শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

নওরোজ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির বাণী

পোস্ট হয়েছে: মে ১৬, ২০১৭ 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরূদ রাসূলুল্লাহ (সা.), তাঁর বংশধর ও তাঁর সাহাবিগণের প্রতি।
আনন্দঘন নওরোজ উপলক্ষে মহান ইরানি জাতি, দেশের বাইরে অবস্থানরত ইরানি নাগরিক এবং এতদঞ্চলের সেসব জাতি, যাঁরা নওরোজ পালন করেন, শহীদদের পরিবারবর্গ, যুদ্ধাহত, আত্মত্যাগী, যুদ্ধফেরত ও মুক্তিপ্রাপ্ত! আপনাদের সবার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা, মোবারকবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। বিশেষ করে যাঁরা এ মুহূর্তে জনগণ ও সমাজের খেদমতে, সীমান্ত প্রহরায়, চিকিৎসা সেবায় ও ত্রাণ তৎপরতা ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকার কারণে যে মুহূর্তে আপন আপন পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছে থাকার কথা, সে মুহূর্তে দেশ ও জাতির খেদমতে নিয়োজিত, সেসব প্রিয়জনদের প্রতি ঈদ মোবারক জানাচ্ছি।

এ বছরের ঈদে নওরোজ বিশেষ বরকতপূর্ণ। কারণ, এ বছর পূত-পবিত্রা হযরত ফাতেমা আতহার (আলাইহাস সালাম) এর পবিত্র জন্মদিন একই সময়ে হওয়ায় তার সাথে আসমানি রহমত ও খোদায়ী বরকতের সংযোগ হয়েছে। ইনশাআল্লাহ বছরের শেষ পর্যন্ত সহমর্মিতা, একতা, একাত্মতার বন্ধনে, চেষ্টা ও কর্মতৎপরতার ছায়াতলে আমাদের প্রিয় দেশকে উন্নতশির রাখার পথে আমাদের পদযাত্রা অব্যাহত রাখব।

আমাদের কাছে নওরোজের বার্তা হলো, হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার বার্তা। নওরোজের বার্তা আমাদের জন্য বিকশিত হওয়া ও প্রাণ উচ্ছ্বলতার বার্তা। এই বছরটিতে, যে বছর বীরত্বের বছর, নির্বাচনের বছর; এ বছর অতীতের বছরগুলোর চেয়ে অধিক হারে নওরোজ ও প্রকৃতি থেকে প্রাণ উচ্ছ্বলতা, সহমর্মিতা ও বিকশিত হওয়ার শিক্ষা আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

১৩৯৫ (ফারসি) সাল ছিল ‘প্রতিরোধ, পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক অর্থনীতির বছর। একইভাবে তা পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নের বছর। এই দু’টি উপলক্ষ একে অপরের পাশাপাশি আমাদের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে।

আমি এখানে প্রিয় কৃষক ভাইদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো কর্তব্য মনে করছি, যাঁরা কৃষি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবং গম উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের গর্বিত করেছেন এবং সমগ্র জাতিকে আনন্দিত করেছেন। আর নিজেদের খাবার দস্তরখানের জন্যও অধিক বরকত বয়ে এনেছেন। আপনাদের চেষ্টার কারণে, গমসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রি করার কারণে সরকার গম ক্রয় খাতে ১৫ হাজার বিলিয়ন তুমান (ইরানি মুদ্রা) প্রিয় কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করেছে।

প্রিয় শ্রমিক, শিল্প নির্মাতাগণ, আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে, আমাদের শিল্প উৎপাদনে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। কোনো কোনো পণ্যে আমরা গেল বছরের চেয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি। ব্যাংকসমূহের প্রচেষ্টায় ২৪ হাজার অর্ধ সমাপ্ত শিল্প ইউনিট অথবা চালু ছিল না এমন অনেক ইউনিট আলহামদু লিল্লাহ সচল হয়েছে। আর এটি প্রতিরোধের অর্থনীতির বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রমাণ বহন করে।

আমি তেল শিল্পের ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে, তাঁদের বিস্ময়কর চেষ্টা ও উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁরা তেল ও তরল গ্যাস উৎপাদন দ্বিগুণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

আমরা তেল কূটনীতির মাধ্যমে প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের প্রচেষ্টায় তেল ও তরল গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের পূর্বের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এটি আমাদের অধিকার আদায় করার শামিল।

এসব প্রচেষ্টার পাশাপাশি মহামান্য রাহবরের পক্ষ হতে ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিশ বছরের অর্থনৈতিক লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করে যে নির্দেশনামা দেয়া হয়েছিল, ১১ বছর পর গেল বছর আমরা সেই ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষমাত্রায় উপনীত হতে সক্ষম হয়েছি।

আমি এখানে চিকিৎসক সমাজ ও নার্সদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে, আপনারা চিকিৎসা সেবাকে শহরের বাইরেও নিয়ে গেছেন। আমাদের জনগণ বর্তমানে খুব অল্প খরচে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছে।

