মঙ্গলবার, ১৮ই জুন, ২০১৯ ইং, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ঢাকায় ইরানি নওরোয ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন ( ভিডিও )

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ১২, ২০১৯ 

news-image

ইরানি নওরোয (নববর্ষ) ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে ১২ এপ্রিল, ২০১৯, বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাযেম কাহদুয়ী ও বিশিষ্ট নাট্য পরিচালক অভিনেতা জনাব মামুনুর রশিদ। 

সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব লিয়াকত আলী লাকী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি দুটি নববর্ষ একত্রে পালিত হওয়ায় সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ইরানের পাশাপাশি এই উৎসব আজ মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে তুরস্ক, ইরাক, ভারত উপমহাদেশ এবং উত্তর আফ্রিকাসহ বিশ্বের আরো অনেক অঞ্চলে তাদের নিজস্ব আচার পদ্ধতিতে উদ্যাপিত হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, ইরানি সাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ, তারা মেধাসম্পন্ন জাতি। ইরানিরা সকল দেশের সাথে সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে চায়। আর বাংলাদেশও প্রতিটি দেশের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখায়। ইরানের যেমন সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে তেমনি বাংলাদেশেরও একটি বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি রয়েছে।
‘কারো সাথে বৈরিতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব’- এ আলোকে বাংলাদেশ সকল দেশের সাথে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিশ্বের সকল মানুষ যেন সুখ ও শান্তিতে থাকে এটিই আমাদের কামনা। সংস্কৃতিকে যদি আমরা লালন করতে পারি তবে মানবজাতি আরো সমৃদ্ধ হবে। 


তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের আবহমান গ্রামবাংলাকে মেলে ধরার চেষ্ট করে যাচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ এবং এদেশের নদ-নদীকে কেন্দ্র করে অসংখ্য সাহিত্য রচিত হয়েছে, সেহেতু এই নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নতুবা অনেক বড় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আমরা হারিয়ে ফেলব। তাই বাংলাদেশ সরকার নদী দখলমুক্ত ও দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং বেশ জোড়েশোরে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোন কার্যক্রম সফলতা লাভ করতে পারে না। তাই তিনি এ কার্যক্রমে সকলকে সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানের সভাপতি জনাব লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ইরানের সাথে বাংলাদেশের কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কই নয়; বরং দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যে বলেছেন, তিনি পৃথিবীতে অনেক ভাষা ও জাতি- গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছেন যাতে মানুষ পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পারে, সেই বাণীরই প্রতিফলন হচ্ছে ইরান-বাংলাদেশ সম্পর্ক। তিনি একজন মনীষীর বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, প্রাচ্যের দর্শন হলো মানবতার দর্শন। তাই যদি পৃথিবীকে রক্ষা করতে হয় তাহলে প্রাচ্যের লোকদেরকে দায়িত্ব দিতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে একই ধ্বনি ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান’। আমরা আমাদের সাহিত্যেও তেমনটিই দেখতে পাই। সুকান্ত মাত্র ২২ বছর জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁর কবিতার মধ্যে বলে গিয়েছেন যে, তিনি বিশ্বকে শিশুর বাসোপযোগী করে রেখে যেতে চান। প্রকৃতপক্ষে এটাই মানবতা ও শান্তির বার্তা যেখানে বলা হয়েছে, প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। মানবতাবাদী দর্শন নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। ইরান ও বাংলাদেশের জনগণ এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছে।


তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কেউ তার সমকক্ষ হোক তা কোনভাবেই চায় না। তারা ইসলামকে নানা ভাগে বিভক্ত করার জন্য অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কৌশল সম্পর্কে মুসলমানদেরকে সচেতন হতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। আর এই সংস্কৃতির বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে নদী। অনেক গান, কবিতা, নাটক প্রভৃতি তৈরি হয়েছে নদীকে ঘিরে। বর্তমান সরকার এ নদী উদ্ধারে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা প্রশংসনীয়। অন্যদিকে শিল্পের সকল শাখায় ইরান অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
জনাব মামুনুর রশীদ বলেন, ইরানি নওরোয ও বাংলা নববর্ষ একইসাথে পালিত হচ্ছে এটি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে দৃঢ়তর করার একটি ভালো সুযোগ। মার্চ মাসের শেষের দিকে ইরানি নওরোয আর এপ্রিলের মাঝামাঝি বাংলা নববর্ষ উদ্যাপিত হয়। বাংলা সন শুরু হয়েছিল মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে শকাব্দ বা ইংরেজি সন দিয়ে হচ্ছিল না। তাই বাংলা সনের প্রচলন ঘটে। বৈশাখ মাসে কৃষকরা ফসল তুলে খাজনা দিত। আর তাই এ মাসটিকে প্রথম মাস ধরে বাংলা সনের প্রচলন হয়। মোঘলদের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছুই পারস্য তথা ইরান থেকে পেয়েছি। 

আমরা বাংলায় প্রচুর শব্দ ব্যবহার করি যা মূলত ফারসি শব্দ। ফারসি সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে অনেকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। নজরুল অনেক গজল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ক্লাসিক পারস্য সাহিত্য ‘শাহনামা’ গুরুত্বের সাথে আমাদের সাহিত্যে স্থান লাভ করেছে। চলচ্চিত্র, নাটক প্রভৃতিতে ‘শাহনামা’র নানা গল্প ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সর্বশেষ মোঘল বাদশা বাহাদুর শাহ ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। সেদিক থেকে আমাদের আবেগের সাথে ফারসি সাহিত্যের একটি সম্পর্ক রয়েছে।

ইরানি চলচ্চিত্র বিশ্বের চলচ্চিত্র অঙ্গনে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত। সম্প্রতি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানি চলচ্চিত্রের জয়জয়কার। ইরানি চলচ্চিত্রের গল্পগুলো যেন আমাদের সমাজের, আমাদের লোকদেরই গল্প। তেহরান ফজর ফিল্ম ফেস্টিভাল একটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব। ইরানিদের পথনাটকও অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলে যে বিশ্বনাটক দেখানো হয় সেখানে আমরা ইরানি নাটকের অনুবাদ দেখলে খুশি হব। এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। 

তিনি বলেন, ইরানের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা আমাদের প্রেরণার বিষয়। এত চাপের মুখেও ইরান সাম্রাজ্যবাদীদের সামনে মাথা নত করে নি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ইরান যেন একাই লড়াই করে যাচ্ছে। আর এ কারণে খোদ সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মানুষগুলোর কাছেও ইরানের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে।
ড. কাযেম কাহদুয়ী বলেন, ৪০০০ বছর পূর্বে ইরানি নওরোয চালু হয়। নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য ইরানিরা বাড়ি-ঘর পরিষ্কার করে, নতুন পোশাক ক্রয় করে। নববর্ষে তারা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যায়; পরস্পরের মধ্যে উপহার বিনিময় করে। ‘হাফ্ত সীন’ বা সীন অক্ষর দিয়ে শুরু সাতটি জিনিসের সমন্বয়ে একটি টেবিল সাজায়। তারা কিবলামুখী হয়ে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যাতে বছরটি ভালোভাবে অতিবাহিত করতে পারে। প্রায় ১৩ দিন ইরানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। ১৩তম দিনে ইরানিরা পার্কে বেড়াতে যায়।

ড. কাযেম কাহদুয়ী ‘হাফ্ত সীন’-এ ব্যবহৃত সামগ্রীগুলোর বর্ণনা দেন এবং প্রতিটি সামগ্রী কোন্ জিনিসের প্রতীক তা ব্যাখ্যা করেন।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীবৃন্দ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সাংস্কৃতিক দল।


প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সাংস্কৃতিক দল নওরোয নিয়ে ইমাম খোমেইনী রচিত একটি ফারসি সংগীত এবং নববর্ষকে আবাহন করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গানটি পরিবেশন করেন। 
সবশেষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীবৃন্দ একের পর এক মনোজ্ঞ বাউল সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।