায়ে রাজা দারিয়ুসের উৎকীর্ণ লিপিতে তাদের প্রভু হিসেবে আওরমাযদাকে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীকালে অনেকেই আওরমাযদাকে জরাথ্রুস্টীয় প্রভু আহুরামাযদা লিখেছেন যা সঠিক নয়। কেননা, হাখাশানশিগণ তাদের দেহ মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের চূড়ায় স্বাধীনভাবে রেখে দিয়েছেন। এছাড়া হাখামানশিগণ পশু কোরবানি করতেন ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করতেন যা জরাথ্রুস্টীয় ধর্মের পুরোপুরি বিপরীত দিকে অবস্থান। যদিও পরবর্তীকালে বেশ কিছু জরাথ্রুস্টীয় রীতিনীতি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নওরোজ উৎসবে, যা নওরোজকে জাঁকজমকপূর্ণ আকার দিয়েছে। তবে ইরানের প্রতিটি শাসনামলই কিন্তু নওরোজকে মহিমান্বিত করেছে, এমনকি ইরানে মুসলিম শাসনামলেও নওরোজ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবেই পালনের ইতহাস পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য যে, বর্তমানে প্রচলিত পারস্যবছর ২১ মার্চ থেকে শুরু হয় এবং এটি সৌরবর্ষ। সৌর ক্যালেন্ডারটি ১০৭৯ খ্রিস্টাব্দে সালজুকি বাদশাহ মালেক শাহ এর আমল থেকে প্রচলিত। ঐ সময় থেকেই নওরোজের প্রথম দিন বসন্তের প্রথম দিন বা ২১ মার্চ ধার্য করা হয়। বলা হয়ে থাকে এটি পৃথিবীর সবচাইতে নিখুঁত ক্যালেন্ডার। কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ৩২২৬ বছরে ১ দিন গড়মিল হয়ে থাকে, কিন্তু ওমর খৈয়াম প্রণীত এই সৌর ক্যালেন্ডারটি ১ লক্ষ ৪১ হাজার বছরে ১ দিন গড়মিল হয়ে থাকে। ওমর খৈয়াম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এর মূল কারণ হলো সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নতুন বছরের সূচনা। যা ঠবৎহধষ ঊয়ঁরহড়ী (২১ মার্চ/মহাবিষুব) জ্যোতির্বিজ্ঞান স্থির করে দিয়েছে। এটি প্রতি ৪ বছরে একবার ৩৬৬ দিনে ১ বছর, এছাড়া অন্য সব বছর ৩৬৫ দিনে স্থির রয়েছে।
নববর্ষ শুরুর আগের বুধবার (মঙ্গলবার দিবাগত রাত) একটি উৎসব পালিত হয়, ফারসিতে যাকে বলা হয় চাহার শাম্বে সুরি। এটি বিশেষ কিছু সুনির্দিষ্ট রীতি-নীতি ও উৎসবের মাধ্যমে পালিত হয়। এটি ইরানের প্রাচীন উৎসবগুলোর অন্যতম যা পালনের ইতিহাস ইসলামপূর্ব সময় থেকে নিহিত এবং এটি জাতীয় উৎসব হিসেবে পরিগণিত হতো। অবাক হয়ে দেখলাম তেহরানের আকাশে উড়ছে হাজার হাজার ফানুস! এই দিনে অবিবাহিত যুবক-যুবতীরা অতি দ্রুত বিবাহের ইচ্ছাপোষণ করে ফানুস উড়িয়ে থাকে। প্রায় প্রতিটি অলিতে-গলিতে হরেকরকম আতশবাজি ফুটানো হচ্ছে। আতশবাজিগুলোর নামগুলোও দারুণ! ফেশফেশে, নরাঞ্জাকে দাস্তি, তারাক্কে, পচে খিযাক ইত্যাদি। রাস্তার দু’পাশে অবাধে বিক্রি হচ্ছে এই সব আতসবাজি! ২১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া বসন্তের প্রথম দিন তাদের নববর্ষের প্রথম দিন। ইরানের প্রাচীন আমলে প্রবর্তিত এই উৎসবটি এখনও ইরানের মূল উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ছে শপিং মলগুলোতে উপচেপড়া ভিড়, দোকানপাট সারারাত খোলা, সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত!