শিক্ষক সমাজ, বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকবৃন্দ ও জ্ঞানীগুণি মহল, যাঁরা আমাদের গর্বের প্রতীক, আপনাদের প্রচেষ্টায় আমরা সকল দেশের মধ্যে প্রাগ্রসর হয়ে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে উন্নত সকল দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছি। আমি আপনাদের প্রতি প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আপনারা যাঁরা শরীরচর্চার অঙ্গনে আছেন এবং যাঁরা শিল্পী, আপনারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও দেশের অভ্যন্তরে নিজ নিজ প্রচেষ্টায় জাতীয় জীবনে যে গৌরব বয়ে এনেছেন, তার জন্য আপনাদের প্রতি আমি মোবারকবাদ জানাচ্ছি। নারীর প্রতিও, একজন নারী যিনি অলিম্পিকে পদক অর্জন করেছেন তার জন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

এসবকিছুই ছিল ১৩৯৫ সালে (ফারসি সাল) আমাদের জনগণের জন্য আনন্দের উপলক্ষ।

অবশ্য ১৩৯৫ সালে আমাদের অপূর্ণতা, তিক্ততা ও সমস্যা অনেক ছিল। ট্রেন দুর্ঘটনা, প্লাস্কো ভবনে অগ্নিকা-, কোনো কোনো প্রদেশে ধূলিঝড়, বন্যা এবং কয়েকটি অঞ্চলের প্রিয় জনগণকে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে আর বিপ্লবের দীর্ঘদিনের বন্ধু আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানির ইন্তেকাল প্রভৃতি এর মধ্যে শামিল। তবে আপনারা জনগণ তার ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছেন। আপনারা সর্বত্র আপনাদের উপস্থিতির স্বাক্ষর রেখেছেন। আপনাদের সহমর্মিতা ও একাত্মতা এবং জানাযা অনুষ্ঠানসমূহে আপনাদের বীরত্বপূর্ণ উপস্থিতির মাধ্যমে আপনারা দুঃখ ও বেদনা দূর করতে সক্ষম হয়েছেন। আমাদেরকে একে অপরের দুঃখের সাথি হতে হবে। একে অপরের পাশে থাকতে হবে, যাতে উন্নতশির ইরানকে চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হই।

নতুন বছর হবে আমাদের প্রিয় জাতির জন্য অধিকতর অগ্রগতির বছর। আগামী বছর হবে আমাদের যুবকদের জন্য অধিকতর কর্মসংস্থানের বছর। আমাদেরকে আরো বেশি চেষ্টা চালাতে হবে। আমাদের অপূর্ণতাগুলো পুষিয়ে নিতে হবে।

গেল বছর মুদ্রাস্ফীতি রোধ করার জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে যাকিছু আমরা অর্জন করেছি, তা গত ২৫ বছরে নজিরবিহীন ছিল। আমাদেরকে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দ্বারা তা অব্যাহত রাখতে হবে।

আমরা গেল তিন বছরে ১১তম সরকারের আমলে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বেতন ভাতা বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে বেশি হারে নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছি। এর অর্থ এই যে, মানুষ অধিকতর শান্তি ও সুখী জীবন উপভোগ করতে পারবেন।

১৩৯৫ সালে যেমন তেমনি ১৩৯৪ সালেও আমাদের তেল-বহির্ভূত রফতানির পরিমাণ আমাদের আমদানির চেয়ে বেশি ছিল। এখানে আমাদের সকল উদ্যোক্তা ও সকল রফতানিকারকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত মনে করছি। কারণ, তাঁরা আমাদের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন, এখনো আনছেন। আমাদেরকে এই পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে।

আগামী বছর আমাদের জনগণ সাইবার স্পেসকে জ্ঞানচর্চা, তথ্য সরবরাহ, আয় উপার্জন ও কর্মসংস্থান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আরো বেশি কাজে লাগাতে পারবেন। এটি ছিল ১১তম সরকারের উদাহরণ দেয়ার মতো একটি প্রচেষ্টা। আমরা এই পথচলা অব্যাহত রাখব।

যেভাবে ওয়াদা করা হয়েছিল সেভাবে গত বছর নাগরিক অধিকারের সনদ প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছর আপনাদের সহযোগিতায় সে সনদ কার্যকর ও বাস্তবে পরিণত করতে হবে। মানুষের সম্মানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। মানবমর্যাদার প্রতি সবাই যেন যত্নবান হই সে দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

নতুন বছর হবে পরিবহনের উন্নয়নের বছর। রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। আমরা পাঁচটি প্রদেশকে রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসব। আকাশ পথে পরিবহন ও নৌপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। আর বিভিন্ন দেশের সাথে ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রেও।

নতুন বছরে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আমাদের সামনে রয়েছে। তাতে আমাদের উপস্থিতি অর্থবহ করার জন্য আমাদের সবাইকে চেষ্টা চালাতে হবে। আমরা সবাই যেন সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ, সুস্থ প্রতিযোগিতা ও আইনসঙ্গত নির্বাচনের বিষয়টিকে সামনে রেখে কাজ করে যাই।

আশা করি, আমাদের প্রিয় দেশ এই নতুন বছরে এবং আগামী বছরগুলোতে বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। ইরানের প্রিয় ও উন্নতশির জনগণ অধিকতর ঐক্য, সংহতির মাধ্যমে এবং আরো অধিক অর্থনৈতিক উৎকর্ষ নিয়ে তাঁদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে পারবে।

জাতির সেবকগণ আরো অধিকহারে জনগণের খেদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবেন।

ওয়াস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
[সংক্ষেপিত]