বুধবার, ১৩ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৯শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ঢাকার মঞ্চ মাতালো ইরানের লোকসঙ্গীত দল রাস্তাক

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১৩, ২০১৭ 

news-image

ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের শেষ দিনে মঞ্চ মাতালো ইরানের লোকসঙ্গীত দল রাস্তাক। এদিন পরিবেশনায় ছিল দেশ-বিদেশের জনপ্রিয় সব লোকসঙ্গীতের দল, তবে সব ছাড়িয়ে স্টেডিয়াম জুড়ে ইরানি লোকসঙ্গীত দল রাস্তাকের প্রশংসা ছিল সবচেয়ে বেশি। ভাষা না বুঝলেও যে গান মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে তা বোধ হয় রাস্তাকের পরিবেশনা না দেখলে এত সহজ ও সুন্দরভাবে বুঝা যেত না।

যারা গান শুনতে গিয়ে কখনো মন থেকে হাততালি দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তারাও রাস্তাকের পরিবেশনার সময় হাততালি দিয়েছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। বাংলা চলচ্চিত্রে যারা সাপের বাঁশি শোনেছেন তারা খুব সহজেই এই গান আত্মস্থ করতে সক্ষম হবেন। তাদের চমৎকার পরিবেশনার পর মঞ্চে আসেন বাসুদেব বাউল। পশ্চিমবঙ্গের এই শিল্পী প্রথমেই গেয়েছেন ছেড়ে দিলে মনের মানুষ আরতো পাবো না’ শেষ করেছেন পিরিতি কাঁঠালের আঠা গানটি গেয়ে।

উৎসবের শেষ পরিবেশনা নিয়ে আসে আফ্রিকার তিনারিওয়েন। হৃদয়গহিনে লোকসঙ্গীত যে ধরনের অনুভূতির পরিস্ফুরণ ঘটায় তা কেবল সঙ্গীতপাগল মানুষেরাই ভালো জানে। সুরের উচ্ছ্বাস ও তাল, লয়ের অনবদ্য শৈল্পিকতা হৃদয়ের গহিনে কী ধরনের অনুরণন ঘটায় তা কেবল সুরপিয়াসীরাই বোঝে। নন্দনতত্ত্বের এই একটি মাধ্যমের দ্বারাই সারা বিশ্বের সব ভাষাভাষীর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া যায়। ভাষা যতই অপরিচিত হোক কিন্তু মেলোডি আর সুরের উত্তাপ সুরের কাঙালদের মনমন্দিরে ভালোলাগা আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবেই। মুহুর্মুহু করতালি, উচ্ছ্বাস, নাচের উদ্দামতা আর ওয়ান মোর ধ্বনিতে আফ্রিকার মালির গানের দল তিনারিওয়েন ও দলটির প্রধান ভোকাল ইব্রাহিম আগ আলহাবিবকে অভিনন্দিত করেছে প্রায় অর্ধলক্ষ সুরপিয়াসী। তিন রাতের ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব ২০১৭’। আফ্রিকার মালির সঙ্গীতের একটি বিশেষত্ব হলো আফ্রিকান ভাষার সাথে আরবি ভাষার সংমিশ্রণের ব্যতিক্রমী ফিউশন। আর এই ফিউশনের কারণেই আফ্রিকার দেশ মালির সঙ্গীত সারা বিশ্বের সঙ্গীত সমঝদারদের কাছে ব্যাপক সমাদর অর্জন করেছে। ইনস্ট্রুমেন্টাল আর মেলোডির ভিন্ন রকমের দ্যোতনা তৈরি করে মালির শিল্পীরা তাদের লোকসঙ্গীতকে অনন্য এক উচ্চতায় উন্নীত করেছে।  এবারের আসরে বাংলাদেশসহ আটটি দেশের ১৪০ জন শিল্পী অংশ নিয়েছেন।