নতুন বছর শুরুর কয়েক দিন পূর্ব থেকেই বাড়িঘরগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, পুরাতন আসবাবপত্রগুলো ফেলে দিয়ে নতুন আসবাবপত্র দিয়ে ঘর সাজানো হয়। ফারসিতে যাকে বলা হয় খুনে তেক্কুনি (কথ্য ভাষায় খুনে বা ঘর, তেক্কুনি বা নাড়াচাড়া।) নববর্ষের দিন ছোট-বড় সকলে নতুন জামা পরিধান করে দাদা বা নানা বাড়িতে বেড়াতে যাবেন, বড়রা ছোটদের সেলামি দিবেন।
বাঙালির ১লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা ও পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির মতোই ইরানি নববর্ষের প্রথম প্রহরে ইরানিরা ‘হাফ্ত সিন’ বা ফারসি অক্ষর ‘সিন’ দ্বারা গঠিত সাতটি শব্দের সমারোহ ঘটান তাঁদের টেবিলে। যেমন : সাবযে (সবজি), সিব (আপেল), সেরকে (সিরকা), সামানু (গম বা যব দ্বারা তৈরি হালুয়া), সোমাক (একধরনের টকজাতীয় ফল, যেগুলো দেখতে মশুর ডালের চাইতে একটু বড়), সেজ্ঞেদ (একধরনের লাল ও কমলা রঙের ফল, যেগুলো দেখতে ছোট বরইয়ের মতো), সেক্কে (ধাতব কয়েন) এবং সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন। এগুলোর প্রত্যেকটির অভ্যন্তরে এক একটি পারিভাষিক অর্থ বিরাজমান রয়েছে, যেমন : পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী চিত্র। এছাড়াও ডিম, মাছের উপস্থিতিও হাফ্ত সিনে দেখা যায়। ধর্মীয় গোঁড়ামি আর ধর্মের নামে সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে এ জাতির ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলা বিস্ময়করও বটে।
নববর্ষের ১৩তম দিনে ইরানের প্রতিটি পরিবার বাড়ির বাইরে অবস্থান করবেন। এদিনটিকে তাঁরা বলেন ‘সিজদাহ বেদার’ বা ১৩ সংখ্যা জাগ্রত করার দিন। তাঁরা ১৩ সংখ্যাটিকে অপয়া মনে করেন, আর এ কারণেই এ উৎসবটি পালনের মাধ্যমে সারা বছরের সকল ১৩ সংখ্যাটিকে সৌভাগ্যবান করার একটি প্রয়াসমাত্র! নওরোজ উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় দীর্ঘ ১৫ দিন তারা আনন্দে মেতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস থেকে শুরু করে অফিস আদালত প্রায় সবখানেই দীর্ঘ ছুটির আমেজ লক্ষ্য করা যায়। এইসময় ইরানি জনগণ বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণ ও বাড়ির বাইরে থাকতে অধিক পছন্দ করেন। রাস্তায়, পার্কে, নদীর কিনারায় বা মহাসড়কগুলোতে তাঁবু টাঙ্গিয়ে অবস্থান করেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত নিখুঁত ও চোখে পড়ার মতোই!
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে সরকারিভাবে বছরের প্রথম দিন বসন্ত ঋতু দিয়ে শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং মাসগুলোকে প্রাচীন আমলের আদলেই স্থির করে দেওয়া হয়েছে ও বছরের প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনে, মাঝের ৫ মাস ৩০ দিনে এবং সর্বশেষ মাস ২৯ দিনে স্থির করে দেওয়া হয়েছে।
এভাবেই অতীতের পারস্য আর বর্তমান দুনিয়ার বিস্ময় ইরান এগিয়ে চলেছে তার আপন শক্তিতে, আপন মহিমায়, আপন সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে। বেঁচে থাকুক ইরানের আবহমান কাল ধরে প্রচলিত এই বর্ণাঢ্য উৎসব!
লেখক : পিএইচডি গবেষক, সহকারী অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়