মঙ্গলবার, ১৯শে জুন, ২০১৮ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

ঢাকায় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার’ শীর্ষক আলোচনা সভা

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১১, ২০১৮ 

news-image

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও নবীকন্যা হযরত ফাতিমা যাহরার জন্মদিবস উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে রাজধানী ঢাকায় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও যাহরা এসোসিয়েশন, বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনার ইউনিভার্সিটির কনভেনশন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মিসেস জাহানারা পারভীন। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের পত্নী যায়নাব ভায়েজী ও ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. ফারহানা হেলাল মেহতাব। সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন আল মোস্তফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ শাখার প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসিলিমীন শাহাবুদ্দীন মাশায়েখী রাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যাহরা এসোসিয়েশনের চেয়ারপার্সন মিসেস সেলিনা পারভীন।

অনুষ্ঠানে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জাহানারা পারভীন বলেছেন, নারীকে তার অবদানের স্বীকৃতি প্রদান ও তাকে সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করা নারী দিবস পালনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। বর্তমান সরকার নারীর কল্যাণে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিধবা ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষুদ্রঋণ প্রদান ইত্যাদি। তিনি বলেন, ইসলামে নারীকে যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে সেই মর্যাদায় নারীকে অধিষ্ঠত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

অনুষ্ঠানে হুজ্জাতুল ইসলাম শাহাবুদ্দীন মাশায়েখি রাদ বলেন, আমরা এই দিবসটি নারী দিবসের পাশাপাশি মা দিবস হিসেবেও পালন করি। তবে অন্যরা যেভাবে কোন দিবস পালন করেন আমরা সেভাবে তা পালন করি না। তারা দিবস পালন করে সান্তনা দানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমরা নারীর প্রতি ও মায়ের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য দিবস পালন করি। নারীর কাজ ও তাঁর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহান। মায়ের জায়গা থেকে নারীকে সমাজে প্রভাব ফেলতে হবে। নারী জাতির আদর্শ হযরত ফাতিমা নারীত্বের জায়গা  ও মাতৃত্বের জায়গা থেকেই এই দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অবস্থান থেকে যদি সে সরে যায় তবে তার মর্যাদার অবনমন হয়।

অনুষ্ঠানে যেইনাব ভায়েজী বলেন, ইসলামে নারী-পুরুষকে লিঙ্গের ভিত্তিতে মর্যাদা প্রদান করেনি। বরং নারী – পুরুষের কর্মকাণ্ডই তার মর্যাদার কারণ। পবিত্র কুরআনে মুমিনদের উদাহরণ দিতে গিয়ে বিবি আছিয়া ও হযরত মারইয়ামের কথা বলা হয়েছে। এখানে নারী-পুরুষ সকলের জন্য তাঁদেরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে কাফিরদের উদাহরণ দিতে গিয়ে হযরত নুহ ও লূত (আ.) এর স্ত্রীদের কথা বলা হয়েছে। কোরআনে ঐশী ও মানবীয় গুণ অর্জনের ক্ষেত্রেও লিঙ্গের পার্থক্য করা হয় নি। ইসলাম সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে অংশগ্রহণের অধিকার দিয়েছে। এদিক থেকে পাশ্চাত্য বিশ্ব ১৩০০ বছর পিছিয়ে রয়েছে। ইউরোপ নারীকে পর্দা থেকে বের করে এনে এর নাম দিয়েছে স্বাধীনতা আর শালীনতাকে নাম দিয়েছে বন্দিত্ব। অথচ প্রকৃতপক্ষে পর্দা ও শালীনতাই হলো মর্যাদা। আর পর্দার মধ্যে থেকেই প্রতিটি কাজ করার ক্ষেত্রে নারী স্বাধীন।

প্রফেসর ড. ফারহানা হেলাল মেহতাব বলেন, ইসলাম-পূর্ব সভ্যতায় নারী অত্যাচারিত অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করত। ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীকে ক্রীতদাসের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করা হতো। ভারতীয় সভ্যতায় নারীকে স্বামীর মৃত্যুর পর একইসাথে চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো। আরবে নারীকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। তাদের কোন ধরনের অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হতো না। কিন্তু ইসলাম নারীকে স্বীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ইসলাম নারীকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অধিকার দিয়েছে। ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান, পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার মধ্য দিয়ে তারা এসব ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে।

জনাব সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনী বলেন, ইসলামি শিক্ষার বিপরীতে পশ্চিমা বস্তুবাদীদের পক্ষ থেকে নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে সর্বদা ব্যাপক প্রচারণা চলছে। তারা নারীর হারানো অধিকারকে ফিরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অবাধ স্বাধীনতার নামে নারীকে কেবল এক ধরনের পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। তারা নারীকে আধুনিক দাসত্বের দিকে নিয়ে আসছে। তাই অত্যাধুনিক এই যুগে নারীর প্রকৃত্ব ব্যক্তিত্ব ও অবস্থান তুলে ধরা ইসলামের মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি।

তিনি আরো বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান গত ৪ দশকে নারীর অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইরানের নারীরা আজ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষকরে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, সমাজ ও রাজনীতি, খেলাধুলা, শিল্পকর্মসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

উল্লেখ্য, ইরানে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর ২০শে  জামাদিউস সানী মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কন্যা ও মহাবিশ্বের নারীদের সর্বোত্তম আদর্শ হযরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)-এর জন্মের দিনটিকে ‘নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় এবং এরপর থেকে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশটিতে নারী দিবস উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

সভায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন আমেনা বেগম লাবনী ও হযরত ফাতিমার শানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন জনাব শাহ নওয়াজ তাবীব।