বাউল সাধক শাহ আলম সরকার এবং পালাগানের শিল্পী আলেয়া বেগমের পালাগানের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হয় শেষ রাতের সুরের আসর। পালাগানের এই লড়াইয়ে শাহ আলম সরকার শরিয়তের ভূমিকায় আর আলেয়া বেগম ছিলেন মারফতের ভূমিকায়। দু’জনেই গানে গানে প্রশ্ন উত্তর কখনোবা প্রশ্ন পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে পালা উপহার দেয়। শাহ আলম সরকার গেয়ে শোনান ‘আকাশটা কাঁপছিল কেন, ‘মায়ের কান্দন যাবত জীবন, ‘বান্ধিলাম পীরিতের ঘর, ‘খড় কুটার এক বাসা বাঁধলামসহ বেশ কিছু গান। এর জবাবে মারফতের ভূমিকায় থাকা আলেয়া বেগম পরিবেশন করে ‘মানুষও রতন করো তারে যতন’। এভাবে একটার পর একটা গানের মধ্য দিয়ে শরিয়ত ও মারফতে তাদের বক্তব্য তুলে ধরে পালাগানের এই দুই শিল্পী। প্রায় ৪৫ মিনিটের এই পরিবেশনা লোকসঙ্গীতের অনুরাগীদের মুগ্ধ করে রাখে। এরপর মঞ্চে আসেন দেশের লোকগানের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা শাহনাজ বেলী। লালনের দেহতত্ত্বনির্ভর গান ‘স্বভাব না হলে চাতক’ দিয়ে শুরু করে একে একে তিনি পরিবেশন করেন শাহ আবদুল করিমের ‘আইলা না আইলারে বন্ধু’ ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে, ‘তুমি যাই ও না যাই ও কান্দাইয়া’ এবং সবশেষে হাছন রাজার গানের মধ্য দিয়ে মঞ্চ থেকে নামেন এই শিল্পী।

এরপর সুইডিস গিটার প্লেয়ার কাম গায়ক মিকাল হেমনিটি উইনথার গিটারের ধুন আর অসাধারণ গায়কীতে মুগ্ধতা ছড়ান সমগ্র স্টেডিয়ামে। এই পরিবেশনা শেষে মঞ্চে আসেন ভারতের বাসুদেব দাস বাউল। তোমার হৃদমাজারে রাখবো, দিয়ে শুরু করে সোঁদামাটির গন্ধ মিশ্রিত সুরের উষ্ণতায় স্টেডিয়ামভর্তি দর্শক শ্রোতাদের হৃদয়ে নিজের ঠাঁই করে নেন ভারতের এই বাউল। শেষ রাতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ইরানের গানের দল ‘রাস্তাক’। ফার্সি সঙ্গীতের সাথে গিটার, বেজ গিটার, বাঁশি ও ঢোলের অপূর্ব সমন্বয়ে লোকসঙ্গীতের ফিউশনে সঙ্গীতের অনুরাগীদের হারিয়ে নিয়ে যান সঙ্গীতের দ্যোতনায়।

ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের সংগীত ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার ঢাকায় আসে দলটি। বিশ্বব্যাপী সংগীতের শ্রোতাদের কাছে ফারসি লোকসংগীত, ভাষা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে অনবদ্য অবদান এই দলের। ১৯৯৭ সালে তেহরানে যাত্রা শুরু করে এই ফারসি লোকসংগীত দল।মূলধারার সংগীতের সঙ্গে ফারসি লোকসংগীতকে মিশিয়ে পরিবেশন করেন তাঁরা।এছাড়া ফারসি লোকসংগীত নিয়ে গবেষণাও করে দলটি।বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের কাছে ফারসি লোকসংগীতের নতুন দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাস্তাক। রাস্তাকের দলনেতা সিয়ামক সেপেহরি মনে করেন,  প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে সংগীতের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।তাঁদের প্রাথমিক ভাবনা ছিল ইরানের ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ করা। এ জন্যই তাঁদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশের সংগীতকে মিলিয়ে-মিশিয়ে উপস্থানের চেষ্টা করেন তাঁরা।